-
গল্পের নাম: “নৈঃশব্দে তোমার পদধ্বনি ”
লেখনীতে : “মুসকান হিম্রাদিতা”মূল অংশ::::
প্রকান্ড ঘরে দাঁড়িয়ে আছে ইহসান।পুরো ঘরে আবছা হলুদ রঙের আলো ছড়িয়ে রয়েছে।কোথাও বেশি বা কম নেই, সব সমান।সেই ঘর থেকে হালকা চন্দন আর গোলাপজল এর ঘ্রান বের হচ্ছে।বিশাল জানালা দুটো পর্দা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।ইহসানের হাতে সোনালি কারুকাজ খচিত একটা সুন্দর শাড়ি।দীর্ঘ ৫ মাস ধরে রাত জেগে সে এই শাড়ি নিজের হাতে তৈরী করেছে তার প্রিয় মানুষের জন্য।একদিন সে নিজের হাতে তাকে এই শাড়ি পরিয়ে দেবে।
ইহসান শাড়ির প্রতিটি কোণায় হাত আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছে।শহরের সেরা ১০ জন ফ্যাশন ডিজাইনারদের মধ্যে ৪ নাম্বার এ অবস্থান তার।কিন্তু তার শাড়ি সম্পকে ধারনা ১ নাম্বার এ।প্রতিটি শাড়ি তিনি একবার দেখেই বলে দিতে পারে সেই শাড়ির কোথায় খুত রয়েছে আর কত দিন টিকবে।
এই ঘরে যে ইহসান একা আছে তা বললে মস্ত ভুল হবে।তার সাথে সবসময় যিনি থাকে সে আজকে ও তার কর্মকান্ড দেখছে।শাড়ির প্রতিটি কোণা যে সুক্ষ্ম হয়েছে তা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে কম্পিউটার এর পাশে থাকা রকিং চেয়ারের দিকে তাকায়।যা ইহসানের উলটো দিকে ঘোরানো।ধীর পায়ে সেই দিকে এগোতে থাকে ইহসান।চেয়ারে কাছে গিয়ে তার হাতলে হাত রেখে চেয়ার টা তার দিকে ঘুরাতে যাবে এমন সময়ই দরজায় টোকা পড়লো।
বাহির থেকেই আওয়াজ এলো- মে অ্যাই কামিং স্যার?
মুখ দিয়ে বিরক্তসূচক একটা আওয়াজ করে চেয়ারে হাতল ছেড়ে শাড়ি রাখা জায়গাটায় এসে দাঁড়িয়ে উত্তর দিলো- ইয়েস,কামিং।
এইঘরটাকে সব সময় ই ভয় পায় মানবিকা।কেমন যেন সবসময় ভিতরে আবছা আলো থাকে।এমনকি সূর্যের আলো ও ঠিক মতো ঢুকে ঘরটাকে আলোকিত করতে পারে না।কেমন ভুতুড়ে পরিবেশ।স্যারের অনুমতি পেয়ে বুকে সাহসের জন্য জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে নিলো।যদি ও জানে এতে তার একটু ও সাহস বাড়েনি কিন্তু তা ও ওর দাদি বলেছিলো এইভাবে দম নিলে সাহস বাড়ে।তাই সবসময় এমন ই করে মানবিকা।দরজা খোলার সাথে সাথে প্রত্যেকবারের মতোই কেমিক্যাল এর গন্ধ নাকে এলো মানবিকার।সাথে মাটির নিজস্ব গন্ধ ও রয়েছে।শাড়ির কাপড়ে হয়ত কেমিক্যাল মিশানো হয় তাই এর গন্ধ পাওয়া যায় কিন্তু এই সিমেন্টে তৈরী চারতলা দালানে মাটির গন্ধ কিভাবে আসে সেটা কিছুতেই বুঝতে পারে না।ভিতরে ঢুকে একবার রুমে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো।না সব একই রকম আছে।এই ঘরের কিছুই কখনো পরিবর্তন হয় না।ইহসানের দিকে এগোনোর আগে একবার পাশ ফিরে রকিং চেয়ার টা দেখে নিলো।
-স্যার,এই কোম্পানি চারশ কোটি টাকার ডিল করেছে।আপনি যদি সব কিছু একবার সাইন করে দেন তবে কাল থেকেই কারখানায় শাড়ি তৈরীর কাজ শুরু করা যাবে।
ফাইল নেওয়ার জন্য বাম হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল- মিস মানবি,আমার মনে হয় আপনি কিছু নিয়ম মেনে চলছেন না।
মানবিকা আর বাকি কথা শুনে না।ইহসানের প্রতি মানবিকা একটু দূর্বল।ইহসান বিবাহিত।সে তার বউকে প্রচন্ড ভালবাসে সেটা জানার পর ও কিছুতেই দূর্বলতা কমাতে পারেনি বরং ইহসান তাকে মানবিকার বদলে মানবি বলে ডাকায় মনের ভিতর প্রজাপতির ডানা ঝাপটায়।ইহসান বয়সে মানবিকার চেয়ে অনেক বড়।মানবিকা ২৫ আর ইহসান প্রায় ৪৫ এর কাছাকাছি। তারপর ও মানবিকার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ ইহসান।ড্রেস কালেকশনে ও ইহসান সবার সেরা।যখন যখন এই কোম্পানির জন্য মডেলিং করতে হয় তখন এই ইহসান নিজের হাতে মানবিকার সমস্ত শাড়ি,গহনা এমনকি নিজের হাতে সাজিয়েও দেয়।সে জন্য অফিসের বাকিরা মাঝে মাঝে বলে ও বসে – ম্যাডাম যদি সব জানতে পারে তবে এই শাড়ির কোম্পানি ই পুড়িয়ে দিবে।কিন্তু মানবিকা তাদের কিছু বলে না।আসলে বলার মত কিছুই নেই।এমন কখন ও মনে হয় নি যে ইহসান ও তার প্রতি দূর্বল।সব মায়া,সব অনুভুতি একান্তই মানবিকার।
ইহসান নিজের প্রশ্নের উত্তর পায় নি মানবিকার দিকে ফিরে দেখে সে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।ইহসান হাত দিয়ে একটা তুড়ি বাজাতেই মানবিকার ধ্যানভগ্ন হয়ে গেলো।অপরাধীর মতো ছোটস্বরে আমতা আমতা করে বলল- সরি স্যার।
সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ইহসান মানবিকার ডান হাত ধরে উপরে তুলে সেই হাতে ফাইল তুলে দিয়ে বলল- কিসের এত চিন্তা মিস মানবি?
এই প্রশ্ন শুনে মানবিকা পিছনে ফিরে কম্পিউটার এর পাশে রকিং চেয়ারের উলটো হয়ে বসে থাকা মানুষটির দিকে তাকায়।মনে মনে বলে – ‘আমি আপনাকে ভীষন হিংসা করি ম্যাম।শুধুমাত্র এইকারনে আমি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী।’
-পিছন ফিরে কি দেখছো?
-সরি স্যার।কিছু না।
-বেশ,এর আগে যেসব প্রশ্ন করেছি তার উত্তর দিন।
আমতা আমতা করে এদিক ওদিক তাকাতে থাকলো মানবিকা।তা দেখে ইহসান দুই হাত প্যান্টের পকেটে গুজে ছোট নিঃশ্বাস নিয়ে শাড়ির কাছে চলে আসে।এসে বলে – নিয়মের সাথে সাথে আপনি মনে হয় মনোযোগ ও হারিয়েছেন।
-সরি স্যার।
-সরি স্যার এটা কি আপনার মুদ্রা দোষ?(বেশ বিরক্ত হয়েই বললো)
– না মানে শুনতে পাই নি কি বলেছিলেন আপনি সেটা।
-আমার মনে হয় আপনি কিছু নিয়ম ভুলে যাচ্ছেন বা মনের সাথে যুদ্ধ করে ও খুব একটা লাভ করতে পারছেন না।
-কেন স্যার? আমার কাজে এ ক……..
– আপনার মান্থলি ইনকাম কত?
-এই প্রশ্ন শুনে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে মানবিকা। তবু ও মুখে বলে – সিক্সটি ফাইভ থাউজেন্ট।
-এই পেমেন্ট নিয়ে সব খরচ বাদ দেওয়ার পর ও প্রায় টুয়েন্টি ফাইভ থাউজেন্ট এর মত টাকা বাড়তি থাকে।অথচ একই কোম্পানি তে যারা কাজ করে তোমার চেয়ে উচুতে থেকে ও তাদের ইনকাম ফিফটি অর সামথিং। কোনো প্রশ্ন জাগে নি কেন এত বেশি টাকা এই কোম্পানি তোমাকে দেয়?
বেশ অপমানবোধ করতে লাগল মানবিকা।আসলেই তার বেতন সবার থেকে বেশি।অথচ তার কাজ শুধু ডিল হওয়া ফাইলগুলো সাইন করিয়ে নেওয়া।আর ও একটা ব্যাপার আছে, সবার বেতন মাসের প্রথম দিন স্যার নিজে সবার হাতে তুলে দেয় কিন্তু মানবিকার বেতন সবসময় ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করেন।ব্যাপার টা নিয়ে এতদিন মাথায় কিছু আসে নি কিন্তু আজকে স্যারের মুখে শোনার পর মনে হলো নিশ্চয়ই কোনো কারন আছে।তাই প্রশ্ন করলো- এতদিন তেমন গুরুত্ব দেই নেই তবে এইমুহুর্তে আপনি বলায় জানার আগ্রহ জাগলো কেন এমন টা ঘটে।
মুখের হাসির রেখা টা আর ও বড় করে একদম মানবিকার কাছে দাঁড়িয়ে তার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে একটা দিক নির্দেশ করলো।মানবিকা সেইদিক লক্ষ্য করতে গিয়ে দেখলো তার চোখকে ইশারা করছে ইহসান।
মানবিকা কিছু বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে ইহসানের দিকে তাকিয়ে থাকে।হঠাৎ ই ইহসান মানবিকার কাছ থেকে ছিটকে সরে এসে কম্পিউটার এর সামনে চলে আসে।এতে মানবিকা ভীষন অপমানবোধ করে। তাই সে ফাইল নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। দরজার কাছে আসার পর পিছন থেকে ইহসান ডাকে- মানবি?
ইহসানের ডাক শুনে পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে সে এখন রকিং চেয়ারের কাছে।
-তোমার চোখগুলো একদম ওসারিসার মত।যখন ও জীবিত ছিলো তখন হুবহু এইরকম ই দেখতে ছিল।তাই তোমার ওই চোখ গুলো আমার চাই।তাই তুমি সবার থেকে আলাদা।
দরজা দিকে বের হয়ে আর পা চালিয়ে হাটতে পারছে না মানবিকা।ইহসানের কাছে ও সবার থেকে আলাদা সেটা জানার পর ওর খুশি হওয়ার কথা কিন্তু ও খুশি হতে পারছে না। ও মনে করার চেষ্টা করে ইহসান কি বলেছিলো – ওর চোখ ওসারিসার মত।সে জীবিতকালে তার মতো চোখ
ছিলো।তবে কি সে মৃত?কিন্তু তা কি করে হতে পারে?ওসারিসা ত ম্যাডামের নাম যে সবসময় ওই ঘরে রকিং চেয়ারে বসে থাকে।ইহসানের বউ।
আর কিছু ভাবতে পারছে না মানবিকা।বাড়ি ফিরতে হবে তাকে।************
-আমার কাছে সব কিছু কেমন গোলমেলে লাগছে।
-কিরকম?
-তুমি যা করতে চাইছো তা কি ঠিক হবে?স্যার এর অগোচরে তার সম্পকে অনুসন্ধান করা হবে এটা স্যার জানতে পারলে আমার কি অবস্থা করবে বুঝতে পারছো?
-তুমি কি তোমার চাকরী চলে যাবে ভেবে ভয় পাচ্ছো নাকি তোমার সম্পকে ইহসানের সামনে খারাপ কিছু ধারনা আসবে ভেবে ভয় পাচ্ছো?(ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো রুনিত)[পর্ব – ১]
চলবে…….
বিঃদ্রঃ দয়া করে কেউ কপি করবেন না।ভাল লাগলে লাইক,কমেন্ট, শেয়ার করে পাশে করে পাশে থাকবেন।কেমন হয়েছে জানাবেন।অগ্রিম ধন্যবাদ সবাইকে।
11 Comments
Friends
Jahin Hashem Chowdhury
@jahinhc
Humayun Kabir Surjo
@humayunkabir-surjo
Foyzur Khan
@foyzur-khan
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
Kabi Doctor Mohammad Zakir Hossain Biplob
@zakir-hossain
Al mamun abdullah
@almamunabdullah
স্মৃতি রানী রত্না
@srratna1990
মোঃ ফয়সাল আহমেদ
@foysalk1119
মোঃ মুহিউদ্দীন
@md-muhiuddin



বেশ জমে উঠেছে। পরের পর্বের জন্য অপেক্ষায় থাকলাম।