Profile Photo

Imranul HossainOffline

  • imranulhasan
  • Profile picture of Imranul Hossain

    Imranul Hossain

    1 day, 4 hours ago

    কুয়াশার সকাল
    ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
    আমিনুল ইসলাম

    শহরের ব্যস্ততা তখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি। ভোরের আকাশটা হালকা ছাই রঙের চাদরে ঢাকা। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নীলিমা দেখছিল, কীভাবে কুয়াশার পাতলা আস্তরণ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে রাস্তার ধারের কৃষ্ণচূড়া গাছটার গা থেকে। আজকের সকালটা অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে একটু আলাদা। একটা অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছে বুকের ভেতর, যাকে ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

    নীলিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফির মগে চুমুক দিল। কফির ধোঁয়াটা কুয়াশার সাথে মিশে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে— “জানালার পর্দাটা একটু সরাবে? বাইরেটা আজ অদ্ভুত সুন্দর।”

    নীলিমা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সে কি ভুল দেখছে? চারপাশটা তো একদম নিরিবিলি। সে সাবধানে জানালার পর্দাটা আরেকটু টেনে সরিয়ে দিল। রাস্তার ওপারে, অস্পষ্ট কুয়াশার ভেতর একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটা স্থির, যেন বহুক্ষণ ধরে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। নীলিমা চশমাটা ঠিক করে ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। ছেলেটা কি তাকে দেখছে? তার মনে হলো, ছেলেটার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি খেলা করছে।

    ***

    অর্ক অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে একটা ধূসর রঙের হুডি। কুয়াশার কারণে তার চুলগুলো ভিজে একাকার। নীলিমাকে জানালা দিয়ে উঁকি দিতে দেখেই তার হৃৎপিণ্ডটা ধক করে উঠল। সে জানে, এই কাজটা একদম পাগলামি। অথচ গত কয়েকদিন ধরে ঠিক এই সময়ে সে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করে, শুধু এক পলক দেখার আশায়।

    নীলিমা জানালা থেকে সরে এল না। বরং সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত এক আকর্ষণ তাকে যেন স্থির করে রেখেছে। ছেলেটার সাথে তার কোনো পরিচয় নেই, অথচ দীর্ঘদিনের কোনো পরিচিত বন্ধুর মতো তাকে মনে হচ্ছে।

    অর্ক হাত তুলে সামান্য ইশারা করল। নীলিমা দ্বিধাভরেই হাতটা তুলল, তারপর নিজেই নিজের বোকামিতে হেসে ফেলল। সে কি পাগল হয়ে গেল? একটা অচেনা মানুষের সাথে এভাবে ইশারায় কথা বলছে! নীলিমা কফির মগটা টেবিলে রেখে দ্রুত পায়ে ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে গেল। হয়তো তার দরজা খোলার সাহস হবে না, কিন্তু বাইরের এই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালটা তাকে ঘরের ভেতর বন্দি থাকতে দিচ্ছে না।

    ***

    রাস্তায় নামতেই ঠান্ডা বাতাস নীলিমার গা ছুঁয়ে গেল। সে রাস্তার দিকে এগোতেই দেখল, ছেলেটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। কাছে আসতেই অর্ক কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ল। সে ভাবেনি নীলিমা সত্যি সত্যি নিচে নেমে আসবে।

    “আমি কি খুব বড় কোনো ভুল করে ফেললাম?” অর্ক একটু কাঁচুমাচু গলায় প্রশ্ন করল। তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর, কিন্তু তাতে একটা মিষ্টি সুর আছে।

    নীলিমা একটু হাসল। তার চোখের কোণে কৌতূহল। “ভুল কি ঠিক, সেটা তো পরে বোঝা যাবে। তবে আপনি যে সকালটা নষ্ট করে আমার জানালার নিচে দাঁড়িয়ে আছেন, তার একটা ব্যাখ্যা তো পাওনা আছে।”

    অর্ক মাথা চুলকে ইতস্তত হেসে বলল, “ব্যাখ্যা খুব সাধারণ। শহরের এই কুয়াশাটা আমার ভীষণ প্রিয়। আর আজ সকালে মনে হলো, এই কুয়াশার ভেতরে কোনো এক রূপকথার রাজকন্যা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে আটকাতে পারলাম না।”

    নীলিমা হেসে উঠল। তার হাসিটা যেন কুয়াশা কাটিয়ে ভোরের প্রথম সূর্যের আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। “রাজকন্যা না হলেও, কফি খেতে খেতে একঘেয়েমি কাটানোর সঙ্গী হতে পারি। আপনার কাছে কি কফি আছে?”

    অর্ক পকেট থেকে একটা থার্মাস ফ্লাস্ক বের করে দেখাল। “আমার কাছে গরম কফি আছে। আর আছে এক ঝুড়ি গল্প। যদি শোনার ধৈর্য থাকে।”

    রাস্তার ধারের বেঞ্চিতে দুজনে বসল। কুয়াশা তখন অনেকটা পাতলা হয়ে এসেছে। শহরের কোলাহল শুরু হতে দেরি আছে। অর্ক আর নীলিমা বসে আছে পাশাপাশি। তাদের মাঝখানের দূরত্বটা বড়জোর কয়েক ইঞ্চির, কিন্তু সেই শূন্যস্থানে যেন হাজারটা না বলা কথা দানা বাঁধছে।

    অর্ক তার থার্মাস থেকে কফি ঢেলে নীলিমার দিকে বাড়িয়ে দিল। নীলিমা মগটা হাতে নিয়ে উষ্ণতা অনুভব করল। বাইরের আবহাওয়া ঠান্ডা হলেও, বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে উষ্ণ হয়ে উঠছে।

    “আপনার নামটা তো জানা হলো না,” নীলিমা নিচু স্বরে বলল।

    “অর্ক। আর তোমার?”

    “নীলিমা।”

    অর্ক নীলিমার দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে গভীরতা। সে মৃদু হেসে বলল, “নীলিমা, এই কুয়াশা কি কেবলই শীতের আগমনী বার্তা, নাকি নতুন কোনো গল্পের শুরু?”

    নীলিমা উত্তর দিল না। সে শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে কুয়াশা সরে গিয়ে সকালের সোনালী রোদ উঁকি দিচ্ছে। একটা সুন্দর সকালের শুরু হলো, যেখানে অর্ক আর নীলিমার গল্পটা মাত্র পাতায় রূপ নিতে শুরু করেছে। কুয়াশার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা এই সকালটা তাদের জীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে, তা সময় বলবে। তবে আপাতত, তাদের দুজনের কাছে এই মুহূর্তটাই সবচেয়ে দামি।হঠাৎ করেই নীলিমার হাতের মগটা একটু কেঁপে উঠল। কফির বাষ্পের সাথে সাথে তার চোখের দৃষ্টিতেও যেন এক অদ্ভুত অস্থিরতা খেলে গেল। সে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখল, কুয়াশার ঝাপসা পর্দা পুরোপুরি সরে যেতেই একটি কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি ধীরগতিতে তাদের বেঞ্চির সামনে এসে থামল। কাঁচের ওপাশে কাউকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু গাড়িটার উপস্থিতি এই শান্ত সকালকে মুহূর্তে যেন এক অস্বস্তিকর স্তব্ধতায় মুড়ে দিল।

    অর্কও বিষয়টি লক্ষ্য করেছে। তার চেহারার সহজ ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। সে নীলিমার দিকে ঝুঁকে নিচু স্বরে বলল, “তুমি কি কাউকে আশা করছিলে?”

    নীলিমা কোনো কথা বলল না। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সে দ্রুতবেগে কফির মগটা বেঞ্চিতে রেখে উঠে দাঁড়াল। তার ঠোঁট কাঁপছে, যেন কিছু বলতে গিয়েও সে নিজেকে আটকে নিল। ঠিক তখনই গাড়িটার পেছনের দরজা খুলে গেল এবং উজ্জ্বল কোট পরা এক দীর্ঘদেহী মানুষ নেমে এল। লোকটার হাতে একটা পুরোনো চামড়ার ডায়েরি, যা নীলিমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে শীতল গলায় বলল, “সময় শেষ, নীলিমা। আপনি যা লুকিয়ে রেখেছেন, তা ফিরিয়ে দেওয়ার এটাই শেষ সুযোগ।”

    অর্ক তৎক্ষণাৎ নীলিমার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর সেই রূপকথার স্বপ্ন নেই, বরং এক তীক্ষ্ণ সতর্কবার্তা। সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “সকালটা কফি দিয়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু মনে হচ্ছে শেষটা অতটা মিষ্টি হবে না। নীলিমা, এই লোকটা কে?”

    নীলিমা অর্কর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার হাতের শীতলতা অর্কর হাতের উষ্ণতাকে ছাপিয়ে গেল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “অর্ক, তুমি জানো না তুমি কিসের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছ। এই ডায়েরিটা আমার কাছে থাকা মানেই হলো… বিপদ।”

    লোকটি এক পা এগিয়ে এসে অট্টহাসি দিল। সেই হাসিতে কুয়াশার চেয়েও বেশি হাড়কাঁপানো ঠান্ডা ছিল। সে পকেট থেকে ছোট একটা ধাতব বস্তু বের করল, যা রোদে ঝিলিক দিয়ে উঠল। অর্ক বুঝতে পারল, এটা কেবল সাধারণ কোনো কথোপকথন নয়, বরং শহরের এই শান্ত সকালের আড়ালে অনেক গভীর কোনো রহস্য ও আসন্ন বিপদের হাতছানি। সে নীলিমাকে নিজের পেছনে আড়াল করে নিয়ে পকেটে হাত রাখল, যেখানে তার নিজের কোনো অস্ত্র নেই, কিন্তু আছে অদম্য এক জেদ।

    “ডায়েরিটা ওর হাতে তুলে দাও নীলিমা,” অর্ক বলল, কিন্তু তার চোখ লোকটার হাতের দিকে স্থির। “দেখা যাক, এই গল্পের শেষটা কে লেখে।”

    3
    3 Comments
    • Imranul Hossain, এই কুয়াশাঘেরা সকালে কফির আড্ডার সাথে এমন রহস্যময় মোড় গল্পের আমেজটাই পুরোপুরি বদলে দিলো, তবে কি নীলিমা কোনো বড় বিপদের আশঙ্কায় ডায়েরিটা এতদিন নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছিল?

    • কুয়াশার সেই মিষ্টি সকালেই লুকিয়ে ছিল রহস্যের প্রথম পদক্ষেপ গল্প শেষ হয় না এত সহজে…..🤍🖤

    • আপনার এই দারুণ রচনাটিতে কুয়াশার রহস্যময় আবহের সাথে নীলিমা আর অর্কর পরিচিত হওয়ার মুহূর্তটি বেশ প্রাণবন্তভাবে ফুটে উঠেছে এবং গল্পের এই রোমাঞ্চকর মোড়টি সত্যিই পরবর্তী অংশ পড়ার জন্য পাঠকদের দারুণভাবে উৎসুক করে তুলছে—তাই এভাবেই আপনার লেখা এগিয়ে নিয়ে যান, আপনি অসাধারণ লিখছেন!

Friends

Skip to toolbar