Profile Photo

তিতা ফুলOffline

  • nadia1
  • Profile picture of তিতা ফুল

    তিতা ফুল

    • 1 month, 2 weeks ago

    “নীলাবতীকে এমন বিষণ্ণতায় একদম মানায় না। হাসবে টুকটাক। মোহনীয় লাগবে।”
    এতটুকুই! অবাক হলো ইন্তিহা। এই চিরকুটটা কে পাঠাতে পারে? ও তো বাড়ির বাইরেও যায় না তেমন, তাহলে? তেমন কেউ তো নেই ওর যে এমন চিঠি দিতে পারে। হুট করে ওর মনে পড়ল আজকের কথাটি। ওর তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তাহলে আবরার নামের লোকটাই দিল এটা? শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল তার। কথা নেই বার্তা নেই, হুট করে চিরকুট পাঠিয়ে দিল! তাও কি অদ্ভুত ধরনের লেখা, আশ্চর্য! অবচেতনভাবেই চিঠির খামটা পুনরায় হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল সে। আর কিছুই নেই। চিরকুটটা তুলে আবার পড়ল, পুনরায় পড়ল, বারবার পড়ল। তবে ইন্তিহা দেখেনি পুরুষটিকে। একবারের জন্যও চোখ তুলে দেখে নেয়নি তাকে। আনমনা ইন্তিহা এবার চিরকুটটা নিয়ে রেখে দিল যত্ন করে। পোড়া নোটবুকটা হয়তো এই চিরকুটের অপেক্ষাতেই উন্মুখ হয়ে ছিল এতক্ষণ!
    সে রাতে আর ঘুম ধরা দিল না ইন্তিহার চোখে। বারবার মাথায় আসছিল নীল নোটবুকটার কথা। লাইব্রেরিতে আরেকবার যাওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এত মানুষের মাঝে আজ আর যাওয়া হলো না। ভেবে রাখল কাল সকালেই গিয়ে একবার দেখে আসবে।
    …
    শ্রাবণের মেঘ ডাকা সন্ধ্যা। একটু পর পর বাইরে বজ্রপাতের শব্দ হচ্ছে। সাথে দমকা হাওয়া বইছে ভীষণ। মেঘের ছায়া যেন রাতের অন্ধকারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আজ ৬ তারিখ। বিয়ের তড়জোড় চলছে পুরোদমে। চলবে নাই বা কেন, এই পরিবারের একমাত্র আদরের মেয়ের বিয়ে কিনা। সব আত্মীয়-স্বজনরা চলে এসেছে প্রায়। পুরো বাড়িতে যেন হইচই চলছে একপ্রকার। আলোকসজ্জা করা হয়েছে আরও ২ দিন আগেই।
    এর মাঝে অন্তর্মুখী ইন্তিহার খোঁজ পাওয়া যেন আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতোই। নিজের মতো থাকা, লাইব্রেরিতে আসা-যাওয়া আর পুকুরঘাট ছাড়া আর কোথাও যেন সে অস্তিত্বহীন। সেদিনের পর থেকে চিঠিওয়ালার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ইন্তিহা এখনো বুঝে উঠতে পারছে না, এটা আবরারেরই দেওয়া নাকি ভিন্ন কারও। আবার এমনও তো হতে পারে, যে অন্য কারও চিঠি ওর হাতে এসে পড়েছে। তাই এই নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি। আসলে ও নিজের মাঝেই নেই আপাতত। চারপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে, কে কি বলল, কে কি করল—কিছুতেই খেয়াল নেই ওর। শুধু একটা কথাই ঘুরেফিরে মাথায় আসছে, লাইব্রেরিতে নোটবুকটা কে রাখল সেদিন? স্বপ্নের মতোই কেন হতে হবে সেটাকে?
    “ইন্তিহা আপু, তোমার বর এসেছে দেখে যাও।”
    মামাতো বোন ঈশানীর এমন কথা শুনে ইন্তিহা আঁতকে উঠল। এ আবার কেমন কথা? ওর বর মানে? বিয়েই তো হলো না এখনো। তাছাড়া এই আবরার নামের পুরুষটি কেমন অদ্ভুত! যার সাথে তার বিয়ে হচ্ছে, তার সাথে একবার কথা বলারও প্রয়োজন বোধ করল না। নাকি তারও মত নেই এই বিয়েতে! এই একটা ভাবনাই যেন যথেষ্ট ছিল ওর মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য। কোনো পুরুষ, যে কিনা ওকে নিজ ইচ্ছায় বিয়ে করতে চাইবে না, এমন কারও সাথে কিভাবে ভালো থাকবে ও? কিছুতেই সম্ভব না, একদমই না। এতক্ষণে ইন্তিহার মনে হলো তার সাথে একবার অন্তত কথা বলে দেখা দরকার। কিন্তু কিভাবে কি? তিনি নিজ ইচ্ছায় কথা বলতে না চাইলে কিভাবে হবে?
    “ইন্তু আপি, তোমার বর দিয়েছে।”
    ইশিতার হাতে নীল খামটা দেখে সেদিনের কথা মনে পড়ে গেল। সেদিনও তো এমনই একটা খাম দিয়েছিল নাবিহার হাতে। তাহলে কি সেটা আবরারই ছিল? কি আশ্চর্য! লোকটা এমন কেন? পুরোটাই অদ্ভুত। সেদিন দেখতে আসার দিনও কোনো প্রশ্ন করেনি ওকে। এমনকি একটা কথাও বলেনি পুরো সময়টাতে। অথচ ওকে চিঠি দিয়ে যাচ্ছে! তাও আবার এমন সব চিঠি, যেন কত বছরের পুরোনো পরিচিত তারা!
    ভাবাভাবি শেষ হলে চিঠির নীল খামখানা সযত্নে খুলল সে। ভেতরে আজও একজোড়া ঝুমকো সাথে একখানা চিরকুট। আজকের ঝুমকোজোড়া নীল রঙের। ইন্তিহা মনে মনে লোকটার পছন্দের প্রশংসা না করে পারল না। চিরকুটখানা খুলতেই গোটা গোটা অক্ষরে লেখাগুলো যেন ছুঁয়ে দিল তাকে—
    “শোনো নিলাঞ্জনা!
    জমানো সব কথার নদী নাহয় বিয়ের পরই বাঁধ ভাঙ্গুক। তার আগ পর্যন্ত তবে অপরিচিত হয়েই রইলাম! অপরিচিত এই আমিটার থেকে পাওয়া ছোট্ট উপহারটুকু যত্নে রেখো।আর যত্নে রেখো চিরকুটে পাঠানো একটুকরো মেঘকেও!”

    নাহ, আর পারা যাচ্ছে না। এ কেমন অনুভূতি! এ কেমন হৃদয় ! ৫ বছরে জমানো হাজার অনুভুতির পর্বতকেও টলোমলো করে দিচ্ছে ছোট্ট একখানা চিরকুট !এই প্রথমবার ওর মনে হলো আবরার নামক মানুষটিকে একবার দেখা দরকার। কেন দরকার, তাও জানা নেই, তবে মনে হচ্ছে দেখা খুব প্রয়োজন। আজ পর্যন্ত কতোজন তাকে চাইলো, কিন্তু কারো প্রতি হৃদয় সায় দিলো না। একটুখানি অনুভূতিও জাগল না। অথচ এটুকু একটা চিরকুটের কিনা এতোখানি সাহস! একেবারে বোধশক্তি এলোমেলো করে দেয়।
    দোতলার বারান্দা থেকে লুকিয়ে একটুখানি দেখার চেষ্টা করলো সে। লোকটা এতক্ষনে চলে গেলো কিনা তাও জানা নেই। তবুও কৌতূহলবশত দেখার চেষ্টা । কিছুক্ষন উঁকিঝুঁকি দিয়েও যখন কাউকেই দেখতে পেলো না, তখন হতাশ হয়ে চলে যেতে নিয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। এ কেমন কণ্ঠ! মারাত্মক গভীর প্রতিটা শব্দ , বাক্য। কি বলল তা খেয়াল না করলেও এই কণ্ঠস্বর গেঁথে গেলো মস্তিষ্কে। নিউরনে নিউরনে জানান দিলো তার গহীন কম্পাঙ্ক। বেখেয়ালি মেয়েটা জানতেই পারলো না অপরপক্ষের উপস্থিতি। নিঃশব্দ পদচারনা আর বিদায়ের আকুতি। শ্রাবণের মেঘ ডাকা ভীষণ বৃষ্টির শব্দও যেন তার জাগ্রত মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে পারলো না বিন্দুমাত্র। মাথায় শুধু গম্ভীর সে কণ্ঠস্বর বাজছে। একবার, দুইবার, বারবার বাজছে। স্বস্তি দিলো না মেয়েটাকে একমুহূর্ত।

    “উনাকে তো আমি একবারও দেখিনি। আচ্ছা, এই লোকটাই কি আমার স্বপ্নপুরুষ হতে পারে না ? “

    বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেলো মেয়েটার সমস্ত বদনে। মাথা ঘুরাতে লাগলো যেন। এ কেমন ভাবনা! এসব কিকরে সম্ভব, আশ্চর্য ! জানালার ওপাশে যতটা ঝড় আর বজ্রপাত ছিল, ইন্তিহার হৃদয়ে উঠা ঝড়ের তুলনায় সেসব যেন ফিকে হয়ে গেলো। সে রাতে গা কাঁপিয়ে ভীষণ জ্বর এলো মেয়েটার। পাশে কেউ ছিল না। মাথায় পানি দেয়ার জন্য উঠতে চেয়েও উঠতে পারলো না সে । কাউকে ডাক দেয়ার মতো অবস্থাতেও নেই যে। অবশ্য ও এভাবেই অভ্যস্ত । কতো রাত এমন জ্বরে অচেতন হয়ে থাকত, সকালে সবাই জানত হয়ত। কিন্তু রাতে কেউ জানতেও পারতো না কিছু। ভীষণ অন্তর্মুখী কিনা মেয়েটা। না বললেও সূক্ষ্ম একটা ইচ্ছা আছে তার। কেউ একজন এমন আসুক, যে তার অমন মুহূর্তগুলোতেও একটুখানি মাথায় হাত রাখবে । গভীর রাতে জ্বরে অচেতন হয়ে থাকলে মাথায় একটু পানি দিয়ে দিবে। মুখ ফুটে না বললেও অসুস্থতা টের পেয়ে যাবে। অকারণ খুব বকাঝকা করবে। দিনশেষে বাকি সবার মতো অভিমান ভাঙ্গানোর একজন মানুষ থাকুক। মানুষ তো, তাই হয়তো বাকিদের মতোই এমন সব আজগুবি ইচ্ছা সেও বুনে।

    —

    দেখতে দেখতে বিয়ের দিন ঘনিয়ে এলো। আজ বাদে কাল বিয়ে।সময়গুলো এতো দ্রুত চলে গেলো যেন সেদিন মাত্র বাতিওয়ালা জুতো পড়ে সারাবাড়ি মাতিয়ে রাখতো মেয়েটা। এইতো, মাত্র কিছুদিন আগেই তো বোর্ড পরীক্ষায় পুরো জেলায় সপ্তম হওয়ার আনন্দে বাড়ির প্রতিটি দেয়ালেও আনন্দের ছড়াছড়ি ছিল। সেদিন মাত্র স্নাতক শেষ করে পড়াশুনার চাপ শেষ বলে হাঁপ ছাড়ল মেয়েটা। আর আজ বাদে কাল কিনা এই বাড়ির অতিথি হয়ে যাবে সে! শুধু একটা দিনের ব্যবধানে।

    লাইব্রেরি বারান্দায় কাঠের চেয়ারে বসে বই পরছিল ইন্তিহা। এমন বিকেল বেলায় অবশ্য বই পরার কথা নয় ওর। তাও আবার লাইব্রেরি বারান্দায় বসে। আজ বাদে কাল চলে যাবে এ বাড়ি থেকে। বাড়ির চেয়েও এই জায়গাটা ওর ভীষণ আপন, খুব পরিচিত মনে হয়।আর কখনো হয়তো কারনে অকারনে এখানে এসে বসে থাকা হবে না। অপেক্ষার প্রহরও গোনা হবে না। ভীষণ কান্না পাচ্ছে ওর। ইচ্ছে করছে সমস্ত আয়োজন বৃথা করে দিয়ে চিৎকার করে সবাইকে বলতে,

    “ শুনছো তোমরা ? যাবো না আমি কোথাও। কোথাও যাবো না। এই লাইব্রেরি বারান্দায় অপেক্ষার প্রহর গুনে কাটিয়ে দিবো পুরো জীবন। নীল সে নোটবুকের গন্ধে মেখে থাকব সর্বদা। কল্পলোকে ভেসে বেড়াব সারাটাক্ষণ। “

    কিন্তু বলা হয় না কিছুই। বাস্তবতার কাছে এসব চিৎকার উপহাস ছাড়া কিছুই না। অবশ্য ওর নিজের পুরোটাই তো উপহাসে ভরা। অপেক্ষার শেষ প্রহরে যাওয়ার সাধ্য নেই যে। স্বপ্নকে আঁকড়ে বেঁচে থাকতে পারে কি কেউ? পারে না তো।

    “ তুমি এইসময়ে এখানে কি করছো ?”

    বাবার কথায় আচমকা ভাবনার জাল ছিঁড়ে বাস্তবে আসলো ইন্তিহা। গভীর ভাবনায় এতোটাই মগ্ন ছিল যে, কখন তিনি ওর কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারেনি। তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল চেয়ার থেকে।

    “ এইমাত্রই এসেছি আব্বু। চলে যাচ্ছি এক্ষুনি।”

    “আবরার এসেছে। তোমার সাথে কথা বলতে চাইছে। বাড়িতে যাও ।”

    কথাটা বলেই আসিফ সাহেব চলে গেলেন সেখান থেকে। বজ্রপাতে আহত মানুষের মতো দাড়িয়ে থাকা ইন্তিহার দিকে তাকানোর ফুরসত নেই যে তার!

    তোমার আকাশ আমার মেঘ
    পর্ব-২
    -তিতা ফুল

    6
    4 Comments
    • লেখাটা খুব সুন্দর আর মিষ্টি একটা ঘোর তৈরি করে রেখেছে। ইন্তিহার মতো এমন শান্ত আর লাজুক চরিত্রের মেয়ের সাথে নীল খাম আর ঝুমকোর এই রহস্য বেশ মানিয়েছে। বিয়ের আগের এই দোটানা আর আবরারের গম্ভীর ব্যক্তিত্বের মিশেলটা পরের পর্বের জন্য দারুণ আগ্রহ তৈরি করলো!

    • গল্পের ডালে সুন্দর কলি উঁকি দিচ্ছে, ফুল ফোটার অপেক্ষায় রইলাম বন্ধু!

    • আপনার লেখা গল্পটি পড়ে ইন্তিহার মনের অবগুন্ঠন আর তার অগোছালো আবেগের বহিঃপ্রকাশ সত্যিই মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে, “জমানো সব কথার নদী নাহয় বিয়ের পরই বাঁধ ভাঙ্গুক”—এই লাইনটি অত্যন্ত নান্দনিক ও গভীর একটি অনুভূতির কথা মনে করিয়ে দেয়। ইন্তিহার নীরবতাকে যেভাবে আপনি বৃষ্টির সাথে মিলিয়ে তুলে ধরেছেন, তা প্রতিটি পাঠকের হৃদয়ে প্রশান্তির ছোঁয়া রেখে যাবে, ঠিক যেন শরতের কোনো শান্ত বিকেলে এক চিমটি রোদ! আপনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চরিত্রের মানস জগত ফুটিয়ে তুলেছেন, এভাবেই সাবলীল ভাষায় আপন মনে লিখে যান।

    • অপরিচিত হয়েও কেউ কেউ কত অদ্ভুতভাবে আপন হয়ে যায়!

Friends

Profile Photo
Mashuk Hossain
@mashukhossain
Profile Photo
Noyontara
@bablee
Profile Photo
Sazia Islam Mim
@saziaislammim
Profile Photo
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Profile Photo
Redowan Hussain
@redowanhussain
Profile Photo
নৈশান
@noishan
Profile Photo
Hashem Molla
@hashemmolla
Profile Photo
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
Profile Photo
mithila jannat
@mithilajannat
Skip to toolbar