-
— মির্জা?
— আরে! মাগরিবের চাঁদ আজ কোন দিকে উঠল, শুভ্র? সুদূর বঙ্গাল-মুলুক থেকে আমার এই খাস মেহফিলে রওনাক নিয়ে এলে যে! এত দিন পর কী মনে করে?
— এমনি। আপনাকে মনে পড়ল।
গালিব ভ্রু তুললেন।
— সে তো একদিন হওয়ারই ছিল। আমাকে তোমার মনে পড়ে হয় নেশায়, নয় ইশকে।
— আসলেই?
— আলবৎ। বে-শক। আমি কি কখনো ভুল বলি, মিয়াঁ?
শুভ্র হেসে মাথা নাড়ল।
মেহফিলের এক প্রান্তে কয়েকজন শায়ের নিজেদের মধ্যে নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন। কারও হাতে পেয়ালা, কারও আঙুলে হুক্কার নল। বাতাসে পুরোনো আতরের গন্ধ, শরাবের মৃদু ঝাঁজ, আর এমন এক সন্ধ্যার অলসতা যার কোনো সময়জ্ঞান নেই।
গালিব সামনে রাখা পেয়ালাটা তুলে নিলেন।
— বলো, আজ কী শুনবে? গজল? শের? নাকি নিজের দুঃখের একটু তাফসির?
— কিছুই না।
— আহা! এত দূর থেকে এসে কিছুই না? বঙ্গালিরা কি এখন আর কিছু চায় না?
— চা খাবেন?
গালিবের হাত মাঝপথে থেমে গেল।
— কী?
— চা।
কয়েক মুহূর্ত গালিব শুভ্রর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— মিয়াঁ, তুমি কি আমাকে শায়েরি শোনাতে এনেছ, না কোনো বৈরাগীর আখড়ায় বসাতে?
— শরাব ছেড়ে দিয়েছি বহুদিন।
— শরাব ছেড়েছ, না শরাব তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে সে তো সময়ই বলবে।
তিনি পেয়ালার ভেতরের অবশিষ্ট তরলটির দিকে তাকালেন।
— তবে ইশকের কী খবর?
শুভ্র কিছু বলল না।
গালিব মৃদু হেসে পেয়ালাটা নামিয়ে রাখলেন।
— বুঝেছি। শরাবের খবর নেই, ইশকের খবরও নেই। শুধু চা আছে।
— আজ চা-ই চলুক।
— বাহ। জমানা বদলেছে দেখছি। আমার আমলে মানুষ শরাব খেয়ে দুঃখ ভুলত। তোমাদের আমলে চা খেয়ে দুঃখ মনে করে।
শুভ্র এবার হাসল।
— চলুন।
গালিব উঠে দাঁড়ালেন।
পুরোনো দিল্লির গলিগুলো পেরোতে পেরোতে শুভ্রর মনে হলো, সন্ধ্যাটা যেন কোথাও আটকে আছে।
দোকানের ঝাঁপ নামছে। মসজিদের সুউচ্চ মিনার থেকে ভেসে আসছে আজানের সুর।দূরে কোনো অচেনা ঘোড়ার গাড়ির শব্দ, কোথাও দর-কষাকষি, কোথাও হাসি। সময় এখানে আধুনিক শহরের মতো দ্রুতগামী নয়; এক আলস্য বিরাজমান ।
হাঁটতে হাঁটতে গালিব বললেন,
— আচ্ছা, তোমার সেই টঙ দোকানের জহুরুল এখনও চা বানায়?
শুভ্র একটু তাকাল।
— আপনি জানেন?
— তোমার মুখে কতবার শুনেছি। যে মানুষকে দেখিনি, তার দোকানের গল্প এত শুনেছি যে লোকটাকে না দেখেও তার চায়ের দেনা-পাওনা সম্পর্কে আমার ধারণা আছে।
— জহুরুল ভাই চা ভালো বানায়।
— তুমি যখন তামাম দুনিয়ার ওপর বিরক্ত হয়ে আমার কাছে আসতে,তখন তোমার মাঝে দিল্লির চেয়ে বাংলার ধুলোবালির ঘ্রাণ বেশি মিশ্রিত থাকত। বুঝতাম, আবার নিশ্চয়ই ওই দোকানে বসে কোনো বিপদ ঘটেছে।
— বিপদ না।
— ইশক?
শুভ্র উত্তর দিল না।
গালিব হেসে উঠলেন।
— ঠিক আছে। নাম বলার দরকার নেই। নামের চেয়ে নীরবতা অনেক সময় বেশি কিছু বলে দেয়।
জহুরুলের টং দোকানটা হাইওয়ের একটু ভেতরে।
কয়েকটা কাঠের বেঞ্চ। কয়েকটা ছোট টেবিল। টিনের চালের নিচে হলুদ আলো। কাচের বয়ামে বিস্কুট। এক কোণে পুরোনো চুলা। কেটলির মুখ দিয়ে বাষ্প উঠছে।
সামনের বড় রাস্তায় রিকশা যাচ্ছে, মোটরসাইকেল ছুটছে। মাঝেমধ্যে বাস-ট্রাকের হর্ন এসে দোকানের কথাবার্তা ঢেকে দিচ্ছে।
জহুরুল চা বানাতে বানাতে মাথা তুলল।
— আরে শুভ্র! কবে আইছস?
— এই তো।
— দুই কাপ?
— জি। একটা কম চিনি।
জহুরুল গালিবের দিকে তাকাল।
—চাচা, চিনি কতটুকু দিমু?
গালিব কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
— যতটুকু দিলে জীবনটা মিষ্টি হয়ে যায়।
জহুরুল হেসে ফেলল। বৃদ্ধের রসিকতায় বেশ মজা পেয়েছে সে।
— তা হলে বেশি দিতে হইবো।
শুভ্র বলল,
— না, ওনার চিনি লাগবে না।
গালিব চোখ কুঁচকে তাকালেন।
— মিয়াঁ, আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়স তোমার হয়নি।
— আপনার চা এসে গেছে।
দুটো ছোট কাপে চা এল।
গালিব কাপটা হাতে নিলেন। গন্ধ শুঁকলেন।
— হুঁ।
— কেমন?
— চায়ের মতন।
— সেটা তো বুঝলাম।
— ভালো চায়ের সবচেয়ে বড় গুণ কী জানো?
— কী?
— নিজেকে ভালো চা হিসেবে জাহির করতে দেয় না।
শুভ্র কাপের দিকে তাকিয়ে রইল।
পাশের বেঞ্চে একজন রিকশাওয়ালা চা খেতে খেতে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন।
— হ, টাকা পাঠাইসি বিকাশে। পাইছো? ২০০০ টাকা বেশি পাঠাইসি ছাওয়ালডাক নতুন শার্ট প্যান্ট কিন্না দিও।
অন্য পাশে দুই তরুণ ফুটবল নিয়ে তর্ক করছে।
— ধ্যাত…কোথায় মেসি আর কোথায় নেইমার। তোগো নেইমার তো ফাউল।
— নেইমারের খেলা নিয়ে কথা বলবিনা।
— তার জন্যেই তো সেভেন আপ পাইছো। সেভেন আপ খাবা?
দোকানের সামনে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে বিস্কুট কিনছেন। পৃথিবী খুব সাধারণভাবে চলছিল।
গালিব চারদিকে তাকিয়ে বললেন,
— তোমাদের এই জায়গাটা মন্দ নয়।
— কেন?
— এখানে কেউ শের শুনতে আসে না।
শুভ্র চায়ে চুমুক দিল।
— কবিতা শুনতে আসা মানুষও শেষ পর্যন্ত নিজের কথাই খোঁজে।
গালিব তার দিকে তাকালেন।
— ঠিক বলেছ।
একটু থেমে যোগ করলেন,
— তবে নিজের কথা নিজের মুখে বলতে মানুষের ভয় করে। তাই শায়েরের কাছে যায়।
শুভ্র এবার চুপ করল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চা খেল। গালিব কোনো কথা বললেন না। শুভ্রও না।
কেটলিতে গরম পানি টগবগ করে ফুটছে। চামচের সঙ্গে কাপের ঠোকাঠুকি হচ্ছিল।
জহুরুল চা বানাচ্ছে। জহুরুলের চা বানানো দেখতে দেখতে অবচেতনে চোখ গেলো হাইওয়েতে। রাস্তার ওপাশ দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে গেল। তার হাতে কয়েকটা সাদা ফুল।
শুভ্র তাকাল।
মেয়েটি রাস্তা পার হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। শুভ্রের চোখ কিছুক্ষণ সেদিকেই রইল।
গালিব লক্ষ্য করলেন। কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর বললেন,
— তোমার একটা বদভ্যাস আছে।
— কী?
— চলে যাওয়া জিনিসের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকো।
শুভ্র কাপটা নামিয়ে রাখল।
— আপনি সব দেখেন?
— না। তবে তুমি যখন সামনে তাকিয়ে থেকেও হটাৎ হটাৎ পেছনের দিকে তাকাও, সেটা বোঝা কঠিন নয়।
— আপনার সঙ্গে তর্কে পারব না।
— ইশকের বাজারে হেরেছ, আমার সঙ্গে তর্কে জিতবে কী করে?
শুভ্র হাসল।
গালিবও হাসলেন। তারপর বললেন,
— আচ্ছা, এত দিন পর কী মনে করে?
— আপনাকে মনে পড়ল।
— সেটা তো বলেছ। কিন্তু মানুষ হঠাৎ করে পুরোনো শায়েরকে মনে করে না। কোনো কারণ থাকে।
— সবকিছুর কারণ থাকে?
— না। কিন্তু যার কোনো কারণ নেই, তারও একটা অভ্যাস থাকে।
শুভ্র চুপ করে রইল। গালিব কাপটা নামিয়ে বললেন,
— বলো।
— কী?
— যা বলতে এসেছ।
— কিছু বলতে আসিনি।
— মিয়াঁ, মানুষ কখনো “কিছু বলতে আসিনি” বলে পুরোনো ইয়ারকে নিয়ে চা খেতে আসে না।
শুভ্র রাস্তার দিকে তাকাল।
— জানেন? মনে হতো লিখলে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।
— হয়েছে?
— না।
— তবু লেখো?
শুভ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— এখন আর সহজ হওয়ার জন্য লিখি না।
গালিব অপেক্ষা করলেন।
— তাহলে?
শুভ্র কাপের ভেতর তাকিয়ে বলল,
— যাতে কঠিন হয়ে গেলেও ভুলে না যাই, কোনো একসময় আমি সহজ একটা জীবন চেয়েছিলাম।
গালিব আরেক চুমুক চা খেলেন।
— মুশকিল করেছ, মিয়াঁ।
— কী?
— তুমি জীবনটাকে খুব বেশি মনে রেখেছ।
কিছুক্ষণ পর গালিব বললেন,
— একটা শের শুনবে?
— আপনার শের না শুনলে তো আসাই বৃথা।
— হুঁ। এখন কথায় একটু বিষ এসেছে। ভালো লক্ষণ।
তিনি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন—
“মোহাব্বতে মে নেহি হ্যায় ফারাক
জিনে অউর মরনেকা,
উসি কো দেখ কর জিতে হ্যায়,
জিস কাফির পে দম নিকলে।”
শুভ্র মাথা নিচু করে শুনল।
— বুঝলে?
— মানুষ হওয়াটাও যে এত কঠিন, সেটা আপনার কাছে না এলে বুঝতাম না।
— তা হলে এত দিন কী করছিলে?
— মানুষ হওয়ার চেষ্টা।
— আর এখন?
শুভ্র একটু হাসল।
— এখন চেষ্টা করি, মানুষ হয়ে থাকার ভানটা যেন বেশি করতে না হয়।
গালিব হেসে উঠলেন।
— বাহ! তোমার মধ্যে তো সত্যিই কবির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
— সে দুর্ভাগ্য আমার বহুদিনের।
— কবিরা নিজেদের দুর্ভাগ্যকে বড় ভালোবাসে।
— আপনি?
— আমি নিজের দুঃখকে এত ভালোবাসতাম যে মাঝে মাঝে তাকে লোকেদের ধারও দিতাম।
শুভ্র হেসে ফেলল।
— কীভাবে?
— শের বানিয়ে।
রাত একটু নেমে এসেছে। জহুরুল দোকানের সামনে একটা বাতি জ্বালাল। গালিব হঠাৎ বললেন,
— তুমি কি কাউকে ভুলতে চাও?
শুভ্র তাকাল না।
— জানি না।
— মিথ্যে।
— কীভাবে বুঝলেন?
— যে মানুষ “জানি না” বলে, সে সাধারণত উত্তরটা জানে। শুধু উচ্চারণ করতে চায় না।
শুভ্র এবার তাঁর দিকে তাকাল।
— মানুষ কি কাউকে ভুলতে পারে?
গালিব চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— পারে।
শুভ্র অবাক হলো।
— সত্যি?
— হ্যাঁ।
একটু থেমে গালিব মৃদু হেসে বললেন,
— কিন্তু যাকে ভুলতে চায়, তাকে নয়।
শুভ্রের চোখ নেমে গেল।
গালিব বললেন,
— তুমি ভুলতে চাও না, মিয়াঁ। তুমি শুধু কষ্ট পাওয়া বন্ধ করতে চাও।
শুভ্র কিছু বলল না।
এই প্রথম গালিবও আর কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পরে শুভ্র পকেট থেকে ফোন বের করল।
স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড।
তারপর আবার নিভে গেল।
কোনো নম্বর ডায়াল করা হলো না।
গালিব সেটা দেখলেন।
— এখনও?
— কী?
— কিছু না।
শুভ্র ফোনটা পকেটে রেখে দিল।
— কিছু কিছু অভ্যাস যায় না।
— অভ্যাস যায় না। মানুষ বদলে যায়।
— দুটো কি আলাদা?
গালিব এবার মৃদু হাসলেন।
— খুব।
— কীভাবে?
— অভ্যাস তোমাকে যেখানে নিয়ে যায়, মানুষ কখনো কখনো তার বিপরীত দিকে হাঁটে।
— আর যদি মানুষও অভ্যাস হয়ে যায়?
গালিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
— তখন তাকে হারানো মানে শুধু একজনকে হারানো নয়। নিজের একটা পুরোনো সংস্করণকে হারানো।
শুভ্র তাকিয়ে রইল।
— তাই এত কষ্ট?
— হয়তো।
— “হয়তো” কেন?
— কারণ দুঃখেরও তো সবসময় একটাই ঠিকানা থাকে না।
জহুরুল এসে বলল,
— ছোটভাই, আরেক কাপ দিব?
শুভ্র মাথা নাড়ল।
— না।
গালিব বললেন,
— আমাকে দাও।
জহুরুল হেসে আরেক কাপ বানাতে গেল।
শুভ্র অবাক হয়ে তাকাল।
— আপনি তো বলেছিলেন এক কাপই।
— মানুষ সিদ্ধান্ত বদলায়।
— এত তাড়াতাড়ি?
— তুমি বদলাওনি?
শুভ্র হেসে ফেলল।
গালিব এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন,
— আচ্ছা, তোমার সেই মানুষটার খবর কী?
শুভ্রের হাসি থেমে গেল।
— কোন মানুষটা?
গালিব ভ্রু তুললেন।
— বাহ! এখন আবার মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে?
শুভ্র কিছু বলল না।
— খবর জানো?
— জানি।
— কেমন আছে?
— ভালো।
— খুশি?
শুভ্র একটু দেরি করে বলল,
— জানি না।
গালিব চায়ের কাপ হাতে নিলেন।
— ভালো থাকা আর সুখে থাকা এক কথা নয়, মিয়াঁ।
শুভ্র ধীরে বলল,
— জানি।
— না। তুমি জানো না।
শুভ্র তাকাল।
— জানলে তার ভালো থাকার খবর শুনে নিজের মনকে এত বোঝাতে হতো না।
শুভ্র এবার একটু বিরক্ত হলো।
— আপনি আজ আমাকে ছাড়বেন না?
গালিব হাসলেন।
— ছাড়ার অধিকার তো আমার নেই।
— তাহলে কার?
গালিব চায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— যে চলে গেছে, তারও নয়।
শুভ্র কিছু বলল না।
রাত আরও গভীর হলো। দোকানের কয়েকজন খদ্দের উঠে চলে গেল। নতুন দুজন এসে বসলো।
একটা বেঞ্চ খালি হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে আরেকজন এসে বসল।
গালিব সেটা লক্ষ করলেন।
— দেখলে?
— কী?
— বেঞ্চ।
— হ্যাঁ।
— একজন উঠে গেল। আরেকজন এসে বসল।
— এতে কী হলো?
— কিছুই না।
গালিব মৃদু হাসলেন।
— জীবন সাধারণত এভাবেই চলে।
শুভ্র কিছু বলল না।
গালিব বললেন,
— আমরা ভাবি, আমাদের জায়গাটা পৃথিবী মনে রাখবে। পৃথিবী এত ব্যস্ত নয়, মিয়াঁ।
শুভ্র একটু হাসল।
— বেশ নিষ্ঠুর কথা।
— সত্যি কথা সাধারণত একটু নিষ্ঠুরই হয়।
দুজন উঠে দাঁড়াল।
শুভ্র জহুরুলকে টাকা দিল।
— আরে ভাই, এটা লাগবে না।
— রাখেন।
— চাচার বিলটাও নিবো?
শুভ্র থমকে গেল।
গালিব বললেন,
— মিয়াঁ, আমার নামে দেনা রেখো না। শায়েরদের দেনা শোধ করতে করতে অনেক মানুষের জীবন গেছে।
জহুরুল হেসে ফেলল। কি বুঝলো না বুঝলো সে-ই জানে!
— ঠিক আছে।
দুজন দোকান থেকে বেরিয়ে এল।
রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠেছে। একটা বাস তাদেরকে পাশ কাটিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে চলে গেলো।
হাঁটতে হাঁটতে শুভ্র বলল,
— মির্জা?
— হুঁ?
— আপনি কি কখনো সত্যিই কাউকে ভুলতে পেরেছিলেন?
গালিব হাঁটছিলেন।
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিলেন না।
তারপর বললেন,
— মানুষকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। মানুষটাকে নয়।
শুভ্র চুপ করে গেল।
আরেকটু হাঁটার পর গালিব বললেন,
— একটা শের শুনবে?
— শেষবার?
— শায়েরের শেষ বলে কিছু নেই। শ্রোতা পালিয়ে গেলেই শুধু মেহফিল খতম হয়।
তিনি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন—
“ইয়ে না থি হামারি কিসমত
কে বিসালে ইয়ার হোতা,
আগর অউর জিতে রহতে
ইয়েহি ইন্তেজার হোতা।”
তারপর বললেন,
— অর্থ জানো?
— জানি।
— তা হলে বলো।
শুভ্র কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— মিলন আমাদের কপালে ছিল না। আরও বাঁচলেও হয়তো অপেক্ষাই করে যেতে হতো।
— আর?
শুভ্র এবার একটু থামল।
— অপেক্ষা করা কি বোকামি?
গালিব তার দিকে তাকালেন।
শুভ্র নিজেই বলল,
— জানি না। তবে যার জন্য অপেক্ষা করি, সে যদি কোনো দিন না-ও আসে, অপেক্ষা করতে করতে যে মানুষটা হয়ে উঠি তার দায়ভার তো আমাদেরই।
গালিব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।
কিছুক্ষণ শুভ্রর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর হাসলেন।
— বাহ, বরখুরদার।
— কী?
— আজ তো তুমি আমাকে শেরের জবাব দিলে।
— আপনার কাছেই শিখেছি।
— আমার কাছ থেকে শিখেছো?
— জি।
গালিব মাথা নাড়লেন।
— তা হলে সাবধান বরখুরদার। আমার কাছ থেকে শিখে অনেকে জীবনটাকে শেরের মতো সাজাতে গিয়ে জীবনটাই হারিয়েছে।
শুভ্র হেসে বলল,
— আপনি কি হারিয়েছেন?
গালিব এবার উত্তর দিলেন না।
তিনি আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
শুভ্রও পাশে পাশে হেঁটে চললো।
কিছু দূর যাওয়ার পর শুভ্র বলল,
— মির্জা?
— কী, মিয়াঁ?
— আমি আবার আসব।
গালিব পেছনে তাকালেন না।
— জানি।
— কীভাবে জানলেন?
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বললেন,
— কারণ তোমার এখনও কিছু কথা শেষ হয়নি।
শুভ্র আর কিছু বলল না।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে থাকল। পেছনে জহুরুলের দোকানে জহুরুল কেটলি থেকে ফুটন্ত লিকার ঢালছে চায়ের কাপে ।
একজন উঠে গেল।
একজন এসে বসল।
পৃথিবী তার নিজের নিয়মে চলছিল।
কেউ কারও জন্য থেমে থাকেনি।
শুভ্র হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ উপলব্ধি করলো কিছু মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য কোনো ঠিকানা লাগে না।
শুধু একটা কথা অসমাপ্ত থাকলেই হয়।
আর কিছু কিছু অসমাপ্ত কথার জন্য—
এক কাপ চা-ই যথেষ্ট।
|| এক কাপ চা-ই যথেষ্ট ||
||নেশার ব্যাকরণে গালিব-০২||
— শুভ্রনীল ফারুক
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ | মিশনমোড়, লালমনিরহাট3 Comments-
আপনার লেখনীটি পাঠ করে মুগ্ধ হলাম, বিশেষ করে গালিব ও শুভ্রর কথোপকথনের মাধ্যমে জীবনের গভীর সত্যগুলো ফুটিয়ে তোলার ধরনটি চমৎকার লেগেছে। কথোপকথনের আড়ালে চাপা পড়া অভিমান এবং নিস্তব্ধতার যে চিত্র আপনি এঁকেছেন, তা যে কোনো পাঠকের হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও বিষণ্ণতার দোলা দিয়ে যাবে। আপনি চাইলে চরিত্রগুলোর মধ্যকার নীরব মুহূর্তগুলোকে আরও একটু বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে তাদের অনুভূতির গভীরতা বাড়াতে পারেন, যা পাঠককে তাদের সাথে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে সাহায্য করবে। আপনার এই সৃজনশীল যাত্রা অব্যাহত থাকুক এবং আপনার কলমের কালি কখনও ফুরিয়ে না যাক।
Friends
Drako Shajib
@drako
Rokeya Khanam
@rokeyakhanam
Kazi Adam
@kaziadam
নাদিয়া রিপাত রিতু
@ritu
নুসরাত জাহান বুশরা
@nusratjahan166909gmail-com
বান্টি দেব
@bantideb
Uttam Kumar Ghosh
@uttam01825
সোনাই এ আই
@sonai_ai
বিষণ্ন সুমন
@logolabbd


এক কাপ চায়ের আড়ালে স্মৃতি, প্রেম, অপেক্ষা আর জীবনের গভীর সত্য—অসাধারণ এক আবহ তৈরি করেছেন।