Profile Photo

Drako ShajibOffline

  • drako
  • Profile picture of Drako Shajib

    Drako Shajib

    4 years, 6 months ago

    “বহিছে ভূবনে আনন্দ ধারা”
    সবাইকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাই আগাত উৎসবের।
    বড়দিনের এক সুন্দর স্মৃতি মন পড়ল,
    ছেলেবেলায় ঠিক বড়দিনের আগে আগে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হত আর ছুটতাম গ্রামে। সে সময়ে গ্রামের সবাই একসাথে একদলে স্বাগত জানাত বড়দিনের উৎসবকে। বড়দিনের উৎসব ঈদ-পূজার মতই আগে আগে ছড়িয়ে পড়ত সমস্ত গ্রামে। আমি গ্রামে গেলে গ্রাম আমায় আপন করতে কিছু মুহূর্ত নেয়মাত্র। মিশে যাই সে উৎসবে ভাই-বন্ধুদের সাথে।
    শীতের সন্ধ্যায় গ্রামের সবার সব থেকে প্রিয় মানুষটির উঠোন থেকে শুরু হত একটি গায়েনদলের যাত্রা সাথে থাকত উৎসুক কিছু প্রাণ। অবাক করার মত সবাই একসুরে একতালে অবলীলায় গাইছিল। সমাবেত কন্ঠে সবার গানের এমন সুর হত সে সুর আপনা থেকেই মনের ভেতর দোলা দিতে থাকে মধুর লয়ে। সে লয়ে ছন্দ রেখে নেচে ওঠে সবার পা। একতালে একসুরে বেশ কয়েকটি গানের পরে বেরিয়ে পড়ে দলটি গ্রমের পথে।
    গ্রামের রাজকন্যা টুকুপিষির হাতে সবসময় থাকত পেটমোটা সুন্দর চামড়ায় বাধানো একটি ডায়েরী, ও বেশ কয়েকটি ছোট বই। বেশ ভাল গাইতেন তিনি। তার মত অন্যসবাইও হাতে হাতে নিয়ে নিত গানের বই, প্যাড খাতা, ঢোল, করতাল থেকে শুরু করে থালা, বাটি, গ্লাস, বাচ্চাদের খেলনা ঝুনঝুনি। যাদের হাতে বই নেই তাদের হাতে হাতে দিয়ে দিত অতিরিক্ত বই ও বাদ্যগুলো। আর যে হাতগুলো শূন্য থাকত তারা কুড়িয়ে নিত হাতের কাছে পাওয়া সুলভ ফুল, কাচা-শুকোনো ডালপাতা।
    পড়ে জেনেছিলাম, টুকুপিষি ও রাঙ্গাকাকী গ্রামের সকল আগ্রহী তরুনী-বালিকাদের সারা বছর নাচ-গান, আঁকিবুঁকি, হস্তশিল্পের সাথে সাথে লেখা পড়া শেখাত আর প্রস্তুত রাখত গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী সবরকমের উৎসবের জন্যে। নাচ-গান, শিখে পড়ে একবারে পুরোদস্তুর তৈরী দলের সাথে ভিড়ত আনাড়ি দল।

    গ্রামের পরম মোহনীয় সুবাস মাখা পথে মাতাল করা ধূপের গন্ধ ও আলো জ্বেলে উৎসবমুখর প্রাণগুলো আনন্দের ঢেউ নিয়ে একদলে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি করে ছুটে বেড়াল সমস্ত গ্রাম। যে ঘরের উঠোনে আছড়ে পড়ছিল এ নির্মল আনন্দের উচ্ছ্বাস সে ঘরের সবগুলো আলো জ্বলে ওঠে সাথে সাথে। একগাল হাসীমুখে ঘর থকে বেড়িয়ে ঘরে থাকা সকলে যেন অপার্থিব সুখী তারা। ব্যস্ত বিয়ে বাড়ীর মত, ঘরামি ঘরের থেকে চেয়ার, কাঠের বেঞ্চি বের করে দেয় বসার জন্যে। প্রতি ঘরের উঠোনেই বৃত্তাকার হয়ে সমস্ত দলটি মন মাতানো একের পর এক গানের সাথে সহজ সুন্দর তালে ঘুরে ঘুরে নেচে বেড়ায় সমস্ত উঠান। ঘুমন্ত শিশুগুলো ঘুমভাঙ্গা চোখে অবাক বিস্ময় নিয়ে ফোলা ফোলা চোখে দেখে এ আয়োজন। ঘরের মা, মেয়ে, বউ, ঝিরা ভালোবেসে হাতে করে এগিয়ে দিত মুড়ি, চিড়া, গুঁড়, জল, বাতাসা, শীতের পিঠাসহ আরো নানান পদের শুকনো খাবার। মাটির চুলায় ওঠে বড় চায়ের হাড়ি। মুড়ি-মুড়কি পকেট পুড়ে, লেবু পাতার চায়ে চুমুক দিয়ে পার্থনা ধরে সকলে। এক স্নিগ্ধ পবিত্রতায় ছেয়ে গেলে চারিপাশে। পার্থনা শেষে চাঁদার টাকা মুঠোভরে বেড়িয়ে পড়ত অন্য বাড়ি।
    প্রায় প্রতি ঘর থেকেই একদল কচিকাচা যোগ দিয়ে দিয়ে ভারী হতে থাকে এ উৎসবমুখর দল। কুয়াশা ও হীম ধরানো বাতাসে শীতের প্রকোপ থেকে বাচতে শীতের পোষাক থাকলেও চাদর, মাফলার, গামছা দিয়ে ভালো করে মুখ-কান জড়িয়ে নিত সকলে। কচিকাচার আবদার মেটাতে অথবা, একরাশ স্বচ্ছ, নির্মল আনন্দ পাওয়ার অসীম উৎসাহে বাপ-চাচার কাধে, মা-মাসীর কোলে, কাকা-পিসীর স্নেহতলে, দাদা-দিদার জামা ধরে, বড় ভাই-বোনের হাত ধরে গ্রামের মেঠে পথে ধরে অনুসরণ করে মূল দলটিকে। সে পথে চেনা-অচেনা সকল মুখগুলো খুব আপন হয়ে ওঠে গ্রামের নিশুতি রাতে। গীর্জার ধারে ঝাকড়া ধরা বড়ইগাছ থেকে কড়া বড়ই ছিড়ে পকেট ভরে দস্যীদল।

    বাড়ি থেকে বাড়ি শেষে গ্রাম থেকে গ্রামের পথে এগিয়ে চলা শুরু করে বিশাল আনন্দ মিছিলটি। গ্রামে থেকে গ্রামে খুশীর জোয়ারে প্লাবিত হয়। বিরতীহীনভাবে সবাই নেচে-গেয়ে ঘেমে-নেয়ে উঠতে থাকে। গ্রামে গ্রামে সবার মাঝে এই উৎসবের নির্মল আনন্দ ও পার্থনা এভাবে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়ে আনন্দ মাতোহারায় উজ্জ্বল সকলের মুখে যখন ক্লান্তির ছাপ দেখা যায় তখন সবাই আবার বাড়ির পথ ধরি। যে পথে এসেছিলে দলটি সে পথেই ফিরতে থাকে সবে। ক্লান্ত শরীর, ধরে এসেছে গলার সুর, পা চলে না কারো তবুও ক্লান্ত হয়নি মন তাই ছোট-বড় সকলে মিলে হাসি, ঠাট্টায় মেতে ওঠে, কমে আসে বাড়ির পথ। যেভাবে আস্তে আস্তে বড় হয়েছিল দলটি ঠিক সেভাবেই ছোট হয়ে আসে। কেউ কেউ বাড়ি না ফিরে মনের সুখে গুনগুনিয়ে এদিক সেদিক চলে যায়, আবার কেউ কেউ এগিয়ে চলে দলটির সাথে। দলটির সাথে সমাবেত হই ঠিক যেখান থেকে শুরু হয়েছিল এ আনন্দ শোভাযাত্রা সেই প্রভুধান কাকার বাড়ির উঠানে। নতুন করে আবার চা বসানো হয় চুলোয়।
    চেয়ার টেনে প্রবীনরা বসে, পিড়ে টেনে বসে মা-কাকীরা আর বাকিরা ঘরের দাওয়ায়, শুকনো লাকড়ি টেনে যে যেখানে খুশী বসে পথে ঘটে যাওয়া মজার, মজার অভিজ্ঞতা বলতে শুরু করে। চাঁদার টাকা গুনে ঝলমল করে ছোটবড় সকলের মুখ। এ টাকা জমারাখা হয় রাঙ্গাকাকির কাছে বড়দিনের পরে প্রথম পূর্নিমায় বনভোজনের উদ্দশ্যে। শেষবারের চড়ূইভাতির গল্প প্রাণ ফিরে পায় তখন আসরে।

    গল্প ফুরালে, ঘুমোতে যায় একে একে। নানান আলোকসজ্জ্বায় সাজানো উঠোনটিতে জোনাকের মত ঝিলমিলে আলোর সঙ্গী হয় গাড় নিস্তব্ধতা। ভোরের আলো ফোটার আগে আগে বাড়ি ফিরি আমরা। পরের সন্ধ্যায় আবার বেরিয়ে পড়ে দলটি এভাবেই চলতে থাকে বড়দিনের আগ প্রর্যন্ত।

    39
    23 Comments
Skip to toolbar