Profile Photo

হাসনাত সৌরভOffline

  • Hasnat21
  • Profile picture of হাসনাত সৌরভ

    হাসনাত সৌরভ

    • 4 years, 11 months ago

    হিমগন্ধ জীবন
    ————————-

    গাঁয়ের লোকের খুশির দিন হল এই শীতকাল। ফসল কাটা হয়ে, ঝাড়া হয়ে গোলায় ঢুকেছে। ভিটা লাগোয়া খন্দ চাষের উঁচু জমিতে ফুলকপি, ওলকপি, শিম, বরবটি, বেগুন, পালং মকমক করছে। ওদিকে সারিসারি আলু গাছের ঢলঢলে পাতাগুলি উত্তুরে হাওয়ায় চাষির পাঁজরসার বুকে ভরসার দোলা দেয়। আলুতে দুটো পয়সা এলে বৌ’র বন্ধকির গয়না ছাড়িয়ে, দেনার কড়ি শোধ দিয়ে, চাই কি দুটা লয়া শাড়ি জামা খরিদ করা যাবে।

    নীচু মাঠ থেকে ধান তুলে নিলে মাঠ ফাঁকা। শীতে সরসর করে রস টানে। নরম মাটি দুদিনেই খটখটে। খেসারি বুনলে সবুজ, নইলে বেথুয়া, চিকনি, শুষনি, গিমা, গুইয়া কলমি, থানকুনির কি বাড়! ঝি বৌয়েরা গামছায় নয় শাড়ির কোঁচড়ে উবু হয়ে হয়ে শাক তোলে বিকেলবাটে। নতুন বেগুন আর আলু ঝিরি ঝিরি কুটে মরা আঁচে শাক রান্না, তাতে দুটা ডালের বড়া। রোদে পিঠ দিয়ে বসে ঐ শাক দিয়ে এক থালা ভাত গবগবিয়ে হাওয়া। শাকের স্বাদ শীতেই খোলে।

    মাঠের ধারে শিউলিদের ঠেক। খড়ের অস্থায়ী ছাউনি। নিপুনভাবে নিকোনো ভুঁয়ে খেজুরের বুক চেঁছা রসে টইটুম্বুর কলসিগুলি ঠেসাঠেসি করে রাখা। একপাশে ডাঁই করে রাখা তেঁতুল কাঠের চ্যালা। রস মারার গন্ধে ভুরভুর করছে গোটা গাঁ।

    পিঠেপুলির দিন। আজ এর বাড়ি কাল ওর বাড়ি। কচি ছানাদের বাধাবাঁধন নাই। নাকের সিকনি হাতের উল্টো পিঠে মুছে ফোকলা দাঁত বের করে হাত বাড়িয়ে দেয়। পোড়া পিঠা, পুলি পিঠা, কাখরা পিঠা, চিতুই পিঠা..পিঠার কি আর শেষ আছে! নারকেল কোরা, ক্ষীর আর নতুন গুড়ের পুর। আহা! প্রানটি শীতল হয়ে যায়।

    একসময় ফাঁকা মাঠে যাত্রার আসর বসতো। সেই নিয়ে কদিন সরগরম খিড়কি পুকুর থেকে গাঁয়ের হাট। বায়না করতে শহরে গেছিল মাতব্বরের দল। তার কি বর্ণনা! কি দল গাইতে আসছে? কি পালা বায়না হল? সামাজিক পালা শুনে খিড়কি পুকুরের আসরে দাদীমা ঘোমটা নামিয়ে মুখ ভেঙান।

    তবুও পালার দিন আসর ভিড়ে ভিড়াক্কার। ভিড়ের মাঝে মদন কটকটি গলায় বত্রিশ ভাজার হাঁড়ি গামছায় বেঁধে হাঁক পাড়ছে, “মদন কটকটির ইস্পেশাল বত্রিশ ভাজা, আজকের যাত্রাপালা ‘শাশুড়ি দিল বৌকে সাজা’।

    মাদুর সতরঞ্জি পেতে আগেভাগে জায়গা ধরে রেখেছেন সাবধানীর দল সেই বিকেল থেকে। সাথে পানের ডিবে, মুড়ি আর কলাই শুঁটির বোঁচকা। যাত্রা যখন শুরু হয় তারাই আগে ঢুলতে থাকেন। সুরপার্টি তেমন দৃশ্যে কঁকিয়ে উঠলেই এরা চোখ কচলে তাকান। বিড়বিড় করতে শোনা যায়, “বড় ভালো গাইতিছে গো। হবেনি? শহরের দল বলিয়া কথা!”

    আত্মীয় কুটুম্ব আসে। একদল যায়, একদল আসে। এর বাড়ি ওর বাড়ি। এর মাঝে কনে দেখা, বিয়ের সম্বন্ধও টুকটুক করে হয়ে যায়। মন দেওয়া নেওয়াও। হৃদয়ের টানে হৃদয় জোড়ে। ভাঙেও। জীবন গাঙে ভাঙাগড়ার এই খেলা নতুন তো নয়!

    @হাসনাত সৌরভ

    18
    10 Comments
Skip to toolbar