Profile Photo

Drako ShajibOffline

  • drako
  • Profile picture of Drako Shajib

    Drako Shajib

    6 days, 12 hours ago

    গল্প : মঙ্গলগ্রহন
    ———————————

    ** সূর্যের আয়ু আর মাত্র ২৯ দিন **

    সূর্যের আয়ু প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। বিশ্ব বৈজ্ঞানিক সংস্থার হিসাব মতে আর মাত্র ২৯ দিন আমাদের হাতে আছে। এরপরেই সূর্য তার সমস্ত শক্তি নিংড়ে এক মহাবিস্ফোরণ ঘটাবে।

    ইতিমধ্যে সূর্যের আয়তন বেড়ে হয়েছে ৩ গুন। প্রচন্ড তাপমাত্রা অসহনীয় করে তুলেছে সৃষ্টিকূল, তবে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সংস্থা যে আর্থশিপ তৈরী করেছে তার জন্য আমরা প্রচুর ফুয়েল পেয়ে যাচ্ছি। অবশ্য আমাদের নিউক্লিয়ার চুল্লী থেকেও অসীম পরিমাণ শক্তি তৈরী করে স্টক করে রাখা আছে। তবে সমস্যা হচ্ছে সৌরমণ্ডল নামক এই পরিবার থেকে অবাধ্য সন্তানের মত পৃথিবীকে বেরিয়ে আসতে হবে তার নিজস্ব কক্ষপথ ছেড়ে। এর জন্য এক মহাশক্তির প্রয়োজন যেমনটা তৈরী হবে গোটা সূর্যটা ফেটে পড়লে।

    বিষয়টা খুব হাস্যকর লাগছে আতিকের। সৌরজগতের বাইরে গিয়ে অন্য গ্যালাক্সিতে বাসা বাধতে চায় গোটা বিশ্ববাসী। এই সৌরমন্ডলের ভেতর, যে নিরাপত্তার মাঝে আমাদের আশ্রয় ছিল তা কি পাওয়া যাবে অন্য কোথাও? অবশ্য যে গাছ এত দিন ছায়া দিয়েছে তার মৃত্যু হলে ক’দিন আর শোক করবে মানুষ যখন তাদের নিজের জীবন নিয়ে টানাটানি। আতিক প্রতিবেদনটি আবার পড়তে শুরু করে।

    চায়নার কৃত্রিম সূর্যকে প্রস্তুত করা হয়েছে পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তবে এই সূর্য ঠিক কিভাবে প্রদক্ষিণ করবে পৃথিবীকে এ বিষয়ে এখনো কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পারেনি বিশ্ব বৈজ্ঞানিক সংস্থা। তবে সিদ্ধান্ত হয়েছে দক্ষিণ ব্যাসর্ধীয় ছায়াপথ ধরে এগিয়ে চলবে পৃথিবী এনড্রোমিডা গ্যালাক্সির দিকে। এই ছায়াপথের ভেতর সূর্যের সমগোত্রীয় কোন একটি তারার অক্ষপথে ঢুকে যাবে পৃথিবী। চাঁদের সাথে পৃথিবীর সম্পর্ক চিরতরে বিছিন্ন হবার আশংকায় বিশ্ব কবি কমিটির আন্দোলন বিজ্ঞানীদের চিন্তিত করে তুলছে। তাই বিশ্ববাসীর কাছে তাদের একমাত্র প্রত্যাশা, এই সংকটময় সময়ে যেন সবাই তাদেরকে মনোবল যোগাতে সহায়তা করে।

    আতিকের আর পড়তে ভালো লাগছে না। সে ভাবতে শুরু করল এই পৃথিবীটাকে কিভাবে অন্য গ্যালাক্সিতে নিয়ে যাওয়া হবে। কিভাবে আর্থশীপ কন্ট্রোল করবে?

    পৃথিবী হঠাৎ একদিকে ছোটা শুরু করলে সবকিছুর উপর কিভাবে প্রভাব পড়বে?
    “নাহ! এটা একটা সুইসাইড মিশন ছাড়া আর কিছুই না”, বলে চিৎকার করে উঠল সে।

    ঘরে ছেড়ে পথে নামল আতিক। এখন আর রাত হয়না এই পৃথিবীতে, চারিদিকে আলোয় ঝলমল করছে। সেই প্রখর আলোয় চাঁদটার খাদগুলো এখন আরো বিভৎস লাগে দেখতে। এই চাঁদের জন্য কবিরা এখনো কেনো আন্দোলন করছে বুঝতে পারছে না আতিক।

    আতিক যাচ্ছে তার বাসার নিকটবর্তী সুপারশপে, সুইসাইড করার জন্য শক্তপোক্ত দড়ি কিনতে হবে। এমন ভয়বহতার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত নয় তাই আগে থেকেই সরে পড়তে চায় এই দুর্যোগ থেকে।

    ঝিলমিল সুপারশপ থেকে কিছু দড়ি ও একপাতা প্যারাসিটামল কিনে টাকা দিতে গিয়ে দোকানির কাছে জানতে পেলো দোকানি আজকের পর আর দোকান খুলবে না। তাই আর কিছুর প্রয়োজন থাকলে যেন একবারে নিয়ে যায়। দোকানি আরো বলল, ভাইজান, জীবনে একটাই সখ বাকি আছে এখন। যেই কয়টা দিন আছি, ছেলে-মেয়ে নিয়া আনন্দ-ফুর্তি কইরা কাটায়া দিব।

    স্টোর থেকে বের হয়েই আতিক একটা অস্থিরতা অনুভব করল। দোকানী নিশ্চয়ই সন্দেহ করেছে কিছু। এখন যদি সে পুলিশে ফোন দেয় তাহলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে তাকে। কাউন্সিলিং করে, করে তার বাচার ইচ্ছা আরো নষ্ট করে দেবে দেশের মানুষ। তাই, আর কোনদিকে না তাকিয়েই এক দৌড় দিল সে। বড় রাস্তার মোড়ে এসে থামলো সে। ভাবার চেষ্টা করছে কোথায় যাবে আতিক। তার যাওয়ার জায়গা খুব সীমিত হয়ে গেছে এই শহরে। তার নিজের বাসা আর কলেজ মাঠ ছাড়া আর কোথাও যায় নাই সে গত ৫ বছরে। তবে, এখন কলেজ মাঠে কাউকে পাওয়া যাবে না। তাতে কি? একাই বসে থাকবে সে। জীবনের শেষ কিছু মুহুর্ত আনন্দ-ফুর্তি করে কাটানোর ইচ্ছা তার নাই। তবে, শেষবারের মত নিজের সাথে একটা বোঝাপড়া করা দরকার।

    কলেজ মাঠের শহীদ মিনারের সামনে, শুকোনো ঘাসের উপর শুয়ে পড়ল আতিক। ক্লান্তি আর তৃষ্ণায় মনে হচ্ছে এখনি প্রানটা বের হয়ে যাবে তার। আকাশে উজ্জ্বল আলোতেও সব অন্ধকার দেখছে সে। চোখ বুজে ফেলতেই আতিকের মাথার ভেতর শুরু হয়ে গেল এক চলচিত্র।

    বন্ধুরা সব বসে আছে এক সবুজ মাঠে, এক প্রকান্ড তমাল গাছের ছায়ায় পৃথিবীটাকে যেন স্বর্গ মনে হচ্ছে। অবিরত এক ঠান্ডা বাতাসের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সময়, এর মাঝে নিলীম গাইছে,

    “হইতাম যদি পঙ্খী তবে
    উড়াল দিতামরে,
    ডালে ডালে বানতাম বাসা
    দেখতাম জগৎরে।”

    তারপর হঠাৎ গান থামিয়ে দিয়ে বলল, বন্ধু সময়টা বেশী ভালোনা। পাখি নাই, পাখির বাসা নাই, অনেক দেরী হইয়া গেছে। শ্যামলদা, বলে উঠল ঠিক। প্রতিদিন ১০০ ফুটবল মাঠের সমান জঙ্গল কাইটা সমান কইরা ফেলতাসে চোরের দল। প্রোটিন খুজতে গিয়ে শামুক খাইয়া শেষ কইরা ফালাইছে, মাছের কথা আর কি কমু।

    রবীন, তামাক কুটতে কুটতে কইলো, মরুভূমিতে নাকি গাছ লাগাইয়া বন বানাইয়া ফেলছে?

    আর্টিফিসিয়াল বন ঐগুলা। দেখতেই সুন্দর কিন্তু কোন কামের না। দোয়েল আরো বলল, প্রকৃতির জন্য চাই জংলা গাছ। যেইগুলা প্রকৃতির প্রয়োজনেই জন্মাইছে।

    বাক্য এবার সাড়া দিল, চল তাইলে কিছু একটা করি। আমগো ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করা দরকার তো…

    মাজেদ বলল, কি করবি? নেশা খাইতে খাইতে তোরা প্রতিদিন হাজারটা জিনিস করতে চাস শেষে তো বাসায় গিয়া ঘুমাইয়া পড়স।

    শ্যামলদা কইলো, ঘুমের দরকার আছে। তবে কালকে ঘুম থেকে উঠে চল সবাই মিলে এই পৃথিবীটারে একটা অভয়ারণ্য বানাই। শুধু মানুষের জন্য না, কাউয়া, শালিক ওদের জন্যেও।

    তারপরের কয়েকটা দিন সবাই খুব উৎসাহ নিয়া গাছের চারা রোপণ শুরু করলো ওরা। কলেজ প্রধানের পারমিশন নিয়ে কলেজ মাঠে প্রথম গাছ রোপন করলো, তারপর মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান,শশ্মান কিছুই বাদ দিলো না ওরা।

    সবাই যেন জীবনের একটা মানে খুঁজে পেয়েছে। শহর-গ্রাম চষে ফেলল ওরা। অনেক ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেল সবাই। এখন পর্যন্ত পাওয়া ৭৩,৩০০ প্রজাতির গাছের মধ্যে ওরা প্রায় হাজার খানেক প্রজাতির গাছের সাথে পরিচয় হতে পেরেছে। এছাড়া কত রকমের প্রাণীর সাথে পরিচয় হয়েছে তার কোন ইয়াত্তা নাই।

    সবকিছুই ভালোই যাচ্ছিল। কলেজ-ইউনিভার্সিটির জীবন শেষ হতেই সবকিছু বদলে যেতে শুরু করল। গাছ কাটার প্রয়োজনটা যেন সবাই বুঝতে শুরু করেছে তাই সবার মাঝে প্রকৃতিকে বাঁচানোর তাগিদটা কমতে শুরু করলো।

    হঠাৎ করে শুরু হওয়া চলচিত্র আবার হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল। সবুজ প্রান্তর থেকে আবার ধূসর মাঠে উঠে বসল আতিক। প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। লক্ষণ ভালো না, একটু পরেই শুরু হবে মাথা ব্যাথা। রাজ্যের অনিশ্চয়তায় ছেয়ে যাবে সব কিছু। কি খাবে সে? এই চিন্তা করতে তার খুব বিরক্ত লাগে। হাজারটা জিনিস খেতে ইচ্ছে করে তার কিন্তু যেগুলো খেতে ইচ্ছে করে তার কোনটাই খাওয়া হয়না শেষে। কলেজ মাঠ ছেড়ে গন্তব্যহীন ভাবে হাটা শুরু করলো সে। সব দোকান বন্ধ। সম্ভবত রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তবে, ঘড়ি ছাড়া বোঝার কোন উপায় নাই। শহরে কোথাও একটা পাখি নাই যে ভোরের কিচির মিচির শুনে বুঝবে সকাল হতে চলেছে।

    মাথার ভেতর একটা ভোঁতা যন্ত্রনা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আতিক বাসার পথ ধরল। তার জীর্ন বাড়িটার সামনে এসে এখন আর বাসায় ঢুকতে ইচ্ছা করছে না তার।

    তারপরেও অনিচ্ছা স্বত্বেও নব ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই, বিকট চিৎকার দিয়ে আতিকের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল মাজেদ। দোস্ত আমরাতো সবাই মারা পড়ুম রে…

    অতর্কিত মাজেদকে লাফিয়ে পড়তে দেখে রিফ্লেক্সে আতিকের হাতটা চলে যায় মাজেদের নাকে।
    সাথে সাথে মাজেদের নাকটা ফুলে লাল হয়ে ওঠে।

    কি রে মামা ওরা মাইরা ফালানের আগে তো দেখি তুই মাইরা ফালাবি।
    ওরা মানে?
    যারা আর্থশিপ বানাইছে।
    ও… তুই আইছস কেন?
    কেন আইছি মানে? মরার আগে মনে হইলো সবার সাথে দেখা করা দরকার। আর তোর বাসায় আইতে আবার কোন কারণ লাগবো নাকি? তা তোর ফ্রিজে বরফ আছে নাকি? থাকলে, একটু আইনা দে মামা। ঘুসি মাইরা তো নাক দিয়া রক্ত বাইর কইরা ফালাইছস।
    বাসায় কিছু নাই। তুই এখন যাহ!
    ভাগায়া দিতাছস কেন? তর ব্যবহার তো দেখি চামারের থেকেও খারাপ হইয়া গেছে ।
    দেখ মন মেজাজ ভালো নাই। তার উপর হেভী মাথা ব্যাথা। এর মইধ্যে তর বকবক সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব না। ভালো কইরা কইতাসি যাগা, প্যারা দিস না।
    তর সাথে দোস্ত কিছু কথা আছে। কথা গুলা মরার আগে না কইলে, মইরাও শান্তি পামু না।
    যা বলার বাসায় গিয়া ফোনে বল।

    মাজেদ উঠল। কিছুক্ষণ গাইগুই করে ফ্রিজের দিকে হাটা দিল। আতিক দড়িগুলো দিয়ে ঘরের এমাথা থেকে ও মাথা লম্বা করে এমনভাবে দড়ি বাধল এখন একপাশে আতিক অন্য পাশে মাজেদ দাঁড়িয়ে। দড়ি বাধা শেষে মাজেদকে বলছে তুই দড়ির এই পাশে আর আসবিনা। যা বলার ঐ পাশ থেকে বলে বিদায় হবি।

    মাজেদ মার্টিন এর ক্যানটি ময়লার বাস্কেটে ফেলে ঢেকুর তুলল। তারপর আতিককে তোয়াক্কা না করে দড়ির মাঝ বরাবর রাখা সোফার উপর চুপচাপ বসে শুন্য দৃষ্টিতে বন্ধ টিভির দিকে তাকিয়ে রইল।

    আতিক বাথরুম থেকে কিছু ভেজা জামা কাপড়, বিছানার চাদর, বালিশের কাভার ইত্যাদি টানিয়ে দিয়ে অন্য একটি ছোফায় শুয়ে পড়ল।

    মাজেদ প্রশ্ন করল,
    আচ্ছা যদি আর্থশিপ অন হয় তখনোকি পৃথিবী স্পিন করবে? মাজেদ প্রশ্ন করল।
    জবাবে আতিক বলল, স্পিন করলে মনে হয়না আর্থশিপের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে বিশ্ব বৈজ্ঞানিক সংস্থা।

    তোর কাছে কি মনে হয়? আমরা কতদিন সার্ভাইভ করতে পারব মহাশূন্যে।
    এক মিনিটো না। আমার তো মনে হয় আর্থশিপ স্টার্ট দেয়ার সাথে সাথেই গোটা পৃথিবী ব্লাস্ট করবে। বুম!
    এইটা তুই কি কস? তাইলে ওরা এত কষ্ট কইরা আর্থশীপ কেন বানাইলো?
    ওগোরে যাইয়া জিগাস্যা কর। আমার মাথাটা কেন খাইতাছস?
    মাজেদ আর কিছু না বলে টিভির রিমোট হাতে নিল। টিভি অন করে খবরের চ্যানেল খুঁজে খুঁজে আর্থশিপের সংবাদ দেখতে শুরু করল।

    বি. বি. সি. চ্যানেলে রিপোর্টার উডওয়ার্ড বলছে, “আর্থশিপ এমন ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে পৃথিবীর চারপাশে উন্নত সব রকেটশীপ পৃথিবীকে প্রবল নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখবে। মহাশূন্যের ধুলিকনা তো দূরে থাক কোন গ্যাসীয় পদার্থ প্রবেশ করতে পারবেনা এই বলয় ভেঙ্গে। তবে অতিশয় উল্কাপিণ্ড বা অনান্য বস্তুর জন্য যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা কতটুকু কার্যকর হবে সে সম্পর্কে এখনো সন্দীহান বিজ্ঞানীরা।

    মাজেদ একের পর এক চ্যানেল চেঞ্জ করে একি খবর নানান নিউজ প্রেজেন্টারের কাছ থেকে শুনছে দেখে মেজাজটা আরো খারাপ হয়ে গেল আতিকের। তবুও চুপ করে রইল সে।

    মাজেদ এবার দেশি সংবাদ চ্যানেলগুলোর একটিতে থামল।
    রিপোর্টার বলছে আর্থশিপের পরীক্ষামূলকভাবে একবার চালানোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। মাজেদ চেচিয়ে উঠল গাধার বাচ্চায় বলে কি? আর্থশিপ কি তোর খেলনা গাড়ি মনে হয় নাকি? যে একবার চালায়া আবার বন্ধ কইরা দিবি?

    আতিক বলল, মেশিন অন করার অপশন থাকলে বন্ধ করার অপশন অবশ্যই আছে।
    এইটা তো আর সাধারণ কোনো মেশিন না বন্ধু, পৃথিবীর একটু নড় চড় হইলে পুরা সোলার সিস্টাম কোলাপ্স করব। তাই আর্থশীপ একবার চলতে শুরু করলে ফেরার আর কোন ফিরে আসা নাই।
    তরে, না কইছি যাইতে। তুই এখনো কেনো ভ্যাগাইতাছস?
    শোন বন্ধু, কেয়ামত চইলা আইছে, তাই সব শেষ হওয়ার আগে তর কাছে কিছু কনফেস করতে চাই।
    আমি কিছু শুনতে চাই না।
    তুই না চাইলেও আমার বলা দরকার। রিতুর সাথে তর সম্পর্কটা নষ্ট হওয়ার জন্য আমি দায়ী। নেশা খাইয়া খাইয়া মাথাটা নষ্ট হইয়া গেছিলো দোস্ত। আমারে মাফ কইরা দিস।
    রিতু কে? আমি এই নামে কাউরে চিনি না। তরেও আমার অপরিচিত লাগতাসে। তুই চইলা যা প্লিস।

    মাজেদ আরো কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। আতিকের চেহারা দেখে ওর সত্যি খুব মায়া লাগছে। আতিকের চেহারা এই কয়েক বছরে অনেকটা বদলে গেছে। ওর চোখের দিকে তাকালে একসময় জীবন ঝিকমিকিয়ে উঠত সেখানে এখন কবরের অন্ধকার।

    আতিক বলল, দোস্ত একটা উপকার করবি?
    মাজেদ জিজ্ঞেস করল, কি?
    উত্তরে আতিক বলল, টিভি আর লাইটটা বন্ধ করে দে।

    লাইট বন্ধ করতেই আতিকের মাথার ভেতর আবার এক নতুন চলচিত্র শুরু হল,

    মধ্যদুপুরে শহরের প্রসস্থ রাস্তায় রিক্সার হুড ফেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে আতিক। রোদের উত্তাপে রিতুর ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে। চোখে তারায় অবাক বিস্ময় নিয়ে দেখছে সারি সারি গাছে ফুটে আছে ফুল। সমস্ত শহরটাকে মনের মত করে সাজিয়েছিল তারা। শহরের পথশিশুদের মাঝে কিসের যেন এক আনন্দ। এসব কিছুর মাঝে জীবন এত উচ্ছল যে মাইলের পথ মাইল রিকশা চালানোর পরেও বৃদ্ধ রিকশাচালকের মুখে একবিন্দু অবসাদ নেই।

    বসন্তের সুন্দর সময়গুলো বদলাতে শুরু করল উত্তরের হাওয়ায়, রিতুর আচরণেও পরিবর্তন দেখা দিল। আতিক অবশ্য সেটা বুঝে ওঠার আগেই সাইরেনের প্রচন্ড শব্দ গর্জে উঠল, শহর জুড়ে নামল বিভীষিকা।

    প্রতিবেশী দেশগুলো পারমানবিক বোমা টেস্ট করতে করতে যুদ্ধ বাধিয়ে বসল, শিশুদের রক্তে যুদ্ধ দেবতাকে তুষ্ট করতে শয়তানের উপাসকরা যখন উন্মাদপ্রায় তখন প্রকৃতি বিদ্রোহ করে বসল। পরপর কয়েকটা ভূমিকম্পে শহরের মানচিত্র বদলে গেল হঠাৎ। আতিক প্রতিদিন মৃত্যুর শহরে ঘুরে বেড়ায়, আর ইট পাথরের নিচে খুঁজে বেড়ায় জীবনের অস্তিত্ব।

    ক্লান্তি আর বিষাদে একসময় আতিক ঘরবন্দী হয়ে পড়ে, এই সময়টায় আতিক লক্ষ্য করে শহরে প্রতিদিন নিয়ম করে বৃষ্টি নামছে। তবে, সেই বৃষ্টিতে কবিতার কোন ছন্দ নাই।

    এক বিকালে রুমী এসে হাজির। সন্ধ্যা পর্যন্ত ওর জমানো গল্পগুলো শুনতে শুনতে আতিক যখন ক্লান্ত তখন রুমী বলল, শুনেছিস… আজকে নাকি মঙ্গল গ্রহন। চল মাঠে যাই।

    রুমীর জোরাজুরিতে আতিক শেষ পর্যন্ত ঘর থেকে বেরিয়ে কলেজ মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করে। রাস্তায় নেমে আতিকের কেমন যেন গা শিরশির করছে। সময়ের ব্যবধানে আলোকিত ব্যস্ত শহরে বাসা বেধেছে নিরেট নিস্তব্ধতা আর গাড় অন্ধকার।

    কলেজ মাঠে সেইদিন আতিক পৃথিবীর সবথেকে বিরল দৃশ্যটি দেখল, একটা প্রকান্ড লাল রঙের তারা জ্বলজ্বল করেছে মধ্যাকাশে। সেই তারার আলোটা আস্তে আস্তে ঢাকা পড়ে গেল চাঁদের আলোয়। যখন তারাটিকে সম্পূর্ণ গিলে খেল চাঁদটা ঠিক তখনি সমস্ত আকাশ মুহুর্তে পিঙ্গল বর্ণ ধারণ করল। এরপর থেকেই পৃথিবীর আকাশ থেকে হারিয়ে গেল রাত।

    কয়েক মাসের ব্যবধানে সবুজ পৃথিবী ধূসর হয়ে উঠল। গ্লেসিয়ার গলে বাষ্প হতে শুরু করল। মানুষ নিজেদের বিলুপ্ত হওয়া ঠেকাতে, পুরো পৃথিবী জুড়ে মানুষ এই প্রথম সত্যিকারের ঐক্য গড়ে তুললো। একসাথে মিলে গড়ে তুলল আর্থশিপ। এমন একটা মহাকাশযান যেটা পুরো পৃথিবীটাকে টেনে নিয়ে যাবে এক নতুন সম্ভাবনায়।

    6
    5 Comments
    • শিশুতোষ গল্পটা দারুণ লাগলো,ধন্যবাদ

    • পৃথিবীর শেষ সময় নিয়ে আপনার লেখা এই বর্ণনায় এক চরম অস্থিরতা ও গভীর বিষণ্ণতা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে, বিশেষ করে মানুষের শেষ আকুতি এবং পরিবেশের পরিবর্তনের চিত্রটি পড়ার সময় অদ্ভুত এক ঘোর অনুভব করছিলাম। আপনার শব্দের বুনন এবং আতিকের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনগুলো যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আসলেই প্রশংসার যোগ্য। আমি মনে করি, আপনি যদি এমন আরও ভাবনামূলক বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি চালিয়ে যান, তবে সেটি পাঠকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী এক জায়গা করে নিতে পারবে।

    • মহাপ্রলয়ের বৈজ্ঞানিক কল্পনার সঙ্গে আতিকের ব্যক্তিগত ভাঙন, বন্ধুত্ব, প্রেম ও প্রকৃতির স্মৃতিকে একসঙ্গে বেঁধে দিয়ে কাঠখোট্টা সায়েন্স ফিকশনের আড়ালে মানবিকতার গল্পই বলেছেন। খুব ভালো লাগলো। কিন্তু অবন্তীকার গল্প কোথায়?

    • যদি এমনটা হতো পুরো পৃথিবীর মানুষ এক হয়ে যেতো তবে কতইনা ভাল হতো খুব ভালো লিখেছেন মঞ্চবন্ধু ।

    • গল্পটা পড়ে খুব অদ্ভুত একটা বিষণ্নতা কাজ করছে, তবে আপনার কি মনে হয় পৃথিবীটা সত্যিই কি অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে টিকে থাকতে পারবে?

Friends

Profile Photo
Tanjina Talukder
@tanjinatalukder
Profile Photo
Zakir Hossan
@zakirhossan
Profile Photo
Mikdad Hossain
@mikdadhossain
Profile Photo
Md Al Maun
@mdalmaun
Profile Photo
Mst. Hena Parvin
@mst-henaparvin
Profile Photo
Mohammad Rahman
@mohammadrahman
Profile Photo
Rakib Hossain mahadi
@rakibhossainmahadi
Profile Photo
Musharrof Teacher
@musharrofteacher
Skip to toolbar