Profile Photo

naznin shamimOffline

  • nazninshamim
  • Profile picture of naznin shamim

    naznin shamim

    • 1 month, 1 week ago

    “ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে”
    নাজনীন শামীম
    চট্টগ্রাম থেকে
    ৫ ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং

    ​ চোখের কোণে জমাট বাঁধা নোনা জল আর মোবাইল স্ক্রিনের নীল আলো—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মারিয়া তখন সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিল।
    ​স্পেনের মাদ্রিদ শহরের এক ব্যস্ত ক্যাফেতে বসেছিল মারিয়া। স্প্যানিশ বাবার মেয়ে হলেও মারিয়ার মা ছিলেন বাংলাদেশি। কিন্তু কোনো দিন ওই রক্ত আর শিকড়ের গল্প নিয়ে মারিয়া ভাবেনি। তবে বছর দুয়েক আগে সিয়ামের সাথে ফেসবুকে একটি সাহিত্যচর্চার গ্রুপে তার পরিচয় হয়। ঢাকার সাধারণ এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা সিয়ামের সহজ-সরল কথা আর কবিমন মুহূর্তেই জয় করে নিয়েছিল মারিয়ার মন। ভাষা বা দূরত্বের কোনো দেয়াল তাদের থামিয়ে রাখতে পারেনি। তাদের প্রেমটা সময়ের সাথে সাথে গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে।
    ​কিন্তু বাস্তবের পৃথিবী ভালোবাসার মতো অত সহজ নয়। সিয়ামের পরিবারে তীব্র আর্থিক টানাফোড়েন শুরু হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। পাশাপাশি, একপ্রকার সামাজিক আর পারিবারিক চাপে পড়ে সিয়ামের বাবা-মা বাধ্য করেন তার মামাতো বোনের সাথে বিয়ের সম্বন্ধ চূড়ান্ত করতে। পরিবারের এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে সিয়াম ভেঙে পড়ে। সে মারিয়াকে এক রাতে ফোন করে স্রেফ কেঁদে ফেলেছিল, “মারিয়া, আমি হেরে যাচ্ছি। আমি পরিবারকে বোঝাতে পারছি না। তোমার সাথে হয়তো শেষ দেখাটাও আর হবে না।”
    ​ফোনটা কেটে যাওয়ার পর মারিয়া আর এক মুহূর্তও ভাবেনি। ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে পরদিনই বাংলাদেশগামী শেষ ফ্লাইটে উঠে পড়ে সে। কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না, ছিল কেবল ভালোবাসার মানুষকে হারানোর বুকফাটা ভয় আর তাকে একবার স্পর্শ করার অদম্য আকুলতা।
    ​হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন মারিয়া পা রাখল, তখন ঢাকায় তীব্র ঝুম বৃষ্টি। নিজের চেনা শহর ছেড়ে, চেনা সংস্কৃতি ছেড়ে অচেনা এই শহরে কেবল সিয়ামের মুখটা চোখের সামনে ভাসছিল তার। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই সে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা চলে যায় সিয়ামদের ধানমন্ডির বাসার সামনে।
    ​দরজায় কড়া নাড়তেই সিয়ামের মা দরজা খোলেন। সামনে এক ভীনদেশী মেয়েকে বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে দেখে তিনি অবাক হন। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সিয়াম যখন মারিয়াকে দেখল, তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এত মাইলের দূরত্ব পেরিয়ে, কোনো সতর্কতা ছাড়াই একটা মেয়ে শুধু তার ভালোবাসার টানে এক কাপড়ে অন্য দেশে চলে এসেছে!
    ​কিন্তু গল্পের পরিণতি সবসময় সিনেমার মতো সুখী হয় না। মারিয়া এসে সিয়ামের সামনে দাঁড়ায়, কিন্তু সিয়ামের চোখজুড়ে ছিল অপরাধবোধ আর অসহায়ত্ব। নিজের অসুস্থ বাবা আর পরিবারের সম্মান বাঁচাতে সিয়াম তখন মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। সিয়াম মারিয়ার দিকে তাকিয়ে কেবল বলল, “মারিয়া, তুমি কেন এলে? আমি তো তোমাকে পাওয়ার যোগ্য নই। পরিবারকে ফেলে যাওয়ার সাহস আমার নেই।”
    ​মারিয়া সিয়ামের এই চরম সত্য আর বাস্তবতার দেয়ালটা বুঝতে পেরেছিল। সে বুঝেছিল, ভালোবাসার টানে ছুটে আসা সহজ, কিন্তু একজন মানুষকে তার পারিবারিক শিকড় থেকে উপড়ে ফেলা অসম্ভব। মারিয়া কোনো কান্নাকাটি বা হৈচৈ করল না। সে শুধু সিয়ামের চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর পকেট থেকে তাদের পছন্দের একটি শুকনো গোলাপ বের করে সিয়ামের হাতের তালুতে রাখল।
    ​”আমি কোনো অভিযোগ নিয়ে আসিনি সিয়াম, শুধু নিজের ভালোবাসার সত্যতাটুকু প্রমাণ করতে এসেছিলাম,” মৃদু হেসে বলেছিল মারিয়া।
    ​সেই রাতেই মারিয়া এয়ারপোর্টে ফিরে যায়। বিমানের জানালার কাচে যখন বৃষ্টিফোঁটাগুলো আঁচড় কাটছিল, মারিয়া দূর থেকে জ্বলতে থাকা ঢাকা শহরের আলোর দিকে চেয়ে রইল। সে ভালোবাসার মানুষকে পায়নি সত্য, কিন্তু প্রেমের টানে সীমানা পেরিয়ে আসার মধ্যে যে এক মহৎ বিরহ আর আত্মত্যাগ আছে, তা তার হৃদয়কে সারা জীবনের জন্য এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরিয়ে দিল।

    3
    3 Comments
    • শুকনো গোলাপ হাতে দিয়ে বিদায় নেওয়ার সেই দৃশ্যটা মন ছুঁয়ে গেলো। ভালোবাসাকে জোর করে না ধরে রেখে ছেড়ে দেওয়ার এই সৌন্দর্য অসাধারণ।

      • আপনার সুন্দর মন্তব্যে আমি দারুণ অনুপ্রাণিত,। অনেক ধন্যবাদ প্রিয় কবি❤️❤️

    • দূর দেশ থেকে ভালোবাসার টানে ছুটে আসার এমন তীব্র আবেগ আর মারিয়ার সেই শেষ মুহূর্তে শুকনো গোলাপটি তুলে দেওয়ার বিষাদময় মুহূর্তটি আমার হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে গেছে, তবে আপনি চাইলে পরবর্তী লেখায় মারিয়ার নীরব প্রস্থানের পরের অনুভূতিগুলো আরও কিছুটা বিস্তারিত জুড়ে দিতে পারেন, কারণ আপনার এমন সহজ ও সাবলীল বর্ণনার ক্ষমতা সত্যিই প্রশংসনীয়।

Friends

Skip to toolbar