-
দিকচক্রবাল
হাসনাত সৌরভ
=======================শীতের সকালে রোদের আমেজ মেখে রতন মিঞা বসে। আজকাল বিক্রি-বাট্টা কম। জোয়ান বয়সের মত অত পারে না এখন। তাছাড়া এ ধানতলায় এখন দোকানেরও অভাব নেই। বদর ১৯০ টাকা কেজি মুরগি দিলে, জগলু হয় তো দেখো দিচ্ছে ১৭০ টাকায়।
রতন আজ দিচ্ছে ১৭৫ টাকায়। শুক্রবার, মোটামুটি ভালোই বিক্রি হয়েছে। উঠে গেলেই হয়। একটা বাঁশের মাচা মতন, সেখানেই আজীবন বসে মুরগি বেচে গেল রতন। আরো কদ্দিন কে জানে! চিন্তা মা মরা মেয়েটার জন্য। নিকা করিয়ে দিয়েই যে শান্তিতে মরব, সে উপায়ও তো নাই। মেয়েটার মাথাটাই তো খারাপ। এমনিতে দেখতে শুনতে ভালো। চেহারাও ভালো ছিল। এখন কেমন শুকিয়ে গেছে। বয়েসও তো হল প্রায় তিরিশের কাছাকাছি মেয়েটার।
চন্দনা উবু হয়ে বসে রোদ মাখছে বাপের দোকানের সামনেই বসে রাস্তার ধারে। হাসছে, একটা নিমের কাঠি নিয়ে দাঁতে চিবাচ্ছে। বাপের মুখের দিকে তাকাচ্ছে আর খুশির হাসি হাসছে। এ হাসির কি মানে রতন জানে না। সেও হাসছে। তার ফোকলা দাঁত, রোদ চকচকে দাড়ি, কুঁচকে যাওয়া চোখ, তাকেও দেখাচ্ছে বেশ।
রতন উঠল। দোকানপাট গুছিয়ে, মেয়েটাকে সাইকেলের পিছনে বসিয়ে, প্যাডেলে চাপ দিল। কোমরটা টাটিয়ে উঠল। বয়েস হচ্ছে শরীর জানান দিচ্ছে। আগে একটা কিছু হলে ছেড়ে যেত, এখন আর কোনো রোগই ছেড়ে যায় না।
চেনা রাস্তা গড়িয়ে গড়িয়ে রতন বাড়ির সামনে চলে এসেছে। এদিকটা বেশ ঢালু রাস্তা। সাইকেল নামছে হুড়হুড়িয়ে। চন্দনা তার কোমরটা জড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে। রতন বাড়ির দরজার সামনে এসে সাইকেল থামালো। চন্দনা সাইকেল থেকে নেমেই বাবার পকেটে হাত ঢুকিয়ে চাবিটা নিয়ে দরজার তালাটা খুলে বলল, এসো।
রতন ঘরে ঢুকে কুয়োতলায় গেল। হাত মুখ ধুয়ে বসল। চন্দনা গান গাইছে। হিন্দি গান কিছু। রতন ভাত বাড়ল। দুজনের মত ভাত। নিজে খেল। মেয়েকে খাওয়ালো। মেয়ে দৌড়ায়। রতন দৌড়াতে পারে না। কাকুতিমিনতি করে, খেয়ে যা মা…খেয়ে যা।
অনেক রাত। চন্দনা ঘুমিয়ে মেঝেতে। খাটে শোয় না। পড়ে গিয়ে মাথা ফাটায় বারবার। রতনও মেঝেতে শোয়।
হঠাৎ চন্দনা ঘুম থেকে উঠল। বলল, আব্বা আজ আমার নিকা না? তুমি ওঠো…
রতন আচমকা ঘুম থেকে উঠে কি বলবে বুঝতে পারল না প্রথমে। একবার আসতে আসতে বলল, না মা, আজ নয়।চন্দনা ততক্ষণে উঠে ঘরে আলো জ্বেলে সাজতে বসে গেছে। রতন ঘড়ি দেখল, রাত আড়াইটে। রতনের কান্না পেল। কিন্তু ওঠার শক্তি শরীরে জোগাড় করে উঠতে পারল না। মনটা বড় অবাধ্য পাথরের মত বসে।
চন্দনা সাজল। বলল, চলো আব্বা বাইরে চলো।
চন্দনা দরজাটা খুলে বাইরে বেরোতেই একরাশ কুয়াশা আর ঠাণ্ডা বাতাস ঘরে এলো। রতন তাও উঠল না।চন্দনা গান গাইছে। চীৎকার করছে…আব্বা…বাইরে এসো…কত মেহেমান দেখো, সবাই এসে গেছে…. বাইরে এসে দেখো….এসো এসো….
রতন উঠল। গায়ের চাদরটা জড়িয়ে বাইরে এলো। সাইকেলটা ঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে শোয়ানো। সাইকেলটা বলল, যাও না, মেয়েটার সুখে সুখী হও। ভাবো না স্বপ্ন দেখছ…যাও..যাও…ও যখন আমার উপরে চড়ে, আমি ওর স্বপ্নের ভার টের পাই…তোমার বুকে দুঃস্বপ্নের কলকল শব্দও শুনি। যাও, এখন কটা মুহূর্ত ওর সঙ্গে থাকো।
রতন মেয়েটার কাছে এলো। সে কুয়োতলায় বসে। অল্প তারার আলো এসে পড়েছে তার মুখে। কি উজ্জ্বল। কি ভয়ংকর। কি ব্যথার আনন্দ। রসিক তার মাথায় হাত রেখে বলল, জামাই কই রে মা?
মেয়েটা তার বাপের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, এই দেখো, তুমি চশমা পরোনি কেন…ওই তো আমায় বিয়ে করতে এসেছে….
রতন বলল, কে রে?
মেয়েটা অধৈর্য হয়ে বলল, উফ তুমি না আব্বা….আরে আমাদের বসার ঘরে বসে আছে তো…..
চন্দনা ছুটল ঘরের দিকে। রতন ধীরে ধীরে গেল তার পিছনে। ঘরে গিয়ে দেখল, চন্দনা তার আর সৌমাল্যর বিয়ের ছবিটা আঁকড়ে বসে টুলে। রতন ঢুকতেই বলল, এই তো…দেখো আমি আর সে…আমাদের ছবি তোলা…একে চেনো না তুমি?
রতনের বুকের কাছটা শাবলের বাড়ির মত বাজল। দেওয়ালে ঝোলানো পাখাটা বলল, মেনে নাও না ওর কথা। তোমাদের কত দীর্ঘশ্বাস আমি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়ির বাইরে ওই মাঠের দিকে ছেড়ে এসেছি জানো? জানো না। মেয়েটার পাশে বসো। ওর কপালে চুমু খাও। বলো আল্লাহ ওর সব আশা পূর্ণ করবেন। যাও বলো।
রতন মেয়েটার মাথায় হাত রাখল। কপালে চুমু খেলো। বলল, আল্লাহ তোর জন্য দারুণ বর পাঠিয়েছে মা!
চন্দনা আবার বাইরে বেরিয়ে গেল। কুয়োতলার পিছনে বড় মাঠ। তার সামনে দাঁড়িয়ে। তার চুল এলোমেলো। সে রতনের দিকে তাকিয়ে বলল, ও আমার জন্য ট্যাক্সি নিয়ে এসেছে দেখো….এবার আমি যাই? তুমি কেঁদো না, আমি মাঝে মাঝেই তোমায় দেখতে আসব। তোমায় আমার ফোন নাম্বার দিয়ে দেব। তুমি ফোন কোরো। ঠিকাছে?
কুয়োর বালতি বলল, যাও, যাও, ওকে জড়িয়ে আদর করো। ওর মাথাটা বুকে রাখো। তোমাদের সব দুঃখ আমি জানি। কুয়ো বলল, আমার গভীরে যত জল, তারা সব তোমাদের কথা, তোমাদের কান্না। যাও, ওর সঙ্গে কথা বলো। ওর হাতে দুটো চুমু দাও।
রতন গেল। চন্দনাকে জড়ালো। হাতে দুটো চুমু খেল। চন্দনা তার বাপের গালে দুটো চুমু খেয়ে বলল, আসছি আব্বা…
চন্দনা দৌড়াচ্ছে। মাঠ পেরিয়ে অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। রতন দাঁড়িয়ে দেখছে। তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, সাইকেল, ঝুল মাখা পাখা, কুয়োর বালতি, কুয়ো। সবাই হাত নাড়ছে। দোয়া করছে। হঠাৎ একটা মুরগি ডেকে উঠল খাঁচা থেকে। সে বলল, একি করলে, তুমি আমাদের উপর নিষ্ঠুর হও, আমরা বলি না কিছু…..কিন্তু মাঠের ওদিকে যে বিরাট দীঘি…জানো না তুমি? সে যে কি গভীর জানো না তুমি? তুমি সব জানো.. নিষ্ঠুর তুমি। ভীষণ নিষ্ঠুর।
খাঁচার ভিতর থেকে তাদের মাংস বিক্রির জন্য আনা সব কটা মুরগি কেঁদে উঠল। রতন দৌড়ালো। খালি পায়ে মাঠের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে পড়ল কয়েকবার। পা কাটল। গাল ছিলে গেল। কপাল ঠুকলো। রতন আবার দৌড়লো। ওই তো দীঘির উঁচু পাড়। ওই তো সামনেই দীঘির জল…চন্দনা….চন্দনা…..
কেউ সাড়া দিল না। দীঘির জল পাড়ে এসে ধাক্কা দিচ্ছে – ছলাৎ ছলাৎ । থিতিয়ে যাচ্ছে সব। সৌমাল্য দাঁড়িয়ে পাশের তেঁতুলগাছটা হয়ে। তার পাতায় পাতায় শীতের বাতাসের মর্মর শব্দ। সে বলছে, ওকে আমার কাছে আসতে দাও, আসুক, আসুক। দীঘি বলল, ফিরে যাও রতন। ও ফিরবে না।
@হাসনাতের হস্তাক্ষর
11 Comments-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 05 March 2022 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
Friends
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Prithula Zaman
@prithula




শুভেচ্ছা !