-
ছোটগল্প
আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
~~ আসমানী( জসীমউদ্দিন)এপ্রিল মাস। ঝড় হওয়া শুরু হয়নি তখনও তবে বিকেল আকাশের মন ভার হয়। মুখ গুমড়ে রাখে কিছুক্ষণ তারপর এক পশলা কান্না। তপ্ত দুপুর শেষে শীতল কান্না শান্তি দেয়। এমনি একদিনে সকালে, ঘুম থেকে উঠে পড়ার বই নিয়ে বসেছি। মন বসছে না। সামনে পরীক্ষা তাই বই নিয়ে বসে থাকা, যদি একটু মন বসে। সকালটা শীতল, সূর্য উত্তাপ ছড়ানো শুরু করে নি তখনও। মিহি রোদ পরেছে বারান্দায়। তেছড়াভাবে, ঠিক যেখানটায় আমাদের খরগোশগুলোর উপর। তারা রোদ খুব পছন্দ করে। বিশেষ করে টুনা। টুনা মেয়ে খরগোশটার নাম। যদিও কোনটা ছেলে কোনটা মেয়ে ঠিক বুঝে উঠতে পারি না কেওই। তাই ধরে নিয়েছি, যেটা আকারে লম্বা সে ছেলে তার নাম টুন, আর যে আকারে গোলগাল সে মেয়ে তার নাম টুনা। দিনের অধিকাংশ সময় তাদের ছেড়েই রাখা হয়। প্রচন্ড ব্যস্ত তারা। তাদের জ্বালায় ঘরে কোনো পোকা থাকতে পারে না। লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরের সব আনাচে কানাচে ঢুকে পরে, খুব সরু জায়গায়ও কিভাবে জানি শরীর গলিয়ে ঢুকে যায়। দেখতে মন্দ লাগে না তাদের। আজকাল হাত বাড়িতে নাম ধরে ডাকলে কাছে আসে, আদর করি। আদরে চোখ বন্ধ করে তারা। টুনার আদর বেশি পছন্দ৷ হাত বাড়ালে আদর পাওয়ার লোভে সেই বেশি আসে। তবে টুনের সবকিছু নির্ভর করে মুডের উপর। মুড না থাকলে হাত দিতে হাজারবার ডাকলেও আসে না। আবার আদর পেতে চাইলে না ডাকতেই এসে বসে হাতের কাছে। আদর পাওয়া শেষ হলে ফিরে যায় পূর্বের সেই কাজে। লাফালাফি-ছোটাছুটি, আনাচে -কানাচে। রোদটা যে দিকটায় তীব্র সেদিকে গিয়ে বসে আছে টুনা। রোদ পোহাচ্ছে। কি আয়েশ করে বসেছে। কানটা একটু পর পর এদিক ওদিক লড়ছে। আরামে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে তার। আমি পড়ার বই সামনে রেখে এসব দেখছি। এমন সময় মা ঘরে এলেন। আমি তড়িঘড়ি করে বইয়ের দিকে তাকালাম। আমি পড়ছি, তাই যেনো চোখে পরে তার। মা। বললেন,
“ একটা অনুষ্ঠান আছে ছোটদের। যাবি?ফাহিমকে(আমার ছোট ভাই) নিয়ে তো তেমন বের হওয়া হয় না। ”
আমি বললাম,
“অনুষ্ঠান কোথায়? কখন?”
“ শাহাবাগে। বারোটার দিকে শুরু হবে। আধ ঘন্টার মধ্যে বেরিয়ে পরলে সময় মতো পৌঁছে যাবো। ”
আমি বললাম,
“চলো। ”
গোসল সেড়ে তৈরী হয়ে বেরুতে বেরুতে ঘড়িয়ে বেলা এগারো। সি.এন.জি ঠিক করে উঠে পরা হলো। রোদের তেজ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সি.এন.জি তেই বসে সিদ্ধ হচ্ছি। ঘামে ভিজে গেছে শার্ট। অর্ধেক রাস্তা যাবার পর আর ইচ্ছে করছে না যেতে। কিন্তু ফিরে যাবার উপায়ও নেই। সেখানে পৌঁছলাম যখন তখন বাজে বারোটা পনেরো। অনুষ্ঠানের ব্যানার চোখে পরলো। বেলুন- ফেস্টুন-রঙ বেরঙের কাগজ দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো। রঙিন, দেখতে ভালো লাগে। ঘামে জর্জরিত অবস্থা ঢুকলাম হল রুমে যেখানে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠান শুরু হয়নি তখনো। তবে হবে হবে ভাব।হলরুম তুলনামূলক ঠান্ডা কিন্তু ওতোটা না যতটা আশা করেছিলাম চারপাশে তাকিয়ে দেখি ছয়টা এসি চলছে। তবুও এতো গরম। রুমে অনেক মানুষ তাই বোধহয়। খালি দেখে মাঝের দিকের চেয়ারে বসে পরলাম৷ মিনিট পনেরো পর শুরু হলো অনুষ্ঠান। মনে হচ্ছে গরম বেড়েছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি যতগুলো চেয়ার ছিলো সব ভরে গেছে।
অনুষ্ঠান শুরু হলো জাতীয় সংগীত দিয়ে। সবাই দাড়িয়ে একসাথে গাইলাম। এ অনুভূতি সবসময়ই অসাধারণ। তারপর কিছু মানুষ এসে বক্তব্য রাখলেন। ঘুম পাড়ানি বক্তব্য সব। কেও শুনলো না। তবু কি মনোযোগ নিয়ে বলছেন তারা। এই গরমে ঘুমপাড়ানি বক্তব্য শুনতে ইচ্ছে করছিলো না। সব মিলিয়ে খুব বিরক্ত আমি। যাক আরও মিনিট পনেরো শেষে শুরু হলো মূল অনুষ্ঠান। স্টেজে প্রদর্শিত হলো শিশুদের নাটক, গান, নাচ। দেখতে ভালো লাগে। এমন চলছে হঠাৎ খুব ঠান্ডা লাগতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর “ধ্রুম ধ্রুম” শব্দ পেলাম। মনটা ভালো হয়ে গেলো। বুঝলাম বৃষ্টি হবে। ঠান্ড লাগছে। এর পরপরই বৃষ্টির ঝম ঝম আওয়াজ কানে আসলো। স্টেজে তিনটা মেয়ে উঠেছে। খুব সুন্দর করে সেঁজেছে ওরা। কি করবে বুঝা যাচ্ছে না। মাইকের সামনে এসে দাড়ালো, গান করবে বোধহয়। না, গান করলো না আবৃত্তি করা শুরু করলো। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কি সুন্দর! কি সুন্দর! তুড়ি বাজাতে বাজাতে আবৃতি করছে তারা। চেয়েও চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। আবৃতির সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড হিসেবে কাজ করছে বৃষ্টির ঝিমিঝমানি শব্দ। এখনো চোখে ভাসছে সেই তুড়ি বাজিয়ে আবৃতি,আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়,
সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি
থাপড়েতে নিবিয়ে দেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয় নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।
আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে
ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল্-বিল্-বিল করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,
সেই জলেতে রান্না-খাওয়া আসমানীদের চলে।
পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।
~ আসমানী( জসীমউদ্দিন)সে দিনটি স্মরণীয় হয়ে গেলো। প্রায়সই খুব গরম লাগলে মনে পরে সেদিনের কথা। যেমনটি আজ মনে পরে গেলো। তাই লিখে ফেললাম। ভালো থাকুক স্মৃতিগুলো। ভালো থাকুক আসমানীরা। ভালো থাকুক ওই তিনটি ফুল। আকাশ ভালো না থাকুক। মন খারাপ হোক একটু তার। একটু কাঁদুক। গরম লাগে। বড্ড অপেক্ষায় আছি তার কান্নার -বৃষ্টির।
~আসমানী/ আবির হাসান সায়েম
5 Comments
Friends
Sajibul Alam — সজীবুল আলম
@sajibulalambd
Jabed A Emon
@jabedaemongmail-com
মোঃ আবু মুনিফ আল মুকিম।
@munifalmukimrocky
বশির আহমদ
@bashir93
মীর অনাবিল
@miranabil
Maolana Abdullah al mamun
@smmamun21
স্মৃতি রানী রত্না
@srratna1990
Nipun Chandra
@nipunch
Pranto Sarkar
@pranto-sarkar



Gd