-
“আপনি একটা অসভ্য!”
“ আরে আরে চলে যাচ্ছো কেনো? খাবারটা শেষ তো করে যাও।”
ফেরে না মেয়েটা। এমন দুষ্টু বর থাকলে শান্তি আছে কোনো? রান্নাঘরের কাছে এসে বুকে হাত রেখে হাঁপাতে থাকে সে। চাপা হাসিতে লাল হয় অবয়ব। তবে পাশ থেকে কারো হাসির শব্দে মুছে যায় সে হাসি।
“কি? কেমন চলছে দিনকাল, হুম হুম? সব ঠিকঠাক তো? নাকি…!”
মেঝো জা’য়ের টিটকারিতে লজ্জায় মূর্ছা যায় মেয়েটা। এবার একটু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে না? ও জোরপূর্বক সিরিয়াস হয়।
“ কি হবে আবার? সব ঠিকঠাক!”
“ যাই হোক, ঠিক থাকলেই ভালো। আমি আবার ভাবলাম…”
“ রাতে কি ভাইয়া বাসায় খাবার খাবেন ?”
“ বাসায় খাবে আজকে। যাই হোক, কথা ঘুরাতে শিখে গেছো দেখছি।”
‘তোমাদের মতো জা থাকলে না শিখে উপায় আছে?’ বলতে গিয়েও বলে না কথাটা। এখন কথা বাড়ালেই বিপদ। এ বাড়ির মানুষগুলো সব একই ধরনের কিনা! পরে দেখা যাবে কথা একটা বলতে গিয়ে মান সম্মান খোয়াতে হবে!
–
–
–
সপ্তাহ দুই এক পেরুতে না পেরুতেই একদিন খবর আসে ইন্তিহার আব্বু হার্ট অ্যাটাক করেছেন। ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে উনাকে।খবর পাওয়ার পর থেকে কান্না করে করে অবস্থা খারাপ মেয়েটার। আবরার আসেনি এখনো অফিস থেকে। সে আসলে নিয়ে যাবে দেখা করতে। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে আসে আবরার। বাসায় পা রাখতেই সবার ভারাক্রান্ত মুখ দেখে চিন্তিত হয় সে। মায়ের কাছে খবরটা শোনা মাত্রই তাড়াহুড়ো করে রুমে আসে। ইন্তিহাকে কাঁদতে দেখে ধক করে উঠে বুক। এই প্রথমবার কাঁদছে মেয়েটা। বিয়ের দিনে তো কাঁদার সুযোগই পায় নি।
আজ এভাবে কাঁদতে দেখে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না সে।“শান্ত হও, সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।”
“ আব্বু, আব্বু, আব্বুর…”
কান্নার দমকে গলায় আটকে আসে কথা। আবরার ওর চোখ মুছে দেয় আলতো হাতে।
“ কান্না করে না। কিচ্ছু হয়নি উনার। ভালো আছেন এখন। আমরা এক্ষুনি যাবো।”
“ আমি, আপনাকে ফোন…”‘সরি, ফোনটা সাইলেন্ট ছিল। ঠিক আছে, ঠিক হয়ে যাবে সব। শান্ত হও তুমি।”
আবরারের আস্কারা পেয়ে কান্না যেন কমার বদলে বেড়ে যায় আরও। আবরার ওর চুলে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার কান্না যে সহ্য হচ্ছে না কিছুতেই।
“ আচ্ছা দেখি, রেডি হও। বের হবো আমরা। “
ইন্তিহাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌছাতে ২ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। সেখানে গিয়ে আবারো কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মেয়েটা। বাবাকে ধরে কতো বছর পর যে কেঁদেছে মেয়েটা। সেই ছোট্ট ইন্তিহা হয়ে গেছে যেন আজ। আবরার দাঁড়িয়ে আছে কেবিনের বাইরে। সাথে হাসিব আর আমেনা বেগমও আছেন। ইন্তিহাকে একা ছেড়ে দিয়েছে বাবার কাছে। থাকুক কিছু সময় বাবা মেয়ে। সবার সাথে কথা বলতে থাকলেও আবরারের মন পড়ে আছে ক্রন্দনরত রমণীর পানেই। থেকে থেকে কান্নার শব্দ যেন ঝংকার তুলছে ওর কানে। খা খা করছে বুকের ভেতরটা। মেয়েটার কান্না কেন এতো অসহ্য লাগছে? কেন এতো পুড়াচ্ছে অন্তর?
“ খাবে কিছু?”
“ না।”
কেবিনের বাইরে একটা বেঞ্চে বসে আছে আবরার-ইন্তিহা। কান্না থামলেও চোখ মুখ ফুলে আছে মেয়েটার। আবরার ওর দিকে পানির বোতলের ছিপি খুলে এগিয়ে দেয়। দুই ঢোক খাওয়ার পর টিস্যু নিয়ে নিজেই চোখ মুখ মুছে দেয় প্রেয়সীর। দুপুর থেকে কিছু খায়নি মেয়েটা। এখন প্রায় মাগরিবের আজানের সময় হয়ে এসেছে। এখনো বলছে কিছু খাবে না।
“ সেই সকালে কি না কি খেয়েছো। সারাদিনে পানি ছাড়া কিছু খাওনি। এখনো বলছো কিছু খাবে না। এভাবে চললে হবে? কিছু তো খাবে?”
“আমার খেতে ইচ্ছে করছে না কিছুই। আপনি প্লিজ জোর করবেন না।”
ইন্তিহার কথায় হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়ে ছেলেটা। এতো সহজে কথা শুনবে না বউ তার। ইন্তিহা নিঃশব্দে ওর মাথাটা আবরারের কাঁধে রাখে। চোখ বুজে ফেলে ছেলেটা। একটু পর সে নিজেই কথা বলে উঠে।
“ খিদা লেগেছে আমার খুব।”
চমকে উঠে মেয়েটা। সাথে সাথেই মাথা তুলে তাকায় পুরুষটির পানে।
“আপনি খাননি কিছু?”
“ তুমি সারাদিন না খাওয়া। আমার পেটে খাবার ঢুকবে কিভাবে?”
অবাক চাহনি নিয়ে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা। সারাদিন না খেয়ে আছে লোকটা? তাও কিনা ওর কারনে? ও খায়নি বলে?
“আপনি কি পাগল?খেয়ে নিন কিছু, এক্ষুনি যান।”“ তুমি না খেলে আমি খাবো কিছু? বিশ্বাস হয় তোমার?”
“আরে আমি…”
“ ইচ্ছে করছে না, তাইতো? ঠিক আছে, আমি এভাবেই ঠিক আছি। চিন্তা করো না তো!”
হতাশ হয় মেয়েটা। এই লোক ভীষণ ধূর্ত। না খাইয়ে ছাড়বে না ওকে আজ।
“ ঠিক আছে, চলুন। খাবো আমি।”
হাসি ফুটে পাজি লোকটার চোখে। সে থাকতে না খেয়ে থাকতে পারবে বুঝি মেয়েটা? অসম্ভব ব্যাপার-সেপার।
এক প্লেটে ভাত নেয় সে। জানে, নিজ হাতে নিলে খাবে না একটুও মেয়েটা। ভাত মেখে ওকে নিজ হাতে খাইয়ে দেয়। নিজেও খায় সেখান থেকেই। আরেক লোকমা করে করে এক প্লেট পুরো খাইয়ে দেয় মেয়েটাকে। হঠাৎ করে চোখ ভরে আসে মেয়েটার। আবরারের থেকে চোখ লুকাতে চাইলেও পারে না লুকাতে।“কাঁদছো কেনো?’’
টিস্যু দিয়ে ওর মুখ মুছে দিতে দিতে প্রশ্ন করে লোকটা। মাথা নেড়ে জবাব দেয় সে।
“কিছুনা, এমনি।”
আবরার আর বলে না কিছুই। বিল দিয়ে এসে আবার চলে যায় হসপিটালে। রাতের জন্য আমিনা বেগম থাকবেন সেখানে। আর হাসিবকে আবরারদের সাথে ওদের বাড়িতে নিয়ে যাবে আপাতত। থাকার তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই কিনা।
আসিফ সাহেব সুস্থ হয়ে উঠেন কিছুদিনের মধ্যে। উনাদের এই বাড়িতে নিয়ে আসতে চাইলেও আসেননা তারা। কি দরকার, এমন অসুস্থতার সময়ে শুধু শুধু ঝামেলা বাড়ানোর। ঢাকা থেকে সরাসরি চলে যান দেশের বাড়িতে। ইন্তিহাকে সাথে নেয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। তবে আবরারের কড়া নিষেধ, একা একা পাঠাতে একদমই রাজি না সে। কিছুদিন পর ছুটি পেলে নিজেই নিয়ে যাবে ওবাড়িতে। ইন্তিহাও আর কথা বলেনি আবরারের কথার উপর।এমন না যে, ওর যেতে মন চাইছিলো না। তবে লোকটার কথার উপর কিছু বলতে চায় না মন।
সন্ধ্যার পর পর আসে আবরার। অফিস ছুটি বিকেল ৫ টায় হলেও কিছু জরুরী কাজে আটকে যায় আজ। মাগরিবের পর আর বাইরে থাকে না কখনো। বাসায় ইন্তিহাকে পড়াতে বসে এই সময়টায়। পড়াতে বসা তো অজুহাত মাত্র। আসলে বউয়ের কাছাকাছি থাকাই আসল কারন!
“একটা কথা বলবো, রাগ করবেন না বলুন আগে?”
“বলো?”
“না। আগে প্রমিস করুন রাগ করবেন না একটুও।”
“ আমি কখনো রাগ দেখিয়েছি তোমার সাথে? আমার রাগ সম্পর্কে তো ধারনাই নাই তোমার। আর চাইও না এমন কিছু হোক। তোমার যা অবস্থা , আমি ঠিকঠাক করে একটা ধমক দিলেই তো সেদিন আর খুজে পাওয়া যাবে না তোমাকে।”
“ ওরে বাবা! তাহলে তো বলাই যাবে না!”
“ না, বলো। বললাম তো, রাগ করবো না একটুও। কি বলবে বলো ।”
“নাহ, থাক। না বলি।”
“ আরে বলো তো! আগ্রহ জাগিয়ে দিয়ে এখন আবার কথা ঘুরাচ্ছো কেনো?”
আবরারের কথায় হুট করেই হেসে ফেলে মেয়েটা। ও তো দেখতে চেয়েছিলো লোকটার প্রতিক্রিয়া কেমন হয় এই কথা শুনে। কথা কিছুই ছিলো না। লোকটাকে জ্বালানোই ছিলো আসল কারন।
ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে আবরার।“ কি হলো? হাসছো কেন?”
“ কিছুনা।”
“কি বলতে চাইছিলে, বললে না তো?”
“বলবো না বললাম তো।”
মেয়েটার অভিনয় বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। আবরার বুঝে যায়, ওর সাথে মজা করছে মেয়েটা। দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠে ওর মুখে।
“ তুমি জানো, আমি প্রথমবার কোথায় দেখেছিলাম তোমাকে?”
হাসি থেমে যায় মেয়েটার মুখ থেকে। ধক করে উঠে বক্ষপিঞ্জর। কি বললো লোকটা? তার মানে উনি কি আগে থেকেই ওকে চিনতো? নাকি ওর মতোই স্বপ্নে…! আর ভাবতে পারে না মেয়েটা। মাথা ঘুরে উঠে তার। এ নিশ্চয়ই কাকতালীয় ব্যাপার না। সিরিয়াস হয় সে। যা দেখে হাসি আরও গাঢ় হয় ছেলেটার।
“ কোথায়?”
(চলবে)
#তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব -১৩
-তিতা ফুল7 Comments -
Friends
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat
Sk Sagor
@sksagor
Md. Ashraful Alam
@md-ashrafulalam
Fazilatun Nesa
@fazilatun-nesa



দাম্পত্যের সবচেয়ে সুন্দর প্রেমগুলো হয়তো ‘ভালোবাসি’ শব্দে নয়—এক প্লেট ভাত ভাগ করে খাওয়ানো, অসুস্থ রাতে মাথায় পানি ঢালা আর নীরবে পাশে বসে থাকার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। গল্পটি মন ছুয়ে যাচ্ছে।