-
ধারাবাহিক গল্প
:::::::::::::::::::::
জমশেদ আলীর মেহমানদারী
—— শাহ্ কামাল
(২)
মেলাবছর পর জমু’র মেহমানদারী। ভীষন রকমের ব্যস্ততা চলছে তাঁর। ফুরসত নাই। জমু আসলে কাজ কর্ম করে না তেমন। এর জমিতে আগাছা পরিষ্কার করে, ওর বাড়ি বোঝা বয় এসব আরকি। সংসারে কোন টানাটানি নাই। বউ-মেয়ের কোন চাহিদা নাই। দু’এক বেলা না খেয়েও থাকতে হয়। কোন দেনদরবার নাই। সালিশও নাই। মেহমানদারী করানোর মতো টাকা আপাতত তাঁর হাতে নাই। এ নিয়ে টেনশন করে দুঃশ্চিন্তা পেনশনও পেতে চায় না। রোজকার মতো সন্ধ্যা বেলা বরুনের দোকানে এক কাপ চা খেতে বাজারে দিকে যাচ্ছে জমু। বরুনের দোকানের পাশে চেয়ারম্যান সাহেবের অফিস। এতো লোক বলাবলি হচ্ছে অথচ চেয়ারম্যানকে না দাওয়াত করলে কেমন দেখায়? হাঁটতে হাঁটতে চেয়ারম্যান অফিসের দিকে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়ালো জমু।
চেয়ারম্যান ফরিদুদ্দিন মোল্লা সাতশত তিয়াত্তর ভোটে আজমত চৌধুরীকে পরাজিত করে বছর তিনেক আগে চেয়ারম্যান হয়েছ্ন ইউনিয়ন পরিষদে। দু-চার জন লোক লস্কর সব সময়ই সাথে থাকে। নেতা হলে এমন লোকজন থাকতেও হয় কিছু। আজকাল তো রাজনৈতিক নেতাদের কর্মী থাকে না; কর্মীরাই নেতার পাওয়ারে পাওয়ারফুল থাকে।
জমু চেয়ারম্যানের কাছে দাঁড়াতেই তাঁর দিকে চেয়ারম্যানের চোখ পরল। জমু হাত তুলে বলল,
– আসসালামালাইকুম চেরমেন সাব।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। কী ব্যাপার জমু! কী নালিশ তোমার? কার বিরুদ্ধে নালিশ? ঝগড়া-ঝাটি না মারামারি? নাকি জমি জমার বিষয়? তুমি তো আমারে ভোটটাও দেও নাই। যাকগা…. কী বলতে আসছো?
একদমে চেয়ারম্যানের এতো কথা শুনে ডোক গিলল জমু। সাদাসিধে জবাব তাঁর,
– আমি তো ভোট দিছিলাম। আফনে বিশ্বাস করতেন না বইলা সীল মাইরা ব্যালট টা বাকসে ফালাই নাই। আফনেরে আইনা দেখাইছি।
– এইডা কী ভোট দেওয়া হইলো?
– আমার কী দোষ? আমি ত আফনের লাইগাই আনছি।
– আচ্ছা সমস্যা বল।
– কোন সমস্যা না, চেরমেন সাব। সামনের শুক্কুর বার আমার বাড়ি একটু পায়ের দুলা দিতেন যুদি।জুমা বাদ। মেহমানদারী করামু। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত। ময়মুরুব্বী সবাইরে বলবো।আফনে গইন্যমাইন্য মানুষ। আফনেরে ছাড়া ক্যামনে কী করার…..
– মেহমানদারী করাবা? তুমি! আলহামদুলিল্লাহ। আমি যাব।
– আফনে যাবেন শুইনা ভাল্লাগলো। আলহামদুলিল্লাহ।
– হাঁস কি পালের না কিইনা আনবা?
– হাঁস কিইনা আনবো।
– আচ্ছা একটু তাজা-তোজা দেইখা কিইনবা। ডিম পাড়া হাঁস কিনবা না। চাপায় শুধু হাড্ডি লাগে ওই গুলার। খাইয়া মজা নাই। চামড়া কিন্তু ছিলবা না মিয়া। আর ঝাল ঝাল রাকতে বলবা।
– ঠিক আছে, চেরমেন সাব।
– আচ্ছা ময় মুরুব্বী কইবা শোনলাম।
– জ্বি।
– কত জনরে বলবা?
– গেরামের সব মুরুব্বী বলবো।
– অতো জনরে ক্যামনে বলবা? মসজিদের মাইক দিয়া এনাউস করায়া দিমু মৌলভীরে দিয়া?
– দ্যান। দিলে ত ভালাই হইবো।
– আচ্ছা। কালকা বলায়া দিমুনে। আর শান আমার সাথে তিন চার জন ধইরা রাখবা
– জ্বি, আচ্ছা। আমি আহি, চেরমেন সাব।
আসসালামালাইকুম।
– আহো। ওয়ালাইকুম।
খোশ মেজাজে বরুনের দোকানে যেতে যেতে হাজার ভাবনা জমু’র মনে।তর তাজা হাঁস কিনতে হবে। বাজারের সেরা। চেয়ারম্যান সাহেব যাবে। মানী লোকের কদরই আলাদা।আবার মাইকিং হবে। ময়মুরব্বী গোটা পঁয়তাল্লিশ জন তো হবেই। জমু’র জন্য বড়ো আয়োজন বটে। বরুনের দোকানে লোকজন ভরতি থাকে সব সময়। তবে বেঞ্চির শেষ সীমানায় চুলার কাছে সন্ধ্যার পর একটা সীট সব সময় ফাঁকা থাকে। ওখানটায় জমু বসে। চায়ের কাপে চামচ ঘুরাতে ঘুরাতে জমুকে দেখে বরুন প্রশ্ন করে,
– দাদা, আজ লেট ক্যান?
জমু তার সীটটায় যুঁত করে বসতে বসতে বলে,
– চেরমেন সাবের কাছে গেছি।
– অইহানে ক্যান?
– দাওয়াত দিতে। মেহমানদারী করামু। সামনের শুক্কুর বার আমার বাড়ি তুমিও যাইবা ।জুমা বাদ। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত। ময়মুরুব্বী সবাইরে বলবো।
– মেহমানদারী? খুশি হইলাম, জমু দা।
– যাইবা কইলাম।
– যামু।
জমু’র হাতে চায়ের কাপ দিতে দিতে বরুন বলল, ধরো তোমার চা।
– চা? টেকা পয়সা নাই। চা খাওয়াইবা?
– রাখো তোমার টেকা পয়সা। মন চাইলে দিবা। না মন চাইলে না। তোমার লগে কী টেকার সম্পর্ক?
জমু চায়ের কাপে চুমুক দেয় আর বরুনের কথা শোনে। চায়ের কাপে চামচ ঘুরাতে ঘুরাতে বরুন বলে,
– ডাক্তর রে দাওয়াত দিছো, জমু দাদা?
– নাহ। চা ডা খাইয়া ওর দোকানে যামু।কবিরাজ ডাক্তার। বয়স পঞ্চান্ন গত হয়েছে। গোঁফগুলো একটু বড়। সহজে নাপিতশালায় যান না। রোগী আসলে খুব একটা ওষুধ পত্র দিতে চান না। টোটকা চিকিৎসা দিয়ে রোগী বিদায় করেন বলে সবাই তাকে কবিরাজ ডাক্তার বলে। ফুলপুর বাজারে ব্যস্ত থাকেন বেশ। রোগীর চেয়ে তাঁর সঙ্গী সারথী বেশি। দাদন মিয়া বিধবা মেয়ে মদীনা বিবি তাঁর নিয়মিত সেবা যত্নে ব্যস্ত। মদীনা সারাদিন তাঁর দোকানে বসে থাকলেও কেউ কোন ধরনের সন্দেহ করে না। কবিরাজ ডাক্তার লোক ভাল। এ বাজারে সব দোকানে ইলেক্ট্রিক বাল্ব জ্বললেও তাঁর দোকানে নাই। মাগরিবের আজানের আগেই মদীনা হারিক্যান পরিষ্কার করে সলতেতে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিবু নিবু আলোতে একটা টেবিলের সামনে বসে থাকে কবিরাজ ডাক্তার। পাশে লম্বা একটা বেঞ্চের শেষ কোণায় বসে মদীনা। আরেকটা বেঞ্চে দু’চার জন লোক বসা থাকেই। অচেনা কেউ তাকালে প্রথমে ভাববে এটা চায়ের দোকান। অবশ্য চোখের ব্যবহার সঠিকমতো করতে পারলে সে চিন্তা গুছে যাবে। কেননা কবিরাজ ডাক্তারের পিছনে যে সো-কেস তাতে দু’চারটা ওষুধের শিশি আছে।
পার্লামেন্টে এমপিরা যেমন চারপাশে বসে আর একদিকে বসে স্পিকার সংসদ পরিচালনা করে তেমনি এখানে স্পিকার যেন কবিরাজ ডাক্তার। আর বাদ বাকিরা এমপিদের মতো বসে থাকে ফ্লোর পাবার আসায়।
জমু ডাক্তারের দোকানের কাছে না যেতেই একজন বলে বসলো,
– কিও জমু, শোনলাম মেহমানদারী করাইবা?
বেঞ্চে নিজের আসন নিয়ে জমু’র উত্তর,
– জ্বি। হাচাই শোনছো।
কবিরাজ ডাক্তার মদীনা বলল,
– কী ব্যাপার, মদীনা। জমুরে চা দাও।
ভানু কিছু বলবার আগে জমু উত্তর দেয়,
– কবিরাজ, চা খামু না। বরুন খাওয়াইলো এক কাপ।
– আমার দোকানে আসলে চা খাওয়াই তোমারে এইডা কী নতুন?
– নতুন না তবে মাত্র খাইলাম কিনা…
– আচ্ছা।
– কবিরাজ, সামনে শুক্কুর বার আমার বাড়ি একটু পায়ের দুলা দিবা। জুমা বাদ। মেহমানদারী করামু। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত। ময়মুরুব্বী সবাইরে বলবো। তোমার যাওন লাগবোই।
জমু’র কথা শেষ না হতেই সাত মেয়ের বাপ তোতা মিয়া বলল,
– কবিরাজ কী একলাই যাইবো? আমাগো দাওয়াত নাই?
– থাকবো না ক্যান? তোমরা সবাই যাইবা।
কবিরাজ ডাক্তার মুখ খুলল,
– জমু, হাঁস কি ভুনা খাওয়াইবা নাকি ঝোল ঝোল?
মনখুলে একটা হাসি দিল জমু। প্রিয় মানুষের অভিমান ভাঙ্গলে তাঁর চেহারায় যেমন একটা ফুরফুরা ভাব থাকে জমু’র মুখে তেমনই একটা ভাব এখন। হাসি সেড়ে তাঁর দিল খোলা জবাব,
– তুমি ক্যামনে খাইবা?
– যেমনে খাওয়াও আপত্তি নাই। তেল কম দিতে কইবা আর কাঁচা মরিচ দিতে যেন ভুল না করে।
– ওইডা বলা লাগবো না। বউ আমার হাঁসের গোশত ভালাই পাকায়।
– তা তো জানি। কথা হইলো…..
– কী কথা বাকী আবার?
– আর কয়ডা দিন গেলে ভালা হইতো। শীতের দিনে হাঁসের গোশতের একটা মজা আছে।
– কথা সত্য। তহন ত দাম বেশি।
– তা ঠিক।
জমু আর কবিরাজ ডাক্তারের কথা বেশি
দূর এগোয় না। রাত বাড়ছে। জমু বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়।
ফজরের আজান কানে আসছে।আসসালাতু খাইরুমমিনান্নাউম….
(চলবে)8 Comments
Friends
Rakib Rakib
@abdurrakib
Md Ashfak Sayed
@ashfak
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Foyzur Khan
@foyzur-khan
sanjida akter jim
@sanjidajim



ভাল লাগছে। ধন্যবাদ।