-
প্রসঙ্গ – কৃষি ও কৃষক
—————————
কৃষি ও কৃষক প্রসঙ্গে কথা বলার আগে একটা লেখা শেয়ার করতে চাই প্রথমে। লেখক: রোমেন রায়হান।
“জাপানিজরা সবচে পছন্দ করে যে ভাত খায় সেটা স্টিকি। মানে ভাতের দানা একটার সাথে আরেকটা লেগে থাকে। আমার ধারণা ছিল স্টিকি ভাত কাঠি দিয়ে সহজে খাওয়া যায় বলেই জাপানিজরা এটা এত পছন্দ করে।
আমার সাত বছরের জাপান জীবনের শুরুর দিকে আমি এই ভাত খেতে একদমই পছন্দ করতাম না। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো জাপানের বাজারে জাপানি কৃষকদের উৎপাদিত এই বিশেষ ভাতের চালের দামই সবচেয়ে বেশি।
বাজার থেকে কয়েকবার বিভিন্ন ধরণের চাল কেনার পর বুঝলাম এই চাল যদি জাপানিজরা নিজেরা উৎপাদন না করে আশেপাশের কোন দেশ থেকে আমদানি করতো তাহলে এর দাম বেশ কম পড়তো। আমি কৌতুহলী হয়ে আমার সুপারভাইজার প্রফেসর কামিজিমাকে একবার জিজ্ঞেসই করে ফেললাম
আমিঃ আচ্ছা প্রফেসর, তোমরা এই চাল বিদেশ থেকে আমদানি করো না কেন? আমদানি করলে তো দাম অনেক কম পড়তো!
কামিজিমাঃ তা হয়তো পড়তো!
আমিঃ তাহলে!
কামিজিমাঃ সরকার ইচ্ছে করেই কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদন খরচের অনেক বেশি দামে এই চাল কেনে।
আমিঃ কেন?
কামিজিমাঃ কৃষকদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
আমিঃ মানে?
কামিজিমাঃ কৃষক যদি ভালো দাম না পায় তাহলে কি ওরা আর কৃষিকাজ করবে? পেশা বদলে ফেলবে না!
আমিঃ তাই বলে সরকার এত বেশি দামে চাল কিনবে কৃষকদের কাছ থেকে?
কামিজিমাঃ শোনো, আমরা আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা ভুলিনি। জাপান একটা দ্বীপরাষ্ট্র। ঐরকম একটা যুদ্ধ যদি আবার কখনো লাগে আর শত্রুরা যদি আমাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে! তখন কী হবে ভেবেছ?
আমিঃ বুঝলাম না!
কামিজিমাঃ বাইরে থেকে কোন খাবার জাপানে আসতে পারবে? আমরা কি তখন এই টয়োটা গাড়ি খাব? কৃষক যদি না বেঁচে থাকে তাহলে আমরা ঐসময় বাঁচব?
আমি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম কামিজিমার কথা শুনে।“বাংলাদেশে আমরা কৃষি বলতে মূলত বুঝি মাঠের কৃষি কাজকে, মানে ধান, পাট কিংবা ভুট্টার চাষ। আদতে কৃষি একটি বৃহৎ শিল্প, যার অন্তর্ভুক্ত যাবতীয় খাদ্যপণ্য, গৃহপালিত প্রাণি বা লাইভস্টক থেকে শুরু করে হস্ত ও কারুপণ্য এবং এদের সাথে সম্পৃক্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সমূহ। একটি জাতির প্রাণপ্রবাহ নির্ভর করে কৃষির উপর, আর তাই উন্নত বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে হলেও এই সেক্টরটিকে চলমান রাখার নীতি মেনে চলে। এখানে কৃষি মানেই সম্মানের পেশা আর কৃষক সমাজের এক সমৃদ্ধ ও বিত্তবান শ্রেণী। পশ্চিমে যারা পরিচিত কান্ট্রি পিপল নামে। কান্ট্রি পিপলদের নিয়ে শত শত বছর ধরে সঙ্গীত-সিনেমা-সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ধারা চলে আসছে, এবং সময়ের সাথে সাথে যা আরো সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় হচ্ছে। শহুরে বা সিটি পিপলদের চাইতে কান্ট্রি পিপলদের আলাদা মনে করা হয়, যা শতভাগ সত্যি। আচরণ, কালচার কিংবা জীবনধারা, সবকিছুতেই কান্ট্রি পিপলরা আলাদা। যখন একজন শহুরে মানুষকে মনে করা হয় মোস্ট কমপ্লিকেটেড, তখন একজন কান্ট্রি পিপল মানে এক সহজ সাধারণ নির্ঝঞ্ঝাট প্রতিনিধি। আজকের সবচাইতে উন্নত আমেরিকা কিংবা ইউরোপের ক্ষেত্রেও এটা একইভাবে প্রযোজ্য।
বিপরীতে আমরা যদি আত্মসমালোচনা করি, কি দেখব? বাংলাদেশে কৃষক শ্রেণী ও কৃষি নিয়ে মুখে মুখে আমরা যত যাই বলি না কেন, আদতে সমাজের এক নিম্নবর্গীয় অভাবী শ্রেণী হলো কৃষক, আর পেশা হিসেবে কৃষি কাজ উল্লেখ করার মতো কিছু নয়। আর তাই একজন কৃষকের সন্তান যখন পড়ালেখা করে কোনো একটা চাকুরি জোগাড় করতে পারে, কৃষক বাবার আনন্দ তখন যেনো আর ধরেই না। এমনকি সেটা যদি হয় শহরের কোনো অফিসের পিয়ন, বাড়ির দারোয়ান কিংবা অন্য কোনো চাকুরি। আমার জীবদ্দশায় আমি অন্তত এমন দেখিনি যে একজন কৃষকের সন্তান কৃষি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করে বাবার সাথে কৃষি কাজে যোগ দিয়েছে, আর সেই বাবা গর্ব করে সমাজের সবাইকে সেই কথা বলে বেড়াচ্ছেন। অবশ্য এতে কৃষক বাবার কোনো দোষ দেখি না। যেই শ্রেণীটাকে আমরা জাতীয়ভাবে সমাজের সবচাইতে দুর্ভাগা ও সমস্যাক্রান্ত এক শ্রেণী বানিয়ে রেখেছি, কোন বাবা চাইবেন তার সন্তান সেই শ্রেণীর একজন প্রতিনিধি হোক? শাসকেরা বাংলাদেশকে আমেরিকা, ইউরোপ বানাতে চান। দাবী করেন আমরা আলরেডি সিংগাপুর, মালয়েশিয়া হয়ে গিয়েছি। তারা কি জানেন স্বপ্নে দেখা এই জাতিগুলির সবচাইতে সমৃদ্ধ শ্রেণী কোনটি? সমাজের কোন শ্রেণীটিকে সবসময় আগলে রাখতে হয়? কখন একটি জাতি উন্নত জাতি হয়??
মেলবোর্ন সি,বি,ডির প্রাণকেন্দ্রে আমার আফিস ছিল ১৭তলা একটি ভবনের ১৪তলায়। একদিন দুপুরে শহরময় যেনো তুলকালাম শুরু হলো। শান্ত নিরপদ্রুপ শহরজুড়ে অসংখ্য হার্লে ডেভিডসন মোটরসাইকেলের গগনবিদারী চিৎকার। জানালার পাশে গিয়ে এক ঝলক নীচের দিকে তাকালাম। দেখে মনে হলো সারিবদ্ধ মোটরসাইকেলের র্যালি, ঠিক যেন সিনেমায় দেখা মোটরসাইকেল গ্যাং। আমার এক অস্ট্রেলীয় কলিগের দিকে তাকালাম। আশা করেছিলাম তার মুখে বিরক্তির রেখা দেখতে পাব। না, সেটা দেখতে পাইনি। তার মুখে ছিল এক ধরনের কৌতুহল, এক ধরনের হাসি। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সে বলল- ফার্মার্স আর ইন দ্য সিটি। মানে দলবেধে কান্ট্রিসাইড থেকে ফার্মাররা এসেছে আজ শহরে। আহা…
বাংলাদেশ কোনো একদিন উন্নত হবে। জাতি হিসেবে মাথা উচু করে দাঁড়াব আমরা পৃথিবীর বুকে। আমাদের সমাজের সবচাইতে সমৃদ্ধ শ্রেণী হবে কৃষক শ্রেণী। তারা যখন হার্লে ডেভিডসনে চড়ে বুম বুম শব্দে শহরে প্রবেশ করবে, শহরের মানুষজন তখন সরে গিয়ে তাদেরকে পথ করে দেবে। দূর থেকে তর্জনি তুলে কেউ একজন বলে উঠবে- লুক.. ফার্মার্স আর ইন দ্য সিটি… আনন্দে তার চোখ-মুখ ঝলমল করবে… এই প্রত্যাশায়
5 Comments
Friends
bithy 123 bithy
@bithy123bithy
Nahian Hasan
@hasan009
Ashaduzzaman-Khokon
@ashaduzzaman-khokon
Fatima Sadia
@fatimasadia
Redwan Khan
@redwan-khan
BONI AMIN
@boniamin
রিফায়াত নিগার
@refayat-nigar
TARIN
@tarin
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ] [ জাকের আদিত্য ]
@md-zaker-hayat-khan


একটি জাতির অগ্রগতি শুধু মাথাপিছু আয়ে নয়, তার কৃষকের মুখের হাসিতে মাপা উচিত। যেদিন কৃষক পেশা নয়, গর্বের পরিচয় হবে—সেদিনই উন্নয়নের দাবি সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হবে।