Profile Photo

Anup DeyOffline

  • Anup-Dey
  • Profile picture of Anup Dey

    Anup Dey

    • 4 years, 9 months ago

    রুপান্তরিত জীবন
    ;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;

    কমল, এইবারে দেখে বেশ অবাক হলো। প্রথম দেখেতো ভেবে নিয়েছিলো এটা অন্য কেউ একজন হবে। —তার চেনা রুক্মিণী, ছোট্ট নামে–রুনুদি, নিশ্চয় নয়।
    ….এই দিদিকে কমল যদিও বেশ কিছুদিন ধরে দেখতে পাচ্ছিলো না।

    ভালোমতো তাকিয়ে দেখে কমল অবশেষে বুঝতে পারলো আসলে অন্য কেউ নয়, ওই নারী তার অতিচেনা রুনুদিই ছিলো! হঠাৎ দিদির পরণে ঝলমলে রঙের নতুন শাড়ির ঝিলিক।সুন্দর পরিপাটি করে সিঁথি কেটে চুল আঁচড়ানো, সিঁথিতে উজ্জ্বল লাল রঙের সিন্দুর, কপালেও সিন্দুর।বোঝাই যাচ্ছে– বেশ যত্নে নববধূর বেশে সেজেছে!
    —– কী আশ্চর্য! আবার বিয়ে করলো দিদি? –এটিতো তার দ্বিতীয়বারের বিয়ে…
    কমল নিশ্চিত করে জানতো। এই দিদি অকাল বিধবা ছিলো। এক বছরের কিছু আগে দিদির স্বামী বলা কওয়া নেই একদম হঠাৎ করে স্নানের ঘরে স্নান করতে ঢুকে দীর্ঘ সময় পরেও যখন আর বেরুলো না, তখন তাকে একপ্রকার দরজা ভেঙ্গে বের করতে হয়েছিলো।অবশ্য দ্রুত ধরাধরি করে কাছের এক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।শেষে হাসপাতাল থেকে জানানো হয়েছিলো খবরটা অবশ্য, —-আসলে লোকটা বেশ কিছুক্ষণ আগেই স্ট্রোক করে মারা গিয়েছেন।
    এইভাবে কমলের বেশ পরিচিত রুক্মিণীদির কপালের লাল সিঁদুর মুছে গেছে!…

    তার বহুদিনের চেনাজানা রুক্মিণী, —এই রুনুদি, তার দোকানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কমল ডিপার্টমেন্টালের একজন নিয়মিত ক্রেতা ছিলো।—-
    —– সাদাসিধে রুনুদি যখন তার দোকানে নিত্য প্রয়োজনের জিনিসপত্রের জন্য আসতো– দিদির কর্মক্লান্ত মুখ, সেই মুখে সারাদিনের শ্রমের সমাপ্তির মলিন ছাপ থাকতো।পরণে অল্পদামী হালকা রঙিন শাড়ি। মুখে কিন্ত মায়া ছড়ানো সুখের হাসি! কমল জানতো, দিদির সংসার জীবন যে খুব সুখের ছিলো তা কিন্ত নয়।সংগ্রামের জীবন, কষ্টের জীবন যাপনটা যেমন হয়ে থাকে। রুনুদি একটা বস্ত্রকলে চাকুরী করতো।ওর স্বামীও কোনো আধা-সরকারী একটি প্রতিষ্ঠানে চুক্তি ভিত্তিক ছোটপদে চাকুরী করতেন। মানুষটার মাসিক বেতন অনিয়মিত হওয়াতে রুনুদিকে বাধ্য হয়ে নিজের এই চাকুরী করতে হয়।
    তবু দিদিটা, কমলের দোকানে এলে কিছু কথাবার্তা হতো।দোকানে বকেয়া পড়তো বলে দিদি লজ্জিত যেমন হতো, তেমনি কমলের সঙ্গে এটা ওটা ঘরের গল্পও তাকে বলতো—
    –‘ওদের ঘরেতে অভাব আছে ঠিকই কিন্ত তারা দুজনে অসুখী নন।রাঙামুখ করে নীচু গলায় বলতো– ওর স্বামী তাকে বেশ ভালোবাসেন।’
    কমল সংকোচ করে জানতে চাইতো।
    –‘আর দাদাকে অাপনি ভালোবাসেন না? —-মুখটা নামিয়ে নীচু করে বলতো—
    –‘হ্যাঁ, আমিও তোমার দাদাকে ভালোবাসি।উনি লোকটা খারাপ নয়।’
    (কমল হাসিমুখে এসব কথাগুলি শুনতো। সে বহুজনের কষ্টক্লিষ্ট জীবনের সংগ্রাম, তাদের মধ্যকার নীরব প্রেম ও ছায়াঘন বিরহব্যাথা আবার কিছুটা সুখের মুখের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্যে দিনান্ত পরিশ্রম; —এই সব তার চোখের সামনে ঘটতে থাকে।এখন সে অন্তরের চোখে ওসব দেখতে পায়!)
    —কমল এখন শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে। তার অনেকদিনের চেনা জানা রুক্মিণীদি আবার বিয়ে করেছে…
    আর মনে মনে কমল বলতে থাকে, আহারে মানুষের জীবন! এমন জীবন অসম্ভব বৈচিত্র্যে নয়তোবা মনের রহস্যে টাঁসা থাকে! তবু কমল মনে মনে খুশি হলো—
    ….রুক্মিণীদি নিজের অবদমিত অকাল বৈধব্যের কাল থেকে মুক্তি পেয়েছে— তার বর্তমানের রুপান্তরিত জীবনে;

    কিন্ত কমলকে খারাপী মন-মানসিকতার মানুষজনের মুখের সুন্দর সুন্দর ফুলঝুরি তত্ত্বকথাও শুনতে হয়। অনেকে ভেতরে থাকে সাক্ষাৎ প্রতারক। কিন্ত বাইরে সাধু-সন্তের স্বভাব দেখিয়ে ভনিতা করে চলে।এমন লোকদের সমাজের সব স্তরেই দেখা মিলবে! কমল নিজের ছোট দোকানদারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, কতো চরিত্রের ক্রেতা মানুষ দেখতে পাই। তাদের সাথে ব্যবসার লেনদেনেরই সুবাদে মিশে!—
    এমনো হয়েছে একদিন।
    কমলের ব্যবসা শুরুর প্রথম দিকে– খুবই অল্প মুখচেনা পরিচয়ের একজন সুশ্রী মেয়ে গ্রাহক, হুট্ করে কমলের হাতটা টেনে নিয়ে বললো, —‘কমলবাবু, আমাকে পাঁচশত টাকা ধার দিবেন। আমার আর্জেন্ট দরকার ছিলো।’ কমল বেশ দ্বন্ধে পড়ে গিয়েছিলো। সেই সময়ে তার ব্যবসার জন্যে পাঁচশত টাকার ক্ষতি হয়ে যাওয়া মানে অনেকটুকু। কমল ইতঃস্তত করতে থাকে। এটা তার কাছে সবে শুরু করা– অল্প পুঁজির ব্যবসার জন্য ঝুঁকি মনে হতে থাকে।
    মেয়েটা যেনো কমলের মনের খবর ধরতে পারার মতোন আচমকাই বলে উঠে, –‘ভাবছেন, শুধু শুধু কেনো টাকাটা আমাকে দিবেন? জানবেন তাহলে আমাকেই আপনি পাবেন।’….
    অপরাধবোধ মনে চেপে রেখে কমল শেষে নিজের সবে শুরুর ব্যবসাটাকে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষ নিলো। তার মনে পড়ে যায়। সে যখন কলেজ ছাত্র ছিলো। কলেজের স্যার পড়িয়েছেন– ‘গরীবের বেশি রকম মানবিকতা দেখানো তাদের দারিদ্রতাকে আরো বাড়িয়ে তোলে!’

    কমলের পুরো নাম কমলেশ গুহ। এই নন্দীপাড়া এলাকার চারপাশে মুখ পরিচিত একজন শিক্ষিত যুবক ব্যবসায়ী। মোটামুটি সে সজ্জ্বন মনের। মনেপ্রাণে শুধুই ব্যবসায়ী স্বার্থ, —-এইকরম স্বভাবের কৌশলী নিষ্প্রাণ ধুরন্ধর একজন ব্যবসায়ী মাত্র, এমনটা কমলেশ আজো হতে পারেনি!
    যদিও জীবনে সে একজন ব্যবসায়ী হবে– এমনটা ভাবেনি। কমল এখন ভালোই বোঝে– নিম্ন বা মধ্যবিত্ত নামক স্তরের মানুষ জনের নিয়তি হচ্ছে তারা জীবনে যা হতে চাইবে, সেটা না হয়ে অন্যকিছু হবে। আসলে কিন্ত আদৌ যেটা হতেই চায়নি!

    কমলের বাবা মোটামুটি বেতনের একজন চাকুরীজীবি ছিলেন। কমল মন লাগিয়ে নিজের বি’কম– পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
    —সেই সময়ে কমলেশের জীবনে একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটলো। গাড়ির এক দুর্ঘটনাতে তার বাবার ডাঁনপাটা কেটে ফেলতে হয়েছিলো। তিনি আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। এজন্য তার চাকুরীটি হারাতে হয়। সেই সঙ্গে কমলদের পরিবারে দ্রুতই নেমে আসে অভাব নামের অন্ধকার! এই পরিস্থিতিতে কমলের মা আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন সংসারের চাহিদার যোগান দিতে। বিয়ের আগে নিজের বাবার বাড়িতেই দেখা ও শেখা সুচীকর্ম ও নতুন কেনা সেলাই মেশিন দিয়ে মহিলা চেয়ে চিন্তে কাজ করে রোজগারপাতি যেটুকু করে থাকেন— তাতে অবশ্য টেনেটুনেও তাদের সংসারটা চলছিলো না….
    —-পরিশেষে নিরুপায়, সেই সাথে অসহায় কমলের পঙ্গু বাবা নিজে উদ্দ্যেগী হয়ে– নন্দীপাড়ার বড়ো গলির মুখে ছোট্ট একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে, দোকানদারি আরম্ভ করেছিলেন। পরবর্তীতে কমল তার কলেজের বি’এ পরীক্ষাটি ইস্তফা দিয়ে সেই দোকানদারির হাল নিজের হাতে তুলে নিয়ে আজকের বড়ো আকারের দুটো’ স্টোরেজ সহ– ‘কমল ডিপার্টমেন্টাল’টা গড়ে তুলেছে।
    —– কিন্ত জীবন সংগ্রামের ঝড়ো ঘূর্ণি হাওয়াতে ভেসে ভেসে অনিশ্চয়তার পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে বইপত্রের লেখাপড়াটা আর কমলের হলো না। আবার সেটার খুউব যে দরকার ছিলো তাও নয়।যেখানে এক সময় তাদের বেঁচে থাকাটাই ছিলো আসল ব্যাপার, ওখানে পুঁজিবাদী নির্মম সমাজ ব্যবস্হায় লেখাপড়ার শেষে– কাগজের একটি সার্টিফিকেট অর্জন করে তার এমন কীই বা লাভ হতো। বড়ো জোর নয়টা- থেকে পাঁচটার একটা চাকুরী হাতে পাওয়া ছাড়া!…

    আজকের কমল, দারিদ্রতার তুফানের মুখে টিকে যাওয়া সফল একজন ব্যবসায়ী। সে এখন অনেক স্বপ্নবান যুবকদের চোখে আইকন!

    কমলেশ নিজের ব্যবসায়িক জীবনে দেখেছে, দেখে আশ্চর্য হয়েছে, এমন সৎ মানুষকে, যে মানুষটি অর্থের বিচারে দরিদ্র কিন্ত নৈতিকতা মানবিকতা মিশিয়ে বেশ দরদী আর সৎ! সে দেখেছে তার ক্রেতাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন, মাসের শেষে চাকুরীর বেতনের টাকাটা, নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়ার আগে স্বয়ং তার দোকানে এসে খাতাতে লেখা বকেয়া পরিশোধ করে দিয়ে যায়।আর্থিক বিষয়ে লেন দেনের ক্ষেত্রে এই সৎ মানুষেরা তার কাছে স্পেশাল মনে হয়! এমন লোকগুলিই তার কাছে প্রিয়…. কমল মনে করে– এমন লোকেরা সমস্ত ব্যবসায়ীদের কাছেও প্রিয় হবেন! আজকের এই সমাজে যে সব মানুষের আর্থিক লেনদেন প্রশ্নযুক্ত নয়, সততার বিচারে তারাই হলেন সৎ মনের ব্যাক্তি অথবা লাভ-লোকসানের সাথে জড়িত কেউ বুকে হাত দিয়ে এই ব্যাপারটি এড়িয়ে যেতে পারবেন না—

    কমল ধারণা করতে পারে—-
    —–জীবনের ঝাঁকুনিতে পরাস্ত মানুষগুলো সাধারণত ভালো গোছের আর মনের ব্যাক্তি হন।যাদের জীবনে সাধারণত হাসির কিছুই ঘটে না– তবু তারা হাসেন। এই হাসিটুকু তাদেরকে ভালো রাখে। ঠোঁটের কোণায় ইচ্ছের বিরুদ্ধে হাসি ধরে রাখাও আসলে রুপান্তরিত জীবনের কিছুটা অংশ…

    =============

    [গল্প]

    11
    7 Comments
    • জীবন বদলায়; কারণে অকারণে বদলায়।

    • সুন্দর হয়েছে। আপনাকে ধন্যবাদ

    • 🙂❤…. গল্পপাঠে আমন্ত্রণ।

    • প্রিয় লেখক, আপনার গল্পের যে বিষয়টি আমাকে সবথেকে বেশি আকর্ষণ করে তা হলো গভীর জীবনবোধ। আর একটি বিষয় খুব ভালো লাগে, আমাদের জীবনধারায় চারপাশে যে মানুষগুলো কারণে-অকারণে আত্নীয় হয়ে ওঠে তাদের জীবনের গল্পগুলোকে রং ছাড়াই চমৎকার ফুটিয়ে তোলেন মূল গল্পের আড়ালে।
      আজকের গল্প সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলার নেই তবে শেষটায় আচমকা নিজেকে খুঁজে পেলাম। বেশ বুঝতে পারি যে প্রতিদিন অল্প অল্প করে বদলে যাচ্ছি। প্রবলভাবে আগলে রাখার চেষ্টা করি নিজেকে আবার ভাবি, কি হবে পুরোনো আমিটাকে আগলে রেখে। যখন বিশ্বচরাচর প্রতিনিয়ত রূপান্তরিত হচ্ছে, ক্রমশ সরে যাচ্ছে চাঁদটা তখন বদলে যাওয়াই তো নিয়ম। একটা সময় ছিল যখন নিয়মের বিপরীতে দাঁড়িয়ে জোর গলায় বিদ্রোহ করতাম। এখন শুধু সেসব ভেবে ঠোটের কোনায় একটা বাঁকা হাসি নিয়ে বলি বেশ ভালো আছি। শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন।

    • শুভেচ্ছা!

অনুপ দে।

লেখালেখি: / লেখার ধরণ- প্রগতিশীলতা; আধুনিকতা।

  • লেখক জীবন আমাকে খুব টানে!
  • লেখালেখির মনটা, ব্যাক্তি জীবনে সবাই খুঁজে পাই না!
  • আমি গল্পের মানুষ, গল্প লিখে সুখ পাই।গল্পে নিজেকে তুলে ধরা যায়।
  • একটা গল্পে অনেকগুলো চরিত্র থাকে, --কথক কিন্ত একজন! সব চরিত্রই গল্প-কারের ভেতর থেকে উৎসারিত!  মজা হচ্ছে,- গল্পকার সব চরিত্রকে ছুঁয়ে দেখেন, চিনেন!

Email : [email protected]

Skip to toolbar