-
“এই চা কে বানিয়েছে?”
আবরারের মুখভঙ্গী দেখে ভয় পেয়ে যায় মেয়েটা। চা তো ঠিকঠাকই বানালো, খারাপ হওয়ার কথা না।
“খুব বেশি খারাপ হয়েছে নাকি?”
“নিজেই খেয়ে দেখো! “
যদিও ও চা তেমন পছন্দ করে না, তবুও আবরারের কথা শুনে কাপ তুলে নেয়।
“ভালোই তো হয়েছে, চিনি, লবন সবকিছু ঠিকঠাক।”
আবরার সাথে সাথে চায়ের কাপটা তুলে। ওর দিকে তাকিয়ে চুমুক দেয় কাপে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ইন্তিহা। এটা কি হলো? একটু আগে না বললো মজা হয়নি? এখন আবার কি সুন্দর করে খেয়ে যাচ্ছে!
পুরোটা শেষ করে ট্রেতে কাপ রাখতে গিয়েও থেমে যায় ছেলেটা। আড়চোখে ইন্তিহার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট এলিয়ে বাঁকা হাসে।যার মানে বুঝতে পারে না ভাবুক মেয়েটা।
–
–
–“কিরে, কেমন চলছে জামাই আদর? সব ঠিকঠাক?”
সিঁড়ির কাছে আসতেই সামিয়ার প্রশ্নে দাড়িয়ে যায় ইন্তিহা। হাতে ট্রে। আর এটা দেখেই মেয়েটাকে খোঁচাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো সে।আশপাশ ভালো করে দেখে নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন ছুড়ল সে,
“দুলাভাই কেমন রে? মানে তোরে ভালো টালো বাসে তো?”
“আপু, তুমিও না? এসব কেমন প্রশ্ন? ভালো লাগে না আমার, সরো তো।”
এবার খুব রেগে যায় সে। তাই বলে সবাই মিলে পেয়েছেটা কি ওকে? সামিয়াকে সরিয়ে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে যেতে নিলে ওর হাত চেপে ধরে সে।
“আরে রাগ কেন করছিস? শোন, আমি কিন্তু একটা গোপন কথা জানি। আবরার দুলাভাই তখন লাইব্রেরী থেকে আসার সময় তোকে দেখছিলো দোতলা থেকে।”
শিরশির করে উঠে মেয়েটার সর্বাঙ্গ। হৃদস্পন্দন হয় অনিয়ন্ত্রিত। মেকি রাগ দেখালেও আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে নিচু গলায় বলে,
“ কি বলো? আসলেই?”
এবার শয়তানি হাসি ফুটে উঠে তার চোখেমুখে।এইতো, এবার সঠিক রাস্তায় আসছে তবে।
“শুধু কি তাই? আবার দেখলাম মুচকি মুচকি হাসছিলোও।আমাকে খেয়াল করে নি প্রথমে। পরে যখন দেখেছে, সুন্দর করে রুমে ঢুকে গেছে।”
লজ্জায় হাঁসফাঁস করে ইন্তিহা। লোকটা এতো পাজি! ওর মানসম্মান কিছুই তো রাখলো না। এখন তো সামিয়া ওকে কথায় কথায় খোঁচাবে, মজা নিবে। এর মধ্যেই সামিয়া একটু ওদিক ফিরে দাঁড়ায়। ইন্তিহা ওর ভাবভঙ্গি না বুঝতে পেরে পেছনে ফিরতে গেলে দেখে আবরার নামছে সিঁড়ি বেয়ে। সাথে সাথেই চোখ দুটো আপনাআপনি বড় হয়ে যায় তার। লোকটা কি সব কিছু শুনতে পেয়ে গেলো নাকি আবার। ভাবাভাবির ও সুযোগ পেলো না মেয়েটা। ওর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হুট করে ওর দিকে এক ভ্রু উঁচিয়ে চাইলো লোকটা। নিঃশব্দে, একদম নিঃশব্দে মেয়েটার বুকের ধুকপুকানি কয়েক গুন বাড়িয়ে দিয়ে গেলো যেন !
পরদিন সকাল সকাল বাড়িতে হাঁক ডাক শুরু হয়ে যায়। নতুন জামাই বলে কথা। রান্নাঘরে যেন হুলস্থুল কাণ্ড বেঁধে গেছে। বিশেষ করে ইন্তিহার মায়ের অবস্থা বেগতিক। কোথায় আস্ত মুরগিটা এখনো ভাজা হয়নি কেন, পোলাওয়ের চাল ভালো করে ধোঁয়া হয়নি, গরুর মাংসটা ভালো করে কষানো হয়নি, এমনই সব ব্যাপারে তদারকি করছেন তিনি।ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছেন পাশের বাড়ির তিন মহিলা। একজন বসে বসে পান চিবুচ্ছেন আর পাশে থাকা পিকদানিতে পানের রস ফেলছেন একটু পরপর। বাকি দুজন কথা বলছেন নিজেদের মতো। পান খাওয়া মহিলাটি একটু পরপর তাদের সাথে তাল মেলাচ্ছেন এক আধটু। ইন্তিহার মা, আমেনা বেগম তাদের জন্য ট্রেতে করে কিছু ফল, শরবত নিয়ে এলেন। পানের বাটা দিয়ে গেছেন আরো আগেই। বাইরের উঠোন থেকে ড্রয়িংরুমে আসছিলো ইন্তিহা। মায়ের ডাকে এসে বসলো তাদের পাশে।সৌজন্যতা সুলভ সালাম দিলো নম্রস্বরে।
“তা ভালো আছিস তো? ওবাড়ির লোকেরা ভালো ব্যাবহার করে তো তোর সাথে?”
তাদের কথায় মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝালেও মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হয় সে। ইচ্ছে ছিলো না কোন তাদের সামনে বসার। তবে মায়ের কথায় তো না করতেও পারে না।বিরস মুখেও বসে রইলো চুপচাপ।এর মধ্যে আবার পান খাওয়া মহিলাটি শব্দ করে পানের পিক ফেলে বলে উঠলেন,
“প্রথম প্রথম সবাই এমন ভালো দেখায়। সময় যেতে থাকলে পরে বুঝা যায়,কে কেমন। শ্বশুরবাড়ির লোক মানেই হলো মুখে মধু অন্তরে বিষ!”
ক্রোধ চিড়বিড়িয়ে উঠলেও মায়ের ইশারায় চুপ থাকে মেয়েটা। শত হোক, বড়দের মুখে মুখে তর্ক করাটা শিক্ষা দেননি তিনি সন্তানদের।
“যাক, ভালোই হয়েছে আপনার মেয়ের শেষমেষ বিয়েটা হলো। ওর গায়ের রঙ তো তেমন ফর্সাও না, বয়সও খারাপ হয়নি । সে হিসেবে জামাই পেয়েছেন মনের মতো একটা। গায়ে গতরে নায়ক যেমন! “
মহিলার কথায় মাথা নিচু করে নিঃশ্বাস আটকে রাখে ইন্তিহা। এমন না যে গায়ের রঙ ওর কালো বা চাপা। উজ্জ্বল শ্যামলা বলে এটাকে। গ্রাম হওয়ায় এই কথা অনেক শুনেছে সে, এখন আর গায়ে লাগে না সেসব।তবে আবরারের সাথে এভাবে তুলনা করায় নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে খুব। আসলেই কি ও যোগ্য না লোকটার?ইতিমধ্যে আরেকজন মহিলা প্রতিবাদ করে উঠে উনার কথায়।
“পোলারও তো বয়স বেশি বেশি লাগে। তিরিশের কম হইবো না।আবার কথাবার্তাও সুবিধার না। আমারে দেখলো দরজার সামনে। সালাম কালাম নাই, সোজা বাইর হইয়া গেলো।”
এবার আর চুপ থাকতে পারে না ইন্তিহা। ছোট থেকে সবার কথায় চুপ করে থাকার শিক্ষা পেয়ে বড় হওয়া মেয়েটা যেন আজ হুট করেই ভুলে গেলো সেসব।মায়ের কঠোর দৃষ্টি উপেক্ষা করে কথা বলে আজ সে।
“ আমার স্বামীর কোন কিছু আপনাদের পছন্দ না হলেও চলবে। সংসার তার সাথে আমি করবো, আপনারা না!”
কথা শেষ করে আর এক মুহূর্ত বসে থাকে না সে। ধুপধাপ পা ফেলে উঠে যায় সিঁড়ি বেয়ে। এদিকে ইন্তিহার মা তাদের কে কি বলে পরিস্থিতি সামাল দিবেন বুঝতে পারেন না। মেয়ে তার এমন কিছু বলবে, চিন্তাও করেন নি তিনি। তবে উনার সেসব চিন্তার অবসান করতে আগমন ঘটে হাসিবের। সাথে মেয়ে জামাইও দাড়িয়ে আছে দরজার সামনে।
“ আরো কিছু শোনার ইচ্ছা আছে নাকি চাচি? থাকলে বলেন, নির্দ্বিধায় বলেন আমাকে।আপনার প্রশ্নসমূহের উত্তর দিতে উতলা হয়ে আছে মনপ্রান আমার।”
হাসিবের অমন রসাত্মক বাক্যে চোখ ফেরান তারা। তড়িঘড়ি উঠে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। অজ্ঞাত কোন কারনে হাসিবকে যমের মতো ভয় পান তিন মহিলা। তাদের এই বাড়িতে আসা যাওয়াও পছন্দ করে না সে। সামনে পড়লেও হাসিবকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন উনারা। এই ব্যাপারে আমেনা বেগম অবশ্য ভীষণ অসন্তুষ্ট। মেয়েটাকে চুপ থাকা শেখাতে পারলেও ছেলেটাকে সামলাতে পারেন না কিছুতেই।অবশ্য চেষ্টাও করেন না সেভাবে। ছেলে মানুষ তো, অতিরিক্ত শাসনে আবার বখে যায় যদি!
এদিকে তাদের মা ছেলের মানসিক দ্বন্দের কিছুই খেয়ালে নাই আবরারের। সে তো বেস্ত সিঁড়ির পানে চেয়ে। যেখান দিয়ে খানিক আগেই রাগে ধুপাধুপ পা ফেলে চলে গেছে বউ তার।
–
–
–
“তখন তোর চাচীদের সামনে এমন ব্যাবহার কেন করলি তুই? মুখে মুখে তর্ক করা শিখে গেছিস খুব? দুইদিন হয়নি বিয়ে দিয়েছি, অমনি মুখে খই ফুটে গেছে যেন। এই শিক্ষা দিয়ে বড় করেছি তোকে আমি?”মায়ের চাপা রাগ দেখে শুষ্ক ঢোক গিলে ইন্তিহা। সকালের পর থেকে রুম থেকে আর বের হয়নি সে। আবরার তো ঘুরাঘুরির মধ্যেই আছে। সেই সকালের পর আর আসেনি উপরে। এখন মায়ের সামনে পড়ে কথা আটকে আসে তার।
“কি হলো? কথা বলছিস না যে? জামাইয়ের সামনেও তুই ছোট করলি আজ আমাকে। সে তো ভাববে মেয়েকে আমি ঝগড়ুটে বানিয়েছি।”
জামাইয়ের সামনে মানে? এ পর্যায়ে এসে ভারী অবাক হয় মেয়েটা। জামাই মানে তো আবরার। উনার কথা আসছে কেন এখানে? উনার সামনে আবার ছোট করলো কখন সে?মনে মনে এমন সব প্রশ্ন বাসা বাধলেও করার সাহস পেলো না এই মুহূর্তে। কোন কথা না বলে চুপ রইলো। আসলে তখন ওই কথা বলার পর হাত পা কাঁপছিল প্রচণ্ড। সামনে সামনে যতই কথা বলুক না কেন, সবসময় চুপ থেকে সবকিছু মেনে নেয়া, মানিয়ে নেয়া মেয়েটা হুট করে একদিন সাধারন একটা কথা বললেও অসাধারণ হয়ে যায় সেটা।
“ তারা উনার সম্পর্কে ওসব বলেছে, তাই!”
কথাটা বলেই মাথা নিচু করে ফেলে ইন্তিহা। আমেনা বেগম তেতে উঠেন সাথে সাথে।
“তো? তোর উনার থেকে তো তোর সম্পর্কে আরো বেশি বলেছে।সেটা নিয়ে তো বলিস নি কিছু? উনার ওজুহাত দিচ্ছিস এখন। তোর উনার সম্পর্কে কিছু বলেছে দেখে মুখে মুখে তর্ক করতে হবে তোর? এসব বেয়াদবি শিখিয়েছি আমি?”
মায়ের কথায় এবারেও কিছু বলতে পারে না মেয়েটা। আসলেই তো,নিজের জন্য তো প্রতিবাদ করতে পারে নি বিন্দুমাত্র। তবে আজ হুট করে কি হয়ে গেলো ওর, যে আবরারের ব্যাপারে সামান্য কথাটুকু সহ্য করতে পারলো না সে। এতো দরদ কেন লোকটার জন্য? মায়ের বকাবকির মধ্যেও লোকটার কথা মনে পড়তে নাক মুখ কুচকে লজ্জামাখা হাসি ফুটে উঠে মুখে তার। যেন মায়ের বকাবকি তো দূর, ধারে কাছেও নাই কেউ তার। ওর হাসি নজরে পড়তেই স্তব্ধ হয়ে যান আমেনা বেগম। কথা বলার ভাষা হারান যেন। কাকে শাসন করছেন তিনি? মেয়ে তো তার হাসছে একা একা! কপাল চাপড়াবেন নাকি? নাহ, তাও তো কম হয়ে যায়।এমন দিনও দেখতে হলো শেষ পর্যন্ত? শেষ, সব চেষ্টা বৃথা তার। ছেলে মেয়ে দুটোই বিপথে গেলো। এদিকে মায়ের শত আহাজারিও যেন চিন্তারত রমণীকে টলাতে পারছে না একবিন্দু। সে তো মায়ের বকা শুনতে শুনতে ভাবছে , চিন্তা করছে, হারিয়ে যাচ্ছে অন্য দুনিয়ায়।
–
–
–
রাতের দশটা বেজে আরো আধঘণ্টা পেরিয়ে গেছে প্রায়। বাইরে বাতাস ছেড়েছে কিছুক্ষন আগে। সারাদিনের ভ্যাপসা গরমের পর আকাশে গাঢ় করে মেঘ জমেছে। হয়তো আর কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘনীভূত মেঘ গলে ঝুম বৃষ্টি নামবে ধরণীর কোল জুড়ে। বারান্দার ডান কোনে বাগানবিলাসের পাতাগুলোতে বাতাসের ঝাপটায় কম্পন তুলছে অনবরত। আরেকপাশে মাটির টবে সাদা কাঠগোলাপের পাতাগুলো দুলছে বাতাসের তালে তাল মিলিয়ে। চারপাশ খোলামেলা হওয়ায় আর বাতাসের তোপ বেশি থাকায় ফুল কয়েকটা পড়ে আছে বারান্দার মেঝেতে।সেদিকে খেয়াল নেই ইন্তিহার। ও তো ফোন নিয়ে বারবার ভাইকে কল করতে ব্যস্ত। বৃষ্টি আসার সম্ভাবনা প্রবল, অথচ লোকগুলো বাড়ি ফেরে নি এখনো। চিন্তায় অস্থির মেয়েটা এখনো পাশে অন্য কারো উপস্থিতি খেয়াল করতে পারেনি। চিন্তারত রমণীর অমন অস্থিরতার মাঝে, ওর বুকের ধুকপুকানি আরো কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়ে আওয়াজ তুলে, গম্ভীর কণ্ঠস্বরে পুরুষটি।“ স্বামীর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিলো বুঝি বউ?”
___________________________________________________
তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-৯
-তিতা ফুল( আপনাদের গঠনমূলক মন্তব্যগুলোই আমাকে লেখার অনুপ্রেরনা দেয়। যদিও তেমন ভালো লিখি না জানি, তবে আপনাদের নিয়মিত পাশে থাকা আমার জন্য অনেক আনন্দের। অনেক ধন্যবাদ সবাইকে। )
4 Comments-
-
আপনার উপস্থাপিত এই রচনাটি বেশ চমৎকার এবং এর চরিত্রগুলোর মধ্যকার খুনসুটি ও কথোপকথন পাঠক হিসেবে আমাকে মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে ইন্তিহা ও আবরারের মধ্যকার আবেগপ্রবণ মুহূর্তগুলো এবং তাদের লুকোচুরি করার ধরণ খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এমন সুন্দর একটি গল্পের ধারা আপনি অনায়াসেই অব্যাহত রাখতে পারেন, যা আমাদের মতো পাঠকদের জন্য অনেক আনন্দের খোরাক জোগাবে।
-
Friends
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat
Sk Sagor
@sksagor
Md. Ashraful Alam
@md-ashrafulalam
Fazilatun Nesa
@fazilatun-nesa


এই চা কে বানিয়েছে?