-
‘কেবল আঘাত দেয় মূর্খ চতুর্দিক;
আমিও এখনো নিষ্ক্রিয় নির্ভীক—
ভারাক্রান্ত মন আজ অবিশ্রান্ত যায়,
তবু নিকটস্থ ফুল সুগন্ধে মাতায়।’
—– কবি সুকান্ত।
—————————————————————————————…..মাতৃহারা একজন বালক বা সদ্য কিশোরের মনোজাগতিক নৈঃশব্দিক কষ্টের গল্প। গল্পের নাম— ‘মনোযোগী শ্রোতা।’
<>
মনোযোগী শ্রোতা
———————-শতদ্রুু —–
এখানে তার ঠাকুর দাদার আমলের পুরোনো, এই যে পুকুর পাড়ের পশ্চিম কোনায়, একটি নিদিষ্ট গাছের নীচে প্রতিদিন আসে, —প্রত্যেক দিনই?
— নাহ, বলা ভালো হবে, শতদ্রুুর হাতে যখন সময়টা হয়– তখনই সে এই গাছটির নীচে এসে দাঁড়ায়।….
তার যতো কথা– এই একটি গাছের সাথে, যতোসব না বলা একান্ত কথা এই গাছটার সাথে! এতো কীসের কথা তার, —এই নির্ভাষিক গাছের সাথে? মনের কথা, প্রাণের কথা, সে অন্য ভাষাবান কারো সঙ্গে আদান প্রদান করতে পারে না!পশ্চিম দিকের প্রশস্ত পুকুর পাড়টায় বারোমাসি সবুজ রঙের জঙ্গলে ভরা থাকে। কিছু পুষ্ট ফুলবতী কলাবতী গাছের সাথে আরো রয়েছে কিছু চেনার সাথে অচেনা সব জঙ্গলি ফুল ফলের গাছগাছালিতে, ওই জায়গাটা পরিপূর্ণ হয়ে থাকে।… সেখানে হয়তো খুঁজলে পাওয়া যাবে– কালোবাসক, তেলাকুচা, বনকচু, আলকুশী, ঘেঁটু, লজ্জাবতী, ডুমুর, শাদা নয়নতারা, মান্দার, শিয়াল কাঁটা, বকফুল, ভেরেণ্ডা, মধুজবা ইত্যাদি….
পুকুরে যাবার পথের মুখ ছাড়িয়ে, বাঁয়ে পায়ে চলার আলরেখার চিকন পথ ধরে অল্প দূর এগুলে, গাছের ছায়ার নিচের শ্যাঁতশ্যাঁতে জায়গার মাটিতে অথবা গাছের গায়ে আশ্রিত, বড় আকারের ব্যাঙের ছাতা গজিয়ে রয়েছে।
শেষ বিকেলের দিকে– যেখানে আবার কয়েকটি নাচুনে ছাতারে পাখিদের সশব্দ আনাগোনা!….
পুকুরে যাবার অন্য পাড়ে —পথিমধ্য হতে হাতের ডানপাশে– নিঃশব্দে দাঁড়ানো আছে পেটমোটা বড় বড় কয়েকটি আম গাছ।ওইখান থেকে শুরু হালকা জঙ্গলের মতো দুই এক জাতের নকশা কাটা সবুজ পাতার পঙ্খীরাজ ফার্ন, ঢেঁকি শাকের গাছগাছালি।পাশে এদেরই সাথে রয়েছে সারা গায়ে ছড়ানো কাঁটাযুক্ত সুচালো ফণী মনসার ঝোঁপঝাঁড়। বহুদিন পর পর এই ক্যাকটাস জাতীয় গাছে অন্য রকমের সুন্দরী ফুল ধরে!
অল্পদূরের ওদিকটায় পুকুর ঘাটলার কাছাকাছি, শতদ্রুুর ঠাকুরমার নিজ হাতে লাগানো একটি এলাচি লেবুর গাছ।কখনো সন্ধ্যাকালের হালকা-আঁধারের বাতাসে অজস্র এলাচি লেবুদের মুকুলের গন্ধে চারপাশটা মৌ মৌ করে!….প্রায় শতদ্রুুর মা বারণ করে তাকে বলে –‘এই ‘শতো, পুকুর পারে– ঠিক ভর দুপুর বেলা, শেষ বিকেলে একদম যাবি না।’
‘কেনো যাবো না- মা?’– শতদ্রুু দ্রুত জানতে চাইতো মায়ের কাছে—
শতদ্রুুর মা বলতেন— ‘ওই সময়গুলি ভালো না রে বাবু’,—
শতদ্রুু বলে–‘গেলে কি হবে মা?’,—
বকুনির সূরে শতদ্রুুর মা বলতেন–‘তোমার খারাপ করবে, ওই সময়ে নির্জন জায়গায় পরী, দেউরা থাকে।এরা তোমাকে ভয়টয় দেখিয়ে কোনো অজানা স্হানে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। তাহলে– তুমি, আমাদের সবার কাছ থেকে হারিয়ে যাবে, —‘বাবা,
— পরক্ষনেই,
আরো যোগ করে তিনি বলেন, –পুকুরের নিচে, সেখানে গভীরে থাকে মহাকাল, ভর দুপুর বেলায় তুমি যখন একা থাকবে —পুকুর ঘাটলার জলে নামবে, তখন মহাকাল তোমার পায়ে লোহার শেকল পড়িয়ে জলের নিচে টেনে নিয়ে যাবে— আর কোনো দিন ফেরত দিয়ে যাবে না– বাবু তোমাকে!মায়ের কথাতে শতদ্রুুর মনে কিছুটা ভয় ঢুকে পড়ে… সে অনেক দিন পর্যন্ত মায়ের এই কথার অবাধ্য হয়নি।—
পঞ্চম শ্রেণীতে পড়বার সময়ে শতদ্রুুর মায়ের শক্ত এক রোগ ধরা পড়ে। সে ছোট বলে কেউ সরাসরি তার মায়ের কী যে রোগ হয়েছে, তাকে সেকথা বলেনি।কিন্ত এই কান ওই কান, পাঁচ কান হয়ে, সে জেনেছে তার মায়ের ক্যান্সার হয়েছে।এই রোগটা হলে মানুষটা আর বাঁচে না। সেদিন থেকে শতদ্রু মায়ের খুউব কাছে ঘেঁষতে চেয়েছে। সেদিন থেকে সে বুঝেছে, তার চেনা জগতের রঙিন সবকিছুর পেছনে লুকিয়ে আছে নিকষ কালো রঙের অন্ধকার! চোখের দেখায় আমরা আবেগের সঙ্গে সে সব শাদাকালোকে আসলে রঙ ছড়িয়ে রঙিন বানায়! গোপনে কিন্ত থেকে যায় বিবর্ণ ধূসরতা, সত্যিকারের বাস্তব শাদাকালোই! সেটা দাঁত খেলিয়ে বের হয়ে আসে তখনই—- যখন হাতের মুঠোয় আর রঙ থাকে না!….
শতদ্রুুর মায়ের দিনে দিনে রোগটি বেড়ে যেতে থাকে।তার মা কাহিল হয়ে পড়েন… মায়ের জন্য চিকিৎসা নামক সুরক্ষা কী হচ্ছে, সেটা সে জানে না।প্রকৃতিরই কাছে সে হাত পাতে…
বিরাট সীমামুক্ত নীল আকাশ, সবুজ বনানী, পাহাড়, নদী, সাগর থেকে মহাসাগর, ভাসমান মেঘের কাছে, রুদ্র বাতাস, তীব্র আগুন, রিমঝিম বৃষ্টির কাছে, দিনের প্রতাপী সূর্য, পূর্ণিমার রাতের স্নিগ্ধ চাঁদের কাছে– সে অশ্রু সজল আকুল হয়ে মায়ের রোগ মুক্তির জন্য হাতজোড় করে মিনতি করে…
তার মায়ের এখন চোখের নীচে চওড়া কালির ছোপের রেখা পড়েছে।ঠোঁট দুটিও নীলচে রঙের খসখসে শুকনো। চুলে চিরুনীর আঁচড় পড়েনি বহুদিন হয়। শরীর শীর্ণকায় হতে থাকে।তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়া প্রায় উঠে গেছে…
শতদ্রুু বুঝতে পারে তার মা আর বেশিদিন বাঁচবে না। —তবু শতদ্রুুর মা মলিন মুখে তাকে কাছে ডেকে নেয়, জানতে চান– ঠিক মতোন সে ইস্কুলে যাচ্ছে কি না? পিঠে শীর্ণ হাতখানা বুলিয়ে দিতে দিতে কাঁপা কন্ঠে বলেন– দুষ্টুমি না করতে, ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করতে, পড়ালেখা করতে…
শেষে বললেন প্রধান কথাটি– সে যেনো এখন থেকে একা একা নিজের সব কিছু করতে শেখে… এই কথা বলে, শতদ্রুুর মা’ অঝোরে কাঁদতে থাকেন।শতদ্রুুর দু’চোখ থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ে… কিন্ত ওই কান্নার কোনো শব্দ তৈরি হয় না!কিছুদিন পরেই– শতদ্রুু মাতৃহারা হয়।— নিজের ঘরেই এখন শতদ্রুু এক এতিম পুত্র!
এক কথায় শতদ্রুুর দৈনন্দিন-যাপন, দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছুর সময় অনুযায়ী করার যে তাগিদ অথবা তাগাদা, মাথার উপরের যে ছায়াটি, –অতি মমতা দিয়ে, শাসন করে, অপার স্নেহ আদর ও উৎসাহ দিয়ে করাতো– আজ তা নেই বলে, সে যেনো হঠাৎই ছিটকে ছন্দোময় সব কিছুর বাইরে পড়ে গেছে! তাকে ডাকাডাকি করে প্রয়োজনে মিষ্টি মধুর শাসন বা অনুপ্রেরণা যোগানোর কেউ নেই! তবে আছে একজন, সেটা সে নিজেই!.. এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, নিজেকেই নিজে টেলে এগিয়ে সামনে নিয়ে যেতে হবে!….মাতৃহারা শতদ্রুুদের ঘরে এখন তার বাবার দিকের দূর সম্পর্কের হতদরিদ্র, পোড়া কপালী, অসহায়া বয়স্কা এক মেয়েলোক থাকছেন।ফুঁসে উঠা রুদ্র দরিয়ার বুকে একটি পাল গুটানো বড় নৌকার যেমন অবস্থা হতে পারে, তাদের সংসারের তেমন দুরাবস্থায়— এই মেয়েলোকটা তাল ঠিকঠাক রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন— তবু শতদ্রুুর মনে হতে থাকে– এ যেনো দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো! তার অসুস্থ অক্ষম মা-টা বেঁচে থাকা অবস্থায়ও তাদের সংসারটা চারদিক ঘিরে, এতোটা শূণ্যতাই ভরে উঠেনি!…
একটি করে দিন যেতে থাকে– প্রত্যেকটা দিনের শুরুতে এবং দিনের শেষে নানা রকম অপ্রিয় কিছু ঘটতে থাকে। এতে শতদ্রুুর বাবা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেন… তিনি মর্মাহত হতে থাকেন, এমন কি তিনি রুষ্টও হচ্ছেন! যা বাইরে থেকে দেখে যে কেউ বুঝতে পারছিলো! …আড়ালে সবাই এই ব্যাপারটকে নিয়ে কানাঘুষা করছিলো– সদ্য শূণ্য হয়ে উঠা এই সংসারটা হয়তো আর বেশিদিন শূণ্য থাকবে না।
নতুন মুখের কোনো বউকে দিয়ে– সেটা সহসাই ভরাট করা হবে!….প্রথমে ব্যাপারটি বুঝতে পারে শতদ্রুু নিজে। তার মনে হতে লাগলো, তার এতো দিনেকার চেনা জানা বাবাটা, এই অল্প কয়েকদিনে কেমন বদলে যেতে থাকে! সে বোঝে— বাবার এই বদলে যাওয়া তার মায়ের মৃত্যু শোকের জন্য অবশ্য নয়।কেমন দুঃখিত চোখে তার বাবাটা চারদিকে তাকাচ্ছেন, কেমন নিঃসঙ্গ মনে সব ভূলে যেতে থাকেন। কিন্ত এই ভূল ভালে তিনি নিজেই বেশ বিরক্ত হতে থাকেন… অযথাই একে ধরে, ওকে ধরে বকাঝকা করেন।এতে শতদ্রুুর অনেক মন খারাপ হয়।
—– শতদ্রুু তার মায়ের এমন হঠাৎ করে, চিরদিনের জন্য চলে যাওয়ার অতিশোকে ও মনের কষ্টে যেখানে খুউব কাতর আর নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে, সেখানে তার বাবার এই রকম আচরণে— তাকে মনের অতলে পোড়াতে থাকে…. যা কেউ দেখতে পায় না!….একদিন, শতদ্রুেুর মৃতা মায়ের অন্তেষ্টিক্রিয়ার তিন মাস পরে— তার বাবা, তাদের ঘর সংসারের আপাতত রক্ষাকারী— যে মেয়েলোকটা দৈনিক উদয় অস্ত তাদের ঘরের গেরস্থালি সামাল দেবার জন্য বেশ খাটাখাটুনি করছেন– শতদ্রুুর বাবা সেই মেয়েলোকটার মুখোমুখি হন। রক্তজবার মতো লাল দুই চোখ পাকিয়ে তিনি মেয়ে লোকটার প্রতি খড়গহস্ত হলেন— মেয়েলোকটাকে এহেন হেনস্তা করার জন্য— দূর থেকে শতদ্রুুর কী যে লজ্জা লেগেছিলো….
কোনো মুখরোচক ঘটনার ধর্মই হচ্ছে– ঘটনা ঘটার পরে, ঘটনাটার ডালপালা গজানো, তারপর সময়ের পুষ্টিতে বাড়ন্ত ঘটনার বুক থেকে কুঁড়ি থেকে ফুল থেকে মুকুল— সবশেষে ফল হয়ে ফলাফল প্রকাশ পাওয়া!
শতদ্রুুর মামাবাড়ির দোরগোড়া পর্যন্ত বিদ্যুগতিতে এই খবরটি, বর্ষার আকাশের মেঘ গুড়গুড় গম্ভীর ধ্বনির মতো পৌঁছে যায় যে, শতদ্রুুর একজন সৎমা আসছে!
শতদ্রুুর মা বিগত হয়েছেন মাস তিনেকের বেশি হয়– এরি মধ্যেই এমন বেমক্কা সংবাদ যেই শুনছে বা যে কোনো মানবিক শ্রোতাকেই ব্যাথিত করে তুলছে!….শতদ্রুুর মায়ের বাবা বাড়ির এক এলাকারই, তার মা’র বড়োবেলার বেশ ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর মেয়ে। যাকে শতদ্রুু ছোটকাল থেকে তাসলিমা আপু ডেকে এসেছে।
—-শতদ্রুুর মামাদের বিশেষ অনুরোধ ও ইচ্ছেতে, তাসলিমা আপু ও তার মা, শতদ্রুুকে দেখতে এলেন।
—-শতদ্রুু স্কুল থেকে ফিরে দেখে— তার সেই তাসলিমা আপু নিজের মায়ের সাথে তাদের বাড়িতে এসেছে।
প্রথমেই শতদ্রুুর তার তাসলিমা আপুর সাথে চোখাচোখি হয়।হাসিমুখে তাসলিমা তাকে কাছে ডেকে জানতে চাইলো—
–‘এই শতো’ তুমি কেমন আছো?’
শতদ্রুুও মুখ হাসি হাসি করে মাথাটা সামান্য নেড়ে উত্তর দেয়– সে ভালো আছে।
তাসলিমা বুঝে নিলো এটা শতদ্রুুর কোনো মতে দেয়া জবাব মাত্র! তার চোখ দেখেই তাসলিমা বুঝতে পেরেছে– শতদ্রুুর ছোট্ট বুকে, পাথর চাপানো কষ্টগুলির ঝড়ো বাতাস বইছে… তবু তাসলিমা শতদ্রুুকে কাছে ডাকলো–
–‘শোনো, আমার কাছে আসো’– শতদ্রুু শুকনো মনে মুখস্থ পড়া বলার মতো পা চালিয়ে— তার তাসলিমা আপুর দিকে এগিয়ে যায়।তাসলিমার সামনে দাঁড়াতেই– তাসলিমা তার হাতটা ধরে বলে উঠে– ‘চলো– তোমাদের পুকুর পাড়ের দিকে যায়…
অগত্যা শতদ্রুু নামেমাত্র মুখহাতটা ধুইয়ে– তাসলিমার সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটতে থাকলো।তাসলিমা, শতদ্রুুর জন্যে বিস্কুট, চকোলেট, চানাচুর এনেছে– সেসব শতদ্রুুর হাতে দেয়…
শেষ বিকেলের ক্লান্ত রোদ তাদের দুজনের নাকে মুখে পড়েছিলো— শতদ্রুুর বুকের মাঝখানে একটা বোবা কান্না ঘুরপাক খায়। তার ছোট্ট বুকের আকাশে আকারে অনেক বড়ো আকৃতির একটা কালো রঙের কষ্টের মেঘ আনাগোনা করে, সে কাউকে– এটা দেখাতে পারে না, কাউকে সে- সেই কথাটি বলতে চাইও না….
আবার যেনো তার বুকের ওই কষ্টের মেঘটা— তাসলিমার সান্নিধ্যে এসে গম্ভীর নাদে্ ডাকতে শুরু করলো!…
যেতে যেতে তাসলিমা জানতে চাইলো– ‘শতো, তুমি কেমন আছো, আমাকে বলো– আমি সত্যি সত্যি জানতে চাইছি, তারও আগে তুমি কিছু খেয়ে নাও।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি? ‘
শতদ্রুু উপর নীচে– মাথা নাড়ে শুধু… কিন্ত নিচু মাথায় হাঁটতে থাকে।
তারা পুকুর পাড়ের মুখে এসে থামে।শতদ্রুু বিস্কুট মুখে দিয়ে খেতে খেতে জানতে চাই–
—‘তাসলিমা আপু, আপনি কেনো এসেছেন?’
—‘বা’রে– তোমাকে দেখতে এসেছি।তোমাকে দেখতে খুব মন চেয়েছে, তাই না– এলাম।’
—‘আমার মা যখন বেঁচেছিলেন তখনতো আসেননি। মা’কে দেখতে মন চাইনি?’
এক কিশোরের মুখে এমন প্রশ্নে– তাসলিমা একটু চমকে্ উঠে! কিন্ত সেটা দেখালো না।এবারে তাসলিমা ভালো করে দেখে শতদ্রুুকে, আর এবার তাসলিমা বুঝতে পারলো নিজের ভূলটা! আসলে শতদ্রুু এরি’মধ্যে বেশ বড়ো হয়েছে।মমতা মাখানো আবেগের জন্যে এতোক্ষণ—- এটা তাসলিমার দৃষ্টিগোচরই হয়নি!…
—‘তখন আমার বিএ পরীক্ষাটা নিয়ে একটা ঝামেলা হয়েছিলো। এইসব কিছুর কারণে আসা হয়নি।তুমি দেখেছোতো আমি কিন্ত একা আসিনি।আমার সঙ্গে করে আমার মা’ও এসেছেন।আমি ইচ্ছে করলেও, তখন একা এখানে আসতে পারতাম না।’
(শতদ্রুুর তাসলিমা আপু, শতো’কে ইচ্ছে সত্ত্বেও এটা বলতে পারলো না– তার মা’ ও সে- দুজনে, শতদ্রুুর মামাদের বিশেষ অনুরোধে ও ইচ্ছেতে… তবে তাসলিমার এই শতো’কে একবার দেখতে মনে ছেয়েছে বলে অন্তত নিজে তাসলিমা এসেছে।)—‘শতো, তোমাকে আমি আরো ছোটকাল থেকে দেখছি। সেই দেখাও তোমার মামাবাড়িতে।এখন তুমি বড়ো হয়েছো।ভবিষ্যতে আরো বড়ো হয়ে একজন ভালো মানুষ হবে। এখন তুমি আমাকে বলো, শুনেছিলাম এই পুকুর পাড়ে তোমার একান্ত একটি জগত আছে?’
—‘তুমি কি এখানে এসে আজো সময় কাটাও?’
—‘হ্যাঁ। পুকুর পাড়ে সময় কাটালে আমার মন ভালো হয়ে যায়।’
—-‘তোমার মন খারাপ কেনো?’
শতো’ মাথা নুয়ে চুপ করে থাকে।মুখে কথার উত্তর দিতে চাই না।পুকুর ঘাটলা থেকে কাছেই— ডানদিকের পরিত্যক্ত একটা জায়গা জুড়ে অজস্র সূর্যকন্যা ফুল ফুটে আছে। দূরে থেকে দেখলে মনে হবে— এই সূর্যকন্যা ফুলেরা কাঁচা সবুজের বুকে– হলুদ রঙের বড়ো ফোঁটা ফোঁটা, শিল্পীরই নিপুণ হাতে আঁকা যেনো কোনো ছবির মতোন! সেই দিকে আঁড় চোখে এক মনে তাকিয়ে তাসলিমা, শতদ্রুুর কাছে জানতে চাইলো– ‘শতো, তোমার মন খারাপ থাকার বিশেষ কোনো কারণ কি আছে?’
—-শতদ্রুুর চোখের কোণা জলে ভরে খানিকটা চিকচিক করছিলো।
—-‘আপু, যেদিন আমার মা বলেছিলো– আমি যেনো একা একা নিজের সব কাজ করতে শিখি, নিজের কাজগুলি নিজে করি– ওইদিন থেকে আমি বুঝেছি আমার কেউ নেই।’….এই কথা শুনে তাসলিমা নিজের মধ্যে চমকে উঠে! —-একজন একা কিশোর নিজের মধ্যে নিজেকে কিভাবে গুটিয়ে নিলে— এমন কথা সব বলতে পারে!…
—‘শতো, তুমি একদম একা– এমন করে কেনো ভাবছো? তোমার বাবা রয়েছেন, পরিবারের ঘনিষ্ঠ পরিজনরাও আছেন, আর মামারা আছেন, —এই যে আমিও তোমাকে দেখতে এসেছি। —শুধু শুধু তুমি যে একা, কেনো ভাবছো?’
—-‘আমার মন এটা বলেছে– একদিন আমি একা হয়ে যাবো।আমার মা’ও ঘুমের স্বপ্নে এসে বলেছে, —-আমার একজন নতুন মা আসবে। তখন আমার মা স্বপ্নে আর আমাকে দেখতে আসবে না।’….
—‘বুঝেছি…’ তাসলিমা বললো।
—‘আচ্ছা, তুমি কি নিশ্চিত যে, তোমার নতুন একজন মা আসছে?’….
—‘সবাইতো বলাবলি করে এই কথা— আমার বাবা আরেকটা বিয়ে করবেন।আবার ইস্কুলেও বন্ধুরা এই বলে ক্ষ্যাপায়, আমার নাকি ‘ডাবল মা’ হবে।’( শতদ্রুুর মায়ের অকাল মৃত্যু’টার শূণ্যতা বোধ, তার বুকে ঝাঁক বেঁধে কষ্টগুলো —-যেনো সব কাঁচপোকা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!)
—‘এই খবরটা কি শেষপর্যন্ত কানাঘুষাও হতে পারে না?’ —-তাসলিমা শতোর দিকে না তাকিয়ে কথাটি বললো।
( কথাগুলি বলে তাসলিমার মধ্যে অপরাধ বোধের মতো অনুভূতি হয়। কেননা সে নিজেও নিশ্চিত জানে না, আদৌ ওই কানাঘুষার খবরটি মিথ্যে হয়ে যাবে কি না?)
শতদ্রুু নিশ্চুপ।শুধু মৃদু মাথাটা নাড়লো….
—‘শতো তুমি, তোমার প্রিয় পুকুরপাড়ের সবকিছু আমাকে ঘুরিয়ে দেখাবে না? এখানে এসেছি যখন, তোমার প্রিয় এই জগতটার সঙ্গে আমিও, একবার পরিচিত হয়ে যায়।’…
—–শতদ্রুু এই কথারও কোনো প্রতিউত্তর দিলো না। সামান্য একটু হাসলো মাত্র….
তাসলিমা শতদ্রুুকে সঙ্গে করে পুকুরপাড়ের সবুজের ভিতরে প্রবেশ করলো। দেখতে লাগলো বিকেলবেলার আলোতে এক অন্যরকম প্রকৃতির শোভাকে! দেখে দেখে এগুতে থাকে।কিন্ত অল্প দূরে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে…
চারিদিকের দারুণ প্রকৃতির, এই রকম নিজস্ব ছবিময় শ্রী সৌন্দর্য— ইতিপূর্বে তাসলিমা দেখেনি। সে একই সাথে মুগ্ধ হয়েছে, আবার বিষন্ন হয়ে উঠে! যখন তাসলিমা দেখতে পাই–
বড়ো একটা গাছের গায়ে সাঁটানো মোটা সাইজের বড়ো টুকরো কাগজে শতদ্রুু কয়লা বা এই রকমের কিছু দিয়ে এঁকেছে— একটা এলোকেশী নারীমুখের ছবি! ছবিটির নিচে হাতে লিখেছে গোটা গোটা অক্ষরে… ‘আমার মাকে ভালো করে দাও —অসীম আকাশ; মাকে ভালো করে দাও– প্রজাপতি মেঘ; মাকে ভালো করে দাও —সবুজ গাছপালা; …সূর্যদেব; —-এভাবে সে আরো কিছু লিখেছে…
আহা! ছোট্ট শাদা মনে— মাকে সুস্হ করে তোলার জন্য একজন কিশোর প্রাণের আকুতিতে, তাসলিমার নিজেরই অজান্তে চোখদুটি জলে ভরে ঝাপসা হয়ে উঠতে চাইলো!
এখন শেষ বিকেল।দিনের বেলার প্রায় শেষ সময়।চারিদিকে উদিত সূর্যের আলোর রোশনাই কমে এসেছে।নিঝুম এই পুকুরপাড়ের এক টুকরো প্রকৃতির, ঘন সবুজের সান্নিধ্যে তাসলিমা যেমন অন্যরকম সুখের আবেশে ভরে উঠেছে, সাথে সাথে এই
একা নিঃসঙ্গ একজন কিশোর শতো’র জন্যে, তার তেমন মনের ভেতরটা কষ্টে ভরে উঠলো!
—‘শতো’ তুমি কি তোমার মা’কে দেখতে পাও, মানে হচ্ছে— খালা’মণিকে, উনি কি আসেন– তোমার সাথে দেখা করতে?’
শতদ্রুু পুকুরপাড়ের সেই গাছের দিকে তাকিয়ে ছিলো।যে গাছটার গায়েতে সে তার মা’য়ের আঁকা ছবিটি সেঁটে ছিলো।—-
–‘ধরো, এই পুকুরপাড়ের নির্জনতায় তোমার মা’— কি, কোনো কিছুর রুপ ধরে, তোমার সাথে দেখা করতে আসেন?’
—‘নাহ! এইভাবে মা’য়ের সাথে আমার কোনো সময়ে দেখা হয়নি।’
— এই’টা বলে– শতদ্রুু চুপচাপ থাকে।দৃশ্যত জগত সংসারটা নিবেদিত কিছু অদৃশ্য সংযোগ তারের সমাহার! তারই মধ্যে এই শতদ্রুুর, একটি সংযোগ তার ছিঁড়ে গেছে… ওই বিচ্ছিন্ন সংযোগ তারটির নিজস্ব পরিচয়– মা ও সন্তানের মধ্যেকার প্রাকৃতিক সম্বন্ধ!
তাসলিমা চোখের সামনে এখন দেখতে পাচ্ছে, একজন শতদ্রুু যেনো, কোনো সুতো কেটে যাওয়া, ঘুড়ির মতোন মনের আপন ভূবনে, চরকি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!…—‘শতো, বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেলো– এখানে এলাম। চলো, এবারে ফিরে যাই।
—‘তাসলিমা আপু, আপনারা কি আজ রাতে আমাদের বাড়িতে থাকবেন?’
—‘নারে– শতো, তোমার সাথে দেখা হলো।তোমার বাবার সাথে যদি দেখা হয়ে যায়, তাহলে ভালো। আমরা কিন্ত কাছেই আজ রাতে, আমার আব্বুর ছোট রবিউল চাচুর বাড়িতে থাকবো। তারপর সকালে– না হয়, দুপুরে ফিরে যাবো।’চলতে চলতে তাসলিমা শতদ্রুুর কাছে জানতে চাইলো–
—‘তোমার কি মামাবাড়িতে একেবারে চলে যেতে ইচ্ছে করে, ওখানে ভবিষ্যতে তুমি বসবাস করলে?’…
—‘আপু, আমি কোথাও যেতে চাই না।’
—এই বলে পথ চলতে, শতদ্রুু হোঁচট খেলো—
সে মাটিতে বসে পড়ে। এই সময়ে তাসলিমা দেখতে পেলো শতদ্রুুর পায়ে মারের কয়েক’টা দাগ, আহারে– কালচে রঙ হয়ে চামড়ায় বসে গেছে!
তাসলিমার মনটা– এই জন্য হু হু করে উঠে, কিন্ত এই আবেগটাকে সে লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন বোধ করে।রাত গভীরে হঠাৎ ঘুমের ঘোরে— শতদ্রুু দেখে, কী যে সুন্দর একজন দেবী মা! তার কিছুদূর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভীষণ সুন্দরী দেবী মা, দেবীর গা থেকে রুপের জ্যোর্তি বের হচ্ছে।শুভ্র বসন, কাঁচা হলুদের মতো গায়ের বরণ, কাজলটানা চোখ, রক্তাভ ঠোঁট, ঢেউ খেলানো খোলা চুলের রাশি, হাসি মাখানো মুখশ্রী…
একটু একটু করে– খালি পায়ে দেবী মা শতদ্রুুর সামনে এগিয়ে আসছে…
—-কিন্ত এই কি, —দেবী মা’র চেহারাটা অবিকল তার নিজের মায়ের মতো যে!…বহুদিন পরে—
শতদ্রুু নাম জেনেছে তার ওই প্রিয় গাছটির।সেটি ছিলো একটা বরুণ ফুলের গাছ।অনেককাল আগে– সে এই গাছেরই গায়ে সিরামিকের ভাঙ্গা কাপের টুকরো দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁটিয়ে লেখার চেষ্টা করেছিলো—
‘আমার প্রিয় বোবা বন্ধু!’
যদিও তার লিখতে মন চেয়েছিলো পুরো একটি লাইন,
–‘আমার একমাত্র একান্ত বোবা শ্রোতা বন্ধু’…[ গল্প ]
২২/৯/২০২১
10 Comments-
নিজের মানসিক অবস্থা’টা বোঝাবার জন্য এই কয়েক’চ্ছত্র পঙক্তি, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য– কারো উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে এটি উল্লেখ করেছিলেন।সন্দেহ নেই পঙক্তি ক’টি চমৎকার!
——আমার এই গল্পের প্রধান চরিত্রের মানসিক অবস্থা’টাও বোঝাবার জন্যে এটি এখানে উদ্ধৃত হয়েছে।
গল্পটি পড়ার জন্য— ধন্যবাদ। 🙂
সজীবকে, নীলকে অনেক ভালোবাসা। 💟
——-এবং পাঠককে গল্পপাঠে আমন্ত্রণ….

অনুপ দে।
লেখালেখি: / লেখার ধরণ- প্রগতিশীলতা; আধুনিকতা।
- লেখক জীবন আমাকে খুব টানে!
- লেখালেখির মনটা, ব্যাক্তি জীবনে সবাই খুঁজে পাই না!
- আমি গল্পের মানুষ, গল্প লিখে সুখ পাই।গল্পে নিজেকে তুলে ধরা যায়।
- একটা গল্পে অনেকগুলো চরিত্র থাকে, --কথক কিন্ত একজন! সব চরিত্রই গল্প-কারের ভেতর থেকে উৎসারিত! মজা হচ্ছে,- গল্পকার সব চরিত্রকে ছুঁয়ে দেখেন, চিনেন!
Email : [email protected]
Friends
Zahidul Jamy
@zahidul
আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল
@uzzal6821
Payel Akhter Jyoti Nur
@payel
রাহেনা বেগম
@rahena-begum
MD.RAKIB HASAN ONTO
@rhonto27
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Ashaduzzaman-Khokon
@ashaduzzaman-khokon
এড: সাজেদুল হক টুটুল
@sazedul
AdabenTatali
@adabentatali



আমার প্রিয় কবি সুকান্ত