-
“মৃত্যু সময়কে থামিয়ে দেয়, অথচ রবীন্দ্রনাথ সময়কে চলতে শিখিয়েছেন।”
— পংকজ প্রিয়মমৃত্যু মানুষের জীবনের শেষ উচ্চারণ। একদিন হৃদস্পন্দন থেমে যায়, চোখের আলো নিভে আসে, পরিচিত পৃথিবী থেকে মানুষটি হারিয়ে যায়। ঘড়ির কাঁটা অবশ্য থামে না; নদী তার গতিতে বয়ে যায়, ঋতু আসে-যায়, সূর্য প্রতিদিন পূর্বাকাশে ওঠে। তবু একজন মানুষের জন্য সময়ের যে ব্যক্তিগত অধ্যায়, মৃত্যু সেখানে একটি পূর্ণচ্ছেদ বসিয়ে দেয়।
কিন্তু সব মানুষের মৃত্যু কি সত্যিই তাঁদের থামিয়ে দিতে পারে?কিছু মানুষ চলে যান, অথচ তাঁদের চলে যাওয়া শেষ হয়ে যায় না। তাঁরা থেকে যান শব্দে, সুরে, চিন্তায়, সৌন্দর্যবোধে, মানুষের জীবনদর্শনে। তাঁদের সৃষ্টি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে যায় এবং প্রতিবার নতুন করে অর্থ খুঁজে নেয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তেমনই একজন। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ। কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে থেমে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনযাত্রা। বর্ষার আকাশ যেন সেদিন নিজের ভাষায় শোক প্রকাশ করেছিল। একজন মানুষ চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শব্দগুলো থামল না। তাঁর কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠি, দর্শন ও শিক্ষাচিন্তা ক্রমেই নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছাতে থাকল।
সেখানেই এই উক্তিটির সবচেয়ে গভীর সত্য। মৃত্যু তাঁকে থামাতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু তাঁর ব্যক্তিগত সময়কে থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির সময়কে থামাতে পারেনি। বরং সময় যত এগিয়েছে, রবীন্দ্রনাথের রচনার নতুন নতুন পাঠ তৈরি হয়েছে। একসময় যে কবিতা একটি নির্দিষ্ট সময়ের অনুভূতি বহন করেছিল, পরবর্তী প্রজন্ম সেখানে খুঁজে পেয়েছে নিজের জীবন। যে গান কোনো একদিন কোনো নির্দিষ্ট মানুষের হৃদয়ের কথা বলেছিল, বহু বছর পর সেটিই অন্য কারও একান্ত অনুভূতির ভাষা হয়ে উঠেছে। এটাই বড় সৃষ্টির আশ্চর্য শক্তি।
একজন কবি তাঁর সময়ে লিখেছিলেন, কিন্তু তাঁর কবিতা যদি পরবর্তী সময়ের মানুষের হৃদয়ে কথা বলে, তবে তিনি আর শুধু তাঁর সময়ের কবি থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন সময়ের কবি। রবীন্দ্রনাথ সেই বিরল উচ্চতায় পৌঁছেছেন।
“সময়কে চলতে শেখানো” কথাটির অর্থ কী?
সময় নিজে তো চলবেই। তাকে কেউ চলতে শেখায় না। তাহলে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে সময়কে চলতে শেখালেন? এখানে “সময়” আসলে শুধু ঘড়ির কাঁটা নয়। সময় মানে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, রুচি, সমাজ, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের বিবর্তন।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষকে পুরোনো অন্ধত্বের বাইরে তাকাতে শিখিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, সৌন্দর্যকে নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছেন, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে নতুন ভাষা দিয়েছেন, প্রেমকে দিয়েছেন গভীর মানবিকতা, স্বাধীনতাকে দিয়েছেন আত্মমর্যাদার অর্থ। তিনি শুধু কবিতা লেখেননি; তিনি বাঙালির ভাবনার ভুবনকে প্রসারিত করেছেন।তাই “সময়কে চলতে শেখানো” আসলে একটি রূপক। এর অর্থ, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়কে অতিক্রম করে পরবর্তী সময়ের মানুষের চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিতে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়ার ক্ষমতা।
রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো তাঁর সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। একদিকে আছে প্রকৃতির সৌন্দর্য, অন্যদিকে মানুষের নিঃসঙ্গতা। কোথাও প্রেম, কোথাও বিচ্ছেদ। কোথাও দেশ ও সমাজের প্রশ্ন, কোথাও ব্যক্তিমানুষের আত্মঅন্বেষণ। কোথাও শিশুর নির্মল পৃথিবী, কোথাও সভ্যতার সংকট।
তাই একজন কিশোর রবীন্দ্রনাথকে যেমনভাবে আবিষ্কার করে, একজন প্রৌঢ় হয়তো তাঁকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে আবিষ্কার করেন। একই কবিতা বয়সের সঙ্গে বদলে যেতে পারে। একই গান জীবনের ভিন্ন সময়ে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। সৃষ্টির এই পুনর্জন্মই রবীন্দ্রনাথের সময়জয়ী শক্তি।
রবীন্দ্রনাথ শুধু অতীতের নন। রবীন্দ্রনাথকে আমরা অনেক সময় কেবল স্মরণের মানুষ করে ফেলি। জন্মদিনে তাঁর ছবি, প্রয়াণদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা, বিশেষ দিবসে তাঁর গান, কবিতা কিংবা উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা তাঁকে স্মরণ করি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে শুধু স্মরণ করলে তাঁর প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না।
তাঁকে পড়তে হয়। আর পড়তে হয় নতুন চোখে।
কারণ রবীন্দ্রনাথকে কেবল অতীতের কবি হিসেবে দেখলে তাঁর বিশালতার অনেকটাই অদেখা থেকে যায়। তিনি তাঁর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন, আবার ভবিষ্যতের মানুষের সঙ্গেও কথা বলার মতো সৃষ্টিশক্তি রেখে গেছেন।সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর রচনার পাঠও পরিবর্তিত হতে পারে। এটাই জীবন্ত সাহিত্যের লক্ষণ।
যে সাহিত্যকে প্রতিটি প্রজন্ম নতুন করে আবিষ্কার করে, সে সাহিত্য কখনো মৃত হয় না। মৃত্যু যেখানে শেষ নয়। মানুষের শরীরের মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু মানুষের চিন্তার মৃত্যু কি অনিবার্য? একজন মানুষ চলে যান। তাঁর কণ্ঠ আর শোনা যায় না। তাঁর হাত আর কলম ধরে না। কিন্তু তিনি যদি এমন কিছু সৃষ্টি করে যান, যা অন্য মানুষের চিন্তাকে জাগিয়ে রাখে, তবে তাঁর অস্তিত্ব অন্য এক রূপে চলতে থাকে।
সেই অর্থে মৃত্যু কেবল শরীরের সমাপ্তি।সৃষ্টিশীল মানুষের ক্ষেত্রে মৃত্যু কখনো কখনো নতুন এক যাত্রার শুরু। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁর জীবনের সময় শেষ হয়েছে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির সময় শুরু হয়েছে আরও দীর্ঘ পরিসরে। তিনি যখন বেঁচেছিলেন, তখন তিনি লিখতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর মানুষ তাঁকে নতুন করে পড়তে শুরু করেছে। এক প্রজন্ম তাঁর মধ্যে যা আবিষ্কার করেছে, পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো সেখানে অন্য কিছু খুঁজে পেয়েছে। এভাবেই একজন স্রষ্টা সময়ের ভেতর ক্রমাগত পুনর্জন্ম লাভ করেন।
আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মানুষের জীবনযাপন বদলেছে, যোগাযোগের ভাষা বদলেছে, সম্পর্কের ধরন বদলেছে, চিন্তার গতি বেড়েছে। হাতে থাকা ছোট্ট একটি যন্ত্র মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর আরেক প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে। তবুও মানুষের কিছু মৌলিক অনুভূতি বদলায়নি।
মানুষ এখনও ভালোবাসে।
মানুষ এখনও হারায়।
মানুষ এখনও একাকী হয়।
মানুষ এখনও প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চায়।
মানুষ এখনও স্বাধীনতা চায়।
মানুষ এখনও নিজের অস্তিত্বের অর্থ খোঁজে।এই জায়গাতেই রবীন্দ্রনাথ আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি কেবল তাঁর সময়ের মানুষের কথা লেখেননি; তিনি সব সময়ের মানুষের কথা লিখেছেন। আর মানুষ যতদিন থাকবে, মানুষের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, আশা-হতাশা, প্রশ্ন ও স্বপ্ন যতদিন থাকবে, ততদিন তাঁর সৃষ্টিরও নতুন পাঠ থাকবে।
“মৃত্যু সময়কে থামিয়ে দেয়”—এ কথাটি একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষেত্রে সত্য। কিন্তু “রবীন্দ্রনাথ সময়কে চলতে শিখিয়েছেন”—এই কথাটি তার চেয়েও গভীর একটি সত্যের দিকে আমাদের নিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ সময়কে ঘড়ির কাঁটার মতো চালাননি। তিনি মানুষের চিন্তাকে এগিয়ে দিয়েছেন।
তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর শব্দ থামেনি।
তাঁর গান থামেনি।
তাঁর প্রশ্ন থামেনি।
তাঁর সৌন্দর্যবোধ থামেনি।
তাঁর মানবিকতার আহ্বান থামেনি।একজন মানুষের মৃত্যু যেখানে একটি জীবনের দরজা বন্ধ করে, একজন মহৎ স্রষ্টার মৃত্যু কখনো কখনো খুলে দেয় আরও অনেক দরজা। রবীন্দ্রনাথ সেই খোলা দরজাগুলোর নাম। তাই হয়তো বলা যায়—
মৃত্যু রবীন্দ্রনাথের জীবন থামিয়েছে,কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি থামাতে পারেনি। বরং তাঁর সৃষ্টির হাত ধরেই সময় বারবার নতুন মানুষের কাছে ফিরে এসেছে। তিনি চলে গেছেন সময়ের বাইরে, কিন্তু তাঁর শব্দ এখনো সময়ের ভেতর হাঁটে।
———————————————————–
প রি চি তি
লেখক : কবি ও গল্পকার। শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন ৷ সম্পাদনা করছেন-‘পলিমাটি’।
প্রকাশিত একক গ্রন্থ- দুইটি ও যৌথগ্রন্থ- পঞ্চাশের বেশি ৷ মেইল : paulpankaj864@gmail.4 Comments-
আপনার এই লেখায় রবীন্দ্রনাথের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে ফুটে ওঠা “মৃত্যু সময়কে থামিয়ে দেয়, অথচ রবীন্দ্রনাথ সময়কে চলতে শিখিয়েছেন”—এমন উপলব্ধিটুকুর গভীরতা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। সৃষ্টির পুনর্জন্ম নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণগুলো চমৎকার, যা এক অসাধারণ দার্শনিক চেতনার পরিচয় বহন করে। আমাদের এই আনন্দময় আড্ডাকে আরও প্রাণবন্ত করতে আপনিও গ্রুপে অন্যান্য সদস্যদের লেখার উপর মতামত দিন এবং তাদের সৃজনশীল কাজের প্রশংসা করে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।
Friends
faiza adila
@faizaadila
khokon du
@khokondu
মোঃ শাহাব উদ্দিন নয়ন
@shahabuddin1
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান (কবি মিজান পঞ্চায়েত/ কবি মিজান বিএসসি)
@mohammedmizanurrahman
proton 69 (asger ahmmed)
@proton69
Mullick Md. A. khaleque
@mullickmd-a-khaleque
MD.MOMTAZUR RAHMAN Munna
@md-momtazurrahmanmunna
Sarker S Islam
@sarkersislam
Jaman Uddin
@jamanuddin



রবীন্দ্রনাথ তাই সময়ের ভেতরই হাঁটেন চিরকাল…..🖤