-
“ তোমার হাতে কি ওটা দেখি তো?”
পেছন থেকে অমন গম্ভীর কণ্ঠস্বরে কেঁপে উঠে মেয়েটার সর্বাঙ্গ। দ্রুত ওড়নার নিচে লুকিয়ে ফেলে ডায়েরিখানা। চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলে তৎক্ষণাৎ।মানে, এই লোকটার কি কোন সময়জ্ঞান নেই নাকি, এখনি আসতে হবে, আশ্চর্য! ইন্তিহা পেছনে ফিরে না, যেভাবে ছিল সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। এদিকে আবরার বুঝে যায়, মেয়েটা নিশ্চয়ই ওর কাছে থেকে কিছু লুকাতে চাইছে। ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি ফুটে উঠে তার। ধীরে ধীরে সামনে আসে ওর। সূক্ষ্ম নজরে বোঝার চেষ্টা করে হয়েছেটা কি। ওড়নার ফাঁকে ডায়েরীর নীল রঙা কিছুটা অংশ বেরিয়ে আছে।তা নজরে আসতেই হাসির রেখা গাঢ় হয় ছেলেটার।
“চোখ বন্ধ করে রেখে লাভ আছে কোনো? আমি দেখছি তো তোমাকে!”
সাথে সাথেই চোখ খুলে যায় মেয়েটার। নজর লুকাতে চায় প্রাণপণ।পারে না।
“কিসের ডায়েরি এটা, দেখি?”
ইন্তিহা সাথে সাথে মাথা নেড়ে পেছনে লুকায় ডায়েরিটা। যেন কোন বাচ্চা মেয়ে ওর শখের খেলনা লুকাচ্ছে দুষ্টু বাচ্চার হাত থেকে! আবরার হাসে শব্দ করে। খুব মিহি সে শব্দ,বাতাসে যেন ঝংকার বাজে তার। ইন্তিহা তাকাতে পারে না।লজ্জায় নতজানু হয় খানিক।মেয়েটার অমন করুন অবস্থা দেখে এবার সরে দাঁড়ায় আবরার।পরে দেখা যাবে আর আসবেই না ওর সামনে।আবরার বারান্দার দিকে যাচ্ছে বুঝতে পেরে সে দ্রুত ডায়েরিটা ড্রয়ারে রেখে দেয়। তালা মেরে চাবিটা নিজের ওড়নার কোনায় বাঁধে। বলা তো যায় না, কখন আবার চাবি পেয়ে ডায়েরি বের করে পড়া শুরু করে দিবে। পরে বলবে, ‘ইন্তিহা, তুমি এতো দুষ্টু? আমাকে নিয়ে কিসব লিখেছো?’ তারপর লজ্জায় পড়ে জান যাবে ওর।নাহ, ভুল করেও এমন ভুল করা যাবে না, একেবারেই না!
“লুকানো হয়ে গেছে? ভালো জায়গায় লুকিয়েছো তো? দেখো, আমার হাতে পড়ে টরে গেলে তো…”
“আপনি একটা…”
“ কি আমি?বলো বলো?”
“ যাচ্ছেতাই!”
আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না মেয়েটা। হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।এদিকে হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ ছেলেটার। মেয়েটাকে লজ্জায় ফেলতে ভালোই লাগে তার। লজ্জায় যখন মাথা নিচু করে মুখ লাল করে ফেলে, ভীষণ উপভোগ্য লাগে তখন।একা একাই হাসে সে। আজকে আর সহজে ওর সামনে আসবে না নিশ্চিত।
লাইব্রেরী বারান্দার ছোট্ট চেয়ারটার হাতলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে ইন্তিহা। তখন রুম থেকে বেরিয়ে সোজা চলে এসেছে এখানে।বুক ধড়ফড় করছে এখনো। লোকটাকে দেখে তো প্রথমে ভোলাভালাই মনে হয়েছিলো, কে জানতো এর আড়ালে সে এতো বজ্জাত হবে! মুখ কুঁচকে চাপা হাসে মেয়েটা। আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি বুলায়,কেউ দেখে ফেললো না তো আবার! যাকগে, হাসি থামিয়ে লাইব্রেরি তে ঢুকে সে। উদ্দেশ্য, উপন্যাসের বই নিবে একটা। নিজেকে ব্যাস্ত দেখাতে হবে তো লোকটার সামনে। বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকবে চুপচাপ, তখন আর কিছু বলতে পারবে না সে। যেই ভাবা সেই কাজ।একটা- দুটো করে পাঁচটা বই পছন্দ হয়। সবগুলো নিয়ে বারান্দার টেবিলের উপর রাখে সে। একে একে বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখতে থাকে। এর মধ্যেই বাড়ি থেকে খবর আসে বাড়িতে যাওয়ার জন্য। বিরক্ত হয় মেয়েটা। এই লাইব্রেরির সাথে যেন সবার জনম জনমের শত্রুতা। একটুখানি এসে শান্তিমতো বসাও যায় না, অমনি ডাকাডাকি শুরু হয়ে যায়।বিরস মুখে সবকটা বই হাতে নিয়েই সে হাটা ধরলো বাড়ির পথে।ওর রুমের বারান্দা থেকে যে, কেউ একজন সূক্ষ্ম নজরে পরখ করছে প্রতিটা মুখভঙ্গি, সে ব্যাপারে কি বিন্দুমাত্র ধারণা আছে তাঁর?
–
–
–“ তুই কি ঠিক হবি না কখনোই? ঘরে জামাই বসে আছে একা একা, আর তুই কিনা ঢেং ঢেং করে ঘুরে বেড়াচ্ছিস? কোথায় তাঁর কি লাগবে না লাগবে, কি খেতে চায়, সেসব জিজ্ঞেস করে, তৈরি করে সামনে দিবি, তা না করে আরও একা একা বসিয়ে রেখেছিস!”
মায়ের কথায় বিরক্ত হয় ইন্তিহা। মনে মনে ভয়ঙ্কর ভেংচি কাটে লোকটাকে। সবার কাছে কতো ভালো সেজে বসে আছে দেখো। অথচ ওরা তো আর যানে না, লোকটা একটা হাড়ে বজ্জাত। নাজেহাল করে ছাড়ে ওকে। একদণ্ড চুপ করে থাকতে পারে না যেন।সারাক্ষন চুপচাপ থেকে হুট করে এমন একটা কথা বলবে, যেন ওর গায়ের রক্ত হিম করতেই মুখ খোলা লোকটার।মুখ গোমড়া করে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে সবাই সন্ধ্যার নাস্তার আয়োজন করছে।এর মধ্যে ওর কি কাজ বুঝে আসে না মেয়েটার। তবুও গিয়ে এক কাপ ঘন করে দুধ দিয়ে চা বানিয়ে নেয়। সাথে একটা কাঁচের বাটিতে আগে থেকে তৈরি করা পাকোড়া নেয় কিছু। হাটা ধরে সিঁড়ি বেয়ে। উদ্দেশ্য দোতলার কর্নারের রুমটা।
“কোথায় যাচ্ছো আবার?”
নাস্তার ট্রেটা টেবিলের উপর রেখে মানে মানে কেটে পড়তে নিচ্ছিলো মেয়েটা। অমনি ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে ওকে থামিয়ে দিলো আবরার।নাক ফুলিয়ে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ে সে।লোকটাকে নিয়ে আর পারা গেলো না।তবে উল্টোদিকে ফিরে থাকায় সে মোহনীয় দৃশ্য নজর কাড়ে না ছেলেটার।
“ পালানো হচ্ছে নাকি?”
“আশ্চর্য! পালাবো কেন আমি?”
“সেই তো, সেই তো। পালাবে কেন তুমি?আমারই ভাবতে ভুল হয়েছে হয়তো! যাই হোক, চায়ের কাপ একটা যে? স্বামীর সাথে এক কাপে করে চা খেতে চাইছিলে বুঝি? আগে বলবে না?”এবার আর চুপ থাকতে পারলো না মেয়েটা।বড্ড বাড় বেড়েছে লোকটা। তাই বলে এসব বলবে?
“ চা খাই না আমি!”
মুখে স্বাভাবিকভাবে বললেও নিচের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুসছে সে।মনে মনে তো কতোশত বার ‘অসভ্য’ উপাধি পেয়ে গেছেই লোকটা। তাতে কি কিছু আসে যায় তার? সে তো দিব্যি মেয়েটাকে জ্বালিয়ে হাসছে মিটিমিটি।
“ও ও ও ! আমি ভাবলাম তুমি…”পুরো কথা শেষ করতে পারে না সে। অমনি মৃদু চেঁচিয়ে উঠে বউ তার!
“ আপনি তারাতারি চা’টা শেষ করুন, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
হাসি আটকে রাখতে পারে না ছেলেটা। শব্দ করে হেসে ফেলে এবার। প্রথমবার, এই প্রথমবার হাসছে লোকটা এভাবে করে। রাগ করার কথা থাকলেও মুগ্ধ হয় মেয়েটা। আশপাশ ভুলে চেয়ে থাকে সদ্য ফোঁটা কাঠগোলাপের সুরভীর পানে।ওর অমন নির্লিপ্ত চাহনি নজরে পড়তেই যেন আরেকটু সুযোগ পায় ছেলেটা।
“ছি, বউ! স্বামীর দিকে অমন নজর দিতে লজ্জা করছে না তোমার? পরে তো আমার দাঁত পড়ে যাবে, তোমার নজর লেগে।তখন লোকে বলবে ইন্তিহার জামাইয়ের দাঁত নাই। ভালো হবে বলো?”
আবরারের কথায় লজ্জা ভুলে অবাক নেত্রে চেয়ে থাকে মেয়েটা। বলে কি এই লোক? তাই বলে ওর নজর লেগে দাঁত পড়ে যাবে? ইন্তিহা ভেবেছিলো ও’ই একা পাগল, এখন তো দেখা যাচ্ছে লোকটা ওর থেকে বড় পাগল।
“কি হলো বউ,কই হারিয়ে গেলে?আমাকে নিয়ে নিশ্চয়ই…”
“ চা কি খাবেন আপনি? নাকি নিয়ে যাবো, কোনটা?”
আবরার বুঝলো পরিস্থিতি এবার খারাপের দিকে যাচ্ছে, আর রাগানো ঠিক হবে না। ও বাধ্য বালকের মতো চায়ের কাপ তুলে নিলো হাতে। তবে চায়ে চুমুক দিতেই পাল্টে গেলো মুখভঙ্গি। হতচকিয়ে উঠলো ইন্তিহা। চা কি খুব বেশি খারাপ হলো?এমন করছে কেন লোকটা!
(চলবে)
তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-৮-তিতা ফুল
9 Comments-
-
আপনার লেখাটা এত মিষ্টি আর ইন্তিহা-আবরারের খুনসুটিগুলো পড়তে খুব ভালো লাগছিল, এখন বলেন তো পরবর্তী পর্বে কি চায়ে লবন ছিল যে আবরারের মুখ এমন হয়ে গেল?
-
-
-
Friends
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat
Sk Sagor
@sksagor
Md. Ashraful Alam
@md-ashrafulalam
Fazilatun Nesa
@fazilatun-nesa


খুব ভালো