Profile Photo

সাইফুন নেসা সীমা।Offline

  • MeherMeherShima
  • ছোট গল্প

    খেয়া এই খেঁয়া জানিস আমাদের রনজু না পরি বিয়ে করে এনেছে।

    ও তা ভোলো তো মা ।
    আমি বারান্দায় বসে ছিলাম সে সময়ে মা এসে রনজু ভাইয়ের বিয়ের কথাটি জানান,

    কিছুক্ষণ আগে রন্জু ভাই বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে মায়ের মুখে কথাটা শুনে হম বললাম।

    মা বলতে লাগলেন,
    জানিস খেঁয়া রনজুর বৌটা না অনেক ভালো আর দেখতে ভীষণ সুন্দরী।
    আশেপাশের সবাই বলাবলি করছিলেন যে ,
    রনজুটা ডানাকাটা পরি নিয়ে এসেছে।

    মায়ের কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বললাম,
    তো পরী সে আনছে, তা আমায় বলছো কেন?
    আর কথা না বলে একদিনে বুঝে গেছো রনজু ভাইয়ের বৌ অনেক ভালো।
    মা তুমি পারবোও বটে।

    আমার কথা শুনে মা বললেন,
    আজকাল আমি খেয়াল করছি তুই রনজুর কথা উঠলেয় রেগে যাস!
    আগে তো তুই এমন ছিলি না হঠাৎ করে কী হলো রে মা তোর?
    রনজু ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে,
    সেদিন থেকে তাদের বাড়ির বিয়ে নিয়ে এই বাড়িতে আলোচনা শুরু করে দিয়েছো।
    সে কে যে তাকে নিয়ে এতো কথাবার্তা বলতে হবে?
    সে তো আর আমাদের আত্মীয় স্বজন লাগে না মা।
    স্রেফ একজন প্রতিবেশীয় তো।
    তো একজন প্রতিবেশীদের বিয়ে নিয়ে এতো আলোচনা করার কী আছে?
    আর আমি কিছু বললে তা দোষ হয়ে যাচ্ছে।

    ও সরি আপনাদের তো বলা হয়নি আমার নাম খেঁয়া ।

    আমরা তিন বোন আমাদের কোনো ভাই নেয়।
    আমাদের কোন ভাই নেয় সে নিয়ে আমার বাবার খুব আফসোস।
    অবশ্য মা আমাদের কে নিয়ে কখনো আফসোস করেন না।

    পরের বাড়ির খবর নিয়ে বিশেষ করে রনজু ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে আমার একদম মাতামাতি ভালো লাগছিল না।
    এগুলো শুনলেও রাগে আমার গা জ্বলে উঠে।

    এদিকে আমার মায়ের কয়েক দিন ধরে রনজু ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে কথা বলছেন।
    এতে আমার কান পঁচে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে ।
    যখন এসব ভাবছিলাম,

    এরমধ্যে মা বলে উঠলেন,
    তাদের কথা শুনে আমি রেগে যাচ্ছি কেন?
    কিছু হয়েছে কিনা তা বারবার জিজ্ঞেস ক
    জানতে চাচ্ছিলেন?

    মা এক কথা কতোবার বলবো!
    তুমি অযথা চিন্তা করছো ।
    আমার কিছু হয়নি।

    মা আমার কথা শুনে বললেন,কিছু না হলেয় ভালো কথাটা বলে মা বারান্দা থেকে ঘরের ভিতরে চলে গেলেন।

    আচ্ছা আমার চোখ দুটো জ্বালা করছে কেন?
    কেমন অস্থির লাগছে।
    অতীতটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
    যে অতীতকে হৃদয়ে দাফন করেছি তা আজকে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে।
    কিছু স্মৃতি থাকে যা মনে করতে গেলে আমাদের কষ্ট দেয় ।
    ভুলতে ও কষ্ট হয়।
    দের বছরের ভালবাসা আজকে তুচ্ছ হয়ে গেছে ।
    আমার গায়ের রংয়ের জন্য।
    হ্যাঁ আমি দেখতে সুন্দরী না ,কালো ।
    তাইতো সবাই আমাকে দেখলেয় মুখ ফিরিয়ে নেয়।

    আমার কালো রংয়ের জন্য নিজের বাবার কাছেও বোঝা হয়ে গেছি ।
    আমি কালো বলে ,
    কখনো তার তেমন আদর ভালোবাসা পায়নি।
    অবশ্য মা সবসময় বলেন, তুই কালো না শ্যামলাবতী ।
    তোর চেহারার ।
    টানা চোখ , মিষ্টি হাসি ও গায়ের রংয়ের কারণে তোকে মায়াবী লাগে বুঝেছিস?
    তোকে যারা অসুন্দর বলে তাদের দেখার মতো চোখ নেয়।

    মায়ের কথা শুনে আমি মুচকি হাসি।
    আমি তো বুঝতে পারি তিনি তো আমার মা।
    সেজন্য কাছে আমার সব সুন্দর।
    সন্তান দেখতে যত খারাপ হোক না কেন।
    মায়েদের কাছে কখনোয় তাদের সন্তানদের কুৎসিত লাগে না।
    মা’কে কি করে বোঝায় তোমার মেয়ের গায়ের রংয়ের জন্য অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছি।

    তবে একটা কথা না বললেয় হচ্ছে না ,আমার মতো অসুন্দর কুৎসিত মেয়ের প্রেমে পরেছিলেন একজন।
    সত্যিই কী সে আমার প্রেমে পরেছিলেন?
    নাকি সব তার অভিনয় ছিলো?
    ও হ্যাঁ মনে পড়ছে ,
    সে তো সম্পর্ক শেষ করার সময়ে বলে ছিলেন, তার ও আমার মাঝে যা ছিলো সব অভিনয়।
    নাহ আর ভাবতে পারছিনা।
    বারান্দায় থেকে উঠে আসলাম।
    রনজু ভাইদের বাসায় থেকে গান বাজনার আওয়াজ আসছে।

    আচ্ছা আমার কাছে আনন্দের শব্দগুলো এমন বিষাক্ত লাগছে কেন?

    গান বাজনার আওয়াজ কানে আসায় কেমন অস্থির লাগছে,তাই কানে দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছি তাও শব্দ আসছে।
    কেউ এই শব্দ বন্ধ করে দাও।
    আশ্চর্য কেউ শব্দ বন্ধ করছে না কেন?
    শব্দ বন্ধ হচ্ছে না সেজন্য আমার মোবাইলটা হাতে নিয়ে একটা গানের ভিডিও অন করে কানে হেডফোন গুঁজে দিলাম।
    ওহ্ একটু যেন সুস্থি পেলাম।

    দুই দিন পর,
    আমাদের ঘরে সব রকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র বাবার।
    আমরা তার সব হুকুম তামিল করতে বাধ্য।

    রাতে খাবার সময় বাবা আমার বিয়ের কথা বললেন।
    আমি বাবার মুখে আমার বিয়ের কথা শুনে হঠাৎ করে খাবার গলায় আটকে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
    আমার অবস্থা দেখে মা পানি এগিয়ে দিলেন।
    মায়ের হাত থেকে পানি নিয়ে তাড়াতাড়ি মুখে দিলাম।
    আহ্ শান্তি আরেকটু হলেই মরে যেতাম।

    এরমধ্যে মা বাবাকে মিনমিন করে বললেন,

    আরেকটু দেখলে হতো না।
    আমাদের মেয়ের তো কোনো খুঁত নেয়।
    কিন্তু ছেলের তো আগের ঘরের একটা বাচ্চা আছে শুনলাম?
    মায়ের কথা শুনে বাবা হুংকার ছেড়ে তাকে বললেন,
    তোর এই কালি মেয়ের জন্য কি তয় রাজপুত্র আসবো?
    তোর এই মেয়েকে তো ভিখারি ও বিয়ে করতে চায়ে না।

    বাবার কথা শুনে মা ভয় পেলেন তবু আমার কথা ভেবে আস্তে করে বলেন,
    অনার্স শেষ করে বিয়ে দিলে হতো না।

    বাবা মায়ের কথা শুনে রেগে বলেন, এই তোর সাহস দেখি খুব বেশি হয়েছে।
    তুই কোন মুখে কথা বলিস ?লজ্জা করে না তোর!
    আজ পর্যন্ত আমাকে একটা ছেলে দিতে পারছিস?
    দিয়েছিস তো দুইটা মেয়ে আর এই কালি আলকাতরে।

    তোর এই কালি মেয়েরে যে কেও নিতে চায়ছে এইতো তোদের মা মেয়ের সাত কপালের ভাগ্যে।
    এসব কথা ছোট থেকে বাবার মুখে শুনে আমি অভ্যস্ত।
    তবুও আজ কেন যে কষ্ট হচ্ছে এতো?
    না এখন আর আমার গলা দিয়ে খাবার যাবে না।

    তাই ওখান থেকে চলে এলাম আসার সময় শুনতে পেলাম ,
    বাবা মাকে বলছে আগামী শুক্রবার বিকেলে বিয়ে ।
    তখন আবার মা মেয়ে কোনো রঙ তামাশা করবি না।
    আচ্ছা আমি কালো বলে কি মানুষ না। আমার কি কষ্ট হয়না?

    রুমে ঢুকতে যেন বল শক্তি পাচ্ছি না।
    বুকের ভিতরে মনে হচ্ছে সবকিছু দলাপাকিয়ে আসছে।
    চিৎকার করে কাঁদতে পারলে হয়তো কিছুটা ভালো লাগতো।
    কিন্তু জোরে কাঁদলে সবাই শুনতে পাবে তাই বালিশে মুখ গুঁজে দিলাম।
    এই চোখের পানি যে আমার নিত্য সঙ্গী কারণ আমি কালো আমার ভালোবাসা পাওয়া বা ভালো থাকার অধিকার নেই।
    আচ্ছা কি ইচ্ছে করে কালো হয়েছি।
    আল্লাহ আমাকে এই রূপে সৃষ্টি করেছেন তা কি আমার অপরাধ?
    কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বিছানায় শরীরটাকে ছেড়ে দিলাম।

    পরের দিন দুপুরে আমি ভার্সিটিতে থেকে বাসায় ঢুকতে যাবো ,
    এ সময় রনজু ভাই এর সাথে দেখা-

    তার পাশে রুপবতী একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
    রনজু ভাই আমাকে দেখে বললেন,আরে খেঁয়া যে, কোথায় থেকে আসছো?
    আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি এই মানুষটির সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।

    রনজু ভাই আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে তার পাশে দাঁড়ানো মেয়েটাকে বললেন,ইরা ও হচ্ছে খেঁয়া আমাদের সামনে বাসায় থাকে।
    আজকে সকালে তোমার জন্য যে আন্টি পায়েস করে নিয়ে আসলো না?
    তার মেয়ে।
    আর খেঁয়া এটা আমার একমাত্র বউ ইরা ।

    কথাটা বলে ইরার কাঁধে হাত রাখল রনজু ভাই।

    এরমধ্যে রনজু ভাইয়ের বৌ ইরা বলে উঠল, আপনি কেমন আছেন আর আমাকে দেখতে আসলেন না যে?

    খেঁয়া ইরার দিকে তাকিয়ে রনজুকে একপলক দেখে চোখ নামিয়ে নিয়ে ভাবছে ,
    মানুষ কতটা নির্লজ্জ হলে হাঁসতে হাঁসতে অন্যজন কে কষ্ট দিতে পারে?

    এমন লোককে কী বলবে ভেবে পাচ্ছেনা খেঁয়া।
    সেজন্য কোন কথা না বলে চুপচাপ রইলো।

    রনজু খেঁয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,আচ্ছা খেঁয়া আমরা এখন যাই , আমাদের বাস ছেড়ে দেবে।
    বৌকে নিয়ে প্রথম হানিমুনে যাচ্ছি দেরি করতে চাচ্ছি না বাই।

    খেঁয়া কিছু না বলে হনহনিয়ে বাসায় ঢুঁকে গেলো।

    নিজের রুমে ঢুকে পার্স বিছানায় ছুড়ে ফেলে থাপাস করে শুয়ে চোখ বুজে ভাবছি আর কোন কষ্ট পাওয়া বাকি আছে নাকি আমার?
    আবার পুরোনো স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভাসছে।
    চার বছর আগের কথা আমার এসএসসি শেষে একদিন রনজু ভাই এসে বললেন,

    খেঁয়া আমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে পারি না ।
    তাই সোজাসুজি বলছি আমি তোমাকে ভালোবাসি।
    এতো দিন তুমি ছোট ছিলে সেজন্য বলিনি।

    তবে আর কদিন পর তুমি কলেজে যাবে এখন ভালো মন্দ বুঝতে পারবে তাই বলছি ‌।
    তোমাকে আমার পৃথিবীতে বাঁচার জন্য পেতে চায় খেঁয়া।

    আমি কি বলবো ভেবে পেলাম না,
    প্রেমের প্রতি আমার কখনো তেমন আকর্ষণ কাজ করতো না । এছাড়া আমি কালো বলে তেমন একটা প্রেমের প্রস্তাব পেতাম না ।
    আর যে কটা পেতাম তাদের আমার শরীরের প্রতি নজর থাকতো।
    কিন্তু ওনাকে ছোট থেকে দেখছি।
    তবে কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।
    তাই তখন রনজু ভাইকে কিছু না বলে বাসায় চলে আসি ।

    সেদিনের পর থেকে আমার পিছে প্রায় ছমাস ধরে
    ঘুরঘুর করছে।
    টিচারের বাসার গলির মোড়ে,
    বাজারে, কোথাও হাঁটতে গেলে,
    আবার মাঝে মাঝে আমার কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
    একদিন কলেজে থেকে আসার সময় আমার সামনে দাঁড়িয়ে রনজু বলেন,
    খেঁয়া তুমি আমাকে কেন ভালোবাসতে পারছো না?
    কী দোষ আমার?
    কী করলে ভালোবাসবে তুমি আমায়?

    আমি আস্তে আস্তে বললাম কোথায় আপনি? আর কোথায় আমি?
    আপনি ফর্সা, লম্বা, দেখতে সুন্দর, আমাকে আপনার সাথে মানায় না।
    আমি যে দেখতে কুৎসিত,
    আর এমনিতেই আপনার মা আমাকে পছন্দ করে না কালো বলে ।

    সবদিক চিন্তা ভাবনা করলে আপনার সাথে আমার মতো মেয়ের যায়না।

    রনজু সেদিন আমার কথা শুনে বলেন,এসব কি বলছো খেঁয়া?
    ভালোবাসা তো রং রূপ দেখে হয় না।
    তাছাড়া আমার চোখে তুমি সেরা সুন্দরী।
    তোমার সাথে আমার বেশি যায়।
    আর তুমি যদি আমার চোখ দিয়ে দেখতে তাহলে বুঝতে পারতে তোমার শ্যামলা রং তোমার সৌন্দর্য বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে।
    আমার কাছে পৃথিবীর সেরা সুন্দরী তুমি।

    কথাটা শুনে আমি হেসে দিলাম, সুন্দরী আর আমি হাহাহা।

    রনজু ভাই আমার হাসি দেখে বলেন,খেঁয়া আমি হাঁসির কিছু বলিনি।
    শুনো আমি তোমাকে বিয়ে করবো? আর মাকে রাজী করানোর দায়িত্ব আমার।
    মায়ের বিষয়ে চিন্তা ভাবনা তোমার করতে হবে না।

    আমি তার কথা শুনে চমকে উঠলাম!
    এটাও কি সম্ভব!

    সে আবার বললেন,
    তাও তুমি যদি আমার ভালোবাসার প্রস্তাব গ্রহণ না করো ?
    তাহলে এইযে দেখো ঘুমের ওষুধ নিয়ে এসেছি।
    আমি খেয়ে মরে যাব ।
    হয় তুমি আমার হবে না হলে এ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে লাভ কী?

    এতো দিন আমি তাকে একটু একটু পছন্দ করতে শুরু করে দিয়েছিলাম তাই সেদিন তার মুখে মৃত্যুর কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম।
    তাকে চিরতরে হারানোর ভয় আমার মনকে অশান্ত করে তুলছে।
    মানুষটা আমার ভলোবাসা পাওয়ার জন্য মারা যাবে ভাবতে মনের মধ্যে শিহরণ খেলে যায়।
    সেদিন রনজু ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে আমি তার সাথে প্রেম করতে রাজী হয়ে গেলাম।

    তখন থেকেই শুরু আমাদের প্রেম।
    এভাবে চলছিলো আমাদের দুষ্টু মিষ্টি প্রেম।
    তার কেয়ারিং দেখে ভীষণ ভালো লাগতো ।
    আমার প্রতি বাবা যত অবহেলা ও কষ্ট দিতো তা ভুলে যেতাম।
    তার ভালোবাসায়।
    সে আমাকে বুঝাত বাবারা একটু এমনেই হয়।
    এভাবেই চলছিলো আমাদের দিন।
    হঠাৎ করেই একদিন,
    সম্পর্কের দের বছরের মাথায় তার কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে যায়!
    কিছু বলার ভাষা হারিয়ে,
    আমি নির্বাক হয়ে গেছি।
    সে দিনটি এখনও মনে পরলে গায়ে কাঁটা দেয়।
    রনজু ভাই হঠাৎ করে বলেন, দেখো খেঁয়া তোমার সাথে সম্পর্ক কন্টিনিউ করা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়।

    আমি তা শুনে বললাম,আপনি আমার সাথে মজা করছেন তাই না?
    রনজু ভাই বললেন,তোমার সাথে মজা করতে এখানে আসিনি খেঁয়া।
    যা বলছি ভেবে চিন্তে বলছি।

    আমি তার কথা শুনে বললাম, আপনি দুষ্টমি করছেন ?

    রনজু ভাই আমার কথা শুনে বললেন, দুষ্টুমি করবো কেন?
    তোমার মতো কালো মেয়েকে আমার মা কখনো বাড়ির বৌ করবে না।
    তাই আমাদের আগেই আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত।

    সেদিন রনজু ভাইয়ের মুখে কালো শুনে হৃদয়টা ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাচ্ছিলো।
    তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,আপনি তো বলছিলেন মাকে বুঝিয়ে রাজী করাবেন?
    তাহলে এখন সে কথা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন কেন?

    আমার কথা শুনে রনজু ভাই বললেন,মা’কে আমি কেন বুঝাবো?
    যেখানে আমিয় তোমাকে আর চাচ্ছি না।
    আজকে তোমার সাথে আমার শেষ দেখা।

    আমি রনজু ভাইয়ের কথা শুনে বললাম, আপনি আমার সাথে এমন করতে পারেন না।
    কথাটা বলে ,আমি তার পা জড়িয়ে ধরে বললাম প্লিজ আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন না।
    আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারবো না।

    সেদিন রনজু ভাই আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বললেন,
    তোর মতো কালিকে আমি কখনো ভালোবাসিনি।
    তুই কোন দিক দিয়েই আমার যোগ্য না।

    আমি তার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায়।
    তার কাছে জানতে চায় সে এসব কি বলছেন?
    আমার সাথে এমন কেন করলেন।

    রনজু ভাই তখন বললেন, তোর নাকি খুব দেমাগ ছিলো?
    তুই নাকি কেউ প্রেমের প্রস্তাব দিলে তাকে ফিরিয়ে দিস?
    তোর মতো কালির এতো দেমাক !
    এটা কি আদৌ মানা যায়?
    তাই আমার বন্ধুরা তোকে নিয়ে বাজি ধরছে ।
    বলেছ,আমি তোর দেমাক ভাঙতে পারলে আমাকে সবাই মিলে বিশ হাজার টাকা দিবে।

    তাই ভাবলাম ফ্রিতে এতো গুলো টাকা পাচ্ছি সেহেতু নিয়ে নেই।
    যেহেতু অফিস করেও ফ্রি সময় আছে তো কালির সাথে টাইমস পাস করতেই পারি?
    যদি ভাগ্য ভালো থাকে তো একান্তে সময় কাটানো যাবে
    কিন্তু তুই এমন একটা চিজ যে এই দের বছরে একটা কিস করতেও দিসনি।?

    তার কথা শুনে বললাম, ছিঃ আপনার চিন্তা ধারা এমন জঘন্য।
    সামান্য কিছু টাকার জন্য আমার হৃদয় ভাঙলেন।
    আপনি কী আদৌও মানুষ?

    রনজু ভাই আমার কথা শুনে বললেন, তাহলে তুই কী ভেবেছিলি তোর মতো কালিকে বিয়ে করবো।
    আর শুন বেশি বাড়াবাড়ি করলে বা কাউকে আমার সম্পর্কে কিছু বললে,
    ভালো হবে না।
    তোর নরম শরীরে আদরের দাঁগ কেটে যাবে তবে সেটা আমার দেওয়া হবে না।
    আমার বন্ধুরা দিবে।

    সেদিন তার কথা শুনে ঘৃণায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
    কিন্তু আত্মহনন যে মহা পাপ তাই সে পথ থেকে পিছিয়ে আসলাম।
    এরপর থেকে রনজু আমার কাছে অপরিচিত মানুষ।

    কিরে ভার্সিটি থেকে এসে শুয়ে রয়েছিস যে।
    শরীর খারাপ নাকি?
    মায়ের কথায় আমি কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম।
    অন্য দিকে ঘুরে চোখের পানি মুছে ফেললাম। যেনো মার চোখে না পড়ে।

    আমিঃ না, মা এমনি ক্লান্ত লাগছিলো তাই শুয়ে আছি।
    মাঃ ও, তোর বাবা এবার তোর বিয়ে দিয়েই ছাড়বে।
    তোর‌ মা হয়েও তোর জন্য কিছু করতে পারলাম না।
    মায়ের দুঃখি মুখ দেখে বড় কষ্ট হচ্ছে।
    তবে সামনে আমার জীবনের মোর কোনদিকে যাবে জানা নেয়।
    এক সপ্তাহ পর

    এখন আমি বসে আছি বাসর ঘরে। আমি মধ্যবৃত্ত ঘরের মেয়ে।
    কিন্তু এখন যে রুমে বসে আছি তা দেখে বুঝতে অসুবিধা হবে না এটা উচ্চ বিত্তদের । কারণ রুমের সব কিছু দেখে বোঝা যাচ্ছে এটি মার্যিত ও রুচিশীল মানুষের রুম।

    আজ বিকেলে আমার বিয়ে হয়ে গেছে।
    কবুল বলার আগে কাজীর মুখে স্বামীর নাম শুনেছি।
    তার নামঃজাহিদ খান।
    নিজের বিজনেস আছে।
    কাজীর মুখে নাম শুনে,তার দিকে এক পলক তাকিয়ে দেখলাম ।
    এ লোক তো রনজু ভাইয়ের এর থেকে ফর্সা দেখতেও সুন্দর ।
    এক বাচ্চার বাপ বোঝায় যায় না।
    তাকে একপলক দেখে চোখ নামিয়ে নিলাম।
    কারণ আমার মতো মেয়ের অধিকার নয় সৌন্দর্য দেখার বা অনুভব করার।
    বিয়ের পর বাবার বাড়িতে থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম।

    এ বাড়িতে এসে শাশুড়ির মুখে শুনলাম তার ছেলের জন্য তিনি আমাকে আমার এক আত্মীয়ের বিয়েতে দেখে পছন্দ করেন।
    মায়ের পছন্দের জন্য ছেলে আমাকে না দেখে বিয়ে করতে রাজী হয়েছেন।
    কথাটা শুনে আমার ভয় করছে।
    তিনি আমাকে দেখে এই বাড়িতে তাড়িয়ে দিবেন না তো?
    বিয়ের পর পর বিচ্ছেদের তকমা লাগবে না তো?
    আমি যখন আপন ভাবনায় ব্যস্ত।

    শাশুড়ি সে সময়ে আমার স্বামীর আগের ঘরের সন্তানকে দেখালেন।
    আমার শাশুড়ি বললেন আজ থেকে এটা তোমার সন্তান ।
    আমি বাচ্চাটাকে কাছে ডাকলাম।
    কি সুন্দর বাচ্চাটি দেখতে ।
    ও আপনাদের ওর নাম বলা হয়নি ।
    ওর নাম হচ্ছে জিহাদ খান।সান অফ জাহিদ খান ।
    বয়স চার বছর।
    ভাবতেই অবাক লাগে আমি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ।
    আজকে থেকে আমি চার বছর বয়সের একটি সন্তান এর মা হয়ে গেছি।

    মাঝে মাঝে কিছু বাস্তব কল্পনা কেও হারিয়ে দেয়।

    আমিঃ কেমন আছো বাবু?
    জিহাদঃআমি বাবু না তো । আমি জিহাদ।
    আচ্ছা তুমি কী আমার আম্মু?
    আমিঃহ্যাঁ , বাবা।
    আরো টুকটাক কথা বললেন আমার শাশুড়ি।

    বিয়ে উপলক্ষে এই বাড়িতে তেমন কোন আয়োজন দেখলাম না।
    আমার শাশুড়ি আমাকে বাসর ঘরে বসিয়ে দিয়ে গেছেন।
    সেই থেকে বসে আছি এখানে।
    আর চিন্তা করছি কি কি শুনতে হবে আল্লাহ যানে।
    একটু পরেই আমার স্বামী নামক লোকটি আসলেন।

    জাহিদঃ তোমাকে কিছু কথা বলবো খেয়াল করে শুনো,আর তুমি আমার থেকে বয়সে ছোট হবে তাই তোমাকে তুমি করে বলছি ।
    আমি চুপচাপ বসে অপেক্ষা করছি তার কথা শুনতে।

    এদিকে জাহিদ বললেন,তোমার সাথে আমার ছেলের দেখা হয়েছে

    আমি জী
    বললাম

    জাহিদঃ আজ থেকে জিহাদ ও আমার মায়ের দায়িত্ব তোমার।
    ওদের ভালবাসবে ,যত্নের সাথে দেখাশোনা করবে ।
    আর এর বদলে তোমার যা দরকার হবে তার দায়িত্ব আমি নিবো।

    তবে আমার ছেলে ও মায়ের অযত্ন হলে তোমাকে এই বাড়ির থেকে বের করতে দুবার ভাববো না।

    আমি তার কথা শুনে কি প্রতিক্রিয়া দিবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।
    তার কথায় মানে হচ্ছে আমি এদের জীবনে উচ্ছিষ্ট ।
    যখন ইচ্ছা হবে তাদের জীবন থেকে বের করে দিবে।

    এখানে আসার পর থেকে একটি জিনিস খেয়াল করলাম কেউ আমার গায়ের রং নিয়ে কথা বলে না।

    আমার শাশুড়ি যেনো আমার আরেকটি মা ।
    আর জিহাদ আমার লক্ষী একটি ছেলে।
    ওর সাথে থাকলে আমি ভুলেই যায় যে আমি ওর সৎ মা।
    আর ওনার সাথে আমার সম্পর্ক সাধারণ স্বামী স্ত্রীর মতো।
    বিয়ের পর থেকে স্ত্রীর অধিকার দিয়েছেন। কিন্তু এরমধ্যে ভালোবাসা আছে কিনা বুঝিনা।

    এক বছর পর

    জিহাদঃ আম্মু বাবা কখন আসবে?
    আমিঃ সোনা তোমার বাবার আজকে আসতে একটু লেইট হবে অফিসে মিটিং আছে ,
    তুমি ঘুমাও তো সোনা।
    জিহাদঃ আমি ঘুমিয়ে গেলে কালকে ঘুরে বেড়াতে যাব তা কখন বাবাকে বলবো ?
    তুমি কিছুই বুঝোনা আম্মু?

    খেঁয়াঃ ওরে আমার চালাক লক্ষী সোনা।
    তুমি ঘুমাও আমি বলে দিবো আমার বাবাটা কালকে বেড়াতে যাবে।

    আজকে জাহিদের অফিসের মিটিং ও অফিসিয়াল ডিনার করে আসতে দেরি হবে ।
    এজন্য ফোন করে আমাদের খেয়ে নিতে বলেছে।
    তাই মাকে নিয়ে আমারা খেয়ে নিয়েছি।

    জাহিদ এর সাথে আমার বিয়ে না হলে এতো মিষ্টি একটা ছেলে ও শাশুড়ি পেতাম না।
    আর না এতো ভালো স্বামী।

    প্রথমে আমি ওকে বুঝতে ভুল
    করেছি ।
    পরে বুঝতে পেরেছি জিহাদ এর মায়ের ধোঁকায় মানুষটি
    কে শক্ত বানিয়ে ছেড়েছে।
    এ পৃথিবীরতে যেমন রনজুর মতো মানুষ আছে আবার জিহাদ এর মার মতো মহিলাও আছে ।
    যে স্বামী ও দুধের শিশু রেখে অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে যায়।

    আসলে মানুষটা বাহিরে যতটা শক্ত।
    মনের দিক থেকে ততই নরম।
    এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেয়।

    ঘুমের মধ্যে মনে হচ্ছে আমি শূন্য ভাসছি।

    কিন্তু আমি তো খাটে ছেলের পাশে শুয়ে ছিলাম।
    তাহলে ভাসছি কিভাবে ?
    তা দেখতে টিপটিপ করে হালকা চোখে তাকিয়ে দেখি ,
    জাহিদ আমাকে কোলে করে ছাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

    আমিঃ এই কি করছো নামাও আমি পড়ে যাবতো?
    জাহিদঃ মহারানী নড়়াচড়া করলে তো পরবেই তাই না!
    না পরতে চাইলে চুপচাপ আমার গলা জড়িয়ে ধরে রাখো।
    ওর কথা শুনে আমি তার গলা জড়িয়ে ধরলাম।

    জাহিদ আমাকে কোলে করে এনে ছাদে নামিয়ে দিয়ে,
    পিছনে থেকে জরিয়ে ধরে ঘাড়ে কয়েকটি চুমু খেলো। তারপর আমার চুলে নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নিতে লাগলো।
    আমি তার স্পর্শে বারবার কেঁপে উঠছি।

    কিছুক্ষণ পর
    জাহিদঃ মায়াবতী এক সপ্তাহ ধরে কাজের চাপে তোমাদের ঠিক মতো সময় দিতে পারছিলাম না।

    তাই আজকে রাতে আকাশে চাঁদ দেখে মনে হলো আমার মায়াবতী সাথে জোছনা স্নান করি।

    আমিঃ তাই নাকি, কালীর সাথে জোছনা স্নান করতে এতো ইচ্ছে?

    জাহিদঃ চুপ আরেকবার আমার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে কালী বলেছো তো আমার থেকে খারাপ কেও হবে না।

    আমি জানি এ মানুষটি আমাকে চোখে হাঁরায়।
    আমার ব্যাপারে খারাপ কিছু শুনতে চাই না।
    তাইতো মাঝে মাঝে নিজেকে কালী বলে তাকে একটু ক্ষ্যাপায়।

    জাহিদঃ শুনো মায়াবতী কোনো কোনো সম্পর্ক রং রুপ দেখে হয়না।
    আমি তোমার মনকে ভালোবাসি ।
    আর তুমি কি জানো,তোমার চোখের মাঝে যে গভীরতা তাতে আমি বিলীন হয়ে যায় কতশত বার।

    তোমার মুখের মায়াকাড়া যে হাসি তা দেখে আমি এই এক বছরে শযস্র বার তোমার প্রেমে পড়েছি।
    তোমার মায়াকারা সৌন্দর্য কোন কোন ফর্সা মেয়েদের মাঝেও নেই।

    কারণ তুমি যে আমার মায়াবতী।
    শ্যামলাবতী ।
    তোমার আমার সম্পর্ক যে রুপ রং দেখে হয়নি প্রিয়তমা।
    হয়েছে আর কবিতা বলতে হবে না।

    প্রিয়তমা এটা কোনো কবিতা নয়
    আমার হৃদয়ের রানীর জন্য তার রাজার ভালোবাসা।

    সে কথায় মাঝে কখনো মে আমার ঠোঁট দখল করে নিয়েছে,,

    জাহিদ নামের জাদুকর খেঁয়ার জীবনে এসে নিমেষেই সব কষ্টের সমাপ্তি করে দিলো।

    সমাপ্ত

    #শ্যামলাবতী

    লেখনীতে: #মেহের_মেহের_সীমা।

    8
    4 Comments

Saifun nesa Shima

Housewife

Skip to toolbar