Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • মুকুটান্তর’
    আমাদের দেশে পদক আর পাপের দূরত্ব খুব বেশি নয়। কখনো কখনো একটি ক্রেস্ট আর একটি কারণ দর্শানোর নোটিশের মাঝখানে কেবল দুটি সরকারি আদেশের ব্যবধান থাকে। আজ যিনি ফুলের তোড়া হাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন, কাল তিনিই পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত। আজ যিনি জেলার শ্রেষ্ঠ, কাল তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ আলোচ্য বিষয়। আর পরশু তিনি চায়ের দোকানের স্থায়ী বিতর্ক।
    এই দেশের মানুষ সম্মান দিতে ভালোবাসে। আরও বেশি ভালোবাসে সম্মানপ্রাপ্ত মানুষের পতন দেখতে। আমরা কাউকে মঞ্চে তুলতে যতটা আনন্দ পাই, তাকে মঞ্চ থেকে নামতে দেখেও প্রায় একই রকম আনন্দ পাই। আমাদের সামাজিক বিনোদনের বড় অংশ জুড়েই আছে এই ওঠা-নামার দৃশ্য।
    সেই জেলা শহরের এক থানার ওসি ছিলেন শফিক সাহেব। কর্মদক্ষতার মূল্যায়নে তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি নির্বাচিত হলেন। জেলা পুলিশের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় তাকে সম্মাননা দেওয়া হলো। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি হাসছেন। এক হাতে ক্রেস্ট, অন্য হাতে ফুল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠছে।
    উপস্থিত সবাই হাততালি দিল।
    হাততালি বড়ই বিচিত্র জিনিস। এর কোনো স্থায়ী আদর্শ নেই। আজ যে হাততালি দেয়, কাল সেই হাতই টেবিলে থাপ্পড় মেরে বলে, “আমি আগেই বুঝছিলাম লোকটার মধ্যে গণ্ডগোল আছে।”
    পরদিন স্থানীয় পত্রিকায় খবর ছাপা হলো—”জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি”।
    ফেসবুকে অভিনন্দনের বন্যা বয়ে গেল।
    “দেশ আপনাদের মতো কর্মকর্তাদের হাতেই নিরাপদ।”
    “স্যার, আপনাকে নিয়ে আমরা গর্বিত।”
    “বাংলাদেশ পুলিশের গর্ব।”
    এমনকি একজন লিখলেন, “এমন অফিসারদের কারণে পৃথিবী এখনো টিকে আছে।”
    পৃথিবী অবশ্য টিকে ছিল ডাইনোসরের সময়ও, টিকে ছিল মোগল আমলেও, টিকে আছে ইন্টারনেটের যুগেও। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পৃথিবী প্রতিদিনই কারও না কারও কারণে টিকে থাকে।
    পুরস্কার পাওয়ার কয়েকদিন পর শফিক সাহেব হজে গেলেন।
    বিদায়ের সময় অনেকেই তাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে গেল। কেউ বলল, “স্যার, আমাদের জন্য দোয়া করবেন।”
    কেউ বলল, “কাবা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে দেশবাসীর জন্য দোয়া করবেন।”
    এক ব্যবসায়ী আলাদা করে কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “স্যার, আমার একটা মামলার বিষয় আছে… ফিরে এসে একটু দেখবেন।”
    মানুষ আশ্চর্য প্রাণী। সে পৃথিবীর যেখানেই যাক, তার ব্যক্তিগত দরখাস্ত সঙ্গে নিতে ভুলে না।
    হজ মহান ইবাদত। সেখানে মানুষ সাদা কাপড় পরে, নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে, নিজের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করে। সেখানে রাজা-প্রজা নেই, বড়-ছোট নেই। সবাই এক পোশাকে, এক কাতারে।
    কিন্তু দেশে ফিরে আসার পর সমাজ আবার সবাইকে তার পুরোনো পরিচয়ে ফিরিয়ে আনে।
    শফিক সাহেব ফিরে এলেন।
    এবার আর তিনি কেবল ওসি নন; তিনি “হাজী ওসি”।
    তার নামের আগে অদৃশ্যভাবে একটি সম্মানসূচক স্তর যুক্ত হয়ে গেল।
    কেউ খেজুর চাইতে এল।
    কেউ জমজমের পানি।
    কেউ বলল, “হাজী সাহেব, আপনার দোয়ায় আমার ছেলে যেন চাকরি পায়।”
    এক ভদ্রলোক আবার বললেন, “হাজী সাহেব, আমার বিরুদ্ধে একটা জিডি আছে, একটু দেখবেন।”
    হজ থেকে ফেরা মানুষের কাছেও আমাদের প্রত্যাশা বড় বাস্তবমুখী।
    এদিকে থানার এক কনস্টেবল খেয়াল করলেন, ওসি সাহেবের কক্ষে একটি নতুন ফ্রেম টাঙানো হয়েছে।
    তাতে লেখা—
    “জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি।”
    ফ্রেমের নিচে সোনালি অক্ষরে তার নাম।
    লোকজন কক্ষে ঢুকে আগে ফ্রেমের দিকে তাকায়, তারপর ওসির দিকে।
    মনে হয়, ক্রেস্টটি যেন মানুষের ওপর আরেকটি পরিচয় আরোপ করে দিয়েছে। তিনি এখন আর শুধু মানুষ নন; তিনি এক টুকরো সম্মাননা।
    কিন্তু সম্মাননা অনেকটা কাঁচের গ্লাসের মতো। দেখতে ঝকঝকে, কিন্তু হাত ফসকালেই ভেঙে যায়।
    এক সকালে হঠাৎ গুঞ্জন শুরু হলো।
    তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
    ঘুষ, চাঁদাবাজি, অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা—বিভিন্ন অভিযোগ।
    প্রথমে মানুষ বিশ্বাস করল না।
    এক দোকানদার বললেন, “অসম্ভব! জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি!”
    অন্যজন বললেন, “তার ওপর আবার হজ করে এসেছেন!”
    তৃতীয়জন চা নেড়ে বললেন, “হজ করে আসলে কি অভিযোগপত্র বাতিল হয়ে যায়?”
    চায়ের দোকান হঠাৎ নীরব হয়ে গেল।
    আমাদের দেশে ধর্মীয় পরিচয় এবং প্রশাসনিক পুরস্কার—দুটোই মানুষকে প্রায় অলৌকিক মর্যাদা দিয়ে দেয়। আমরা ধরে নিই, সম্মানপ্রাপ্ত মানুষ আর ভুল করতে পারেন না।
    কিন্তু ইতিহাসের একটা মজার বৈশিষ্ট্য আছে—সে কোনো ক্রেস্টকে ভয় পায় না।
    খবর এল—ওসি সাহেবকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
    পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত।
    তদন্ত হবে।
    শহর উত্তেজনায় ফুটতে লাগল।
    যারা গত মাসে তাকে নিয়ে গর্ব করেছিলেন, তারা এবার নতুন বাক্য আবিষ্কার করলেন।
    “আমি আগেই বুঝছিলাম।”
    এই “আগেই বুঝছিলাম” জাতির সদস্যরা পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় জনগোষ্ঠী।
    ঘটনা ঘটার আগে তারা কিছুই বলেন না।
    ঘটনা ঘটার পর তারা ঘোষণা করেন যে সবকিছুই তারা আগে থেকে জানতেন।
    একজন বললেন, “লোকটার চোখই ভালো লাগত না।”
    অন্যজন বললেন, “আমি প্রথম দিন দেখেই বুঝছিলাম।”
    পাশে দাঁড়ানো লোকটি জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আগে বলেননি কেন?”
    ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, “সব কথা কি আর বলা যায়!”
    এই জাতির বিশেষত্ব হলো, তারা সব জানেন; শুধু সময়মতো জানান না।
    এদিকে পুরস্কার প্রদান কমিটিরও মন খারাপ।
    এক কর্মকর্তা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মানুষকে চেনা বড় কঠিন।”
    অন্যজন বললেন, “মানুষকে চেনার চেয়েও কঠিন হচ্ছে শ্রেষ্ঠ মানুষ নির্বাচন করা।”
    তৃতীয়জন বললেন, “আমাদের মনে হয় পুরস্কারের সঙ্গে মেয়াদও লিখে দেওয়া উচিত—পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ।”
    প্রস্তাবটি উপস্থিত সবাই গভীরভাবে বিবেচনা করলেন।
    আসলে আমাদের দেশে শ্রেষ্ঠত্ব অনেকটা দইয়ের মতো। মেয়াদ থাকে, কিন্তু প্যাকেটে লেখা থাকে না।
    এদিকে থানার কনস্টেবলটি বিপদে পড়ল।
    দেয়ালে টাঙানো “জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি” লেখা ফ্রেমটি নামাবে কি না, সে বুঝতে পারছে না।
    কারণ সম্মাননা সত্যি।
    আবার অভিযোগও সত্যি হতে পারে।
    অথবা নাও হতে পারে।
    ফ্রেমটি দেয়ালে ঝুলছে আর কনস্টেবলটি তাকিয়ে আছে।
    মনে হচ্ছে, দেয়ালে টাঙানো সোনালি অক্ষর আর টেবিলে রাখা কালো ফাইল পরস্পরের দিকে চেয়ে আছে।
    একজন বলছে, “আমি সম্মান।”
    অন্যজন বলছে, “আমি তদন্ত।”
    একজন বলছে, “আমি অতীত।”
    অন্যজন বলছে, “আমি বর্তমান।”
    আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন মানুষটি—যিনি একসময় জেলার শ্রেষ্ঠ ছিলেন, এখন জেলার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
    বিকেলে চায়ের দোকানে আবার আড্ডা বসেছে।
    নুরু মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “দুনিয়া বড় অদ্ভুত।”
    জলিল বললেন, “দুনিয়া অদ্ভুত না। আমরা অদ্ভুত। আমরা মানুষকে মানুষ থাকতে দিই না। কখনো তাকে ফেরেশতা বানাই, কখনো শয়তান।”
    নুরু মিয়া বললেন, “তাহলে সত্য কোথায়?”
    জলিল চায়ের কাপ নামিয়ে উত্তর দিলেন, “সত্য সম্ভবত মাঝখানে কোথাও বসে আছে। এক হাতে সাদা হজের টুপি, আরেক হাতে কালো তদন্তের ফাইল নিয়ে।”
    সন্ধ্যার আজান ভেসে এল।
    চায়ের দোকানে নীরবতা নেমে এলো।
    পত্রিকার একটি পুরোনো কাটিং উড়ে এসে রাস্তার পাশে পড়ল।
    তাতে দেখা যাচ্ছে—একজন কর্মকর্তা হাসিমুখে সোনার ক্রেস্ট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।
    আর নতুন খবরের কাগজে শিরোনাম—
    “অভিযোগের পর প্রত্যাহার।”
    দুটি ছবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ—
    আমরা মানুষকে যাচাই করার আগেই মুকুট পরাই, আর তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই মুকুট খুলে নিতে উদ্যত হই।
    এই দেশে সাদা টুপি, সোনার ক্রেস্ট আর কালো ফাইল—তিনটিই স্থায়ী নয়।
    স্থায়ী কেবল আলোচনা।
    আর চায়ের দোকান।

    6
    4 Comments
    • ক্রেস্টের ঝিলিক আর তদন্তের ফাইল—দুইয়ের মাঝখানে মানুষটা কেবল এক ক্ষণস্থায়ী পুতুল, আর সমাজটা চিরস্থায়ী এক চায়ের দোকান!

    • সম্মান আর অভিযোগের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ, ক্রেস্ট আর ফাইলের দ্বন্দ্বে…..🤍🖤

    • লেখাটা খুব বাস্তব মনে হলো আমাদের সমাজের একটা বড় সত্য
      “আমরা মানুষকে মানুষ থাকতে দিই না”
      শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আগ্রহ নিয়ে পড়লাম। দারুণ লিখেছেন। 🌿

    • একটি ক্রেস্ট, একটি ফাইল—আর মাঝখানে মানুষের ভঙ্গুর পরিচয়

Skip to toolbar