-
“আপনি কি আর ঠিক হবেন না?”
“কি করলাম আমি আবার?”
অবাক নেত্রে চায় আবরার। অবশ্য অবাক-টবাক কিছুই না, অভিনয় করছে সে।বউটাকে জ্বালাতে প্রচুর ভালো লাগে কিনা! কটমট চোখে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয় ইন্তিহা। লোকটার সাথে আর পারা গেলো না। সারাক্ষন ওর পিছনেই লেগে থাকে।
সেদিনের পর কেটে গেছে অনেকগুলো মাস। মৃত আসমা বেগমের শোক ভুলতে বসেছে প্রায় সবাই। অবশ্য ভুলারই কথা। যতই আমরা বলি না কেন, কাউকে ছাড়া আমরা থাকতে পারবো না, নিশ্বাস নিতে পারবো না, একসময় সেসব আর মনে থাকে না। হারিয়ে যায় বাস্তব জিবনের ব্যস্ততায় সেসব কথা। ভুলে বসি মায়াময় সেসব দিনগুলোর স্মৃতি।
রান্নাঘরের দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবরার। হাতে থাকা আপেলে একের পর এক কামড় বসাচ্ছে সে। এমন সময় সেখানে আগমন ঘটে খাদিজা বেগমের। আবরারকে দেখে মাথায় ঘোমটা টেনে নেন তিনি। আবরারও অপ্রস্তুত হেসে চলে যেতে নেয় সেখান থেকে। তবে উনার কথায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হয় মাঝপথেই।
“ বড় ভাইয়া নাকি জায়গা জমির সব কাগজপত্র তৈরি করে ফেলেছেন। আজকে সন্ধায় থাকতে বলেছে তোমাকে।”
মায়ের মৃত্যুর পর কয়েক মাস সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিলো। তবে গত দুই মাস ধরে জায়গা জমি ভাগ করা নিয়ে বড় দুই ভাইয়ের মধ্যে রেষারেষি চলছে খানিক। আবরার অবশ্য নাই এসবের মধ্যে, তবে কতোদিন আর ভালো লাগে এসব ঝামেলা। সব ভাগ হয়ে যাওয়াই বরং ভালো এখন। আসমা বেগমের মৃত্যুই যেন পুরো পরিবারটাকে আলাদা করে দিয়েছে। এর আগে কেউ কোনদিন সাহসই পায়নি এমন কিছু বলার।
উল্টো দিকে ফিরে থেকেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় আবরার। ওর প্রস্থান ঘটলে ইন্তিহার উদ্দেশে কথা বলেন তিনি।
“ খবর জানো কিছু?”
“ কোন ব্যাপারে?”
“ এই বাড়ির ভাগ নিয়ে?”
ভ্রু কুচকে তাকায় ইন্তিহা। থালাবাসন ধোঁয়ার টেপ বন্ধ করে এদিক ফেরে এতক্ষনে।
“ এই বাড়ির ভাগ মানে? এই বাড়ি তো আম্মুর নামে ছিলো। ভাগ হওয়ার কথা আসছে কেন?”
“ এই বাড়ি পুরোটা বড় ভাইয়ার নামে!”
“মানে?”বিস্মিত হয়ে চেয়ে থাকে ইন্তিহা। কথাও যেন আসছে না তার মুখ দিয়ে। অগোচরে এতকিছু ঘটে গেলো অথচ টের পেলো না কেউ! অবাকের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারে না সে। আশপাশ চেয়ে স্বর নিচু করে খাদিজা।
“ মায়ের অসুস্থতার সময় আইসিইউ রুমে শুধু ভাইয়াই গিয়েছিল, মনে আছে তোমার?”
মুখ দিয়ে কথা বের হয় না মেয়েটার। কথার তালে মাথা নাড়ে শুধু।
“ সেদিন মায়ের টিপ সই নিয়েছিলেন তিনি!”
“ কিহ! মায়ের এমন অবস্থায় ছেলে হয়ে…”
“ আস্তে বলো! কেউ চলে আসবে। আর শুনো, কারো সাথে এ ব্যাপারে কিছু বলার দরকার নাই, বুঝেছো? আবরারকে তো একদমই না। সন্ধায় হয়তো বসতে পারে এসব নিয়ে। তখনই জানা যাবে।”
খাদিজা চলে যান সেখান থেকে। এ বাড়িতে বর্তমানে হর্তাকর্তা হলেন বাড়ির বড় বউ, রাবেয়া বেগম। এই সময়ে দুজনকে একসাথে দেখলে কি না কি বলেন কে জানে!
ইন্তিহা দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ হয়ে। এ বাড়িতে যে একটা বড়সড় ঝড় আসতে চলেছে, সে ব্যাপারে তো সন্দেহ নেই কোন। গত কিছুদিন ধরেই সে অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে আসছে। মনে বারবার দুশ্চিন্তা উঁকি দিচ্ছে, শান্তি পাচ্ছে না সে কিছুতেই। তবে কি এটাই তার কারন?যথারীতি সন্ধ্যার সময় বৈঠক বসে ড্রইংরুমে। আবরার আসে সবার শেষে। হাবিব সাহেব মুখ কালো করে বসে আছে। উকিল এসেছেন সেই বিকেলের দিকেই। কথা শুরু করেন আফজাল সাহেব প্রথমে।
“ আমি সবাইকে এখানে কি কারনে ডেকেছি, সেটা নিশ্চয়ই পুনরায় বলে দিতে হবে না! প্রথমত, সম্পত্তি ভাগ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত….”
উনার কথা শেষ হওয়ার আগেই কথা বলে উঠেন হাবীব সাহেব।
“ কিন্তু ভাইয়া, জায়গা সম্পত্তি সবকিছু আব্বুর নামে ছিল। আমার জানামতে তিনি ভাগ করে দিয়ে যাননি কিছুই। আর আমরা তিন ভাই। সেক্ষেত্রে জায়গা ভাগ হলে তো আমাদেরও জানার কথা। আমাদের না জানিয়েই জায়গা জমি ভাগ হয় কিকরে?”
“ আমি নিজে করেছি সব। আর তখন জানাই নি, এখন তো জানাচ্ছি, নাকি? সবকিছু নিজের নামে তো আর করে ফেলিনি।”
“ তাই বলে সব…”
পুরো কথা শেষ করতে পারেন না হাবীব সাহেব। তার আগেই বড় ভাইয়ের চিৎকারে থেমে যেতে হয় তাকে।
“ ছোট থেকে তোদের সবাইকে বড় করলাম, মানুষ করলাম আমি। আর এখন এসে কিনা সবকিছুতে কৈফিয়ত দিতে হবে আমাকে? আমার প্রতি সন্দেহ করছিস এখন?”উনার চিৎকারে বাড়ির পরিবেশ বদলে যায় হঠাৎ। সবাই শান্ত হয়ে যায় মুহূর্তেই। আবরারের অবশ্য হেলদোল দেখা যায় না এসবে। টেবিলে রাখা সন্ধ্যার নাস্তা থেকে পিঠা নিয়ে খাচ্ছে সে নিজের মতো করে। যেন আশেপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে, এতে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই তার।
মাথা নিচু করে রাখেন হাবীব সাহেব। আপাতত চুপ থাকাই শ্রেয়। উকিলের কথায় নিস্তব্দতা ভাঙ্গে ফের। তবে উকিলের কথা পুরোপুরি শেষ হতেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন হাবীব সাহেব। কিছু সময় বাকবিতণ্ডার পর যখন হাতাহাতির পর্যায়ে যেতে নেয় ব্যাপারটা, তখনই প্রথমবারের মতো নিজের জায়গা থেকে উঠে আবরার। মেঝো ভাইকে সরিয়ে আনে সে। যত যাই হোক, বড় দুই ভাই মারামারি করবে, আর বসে বসে সেসব দেখার ধৈর্য তো আর নাই তার। জায়গা সম্পত্তি যদিও হাবীব সাহেব পেয়েছেন কিছু, আবরারকে দেয়া হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ জায়গার একটা বাগান।বাড়িটাও এখন আইনত আফজাল সাহেবের নামে।
এতে অবশ্য আবরারের মাথাব্যথা নেই কোন। সে শুধু চুপচাপ নিজের উপস্থিতির জানান দিচ্ছিল সেখানে। না তো কোন কথা বলেছে, না তো করেছে কোন প্রতিবাদ!
বাড়িতে এখন আর কোনো হৈচৈ নেই। না তো সন্ধ্যার সময়ে সবার একসাথে বসে আড্ডা দেয়া হয়। সবার মুখ কালো। প্রয়োজন ছাড়া কথা হয় না কারো সাথে কারো। দিন দুই পার হয় এভাবেই। বাড়ির পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়ার চেয়ে বরং গুমোট হয় যেন আরো। ঠিক যেমন বিশাল ঝড়ের পূর্বাভাস।
সেদিন শুক্রবার হওয়ায় সবাই বাড়িতেই ছিল। সন্ধ্যার পর ইন্তিহা আলাদা করে নাস্তা বানায় আবরারের জন্য। এখন তো আর নাস্তাও বানানো হয় না সন্ধায়। সবাই সবার রুমে বসে থাকে গিয়ে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ট্রে হাতে রুমে ঢুকে ইন্তিহা। খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে বসে ফোন টিপছে আবরার। ইন্তিহার উপস্থিতি বুঝতে পেরে ফোন রেখে দেয় পাশে।
“ ফোনে কি করছিলেন আপনি?”
হুট করে এমন প্রশ্ন একদম আশা করেনি ছেলেটা। বউটা তার দিনদিন ঝগড়ুটে হয়ে যাচ্ছে না?
“ ফোনে কি করে মানুষ?”
“ মানুষ কি করে সেটা দিয়ে আমার কি কাজ? আমি জানতে চাইছি আপনি কি করছিলেন?”
“ দেখছিলাম।”
চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিতে দিতে উত্তর দেয় সে নির্বিকার। শরীর জ্বলে উঠতে থাকে মেয়েটার। তবুও রয়েসয়ে প্রশ্ন করে ফের।
“ কি দেখছিলেন?”
“ সবাই যা দেখে, আমিও তাই দেখছিলাম!”
“ সবাই কি দেখে?”
“ আমি যা দেখছিলাম!”
নাক ফুলিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে মেয়েটা। ফাজলামি করছে লোকটা ওর সাথে। সবকিছু নিয়ে এমন ফাজলামি মানা যায়? ভেতরে ভেতরে হাসি চেপে রাখলেও ওর দিকে তাকিয়ে অবাক হওয়ার ভান করে আবরার।
“ কি হলো তোমার আবার? সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছো কেন?”
ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গে মেয়েটার।
“ আমি সাপের মতো করি?”
“ না, তেমন কিছু বলিনি। তবে…আচ্ছা, তুমি কি রেগে আছো?”
“ নাহ, রাগবো কেন আমি? আমি কি মানুষ নাকি ? আমি তো সাপ। সাপেরা আবার রাগে নাকি?”
“ আরে, কি বলো এসব? তুমি সাপ হলে কবে? আর… সাপ হয়ে একটা মানুষকে বিয়ে করে ফেললে? বিয়ের আগে অন্তত একবার জানালেও না? আগে জানালে তো…”
“ কি? বিয়ে করতেন না আমায়?”
“ আরে তওবা তওবা, কি যে বলো না এসব! তোমাকে বিয়ে না করলে কাকে করতাম আমি? তুমিই তো আমার একমাত্র…”
“ চুউউউপ। চুপ থাকুন আপনি। আপনার সাথে কথা বলাই যে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল, তা নিশ্চয়ই আপনার জানার কথা?”
“ আরে এভাবে বলছো কেন বউ? আমরা আমরাই তো নাকি? এমনভাবে বলতে আছে বলো? আর তুমি জানো না? স্বামীর সাথে…”
কথা শেষ করতে পারে না সে। নিচ থেকে আসা চেঁচামেচি শুনে থমকে যায় দুজনেই। আবরার উঠে একপ্রকার দৌড়ে যায় ড্রইংরুমের উদ্দেশে। বাড়ির অবস্থা এমনিতেই ভালো না, কখন কি হয়ে যায়, বলা মুশকিল।
তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-১৭-তিতা ফুল
13 Comments-
-
-
গল্পটা দারুণভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, প্রতিটি চরিত্র বেশ জীবন্ত মনে হচ্ছে। ইন্তিহা আর আবরারের খুনসুটির মাঝেও যে পারিবারিক অশান্তির আঁচ পাচ্ছি, সেটা বেশ রহস্যময়। পরবর্তী পর্বে কী হতে যাচ্ছে তা জানার জন্য বেশ অপেক্ষায় থাকলাম!
-
-
আপনার এই লেখনীটি পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা এবং মানবিক টানাপোড়েনের এক দারুণ প্রতিফলন, বিশেষ করে “এ বাড়িতে যে একটা বড়সড় ঝড় আসতে চলেছে, সে ব্যাপারে তো সন্দেহ নেই কোন” বাক্যটি গল্পের আবহকে অত্যন্ত জীবন্ত করে তুলেছে। সম্পর্কের গভীরতা আর ছোটখাটো অভিমানগুলোর মাধ্যমে আপনি চরিত্রের যে সংঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন, তা বাস্তব জীবনের নাটকীয় পরিস্থিতির সাথে বেশ মিলে যায়। আপনি চমৎকারভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন, তাই নিজের লেখনীতে নিয়মিত থাকুন এবং আপনার চমৎকার সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে যান।
-
Friends
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat
Sk Sagor
@sksagor
Md. Ashraful Alam
@md-ashrafulalam
Fazilatun Nesa
@fazilatun-nesa



গল্পের ভিতরের রহস্যটা জানতে খুব ইচ্ছে করছে, অপেক্ষায় রইলাম ।