-
🍎উপকথা । ১৪ সেপ্টেম্বর 🍎
আশিক ও সিনা — শব্দের খেলা, সত্যের ছায়ায়
দুই চরিত্র, দুই মেজাজ। আশিক — ক্লান্ত, রুক্ষ রসিকতার মানুষ। সিনা — দ্রুতগতির, ভাষার মধ্যে লুকানো মিথ্যাটা টেনে বের করে আনে।
১. সোনালী ব্যাংক
সিনা: সোনালী ব্যাংক। নামটাই তো একটা প্রতারণা।
আশিক: মানে?
সিনা: “সোনালী” মানে সোনার মতো উজ্জ্বল। অথচ ভেতরে যা ঘটল, তাতে সোনা তো দূরের কথা, খাদটাও লুকানো ছিল না।
আশিক: (হাসি) তুমি তো একটা ব্যাংকের নাম নিয়েই একটা মামলা চালাতে পারো।
সিনা: চালাচ্ছি তো। শুধু বিচারক নেই।> *রেফারেন্স: সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখায় হলমার্ক গ্রুপের ভুয়া ঋণপত্র জালিয়াতি, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শাখা থেকে সংঘটিত সবচেয়ে বড় ব্যাংক জালিয়াতি।*
> *কৌশল: শ্লেষ — ব্যাংকের নাম “সোনালী” বনাম বাস্তবের প্রতারণা।*২. তাজরীন ফ্যাশনস
আশিক: ওয়ালমার্ট কারখানাটাকে “হাই রিস্ক” বলেছিল, তারপর চুপচাপ সরে গেল।
সিনা: “রিস্ক” শব্দটা ব্যবসায় মানে সতর্কতার একটা কলাম, শ্রমিকের জীবনে মানে মৃত্যু।
আশিক: একই শব্দ, দুই দুনিয়া।> *রেফারেন্স: ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় আগুন, ১১৭-১২১ জন নিহত; ওয়ালমার্ট এক বছর আগেই কারখানাটাকে “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” চিহ্নিত করেছিল।*
> *কৌশল: Antanaclasis — একই শব্দ, দুই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দুই ভিন্ন অর্থ।*৩. ইভ্যালি
সিনা: অ্যাপে লেখা ছিল “শিপড”। বাস্তবে কিছুই আসেনি।
আশিক: শিপড মানে পাঠানো হয়েছে। নাকি শিপ ডুবে গেছে?
সিনা: গ্রাহকও তো একরকম “শিপড” হলো — নিজেদের সঞ্চয় সমেত, অজানা গন্তব্যে।
আশিক: মানুষ বিশ্বাস কিনেছিল টাকা দিয়ে, ব্যবসা টাকা কিনেছিল বিশ্বাস বিক্রি করে।> *রেফারেন্স: ইভ্যালি অ্যাপে অর্ডার “শিপড” দেখাত, কিন্তু পণ্য কখনো আসত না; মোট বকেয়া অন্তত ৩১১ কোটি টাকা।*
> *কৌশল: Pun + Chiasmus — “shipped”-এর দ্বৈত অর্থ, তারপর বিশ্বাস↔টাকার বিপরীতমুখী গঠন।*৪. আদমজী পাটকল
আশিক: শ্রমিকরা ভেবেছিল, এটা সাময়িক। মালিকপক্ষও বলেছিল, সাময়িক।
সিনা: “সাময়িক” শব্দটা তিরিশ বছর ধরে চলল।
আশিক: সবচেয়ে স্থায়ী জিনিস ছিল সেই “সাময়িক” অবস্থাটাই।> *রেফারেন্স: আদমজী পাটকল ১৯৭২ থেকে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে ২০০২ সালে বন্ধ হয়, তিন দশক ধরে কেউ প্রকাশ্যে “এটা মরে যাচ্ছে” বলেননি।*
> *কৌশল: Paradox — “সাময়িক” শব্দটাই সবচেয়ে “স্থায়ী” হয়ে ওঠে।*৫. “ক্রসফায়ার”
সিনা: “ক্রসফায়ার।” শব্দটা শুনতে প্রায় আবহাওয়ার খবরের মতো নিরপেক্ষ।
আশিক: এটাই এক ধরনের অনুবাদ — “হত্যা”-কে “পালানোর চেষ্টা”-য় রূপান্তরের অনুবাদ।
সিনা: ক্রসফায়ার মানে দুই পক্ষের গুলি। কিন্তু এখানে এক পক্ষই গুলি চালাল — কাগজে দুই পক্ষ লেখা হলো।> *রেফারেন্স: মানবাধিকার সংগঠনের হিসেবে “ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধ/এনকাউন্টার” শব্দগুলো বহুবার বিচারবহির্ভূত হত্যার ছদ্মবেশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ।*
> *কৌশল: দ্ব্যর্থকতা — শব্দের আভিধানিক অর্থ বনাম বাস্তব ঘটনার এক-পাক্ষিকতা।*৬. জাহাজভাঙা শিল্প, সীতাকুণ্ড
আশিক: রাতে কাজ করত, কারণ রাতে পরিদর্শক আসে না।
সিনা: অন্ধকারে নিয়ম লুকায়, আলোয় লজ্জা — এখানে উল্টো।
আশিক: “নিরাপত্তা” শব্দটার এখানে দুটো মানে — শ্রমিকের নিরাপত্তা, আর মালিকের নিরাপত্তা (ধরা না পড়ার)।> *রেফারেন্স: সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্পে রাতে বেআইনিভাবে কাজ চালানো হতো, যেহেতু আইনে নিষিদ্ধ হলেও রাতে পরিদর্শক আসত না।*
> *কৌশল: Antanaclasis — “নিরাপত্তা” শব্দের দুই বিপরীতমুখী প্রয়োগ।*৭. এসিড সহিংসতা
সিনা: একটা “না” শোনার পর প্রতিশোধ। কী অদ্ভুত হিসেব।
আশিক: “প্রেম” শব্দটা এখানে সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত।
সিনা: সে বলত “ভালোবাসি,” আর প্রমাণ দিল বোতল দিয়ে।
আশিক: (থেমে) এইখানে আর হাসতে পারছি না।
সিনা: হাসারও দরকার নেই। শুধু শব্দটা ধরে রাখো।> *শ্লেষ — “প্রেম” শব্দকে সহিংসতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহারের স্ববিরোধিতা।*
জাপানি ধাঁচের শব্দখেলা — সেনরিউ ও কাকেকোতোবা
সিনা: হাইকু তো প্রকৃতির জন্য। আমাদের খাতাটা তো মানুষের বানানো বিপর্যয়ের।
আশিক: তাহলে সেনরিউ। জাপানিরা এটাই ব্যবহার করত ক্ষমতাকে খোঁচা দিতে।
সিনা: চলো লিখি।**সেনরিউ ১ — সোনালী ব্যাংক**
> সোনার নামে
> খাদ জমা রেখেছে
> ব্যাংকের ভল্ট**সেনরিউ ২ — “শীঘ্রই”**
> শীঘ্রই আসবে
> তিরিশ বছর গোনা
> এখনো “সাময়িক”**সেনরিউ ৩ — ক্রসফায়ার**
> দুই পক্ষ লেখা
> কাগজে যুদ্ধ হলো
> এক হাতে গুলিআশিক: কাকেকোতোবা জিনিসটা মজার। জাপানি কবিরা একটা শব্দ বসাত, যার একদিকের বাক্যে এক মানে, অন্যদিকের বাক্যে আরেক মানে — দুটোই সত্যি, একসঙ্গে।
সিনা: আমাদের শ্লেষও তো তাই করে। “রিস্ক” শব্দটাই তো একটা কাকেকোতোবা — এক পাশে স্প্রেডশিট, আরেক পাশে লাশ।
আশিক: তাহলে আমরা তো না জেনেই জাপানি কবিদের মতো লিখছিলাম এতদিন।
সিনা: অথবা ওরাই না জেনে আমাদের মতো লিখেছিল। ভাষার কষ্টটা তো সব দেশেই এক।(তীক্ষ্ণতা সবসময় প্রতিষ্ঠান, ভাষা ও ক্ষমতার স্ব-প্রতারণার দিকে তাক করা — ভুক্তভোগীর দিকে নয়।)
3 Comments-
Ashik Mokami, আপনার এই লেখায় সমাজের ক্ষতগুলো শব্দের সূক্ষ্ম বিন্যাসে যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই অসাধারণ এবং গভীর অনুভূতির সৃষ্টি করে। প্রতিটি প্রসঙ্গের পেছনের অসংগতিগুলো তুলে ধরার ভঙ্গিটি বেশ চমৎকার এবং পাঠকমাত্রই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের এই গ্রুপের সবার লেখাগুলো পড়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে এবং নিয়মিত মন্তব্য করতে পারেন, যাতে আমাদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
Friends
মারকাযুল আনছার মহিলা মাদরাসা
@650e4da081a127b8b14fa9606be6476b
মো মবিনুল ইসলাম সিয়াম
@mobinulislam
Uttam Kumar Ghosh
@uttam01825
wajibad
@wajibad
নাঈম ভুঁইয়া
@naimbhuiyan
বান্টি দেব
@bantideb
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
Ms. Tanha
@ms-tanha
Md. Kamrul Hasan
@md-kamrulhasan

আপনার লেখাগুলো পড়ে অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করছে, বিশেষ করে ‘রিস্ক’ শব্দটা নিয়ে আপনার বিশ্লেষণটা অসাধারণ ছিল। শ্লেষ আর শব্দের খেলার মাধ্যমে বাস্তবতাকে এভাবে ফুটিয়ে তোলা সত্যিই বেশ ইউনিক। এমন দারুণ আর গভীর কিছু পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম।