-
লা’শ নিয়ে আসতে আসতে মাগরিবের সময় হয়ে যায়। এদিকে আবরারদের আত্মীয় স্বজন সবাই চলে এসেছে প্রায়। অনেকে আসার পথে আছে এখনো। বাড়িতে মানুষ অনেক। পাড়া প্রতিবেশী থেকে শুরু করে চেনা অচেনা অনেক মানুষের আনাগোনা।
খাদিজা বেগম অজ্ঞান হয়েছেন দুইবার। মাথায় তেল মালিশ করা হচ্ছে উনার। এদিকে আসমা বেগমকে গোসল করানো হচ্ছে মাত্র। এশারের পর জানাজা হবে।সারাদিন কিছুই খাওয়া হয়নি কারো।
ইন্তিহা ভেতরের ঘরে আছে খাদিজা বেগমের কাছে। ওরও কথা আসছে না গলা দিয়ে। তৃষ্ণার্ত দুচোখ শুধু আবরারকেই খুঁজছে বারবার। তবে আসার পর থেকে আর খোঁজ পাওয়া যায় নি লোকটার। কোথাও একা একা বসে আছে নিশ্চয়ই!এর মধ্যেই ইন্তিহার আম্মু আব্বু আর ভাইয়া আসে। মাকে পেয়েই জড়িয়ে ধরে ইন্তিহা। কেঁদে ফেলেন আমেনা বেগমও। তবে ইন্তিহা কাঁদে না। ও কাঁদলে আবরারকে সামলাবে কে? মেঝো ভাবীর জ্ঞান ফিরলে বারবার ‘আম্মা’ ‘আম্মা’ বলে কাঁদতে থাকেন উনি।ইন্তিহা শান্ত করার চেষ্টা করে উনাকে।
“ শান্ত হোন ভাবী। আল্লাহর কাছে দুয়া করুন আম্মুর নাজাতের জন্য। কাঁদলে আম্মুর কষ্ট হবে আরো।”
“ ইনি আমাদের এতিম করে গেলো ইন্তিহা। আর কোনদিন ‘মা’ বলে ডাকবে না আমাকে। আর কে আমাকে এতো আদর করবে বল। কে করবে?”
উনার বিলাপ যেন থামছেই না। এসময় মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। চারপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেসবের ধ্যান থাকে না তার। ইন্তিহা উনার পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে। রাবেয়া বেগমের চোখেও পানি। উনাকে শত ধমকের উপর রাখুক না কেন, সব বউকেই স্নেহ করতেন মেয়ের মতো। আপন মেয়ে তো ছিলো না, ওদের তিন জা কেই নিজের মেয়ে মনে করতেন তিনি।
এশারের পর জানাজা হয়ে যায়। ওদের এই বাড়িটা বিশাল। বাড়ির সামনের দিকে পারিবারিক কবরস্থান। সেখানেই দাফন করা হয় আসমা বেগমকে।
লাশ দাফনের পর সবাই ধীরে ধীরে চলে যেতে থাকে। ফাঁকা হতে থাকে লোকে ভরপুর বাড়িটার আনাচ কানাচ। পাশের বাড়ি থেকে গরুর মাংস, ডাল আর ভাত রান্না করে পাঠানো হয়েছিলো মেহমানদের জন্য। কুসংস্কার ওরা মানে না কখনোই, তবে এতো মানুষের রান্না করার মতো মানষিক অবস্থা ছিল না বাড়ির কারো। মেহমানরা খেয়ে দেয়েই গেছে। তবে খাবারের প্লেটে হাত লাগায়নি বাড়ির কেউই।
কান্নার রেশ কাটেনি এখনো। খানিক বাদে বাদেই কান্নার দমক উঠছে বাড়ির ভেতর। সারাদিন পর প্রায় রাত ১২ টার সময় দেখা মেলে আবরারের। রুমে এসে কোন কথা না বলে শুয়ে পড়ে বিছানায়। ইন্তিহা পাশে বসে। চুলে হাত বুলিয়ে দেয় লোকটার। সাথে সাথেই বন্ধ চোখের পাতা থেকে নির্দ্বিধায় অশ্রু গড়ায় তার।
“ খেয়ে নিন কিছু। এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বেন আপনি। কাল রাতের পর থেকে তেমন কিছুই তো খাননি।”
আবরার বলে না কিছুই। না তো চোখ খুলে তাকায় স্ত্রীর পানে। পড়ে থাকে চুপচাপ জড় বস্তুর মতো। ইন্তিহা উঠে যায় রান্নাঘরের উদ্দেশে। প্লেটে করে অল্প করে ভাত আর একটু তরকারি নিয়ে ফেরত আসে। গ্লাসে পানি ঢেলে নেয় খানিক।
“ উঠে বসুন একটু। পানিটা খেয়ে নিন।”
“ খাবো না বলালাম তো, কেন জোর করছো?”
“ আমি খাইয়ে দিবো। অল্প করে হলেও নিন। অসুস্থ হয়ে পড়বেন আপনি।”
“ একদিন না খেলে কিছু হবে না।”
ইন্তিহা নিজেই জোর করে উঠানোর চেষ্টা করে আবরারকে।
“ কেন বিরক্ত করছো ইন্তিহা? খাবো না বললাম তো।”
“ খাবেন না?”
“না, সরো।”
“আপনার কি মনে হয়? সারাদিনে আমি খেয়েছি কিছু?”
চুপ করে থাকে আবরার। ওর ট্রিক ওর উপরেই প্রয়োগ করছে মেয়েটা।
আরো কিছুক্ষন ঠেলাঠেলি করে উঠায় লোকটাকে। ভাত মেখে লোকমা বানায় বড় করে।“ হা করেন।”
কথা না বাড়িয়ে দুই লোকমা খায় সে। এর বেশি খেতে পারে না। নামে না গলা দিয়ে খাবার।ইন্তিহাও আর জোর করে না। আবরারকে পানি খাইয়ে বাকিটা নিজেই খেয়ে নেয়। খাদিজাকে জোর করেও খাওয়ানো যায়নি কিছুই। এমনকি এক ফোঁটা পানিও মুখে নেননি এই পর্যন্ত। দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্লেট রেখে রুমে আসে ইন্তিহা। আবরার বসে আছে এখনো একই ভাবে। ইন্তিহা এসে পাশে বসে। হাত রাখে লোকটার কাঁধে। চোখ তুলে আবরার।
“ কাঁদুন। কেঁদে মন হালকা করুন।”
আবরার তাকিয়েই থাকে এক মনে। কতো সহজে বলে দিলো কথাটা। পুরুষ মানুষের কান্না কি এতোই সহজ? আবেগ প্রকাশ মেয়েদের জন্য যতটা সহজ, ছেলেদের জন্যও কি তাই?
“ প্রতিটা প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে। অন্য কারো মৃত্যু আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ইনশাআল্লাহ, জান্নাতে আমরা আবার দেখা করবো আম্মুর সাথে। শুধু দুয়া করুন উনার জন্য। আল্লাহ উনাকে জান্নাতবাসী করুন, আমীন।”
“আমীন।”
মাঝারাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে পাশে আবরারকে না দেখে বুকটা ধক করে উঠে ইন্তিহার। এতোরাতে কোথায় যাবে লোকটা? রুমের দরজাটা চাপানো। বাইরে গেছে নিশ্চয়ই। কি মনে হতেই বারান্দার দরজা খুলে সে। বারান্দা থেকে বাড়ির সামনের দিকটা স্পষ্ট দেখা যায়। পূর্ণিমা বোধহয় আজ। চারদিক কেমন ধবধবে আলোয় ভরপুর। বাড়ির সামনের দিকে কবরস্থানে সাদা পাঞ্জাবী পরা একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। মুখ না দেখেই মেয়েটা বলে দিতে পারে এটা তার স্বামী। কবর জিয়ারত করছে কি?
কিছু দুঃখ মানুষের একেবারেই নিজস্ব হয়। অন্য কারো উপস্থিতিও বেমানান সেখানে। থাকুক না লোকটা একা কিছুক্ষন।
বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে ইন্তিহা। যতক্ষণ পর্যন্ত না আবরার উঠে আসছে সেখান থেকে। ফজরের খানিক আগে আবরার ফিরে আসে। ওর আসা দেখে রুমে গিয়ে আগের মতো শুয়ে পড়ে ইন্তিহা। আবরার রুমে এসে টুপি খুলে রাখে টেবিলের উপর। বারান্দার দরজা বন্ধ করে। বিছানার কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়।“ এখন শুয়েছো কেন? উঠো, তাহাজ্জুদ পড়ে ফজর পড়ে একেবারে ঘুমিও।”
চোখ পিটপিট করে তাকায় ইন্তিহা। ও যে জেগে আছে, কিভাবে বুঝলো লোকটা? দীর্ঘশ্বাস ফেলে জায়নামাজ বের করতে করতে বলে উঠে আবরার,
“ এতো রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকার মানে কি? এমনিতেই ঠাণ্ডা পড়ে এসময়।”
তড়াক করে চোখ মেলে তাকায় ইন্তিহা। লোকটা বুঝে গেলো সব? দেখেছিলো কি তখন? তড়িঘড়ি উঠে বসে সে।
“ আপনি দেখেছেন আমায়?”
“না দেখলে বুঝতাম না মনে হয়? বারান্দার দরজাটাও তো বন্ধ করে নিবে!”
মনে মনে নাক কুঁচকায় মেয়েটা। বিরক্ত হয় নিজের বোকামির জন্য। ভাবাভাবি বাদ দিয়ে অজু করে আসে সে। দাঁড়ায় আবরারের পেছনে। নিস্তব্দ শেষ রাতে দুজন মানুষ একাকী সামিল হয় প্রার্থনায়।
(চলবে)
-তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-১৬
-তিতা ফুল3 Comments
Friends
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat
Sk Sagor
@sksagor
Md. Ashraful Alam
@md-ashrafulalam
Fazilatun Nesa
@fazilatun-nesa



মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর ও কঠিন আবেগগুলোকে আপনি খুব সুন্দর এবং মমতাভরা শব্দে ফুটিয়ে তুলেছেন, বিশেষ করে শোকের মুহূর্তে একে অপরের পাশে থাকার দৃশ্যটি আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। এমন সংবেদনশীল বিষয়গুলো আরও বিস্তারিতভাবে লিখে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, কারণ আপনার লেখার ভঙ্গি পাঠককে এক ধরনের অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়।