-
‘মাঝে মাঝে গল্পের শরীরে নিজেও ঢুকে যেতে ইচ্ছে করে! ওটি একটি নির্মোহ পরিতৃপ্তি। গল্পের অন্যান্য চরিত্রের সাথে মিলেমিশে একাকার হওয়ার…
যেমন– নিচের গল্পটি; যেখানে আমি নিজেকে আবিস্কার করেছিলাম অন্যরুপে!’নগর পতিতা আম্রপালী ও আমি অনুগত দাস
————————————————————–তার সাথে ছিলো আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়।ছিলো দাদা ও বন্ধু সুলভ সখ্যতা।যাকে বলতে পারি, —শ্রদ্ধাবোধ সঙ্গে ভালোবাসার সম্বন্ধ। আমরা অনেক মনোরম বিকেল বেলা, সন্ধ্যাবেলা কাটিয়ে ছিলাম।তখন সে ছাত্র ছিলো।আমি ছাত্রকালটা পার করে চাকুরীর বাজারে ভাগ্য বঞ্চিত হয়ে, সহজপথ হিশেবে টিউশনি করা শুরু করেছি।
এইভাবে শূণ্য পকেট ও হাত খরচ হয়েও নিজেকে টানতে পারতাম বন্ধু মহলে আনুষ্ঠানিক ভাবে, কিছুটা সামাজিকভাবে। বেশ কয়েকটা ঘরে ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে যখন ফিরতাম, তখন কোনো কোনো সময়ে তার সাথে আমার দেখা হতো। অবশ্যই সাপ্তাহিক বন্ধের দিনটাতে আমাদের দেখা হতোই, —-সেটা অঘোষিত নিয়ম হয়ে যায়! আমরা কোনো কোনো সময়ে জায়গা নির্বাচন করতাম, —আজকে কোথায় যাওয়া যায়?তার নাম বলাটা এখানে উহ্য থাক। প্রসঙ্গান্তরে তেমন জরুরীও নয়—-
আমাদের একটা পছন্দের জায়গা ছিলো। খোলা প্রকৃতির নির্মল সবুজ দৃশ্য ও দরিদ্র লোকবসতির সংমিশ্রণে ছিলো সেটা! রেলওয়ে জংশনের পাশে খোলামেলা অনেক বড়ো ওই এলাকা জুড়ে, নিম্ন আয় মানুষজনদের দখলদারিত্ব ছিলো। কিন্ত পরিচ্ছন্ন পরিবেশের এলাকাটাকে হঠাৎ করে কেউ দেখলে, তার কাছে ছবিময় মনে হবে! অল্প দূরে রয়েছে মাঝারী আকারের এক দীঘি। এই দীঘির পাড়েই আছে নারিকেল গাছদের সারি। শেষ বিকেলে এ দীঘির জলে পড়তো খোলা আকাশের মেঘের ছায়া। আর সারা প্রান্তর জুড়ে ছেঁয়ে আছে কচি সবুজ ঘাসের চাদর! কখনো দেখেছি গাভীর চঞ্চল বাছুরেরা খেলাচ্ছলে ছুটে বেড়াচ্ছে– দিকবিদিকশুন্য! একটু বড়ো বাচ্চাগুলি আবার ঘাস চিবিয়ে চলেছে এক মনে… উদাস দৃষ্টিতে দূর-দিগন্তের কিনারের ছোট ছোট গাছপালাদের কালোছায়া– আমি যে দেখেছিলাম কতো!
সেখানে আবছা সন্ধ্যার আঁধারে, নয়তো গড়ানো বিকেলে আমরা, একটা টঙ’ চায়ের দোকানে প্রায়ই যেতাম।মুখোমুখি বসতাম– কখনো বা পাশে, দুজনে।আজো আমি শিহরিত হই, ওই জায়গাটির জন্য!
—কী এক ভালোলাগাটুকু আমাদের মনকে ভরে তুলতো! আমাকে সে শব্দ খরচ করে তার ভেতরের ওই সময়ের পল্লবিত ভালোলাগাটুকু মুখে এনে বলেছেও! বুঝতাম সেও আমার মতো বুকের ভেতর সুন্দরী প্রকৃতিটার কাঁচা সবুজের রুপে ভরে উঠতো! —-আমার সঙ্গে থেকে থেকে—- তার কি এইটা হয়েছে সঙ্গ দোষে , না কি সঙ্গ গুণে?টঙ চায়ের দোকানটার পাশ হয়ে পিছনে পর্যন্ত ছিলো হাঁটু সমান জলের একটা জলাধার।শেষ বিকালবেলা অথবা সন্ধ্যার আঁধারে– আমরা দেখেছি কতো কালচে সবুজের সমাহার। অল্প দূরেতে দাঁড়িয়ে ছিলো নল খাগড়ার ঝোপ ঝাড়। পাশেই কিছুটা নানান গাছগাছালির জঙ্গল! অনেক মাথা সমান উঁচু নল খাগড়ার চিকন পাতাগুলির পাতলা সরু মাথাগুলি হাওয়াই উড়তো। দোল খেতো এপাশ হয়ে ওপাশে।হাঁটু সমান পানিতে ছড়ানো ছিটানো খুচরো পয়সার মতো শাপলা শালুকের পাতাদের একচ্ছত্র। কিনারে কিনারে ঢোল কলমীর ফুলের সাম্রাজ্য দেখতে ভালো লাগতো।কখনো বিকেলে আমরা সেখানে গেলে— চা খেতে খেতে আমি বহু দূর পর্যন্ত দৃষ্টি প্রসারিত করে দেখতাম– হঠাৎই আমার মনে হতো, এ’তো নিসর্গী শিল্পী ক্লদ্ মনে্র আঁকা— কোনো পদ্মপুকুরের পাশেই যেনো বসে আছি!
আমি বহুবারই দূর থেকে এই গানটি শুনেছি।এখানে কাছের কোনো বাসা বাড়ি থেকে ভেসে আসতো।গায়ক শ্যামল মিত্রের গান— ‘নাম রেখেছি বনলতা যখন দেখেছি, হয়তো বা সেই ক্ষণেই তোমায় —ভালবেসেছি। ….জল ভরা মেঘ ঐ দুচোখে দেখতে আমি পেয়েছি, —একলা মনে নির্জনেতে তোমার ছবি এঁকেছি…’
দেখতাম দূরের আকাশে সূর্য বিদায়ের রক্তিম লালিমা ডালিম ফুলের মতো রাঙা রঙে সাজতো…. সেই সাথে চোখের সামনে দেখা শিল্পী মনে্’র আঁকা– পদ্মপুকুর আর আমার–আমি, ও সে একজন। সেই সব স্বপ্নীল বিকেল বা সন্ধ্যা উপভোগ করেছি। তার কাঁচা মনেও সেসবি ভালো লাগতো। আমাকে বলতো সে কথা… আমিতো আবেগে– ওই মনোমুগ্ধকর অনবদ্য প্রকৃতির শোভা, আসন্ন সন্ধ্যার সময়বেলা আর চিরচেনা পদ্মপুকুর, সেই সাথে টঙ ঘরের চা’য়ের দোকান–
সব মিলেমিশে আমার ভেতরে— আমি ভরে উঠেছি!…..আমাদের দুজনের যোগাযোগ রক্ষা হতো প্রধানত দেখা সাক্ষাৎ হলেই! আমাদের এই সৌজন্য মুখোমুখির বাইরে, আমরা পরস্পরের জন্য অদেখার পীড়নবোধ করতাম না অবশ্য। এর প্রয়োজনও বিশেষ ছিলো না। মনের ভেতর ঢুকে যাওয়া হারানো আশৈশবের মতো— আমাদের মনের ভেতর কিছুটা কষ্টবোধ হওয়াটাইতো স্বাভাবিক ছিলো। অন্তত আমি টের পেয়েছিলাম। হয়তো সেও অনুভব করেছে। যে সময়কালের কথা বলছি, তখন সহজ যোগাযোগের জন্যে– সুলভ কোনো যন্ত্র হাতের মুঠোতে ছিলো না। তারবিহীন মোবাইল ফোন, আন্তর্জাল যোগাযোগ বা ফেসবুকের মতো নিমিষেই সহজতর কোনো প্রকার যোগাযোগ!
অতীতের সময়কে পিছনে ফেলে তারপরে আমরা, আমাদের কর্মজীবন বা জীবন সংগ্রামে— যে যার মতোন ছিটকে গিয়েছিলাম। দুইদিকে দু’জন!
—– গোটাদিনের কর্ম জীবন, ব্যস্ততা, ঝুট ঝামেলা ছাড়িয়ে আমার দিন শুরু হতো রাতের দিকে। মানে আমার ব্যাক্তিগত সময় শুরু হয়! কোনো কোনো সময়ে কিছুটা রাত গভীরে ইন্সোমোনিয়া— অনিদ্রার অসুখ চেপে ধরে আমাকে। তখন অন্তরের অস্থির ভাবটা কাটাতে, নিশুতি রাতের চাপকে শান্ত রাখতে ভালো লেখার কোনো বই অথবা আমার পছন্দের বইটা পড়ি। কবিতার বই হলে– প্রথম পছন্দ হিশেবে কবি সমর সেন পড়ি।অসাধারণ সব কবিতা তাঁর। নিরালা ও বিস্মৃতি কবিতা দুটি অবশ্যই পড়ি।পড়ি আর সেই সাথে চিত্রকল্পনা করি।ভাবনা আর স্বয়ংম্ভু চিন্তা করতে করতে, —-একটা সময়ে অবশ্য চোখে ঘুম নেমে আসে।….
—–ঠিক এগারো বছর পরে….
তার সাথে আমার পুনরায় দেখা হয়েছে আমারই এলাকায়।এই পেরোনো সময়ে আমার কতো পরিবর্তন হয়ে গেছে! তারও দেখছি নাকের নিচে ঢাউস এক গোছা গোঁফ। মিলিটারিদের চেহারার একটা ভাবসাব তার সারা মুখে,তার চোখ জোড়াতে!
স্থির তাকিয়ে মুখের হাসির মতো নরম স্বরে সে জানতে চাইলো–
—‘দাদা, এই যে- প্রজ্ঞাদা’–‘
আমি কয়েক মুহূর্ত নির্বাক থেকে তাকে দেখলাম। এদ্দদিন্ পরে তাকে দেখতে পেয়ে— মনের কোণে আমার ভালোলাগাটুকু লুকিয়ে না রেখে আমি বললাম,
—‘আরে, —তুমি যে! কদ্দিন বাদে তোমাকে দেখলাম্। –সব ভালোতো?’…দাঁড়িয়ে থেকে সে চারিদিক পরখ করে দেখতে লাগলো। হয়তো চোখের সামনে দেখা— নতুনের সাথে পুরোনোকে মেলাতে থাকে। মুখ ঘুরিয়ে আমাকে দেখে বলে উঠলো-
—‘আপনাকে দেখতে এসেছি। একে তাকে জিজ্ঞেস করে করে শেষে আপনার সন্ধান পেলাম। এখানে বহুকিছুই পাল্টে গেছে দেখছি! চারপাশের উন্নতি হয়েছে— কি বলেন?’
আমি বললাম,—‘বাইরের পরিবর্তন সহজে চোখে পড়ে যায়।কিন্ত মনের পরিবর্তন সহজে চোখে পড়বে না।মনের পরিবর্তনটাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে কাম্য।’ পরক্ষণেই বলি– ‘এসো আমার সাথে।’বাইরে তখন বিকেল বেলা গড়াচ্ছে।আমিও ঘর থেকে বেরুবো ভাবছি।একটা অল্প দরকারী কাজও ছিলো। ব্যাক্তিগত ব্যবসার কাজে প্রায়ই আমাকে বের হতে হয়।কিন্ত আজ তাকে দীর্ঘকাল পরে এতো কাছে পেয়ে, তার সঙ্গ পেতে ও নিজের সঙ্গ তাকে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিলো।
আমি ও সে– ঘরে ঢুকলাম।আমার স্ত্রীর সাথে পরিচয় করে দিয়েছি।ছোট ছোট পা বাড়িয়ে এখন হাঁটতে শিখেছে।আমার শিশুপুত্রটা কাছাকাছি এসেই বা-বা, বা-বা করে ডাকতে লাগলো। তাকে বললাম, —এই হলো আমার জগত সংসার… অল্প দূরেতে দাঁড়ানো আমার স্ত্রী রাঙা মুখে আমাদের দেখে বললো– ‘আপনারা বসুন, আমি একটু চা’ করে আনি।’[একটা বিষয়ে আমার কিন্ত চোখের দৃষ্টি এড়িয়ে গেলো না। সে পরণের পোশাকে ক্রেতাদুরস্ত বেশ ফিটফাট হয়ে আছে। কিছু বছর আগে আমি– তার মধ্যে এমনটা দেখতাম না। যেটা এখন দেখছি। আবার বেশ চোখে পড়বারই মতো– সে নাক সিঁটকানো ব্যাপার করছিলো। আমার স্ত্রী তাকে বসতে বলাতে সে’তো বসলোই না বরঞ্চ কেমন একটা বিব্রত হচ্ছে! তার মুখটা দেখে যে, কেউ এটি বলে দিতে পারে।এমনভাবে সে– আমার পিছনে দাঁড়ালো যেনো কোনো কিছুর সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি না হয়ে যায় এবং আমার ঘরদোর যে তার ভালো লাগছে এমনও নয়। মনে হলো, তবু সে নিজের মনের বিব্রত বোধকে চেপে ধরে মুখে হাসির প্রলেপ মেখে– হাত দুটোকে বুক সমান উঁচুতে তুললো।নমস্কারের মতো ভঙ্গিমা করে আমার স্ত্রীর দিকে দেখালো! যদিও আমার স্ত্রী তাকে হাসিমুখে বেশ আন্তরিকতার সহিত প্রতি উত্তর দিয়েছিলো। —-সে তার মুখে শুধুই সাইনবোর্ডের মতোন হারানো হাসিটুকু ধরে রেখে শুকনো দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো! আমার মনে হয়েছে, অযথা হাসি মাখানো মুখে আন্তরিকতা দেখাতে গিয়ে কেউ যদি আন্তরিকতার ভানের অভিনয় করে-তবে এই অভিনয়টা ধরে ফেলতে খুব বেশি বুদ্ধি জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না]
—আমিই স্ত্রীকে থামিয়ে দিয়ে বলি,– ‘নাহ, আমরা বসছি না। বরং এক্ষুনি বের হয়ে যাচ্ছি।’
ঠিক তখনই তার মোবাইলে রিং টোন বেজে উঠে। সে ফোনটা কানে লাগিয়ে আমাকে অনুসরণ করতে থাকে।আমি শুধু শুনতে পেলাম এটুকু– ফোনে বলছিলো, জ্বী, –জ্বী –স্যার….
আরো দেখছি– সে এমনভাবে হাঁটছে যে– বিরক্তি আর শাস্তিকে একযোগ করলে যা হবে! ফোন কলটা কেটে দিয়ে— সে এবারে দুঃখিত মুখে আমাকে দেখে বলে, –‘এভাবে আমার আপনার ঘরে যাওয়া ঠিক হয়নি।আমি একদমই শূণ্য হাতে ঘরে গেছি।’
আমি বলি–‘কিচ্ছু ভূল হলো না।আমার যে দেখা পাবে তুমি ওই বিষয়ে নিশ্চিত ছিলে না।তাছাড়া আমি যে ঘরে নিয়ে যাবো –সেটাও তুমি আগে থেকে জানতে না।’
সে বললো– ‘তবুও’—
আমি তার কাঁধে স্বস্নেহে হাতটা রেখে বলি–‘চলো, —এসো— যাই’….
বললো–‘আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?’…
আমি বলি–‘বহুদিন আগে এই আমরা যে জায়গাটাই যেতে চাইতাম– তোমার কি মনে আছে, — কোন্ জায়গা?’
সে বলে–‘হ্যাঁ– অবশ্যই মনে আছে।কিন্ত আমি কি এখন আপনার কোনো সময় নষ্ট করে দিচ্ছি নাতো?’…
তার দিকে না তাকিয়ে আমি বললাম–
–‘সময়কে নষ্ট করবার মতো বিলাসিতা আমার হাতে থাকে না। জীবনে সংগ্রাম ও পরিশ্রমকে, আমি একমাত্র পাথেয় করেছি।নিজের মনের সততা, সমাজ ও সংসারে একটু ভালো করে বাঁচবার আশাতে– এটি আমাকে করতেই হয়।’—-দুজনে পথ চলতে চলতে— সামনে একটা রিক্সা পেয়ে গেলাম। জায়গাটির নাম বলা মাত্রই– রিক্সা চালক বলে– ‘উঠেন।’ আমরা রিক্সাতে চললাম—-
আমি দেখতে পাচ্ছি– আবারো তার পকেটের মোবাইল ফোনটা বাজছে!…এগারো বছর আগেকার সেই টঙ চায়ের দোকানটি আর নেই।এখন নতুন অনেক দোকান হয়েছে। কিছুটা যুগের চলতি হাওয়াতে টিপটাপ্ ধরণের। আমরা একটাতে গিয়ে বসেছি। সেইদিনের অল্প দূরের প্রকৃতির সবুজাভ ছবি, আমার দেখা সেই স্বপ্নময়ী পদ্মপুকুরের শ্রী আজ অনেকটা ম্লান হয়ে এসেছে। পরিবর্তনে সব সময় ভারসাম্য রক্ষা হয় না।দিগন্তের সবুজে ছাওয়া প্রকৃতিকে পদদলিত করে মানুষ যে পরিবর্তন আনে নিজের সাছ্বন্দ্যের জন্যে, —ওইটা প্রকৃতিকে এক প্রকার ধ্বংস করেই!
—- এখন আমরা দুজনে— চোখের সামনে যা দেখে চলেছি….
দোকানের ছেলেকে আমি চায়ের সঙ্গে কিছু দিতে বললাম।তারপরও আমি সৌজন্য করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম। চা-বিস্কুট, ঝাল কিছু খাবে কি-না?’
সে বলে গরম গরম সেই তেলেভাজা পুরি-কচোরী কি এখন আর পাওয়া যায় না?’
বললাম– ‘হ্যাঁ আছে। তবে আগের আকারেতে নেই।এখন সাইজে ছোট হয়ে গেছে!’
————————আমরা মুখোমুখি বসেছি।কিন্ত তার বসবার চেয়ারটি যথেষ্ট পরিছন্ন থাকার পরেও, সে পকেট থেকে টিস্যু পেপার বের করে– আস্ত করে ঘষে মুছে নিলো। এরপর বসে এমন করছিলো যে, এখানে বসে তার স্বস্তি হচ্ছে না। আমার চোখাচোখি হওয়াতে বসলো তবু। …সেই সঙ্গে ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি লেগেছিলো—
(খেয়াল করলাম যে– হয়তোবা পূর্ব আবেগ, প্রবল শুচিবাই ও নাক সিঁটকানো, এই তিন ব্যাপার– সম্ভবতো চেপে রাখা যায় না! )…..চা’য়ের পর্বটা সেরে বাইরে চলে এসেছি।
আমরা শেষ বিকেলে দুজন পাশাপাশি হাঁটছিলাম।আমি দেখছি তাকে ও চারদিকটা। দূরে বড়ো আকারের একটি লম্বা টাওয়ারের মাথায় হেলোজেন লাইটের উপর একটা কাক বসেছিলো।তাকে ঘিরে আরও তিন চারটি কাক নানা দিকে বসেছে। এদের কি কোনো শোকসভা বসেছে, নাকি এরা নিজেদের জীবন সংগ্রামের গল্প করছে?… আরো কিছুটা দূরে– অনেক লম্বা একটা মালবাহী রেল লাইনের উপর দাঁড়িয়ে ছিলো এ্যানাকোন্ডা সাপের মতো। মাঝে মাঝে ওটা কাঁপুনি দিয়ে দুলে দুলে উঠছে!
আমার এক হাত দূরেই সে। দুই হাত নিজের প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে তন্ময় হয়ে দেখছে চারপাশটা। প্রত্যক্ষ অনেক কিছু পরিবর্তনের নামে যা হয়েছে, সেই সব মিলিয়ে নিতে চাচ্ছে হয়তো।তারপর সেখান থেকে চোখ ফিরিয়ে জানতে চাই—
—‘আপনিতো একজন ভালো বই পড়ুয়া ছিলেন। আপনার এই দিকটি আমি বেশিই পছন্দ করতাম। আপনি পড়ুয়া যেমন তেমনি এক প্রেমিকও ছিলেন।’
একটুক্ষণ থেমে।সে যেনো থিতু হয়ে নিয়ে বলে–
—‘আমি যদি নামটা ঠিক ভূল না বলি– তাহলে পূর্বা’দি তার কি খবর? শেষ পর্যন্ত দিদিটা কি অাপনার ঘরের ঘরণী হলো না? এইতো আপনার ঘরে যে বউদিকে দেখে এলাম, —-ইনি নিশ্চয় পূর্বাদি নয়?’
আমি বলি–‘নাহ্– ও পূর্বা ছিলো না।দেখো তখনতো আমি একটা বেকার প্রেমিক ছিলাম।প্রেমিক হিশেবে বেকার ছেলেগুলো ভালো হয়। কিন্ত ঘরোয়া নুন তেলের হিসেবে গড়া একজন স্বামী হিশেবে ঠিকঠাক মনে করে না– আমাদের এই সমাজ অবশ্য !
তবে এখন আমার মনে হয় যে, ——‘যাকে ভালোবেসেছি খোলা প্রকৃতির মতো, তাকে ঘরে নিয়ে এলে– শুধু মানুষটা ঘরে আসবে। বাইরের খোলা উদার প্রকৃতিময় তার ভালোবাসাটা কিন্ত আসতো না! আর যাকে (বিয়ে করে) ঘরে নিয়ে এসেছি– আগে চিনতাম না, জানতামও না– সে শুধু ভালোবাসাটা নিয়ে আসে, হয়তো মানুষটা আসেনি– আশ্চর্য লাগে– হা’হা’হা !’
—আমি নিঃশব্দে হেসে উঠি।
সে বললো–‘আপনার এই আশ্চর্যকর চিন্তা-ভাবনা আমাকে কিভাবে যে তখন মুগ্ধ করতো, —এখন ভেবে অবাক হতে হয়!—
—–তার এই কথা শুনে আমি পুনরায় হাসলাম।
—‘আই ক্যান নট টীচ্ এ্যানিবডি এ্যানিথিং, আই ক্যান অনলি মেইক দ্যাম্ থিং।’ (আমি কাউকে কিছু শেখাতে পারি না। আমি কেবল তাদের ভাবাতে পারি।)—এটি মহান দার্শনিক সক্রেটিসের বয়ান,— বললাম আমি।সে এবারে জানতে চাই– ‘চোখ নিয়েও আপনি তখন সুন্দর একটা কথা বলতেন–
—‘হ্যাঁ, সুন্দরতম চোখ। বলা হয়ে থাকে —-প্রাচীনকালে দুনিয়ার সব চেয়ে সুন্দর চোখের অধিকারী ছিলো– গৌতমপুত্র কুনালের!
—‘সত্যি কথা না কি?’ —-সে প্রশ্ন করে।
আমি বললাম—‘হতে পারে। এটি একটি ঐতিহাসিক সত্যি! ইতিহাসের বুকেই এর সৌন্দর্য!….…তার ফোনটা আবার বাজছে… কড়া রিং টোনটা শোনা যাচ্ছে!…
একটু সড়ে গিয়ে সে কানে ফোন লাগিয়ে কি সব যেনো বলছিলো। আমি শুধু শুনেছি শেষে এই—- জ্বী– জ্বী স্যার, ঠিক আছে।
…সে আবার পকেটে হাত ঢুকিয়ে বুক কিঞ্চিৎ স্ফীত করে আমার পাশে হাঁটছিলো।বললো— ‘দাদা, আমিই তাকে থামিয়ে দিয়ে বলি চলো এবারে কোথাও একটু বসা যাক…
–‘আচ্ছা– নীতি-নৈতিকতা, কি অনেক বড়ো ব্যাপার নয়?’ —-সে জানতে চেয়েছে।
–‘এটা এক কথায় নীতিবোধ। এটি আমাদের মনের শুদ্ধতা। এই শুদ্ধতা প্রত্যেকের ব্যাক্তিগত ব্যাপার। সত্যিকারের ভালো মানুষ এই শুদ্ধতা হারিয়ে ফেলেন না।’ —‘নৈতিকতা— নিয়ে প্রাচীনকালের এক মজার কাহিনী মনে পড়ছে। —বলি,—
সন্মতি হিশেবে সে, মৃদু করে মাথাটা নাড়লো শুধু! —
–‘আমরা আস্রপালী নামের যে আমটি এখন খায়। এই নামটি এক সময়ে একজন নগর পতিতার নাম ছিলো। এই নারী নাগরিক সমাজে যেমন সম্মানিতা ছিলেন তেমনি ছিলেন অপরুপা।তাকে যে কেউ শর্ত সাপেক্ষে কামনা করতে পারতো।এখন কার সময়ে এটা ভাবা যাবে? ভীষণ রুপসী ছিলেন বলে রাজ্যের ক্ষমতাধর অনেকেই তাকে বিয়ে করে নিজের করে পেতে চাইলো! এই জন্য রাজ্য ঘোষণা করে– তাকে কেউ একার করে পাবে না। এই নারী হবে সবার… সে হবে নগর বধূ মানে পতিতা। তার পছন্দ ও অবশ্যই শর্ত মেনে যে কেউ তার গৃহে যেতে পারবে। —রাজ্যের নীতি আর ওই নারীর নীতিবোধ তোমার কাছে কেমন লাগছে?’
— আমি প্রশ্নটা করলাম তার কাছে।দেখি সে চুপচাপ। দূরের দিকে তাকিয়ে ছিলো। আমি অপেক্ষা করছিলাম সে তার নিজের বর্তমানের (জীবন) গল্প— নিজ থেকে কখন বলবে…
—-‘প্রজ্ঞাদা, আমি এখানে বড়ো একটি নামী প্রতিষ্ঠানের– শাখা ব্যবস্হাপক হয়ে, গত দু’দিন আগে—- ঢাকা থেকে বদলি হয়ে এলাম।’
আমি বলি– ‘বেশ দায়িত্বপূর্ণ পদের চাকরি।’ আমার কথাতে তার মুখে যেনো এক ঝিলিক’চ্ছটা খেলে গেলো!—
সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে– সে জিজ্ঞেস করলো—
—‘এবারে বলুন– প্রজ্ঞাদা, আপনি আসলে কেমন আছেন?’
[ আমি এতোক্ষণে বুঝলাম। সে আমাকে কী বোঝাতে চাইছে? চোখে আঙ্গুল দিয়ে সে আমাকে জানাতে চাই, তার বর্তমানের সামাজিক অবস্থান ও পদের ক্ষমতাবলী… তাহলে তার আমার সাথে দেখা করার প্রকৃত লক্ষ্য– অবস্থানের পরিমাপ করা! —এগারো বছর আগে– দুই জন যখন নিজেদের দুই রকম জীবনের গতি স্রোতে আলাদা হয়ে গিয়েছি।তখন সে ছিলো ছাত্রাবস্হায়। আমি ছিলাম শিক্ষিত বেকার। তারপর— আজ এগারোটা বছর পরে, সে দেখতে আর পরিমাপ করতে এসেছে, —–আমাদের দু’জনের প্রথাগত সফলতা কি?…]আমি অনেক দূর পর্যন্ত তাকিয়ে ছিলাম। সেখান থেকে চোখ ফিরিয়ে তাকে দেখি– তার কাছে জানতে চাইলাম– ‘তুমি যাকে স্যার বলছো। কে উনি?’ সে বললো– ‘আমার উপরের– উর্দ্ধতন।’
–‘তুমি কি জানো, স্যার কথাটার প্রকৃত অর্থ কি বোঝায়?’
–‘উর্দ্ধতনকে— অধীনস্থরা স্যারইতো বলবে–
–‘হ্যাঁ বলে।এটা বলাতে বাধ্য করে। এটা বলা লিখিতভাবে বাধ্যতামূলক নয় কিন্ত।সার্ভিস রেগুলেশনেও বলা নেই। একজন সরকারী কর্মকর্তাকে একজন সরকারী কর্মচারী স্যার বলতে বাধ্য নন। স্যার, মানে স্লেভ আই রিমেইন্ হলো, আমি অনুগত দাস। ব্রিটিশরা চালাকি করে ভারতীয় প্রজাদের পদানত বা চেপে রাখার জন্য এই ‘স্যার’ শব্দ সংক্ষেপ দাপ্তরিকভাবে ব্যবহারের প্রথা চালু করেছিলো। কিন্ত তারা তাদের শাদা বর্ণের উর্ধতনকে, কর্তৃপক্ষকে বলতো— ইওর এক্সেলেন্সী! সুতরাং সরকারী, অসরকারী কোনো উর্ধতনকে স্যার না ডেকে– মিঃ অমুক বলা যায়।কারণ– কেউ কারো অনুগত দাস নয়।গণতন্ত্র ব্যবস্হা এটিকে সমর্থন করতে পারে না।’
—আমি একটু থেমে এবারে বলি– ‘প্রতিদিন তুমি কয়বার এই স্যার, মানে স্লেভ আই রিমেইন্— কথাটি উচ্চারণ করো– পঞ্চাশবার হয়তো এরও বেশি হবে?সে এবারে নিশ্চুপ।মাথাটা খানিকটা ঝুঁকে আছে সামনের খোলা আকাশের দিকে। আমি তাকে বলি– ‘মোবাইল ফোনে আমাকে সারাদিনে হয়তো একবারও স্যার শব্দটি বলতে হয় না। প্রয়োজন পড়ে না।’
সে অস্ফুট স্বরে বললো– ‘সরি’ দাদা… কিন্ত আপনার গুণমুগ্ধ– মন– থেকে…
আমার হাতটা তার কাঁধে আবারো স্ব’স্নেহের ছোঁয়াই রেখে পরিশেষে হেসে বললাম— ‘আজো আমি একজন তোমার সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী আছি।আর এই যে আমি, —-আছি আমি আমার মতোন, —-খারাপতো নেই। এখানে, এই পৃথিবীতে জন্মে আমি সুখী বোধ করেছি নিবিড়ভাবে– আহা!
—“ঘাসের ভিতর ঘাস হ’য়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে।”
সে জানতে চাইলো—‘ এটি কার লেখা?’
তাকে বললাম।—-‘কবিতার রাজপুত্র কবি জীবনানন্দ দাশের।’
সে হাসতে থাকে। অবশেষে, তার আন্তরিকতাও ভনিতাহীন হতে থাকে!…আমি উঠে দাঁড়ালাম। সাথে অবশ্য সেও উঠে –দাঁড়ালো—
—‘আচ্ছা অনেক কথা হলো আজকে। যাই, —-চলি আমি…
বলেই সামনে নিজের পা বাড়ালাম।…
—- সে দাঁড়িয়ে ছিলো—
….আমি পিছনে তার দিকে আর না তাকিয়ে চলে এসেছি এইখানে, চির সময়ের গভীরে যেখানে অপেক্ষারত আমার ঘর বাড়ি।
—-এই জীবনের শেষ সময় অবধি, যেখানে আমি বসবাস করবো!….
————————
[ গল্প ]
আগষ্ট, ২০২১ ইং6 Comments-
প্রিয় লেখক, আবদার পূরণের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
আপনার জ্ঞানগর্ভের গভীর দর্শনের সাথে ভাল লাগার মত চমৎকার কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন।
একটা বিষয় চোখে পড়ল বিষয়টা নিয়ে আমার ব্যাক্তিগত ভাবনা এইরকম যে, কি করছি? কার থেকে কতটুকু ভাল করছি? এই তুলনামূলক প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে দিতে একসময় আমরাও এ প্রশ্ন করতে শুরু করি। হয়ত আগে কথার প্রসঙ্গে বলে ফেললেও বয়েসের একটা প্রান্তে আমরা সবাই প্রচলিত সামাজিক প্রতিযোগিতায় নামি। তখন জীবনের তাগিদে সুযোগ সন্ধানী হয়ে বদলে ফেলি নিজেদের প্রয়োজন মত। প্রথাগত সামাজিক প্রতিপত্তির মাপকাঠিতে নিজেকে তুলে ধরে প্রমাণ করি কতটুকু সামাজিক হতে পেরেছি। জীবন হয়ত অনেকটা সহজ হয় সেসময় কিন্তু চাহিদার তো শেষ নেই। তাই চাহিদা যখন আত্নতৃপ্তিতে ঠেকে তখন অর্থে কেনা সুখ আর সুখ মনে হয়না। যেমন নীতিবোধ হারিয়ে তথাকথিত আত্নমর্যাদা হয়। -
প্রিয় সজীব সুন্দর বলেছো। শুভেচ্ছা তোমাকে।
তবু চারপাশের পঙ্কিলতা থেকে কিভাবে নিজেকে সরিয়ে রাখতে হয়– সেই ভাবনাটা আমাকে ভাবায়। কে যেনো বলেছেন, দশের মধ্যে নিজেকে যে একা রাখতে পারে সে-ই স্পেশাল।কথাটি বলেছেন- বিশেষ মনের মানুষ তৈরি হওয়ার জন্য। বইপড়াকে আমি অনেক উপরে স্হান দিই।ব্যাক্তির মনোজগতের পরিধি বাড়িয়ে তোলে বইপাঠের অভ্যাস।
মানুষ দরিদ্র হয়– সম্পদের বন্টনের কারণে, সেই সঙ্গে বিশেষ পরিস্থিতি ও সুযোগ এবং সুবিধা গ্রহনের মধ্য দিয়ে।দারিদ্রতা কোনো জীবনবিধির লিখন নয়! অন্তত অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে। অর্থনীতি কিন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে দেহোপজীবিনীর অবদানকেও স্বীকার করে।
—এখনকার আধুনিক আত্মমুখী শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশই কাগজের সাটিফিকেট অর্জনকে একমাত্র লক্ষ্য করে! এর বাইরে তারা আর কিছু ভাবতে চাই না। ভাবার আবেগবোধ তারা মন থেকে অনুভব করে না। চোখ তুলে তারা প্রকৃতির সীমাহীন সবুজ, মায়াময়তা আর সুন্দরের দিকে দেখে না।এতে করে তাদের অন্তরে চমৎকার মনোজগত তৈরি হয় না।
—-তাই অর্থনীতির বাজারে অর্থ আয়ের জন্য সিস্টেমিটিক বোরট তৈরি হওয়াটা খুব যে সুখের তা হয়তো নয়…
এই জীবন বিমুখী ধারাবাহিকতা, জীবন সমাজে সৃষ্টিশীলতার পতন ঘটায়! তৈরি করে অন্ধতার বড়ো বড়ো গর্ত।
—- সত্যি এসব আমাকে পীড়ন করে।গল্পচ্ছলে এই অবস্থাটিকে আমি ধরার চেষ্টা করেছি।অন্তত গল্পে যতোটুকু বলা যায়।

অনুপ দে।
লেখালেখি: / লেখার ধরণ- প্রগতিশীলতা; আধুনিকতা।
- লেখক জীবন আমাকে খুব টানে!
- লেখালেখির মনটা, ব্যাক্তি জীবনে সবাই খুঁজে পাই না!
- আমি গল্পের মানুষ, গল্প লিখে সুখ পাই।গল্পে নিজেকে তুলে ধরা যায়।
- একটা গল্পে অনেকগুলো চরিত্র থাকে, --কথক কিন্ত একজন! সব চরিত্রই গল্প-কারের ভেতর থেকে উৎসারিত! মজা হচ্ছে,- গল্পকার সব চরিত্রকে ছুঁয়ে দেখেন, চিনেন!
Email : [email protected]
Friends
Zahidul Jamy
@zahidul
আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল
@uzzal6821
Payel Akhter Jyoti Nur
@payel
রাহেনা বেগম
@rahena-begum
MD.RAKIB HASAN ONTO
@rhonto27
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Ashaduzzaman-Khokon
@ashaduzzaman-khokon
এড: সাজেদুল হক টুটুল
@sazedul
AdabenTatali
@adabentatali


গল্প তোমাকে গহিনে নিয়ে যেতে পারে। অভিনন্দন।