Profile Photo

ইকবাল আহমেদOffline

  • Iqbal
  • এলিটা
    পর্বঃ ২
    কেন্দ্রীয় গোরস্তান। বছরের দুটি বিশেষ দিনে নোয়ান এখানে আসে। সাবিলার কবরের কাছে কিছুক্ষন নিরবে দাঁড়িয়ে হয়তোবা কিছু চোখের জলও ফেলে। সাবিলা চলে যাবার আজ পাঁচটি বছর গত হয়েছে। রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দুজনের আর একসাথে সংসারে ফেরা হল না। দূর্ঘটনাটার জন্য নোয়ান সব সময় নিজেকে দায়ি করে এসেছে। অতিরিক্ত আবেগে ভর করে থাকায় শেষ মূহুর্তে গাড়ির স্টিয়ারিংটা আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
    নিজের ছোট্ট কিউব ফ্ল্যাটে ফিরে নোয়ান বেশ চুপচাপ হয়ে থাকে সারাদিন। আজ আর কোন কিছুতে তার মন বসবে না। অফিস থেকেও দুদিনের একটা ছুটি সে আগেই নিয়ে রেখেছিল।
    – নোয়ান, তোমার কি হয়েছে? গত বছরের এইদিনেও তুমি খুব সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলে। আর ফিরেও সারাদিন মন খারাপ করে রেখেছিলে।
    – আহ্ এলিটা। এত প্রশ্ন করো না তো। আমাকে আজ একটু একা থাকতে দাও।
    – কিন্তু আমার প্রোগ্রামতো মূলত তোমাকে সঙ্গ দেয়া। তুমি তো যে কোন বিষয় আমার সাথে শেয়ার করতে পার। তাহলে আমার ডাটা বেজ থেকে তোমার ভাল মন্দ দেখভাল করার জন্য একটা ভাল স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিউর তৈরি করে নেয়া যেতে পারে।
    – তোমার মতো একটা যন্ত্রমানব মানুষের মনের অবস্থা আর কিই বুঝতে পারবে।
    – নোয়ান তুমি যুগের সাথে তাল মেলাতে পারছ না। এখনকার উন্নত রোবট প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ ও আনন্দময় করে তোলার জন্য সবরকম সুবিধা দিয়েই তৈরি করা হয়। আমরা মানুষের বিশেষ করে যার কাছে আমরা থাকবো তার সামগ্রিক জীবনের ডাটা এনালাইসিস করে তার মতো করে জীবনটা সহজ করার কাজ গুলো করে থাকি। অনেকটা মানুষের মত করেই।
    – তোমরা যন্ত্ররা আর যাই পার মানুষের আবেগ কি তা কখনোই বুঝতে পারবে না।
    এলিটা আর কথা বাড়ায় না। ঘরের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ফিরে যায়। সিগারেট ফুরিয়ে যাওয়ায় নোয়ান আবার বের হয়। উদ্দেশ্য সিগারেট কেনা আর একটু বাইরে হাঁটাহাঁটি করা। ফিরে আসতেই আবরো এলিটার জেরার মুখে পড়ে।
    – নোয়ন, আজ তুমি কিন্তু একটু বেশিই নিকোটিন নিচ্ছ।
    – তার জন্য কি আমাকে তোমার কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে।
    – তোমার ভাল-মন্দ দেখার দায়িত্বই কিন্তু আমার। তাই তোমাকে আমি অবশ্যই সতর্ক করে দিতে পারি।
    – এই তুমি ঘরের বউয়ের মতো জেরা করছ কেন?
    – তোমার কথা শুনে আমার তো মনে হচ্ছে সব পুরুষেরই ঘরে বউ থাকা জরুরী, তাহলে তারা সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করবে।
    নোয়ান মনে মনে ভাবে বলে কি এই গর্দভ যন্ত্রটা। সে বউয়ের কি মানে বুঝে। দিন দিন এই যন্ত্রটা একটা আস্ত যন্ত্রণায় পরিণত হচ্ছে।
    – খেতে এস নোয়ান।
    – না আমি আজ আর কিছু খাব না।
    – না খেলে তোমার শরীর খারাপ করবে। তোমার শরীরে এখন কার্বোহাইড্রট আর কিছু মাত্রায় ক্যালরিও দরকার।
    – বললাম তো আমি কিছু খাব না।
    – ধর আজ তোমার বউ থাকলে কি তুমি তাকে এভাবে ফিরিয়ে দিতে?
    নোয়ান আবারো অবাক হয়। এই যন্ত্রমানবী কি তার আবেগ অনুভূতিরও খবর রাখে। এরা কি সত্যিই একদিন মানুষের স্থান দখল করে নিবে। বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যৎ চিন্তভাবনাতো সেরকমই মনে হচ্ছে।
    – নোয়ান আমার মনে হচ্ছে তুমি আমাকে একটুও পছন্দ করছ না।
    নোয়ান কিছুটা লজ্জা পায়। যদিও একটা যন্ত্রের কাছে লজ্জা পাবার কোন প্রয়োজন ছিল না।
    – না না, সেরকম কিছু তো না। তুমি বুঝতেই পারছো আজ আমার মন খারাপ। তাই…
    – আমি ধারনা করতে পারি, তোমার বেডসাইডে রাখা ছবির সুন্দর মেয়েটিকে তুমি অনেক ভালবাস। যদিও তার সম্পর্কে তুমি কখনোই কিছু বলনি। আমাকে তার মত সুন্দর করে তৈরি করা হয়নি, তাই হয়তো তুমি আমাকে ঠিক পছন্দ করতে পারছো না। তুমি তো আমাকে অর্ডার করার সময় মনের মত করে করতে পারতে। বিশেষ করে ছবির ঐ মেয়েটির চেহারায় আমাকে তৈরি করে নিতে পারতে।
    – এলিটা তুমি সিমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ। তুমি কি করে নিজেকে সাবিলার জায়গার ভাবতে পারলে। সাবিলা আমার আত্মার অনুভুতি। তুমি কিছুতেই তার জায়গায় নিজেকে ভাবতে পার না। তোমাকে আনা হয়েছে ঘরের কাজ করার জন্য। তুমি ততটুকুতেই থাক।
    – আমি দুঃখিত নোয়ান তোমার মস্তিষ্কের উপর আঘাত করার জন্য। তোমার খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তুমি খেতে এস। যদি বল আমি খাবার এখানে নিয়ে আসতে পারি।
    এলিটা রান্নাঘরের লাগোয়া খাবারের জায়গায় ফিরে যায়। নোয়ানের বিরক্তিটা এখন বিস্ময়ে রুপ নিয়েছে। বলে কি এই নারি রোবট। এদের মূলত তৈরি করা হয় ঘরকন্নার কাজ করার জন্য। আর অনেকের নিসঙ্গ জীবনে কথা বলার মতো একজন সঙ্গী হিসেবে। তাই নোয়ান একে কিনেছিল। এলিটা দেখতে পুরোপুরিই একটা যন্ত্রমানব। নারী কন্ঠ আর কাজের ধরনে সে একটি নারী রোবট। এদের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা দৈনন্দিন ঘটনা আর কথোপকথন থেকে নিজের ডাটা বেজ সমৃদ্ধ করে তার রুটিন কাজকর্মে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে থাকে। আর মালিকের অভিরুচি বিশ্লেষন করে তার মতো করে কর্মপন্থা ঠিক করে নেয়।
    …. চলবে

    26
    18 Comments
Skip to toolbar