-
# ছোট গল্প
#যেতে যেতেপূবাকাশে সূর্যের উঠি উঠি ভাবটা তখনও কাটেনি পুরােপুরি । হাতে মার্জিনাল সময় নিয়ে নির্দিষ্ট কম্পার্টমেন্টে উঠে টিকিটের নাম্বার মিলাতে না মিলাতেই ট্রেনটা বিশাল দেহ নড়িয়ে চলতে শুরু করলাে । সাউন্ড বক্সে ভেসে এলাে সুরেলা কণ্ঠে যাত্রা শুরুর এনাউন্সমেন্ট ।
নির্ধারিত আসনে রিসিতাকে বসতে বলে বাংকারে ব্যাগ – ব্যাগেজ তুলে এতক্ষণে সুস্থির হয়ে বসলাে রতন রিসিতার পাশটিতে ।
এই শীতের সকালেও কেমন ঘেমে উঠেছে । টাইয়ের নটটা আলগা করতে করতে রিসিতার দিকে আড়চোখে চেয়ে বলে – তােমার জন্যই তাে ।
রিসিতা ততক্ষণে হাতব্যাগটিকে কোলের উপর ফেলে গায়ের শালটা কাঁধের একপাশে টেনে হাফ ছেড়ে বসেছে । রতনের দিকে মৃদু চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করে
-আমার জন্য মানে ?
ছুটে চলা গাছ – গাছালির পানে জানালার কাঁচের শার্সি গলিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে রতন
– মানে হয়রানি , সাতসকালে ছুটোছুটি ।
-বেশ তাে , পরের ষ্টেশনে নেমে ফিরে যেও তুমি ।
-আর তুমি ?
-আমার জন্যেই আমার হয়রানি , ছুটোছুটি , সহজ হিসেব ।রতন রিসিতার চোখে চোখ রেখে হেসে ফেলে এবার , বলে
– হিসেব যদি এত সহজই হতাে তবে বছরে একটি বার নয় , প্রতিমাসেই এমনি হয়রানি আর ছুটোছুটি করত সাধ জাগে।
-গাছে তুলে মই কেড়ে নেয়া হচ্ছে বুঝি ?পায়ের কাছে রাখা বেতের ঝুড়ি থেকে লম্বা ফ্লাস্কটা বের করে দুধসাদা প্লাষ্টিকের কাপ দুটোতে চা ঢালতে ঢালতে মৃদু হাসে রিসিতা ।
-যাত্রার অব্যাহতি যখন মিলছে না মশাই , দাম্পত্য কলহের অব্যাহতি দিয়ে গলাটা ভিজানােই বােধ হয় ভাল ।
—–যথা আজ্ঞা।
বলে রতন হাত বাড়িয়ে চায়ের ধূমায়িত কাপ তুলে নেয়, রিসিতার হাতের দু’গাছি চুড়ির রিনরিনে সুরের সাথে ।ততক্ষণে সূর্যের লাল আভায় চলন্ত ট্রেনের কামরায় অদ্ভুত এক আলাে – আঁধারির যাওয়া – আসা শুরু হয়েছে । সেই নরম আলােয় নতুন করে দেখে রতন রিসিতাকে। কাজল টানা চোখের পাতায় খুশির ঝিলিক , কপালের জ্বলজ্বলে টিপটিও হাসছে যেন । অনর্গল কথা বলে যাওয়া ঠোঁট দুখানায় লিপিষ্টিকের চকচকে ঔজ্জ্বল্য । চিকন পাড়ের ধানী রং শাড়ির আঁচল লুটোপুটি খাচ্ছে পায়ের কাছটায় । কানে ঝোলানাে মিনা করা ঝুমকো জোড়া আর বুকের মাঝে লম্বা চেনে দোলানাে পান পাতার লকেট খানি রিসিতার কথা আর হাসির দমকে কেঁপে উঠছে বারবার ।
—– ” চা জুড়িয়ে যাচ্ছে যে । ”ঝকঝকে দাঁতের সারি মেলে মােহনীয় হাসি ছুঁড়লো রিসিতা , রতন গলাটা ঝেড়ে নিল । একটু দুষ্টুমি করতে গিয়ে বাধা পেল । সামনে সীটে বা ভ্রলােকের দিকে চোখ পড়তেই সামলে নিল নিজেকে । চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে আবার তাকালাে সামনের লােকের পানে । কি অস্বস্তিকর ! এতক্ষণ কি তবে এতবেই তাকিয়ে তাকিয়ে দু’জনার কথাবার্তা উপভোগ করছিল লোকটা ? দু’জনাইবা হয় কি করে । কামরার হালকা আলােয় ভদ্রলােক রীতিমত সুক্ষ দৃষ্টিতে রিসিতাকেই পর্যবেক্ষণ করে চলেছে ।এ ক্ষেত্রে কি করা উচিত রতনের । রিসিতাও কি ব্যাপারটা খেয়াল করছে না ? চায়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে রিসিতার দিকে তাকাতেই সাহস করে হাসলাে রিসিতা।
ফ্লাস্ক এবং কাপ দুটো ঝুড়িতে গুছিয়ে রেখে সরাসরি তাকালাে লােকটির দিকে । ভদ্রলােক যেন অপেক্ষায় ছিলেন। খানিকটা অস্বস্তি গলায় ঢেলে বললেন,
—–এক্সকিউজ মি – আপনাকে …রিসিতা কথা কেড়ে নিয়ে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বললাে —– খুব চেনা লাগছে ?
—–জী – মানে ঠিক মনে করতে পারছি না ।
—–মনে থাকার কথাও নয় অবশ্য । বছর তিনেক আগের কথা । চৌঠা অক্টোবৱ আপনারা আমাদের বাসায় এসেছিলেন ।
ভদ্রলােক চোখ সরু করে দু ভ্রু কুঁচকিয়ে আউড়ালেন একবার – চৌঠা অক্টোবর ।
রিসিতা ভদ্রলােকের স্মরণশক্তির সাহায্যার্থে বলে চলেছে তখনও ।
—-হ্যাঁ , তার দিন সাতেক পরে অর্থাৎ বার তারিখে কথানুযায়ী আবার এলেন , সংগে …
ভদ্রলােক আচমকা আহত স্বরে উচ্চারণ করলেন – —–থামুন , প্লিজ !
রিসিতা কন্ঠের সেই স্বাভাবিকতা নিয়েই বললাে – —–আমি সেদিনের সেই রিসিতা । ও হ্যাঁ
– আলাপ করিয়ে দেই, আমার হাজবেন্ড রতন ।ভদ্রলােকের চোখে তখন বিস্ময় নাকি বিরক্তি বােঝা গেল না চাহনীতে । রতনের বাড়ানাে হাতে হাত রেখে বললেন
—- – আমি জামিল । সস্ত্রীক রওয়ানা হয়েছি চাকরির বদলি অর্ডার রক্ষার্থে ।
রিসিতা এবং রতন দু’জনেই এতক্ষণে খেয়াল করলাে , জামিলের পাশে বসা গল্পে বইয়ে গভীর মনােনিবেশ করা ভদ্রমহিলাকে । ক্লিপ আটকানাে ছােট রিডিং ল্যাম্পটা বইয়েন মলাটে গেঁথে স্বল্প আলােতেই দু’চোখ পাতায় আটকে মিশে গেছে অন্য জগতে , দেখলেই বােঝা যায় । জামিল সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে মনােযােগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে তাকালাে রতনে দিকে । পূর্বের অস্বস্তিটুকু কাটাতেই হয়তবা জিজ্ঞেস করে
—- -তা , আপনারা মধুচন্দ্রিমায় যাচ্ছেন বুঝি ?
রতন হাসলাে।
—– – তা বলতে পারেন । বছরের এই একটিবার সংসারের বেড়ী খুলে দিন কয়েকের জন্য বেরিয়ে পড়ি চোখ মেলে দেশটাকে দেখতে । আক্ষরিক অর্থে মধূচন্দ্রিমা সেরেছি অনেক আগেই । কিন্তু ঘরছাড়লেই সেই আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ে পদে পদেই।রতন খেয়াল করে দেখে,রিসিতা পরিচয় করিয়ে দেবার পর থেকে জামিল আর একটিবার ও রিসিতার মুখপানে তাকিয়ে কোন কথা বলেননি এপর্যন্ত । রিসিতাও না । জামিলের কথা শুনে মনে হলাে , রিসিতাকে প্রথমটায় চিনে উঠতে পারেনি , রিসিতা কিন্তু চিনে ফেলেছে প্রথম দেখাতেই । যাই হােক- বছর তিনেক আগের চৌঠা অক্টোবর মানে রিসিতার জীবনে রতনের আগমনের আগের ঘটনা অর্থাৎ অতীত । আগমনের অতীতে রতনের কিইবা যায় – আসে ।
এমনকি রিসিতারও না । বরাবরের মত কানে এয়ারফোন লাগিয়ে ওয়াকম্যান শুনছে জানালায় চোখ রেখে – ওর প্রিয় গানগুলির সুরের দোলায় হারিয়ে যায় ভালবাসার ভুবনে ।
জামিল সিগারেটের প্যাকেট খুলতে গিয়ে কি মনে করে উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে যায় সামনের কোন ফাঁকা কামরাকে উদ্দেশ্য করে । রতন তাকায় চারপাশে । জামিলের স্ত্রী বই বন্ধ করে উপরে মালামালে চোখ বুলিয়ে জামিলের ফাঁকা সীটটায় হেলান দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে তন্দ্রায় চোখ দুটি খুঁজে রাখে ।রিসিতা সেদিক পানে তাকিয়ে রতনকে ইশরায় বলে ফিসফিসিয়ে
—- -যদিও ব্যাপারটা অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মত – তবু বলি , উনাকে দেখে আমার কি মনে হচ্ছে জানাে – পৃথিবীর যাবতীয় রূপ – রঙ – রস থেকে চোখ ফিরিয়ে রয়েছেন উনি ।রতন রিসিতার কোলের উপর রাখা ওয়াকম্যানের সুইচটা অফ করে দিয়ে এয়ারফোন দুটো কোন থেকে খুলে নিতে নিতে গলা নামিয়ে বলে
—– – আর আমার প্রেয়সী যে আমার কাছ থেকেই বেরিয়ে অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো শুরু করেছে।ওয়াকম্যানটা হাতব্যাগে পুরে , শাড়ির আঁচল সামলিয়ে শালটা গায়ে জড়াতে জড়াতে উঠে দাঁড়ায় রিসিতা
—–হাত – পা ধরে গেছে , চলাে হেটে আসি ।পা টিপে টিপে ব্যালান্স বজায় রেখে ছুটন্ত ট্রেনে হাঁটতে ভারী মজা পায় রিসিতা । প্লেনে বা বাসে উঠতে এই কারণেই ওর ঘাের আপত্তি। ট্রেনে সারাটাক্ষন কেমন উপভোগ করতে করতে যাওয়া যায় । রতন যদি বলে ট্রেন জার্নিতে সময়ের অপচয় । রিসিতা তক্ষুণি এর যুক্তি খাড়া করে বলবে – অপচয় কোথায় ? সংসারের গণ্ডিটা এড়িয়ে ট্রেনে চেপে বসা মানেই তাে বেড়ানাে শুরু। সংসারের ছক বাঁধা নিয়মের ফাঁকে অফিসের কর্মব্যস্ততার ফাঁকের কয়টা মুহূর্তইবা কাটে এমন পাশাপাশি । এই যে হাতে হাত রেখে চলন্ত ট্রেনে হাঁটা , বুফে কারে মুখোমুখি বসে চোখ চোখে রাখা , পাশাপাশি সিটে গায়ে গা ছুঁয়ে বসে খুনসুটি করা – এগুলো তো বেড়ানোর বাড়তি বােনাস ।
রিসিতার যুক্তির কাছে রতন হার মানে । সত্যিকথা বলতে কি , বিয়ের তিনটে বছর হয়ে গেল কিন্তু প্রথমবারের অর্থাৎ বিয়ের দিন তিনেকের মাথায় মধুচন্দ্রিমার দিনগুলোই যেন বার বার ফিরে আসে।সেবার ঘােমটায় আড়াল করা নববধু রিসিতা- জাফলঙের সবুজের ছোঁয়ায় অন্যরকম হয়ে গেল কিছুক্ষণেই। মাত্র দিন চারেক আগের লেখা অজানা – অচেনা লাজ বিধুর মেয়েটা এমন করে চেনার হবে , জানার হবে । বিস্ময়ের ঘাের লাগা চোখে রতন শুধু অনুভব করছিল রিসিতার উচ্ছলতা , চঞ্চলতা ।
পরের বার সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে খােলা গলায় “তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রেণে” রবীন্দ্রনাথের দু’কলি রিসিতার কণ্ঠে সুর ছড়ালাে যখন , রতনের বহুবার দেখা সমুদ্রকে আরাে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।ফেরার পথে ফয়েজ লেকের গভীর কালাে পানি কি ভীষণ মগ্নতা এনে দিয়েছিল রিসিতার চোখে ।
পড়ন্ত সূর্যটা পানির ছায়ায় দেখতে দেখতে পাশে দাঁড়ানাে রতনের হাতটা আঁকড়ে গভীর – আবেগে বলেছে – এর পরের ম্যারেজ ডে তে আমরা কুয়াকাটায় যেতে পারি না ? সাগর মেহনায় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত নাকি দারুন লাগে দেখতে ।
রিসিতার আঁকড়ে ধরা হাতে রতন পরম ভালবাসায় অন্য হাতটি রেখে বলেছে – নিশ্চয় যাব । ম্যারেজ ডে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কেন – তার আগেই যাৰ ।
রিসিতা এবার সরাসরি চোখ রেখেছে রতনের চোখে । বলেছে , উহ – আগে নয় । আমাদের জীবনের বিয়ের দিনটি যতবার আসবে ততবারই শুধু নতুন করে দেখবাে আমাদের অচেনা চার পাশ কে । সংসার ধর্ম আগে , বুঝলে মশাই ! অর্থ – সময় দুটোই তাে সংসার থেকে নিয়ে সঞ্চয় করতে হবে ।তারপর,
বুফে কারে জানালার পাশ ঘেঁষা খালি আসনগুলােয় চোখ বুলাতেই সৌজন্যতার হাসি নিয়ে উঠে দাঁড়ালাে জামিল । রতন – রিসিতা কিছু বলবার আগেই সিগারেটে শেষ টান দিয়ে জানালা গলিয়ে এগিয়ে গেল নির্দিষ্ট কামরার দিকে । সামনের চেয়ারটায় বসে পড়লাে রতন , অন্যটায় রিসিতাকে বসতে বলে ।
শীতের হিমেল হাওয়ায় রিসিতার খোঁপায় ছড়ানাে আলগা হয়ে যাওয়া চুলগুলি চােখে মুখে বারবারই ছড়িয়ে পড়ছে। ওদিক সামাল দিতে দিতে রিসিতা তাকালাে রতনের ঢিলে টাইয়ের নটের দিকে, আঙুল তুলে ইশারা করতেই রতন ত্বরিতেই নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বসলো।
ক্রীক কালার শার্টের সংগে মেরুন রঙা টাই , ধুপছাই রঙ স্যুট পরিহিত রতনের দিকে তাকিয়ে ভূমিকা ছাড়াই বললাে,
—– পূর্বে যাহা দেখা যায় নাই অর্থাৎ অ – পূর্ব । ‘ “একমিনিট” বলেই মুচকি হেসে রতন পকেট থেকে চিরুণীটা বের করে ব্যাক ব্রাশ সেরে তাকালো রিসিতার৷ দিকে।
—– এবার ?
—- যাহা সকল সময় দেখা যায় – অতি সাধারণ ।—– অর্থাৎবএখন তোমার হাজবেন্ড ।
——তৰ এতক্ষণ আবার কি ছিলে ?
—–প্রেমিক।
কারণ তোমার চোখের তারায় ছিলাম এতক্ষণ । প্রেমিকদের অবস্থান প্রেমিকাদের চোখের তারায় থাকে একতরফা ।
—–তা কতজনের চোখের তারায় এমন ছবি দেখেছেন মশাই ?
——একজনের চোখে । তাও আবার সারা বছর নয় , বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে । যখন
আমাদের বিয়ের দিন আসে , মনে পড়ে অনেকগুলাে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের যােগফল এলাে , আকাশ ভরা কত জোছনা গড়িয়েছে এই যােগফলে , বুক ভরে নেয়া মুক্ত হাওয়ায় ভেসে বেড়ানাে রিসিতাকে দেখা প্রথম দিনটি মনে পড়ে ।
——খুব হয়েছে রােমান্টিকতা । এবার অন্য রকম একটা গল্প শােনো।
——গ-ল্প ?
—–হ্যা , একজন মানুষের হিসেবের গল্প ।
তিন ভাই আর পাঁচ বােনের মধ্যে সবার ছােট যে বােনটি তার তখন অনার্স ফাইন্যালের দু’মাস বাকি । নােটপত্র গুছিয়ে হল থেকে বাড়িতে এসে হাজির , মন দিয়ে পড়বে বলে । পড়ার টেবিলে মনটা যখন প্রায় গেঁথেই ফেলেছিল , মেঝ ভাবী বলে গেলেন ফিসফিসিয়ে খবরটা – ননদিনী ড্রয়িং রুমে নতুন হাওয়া বইছে । খুব ভাল প্রপােজাল এসেছে । সরকারী চাকুরে ছেলে – কিছুদিন পর পর বদলি , কোয়ার্টার , আয়া , বাবুর্চি , ড্রাইবার – সব ফ্রি ।মেয়েটি নােট বন্ধ করে ভাবীর চোখে তাকায়
—– বলে দাও আমি রাজি , ঘুরতে আমার খুব ভাল লাগে ।
ভাবী বন্ধ নােটটি খুলে দিয়ে বলেন
—– সামনে চার তারিখে ওরা দেখতে আসবে । পছন্দ হলে আকদ- এর দিন ঠিক হবে । এখন তুলে নিবে না , পরীক্ষা দিতে হবে । অতএব , ননদিনী মন দাও পড়ায় ।ফেলটেল মারলে শ্বশুর বাড়ীতে প্রেষ্টিজের ব্যাপার । হা হা হা…..নির্দিষ্ট তারিখে পড়ার টেবিলে কান্টের থিউরির বিশ্লেষণ নিয়ে হিমসিম খাচ্ছিল যখন মেয়েটি , মেঝ ভাবী এসে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন নিজের ঘরে । ওয়্যারড্রোব থেকে আকাশ নীল শাড়িটা মুখের কাছটিতে ধরে বললেন – খুব মানাবে । পরা হলে আমায় ডেকো ।
মেয়েটি নিজের মত করে কাজল আঁকলাে চোখে , কপালে পরলাে টিপ , শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে রান্নাঘরে ভাবীর হুলস্থুল কাজের মধ্যে হাজির । ভাবীর চোখ তাে ছানা বড়া ।
——সে কি , একেবারে রেডি যে । খুব তাড়া ?ভাবী সংগে করে নিয়ে গিয়ে সামনের সােফাটায় বসিয়ে দিলেন । তিনজনের ছয়টি চোখ নিবদ্ধ হলাে মেয়েটি মুখমন্ডলে । পাত্র , পাত্রের ফুপা এবং মামা । দু’চারটে কথার এক পর্যায়ে পত্রের মামা ছােট লাল রঙা বক্সটি পকেট থেকে সেন্টার টেবিলে রেখে বললেন,
—– আকদ্ টা তবে সেরে ফেলা যাক আজই । পরীক্ষার আগে তাে আর অনুষ্ঠান হচ্ছে না ।মেয়েটির বাবা এবং বড় ভাই বাধ সাধলেন । এভাবে হয় কি করে । পছন্দ হয়ে থাকলে কথা চুড়ান্ত হতে পারে। আকদ্ – এর জন্য অন্ততঃপক্ষে সাতটি দিন তাে সময় দরকার আমার ।
পাত্র স্বয়ং সেন্টার টেবিলে রাখা বাক্সটি হাতে তুলে নিয়ে জবাব দিল – বেশ তাহলে তাই হােক ।
আসছে বার তারিখ দিন – ক্ষণ পাকা হলাে।মেয়েটির পড়া মাথায় উঠলো । আত্মীয় – স্বজন , বন্ধু – বান্ধব , পাড়া – প্রতিবেশীরা ঘিরে রইল মেয়েটিকে ।
গায়ে হলুদের রাতে হাতে রাখী বাঁধতে বাঁধতে ছােট ভাৰী সাবধান করলেন,
—– কাল রাতে তোমার বর খুলবে এটা । তার আগে খুলে ফেলাে না যেন ।হাতে মেহেদীর নক্সা আর ‘ রাখী বেঁধে বিয়ের পাটিতে বসে বসেই জনা ত্রিশেক বর যাত্রীসহ বর আগমনীর সংবাদ পেল মেয়েটি ।
হৈ – চৈ করে মেয়েরা সবাই বিয়ের কনে সাজিয়ে ফেললাে মেয়েটিকে । খাবার রেডি।
বরযাত্রীদের কেউ আসছে না টেবিলে । ছেলেরাও ডাকতে গিয়ে আটকা পড়েছে । বাবা তদারকি ছেড়ে নিজেই চলে এলেন মজলিশে । কাজী সাহেবকে ঘিরে ছােটখাট একটা গুঞ্জন শুরু হয়েছে ।বিষয়টাও স্বাভাবিক । মােহরানার পরিমাণ কত হবে আর কত হবে না – এ নিয়ে দু’পক্ষে মত বিরােধ ।
বাবা বললেন,
– ঠিক আছে , ওসব পরে হবে । খাবার রেডি , আসুন , আগে খাওয়া – দাওয়ার ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলা যাক ।
বর দাঁড়িয়ে জবাব দিল – খাওয়া – দাওয়ার পর এ সবের ফয়সালা হয় নাকি কখনো ? আগে কথা ঠিক না হলে খাওয়া যাবে না । আমাদের অংকে আপনারা রাজি কিনা বলুন ।
মােহরানার দরদামের ঘটনা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক , কিন্তু পাত্র স্বয়ং হিসেবের কঠগড়ায়।এটা কি স্বাভাবিক ?
বাবা নীরব হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ । তারপর দু’হাত তুলে সবাইকে থামতে ইশারা করে বললেন-,
—–আমি অনুরােধ করছি – আপনারা খাবার টেবিলে অাসুন । কথা দিচ্ছি , আপনাদের হিসেবের ক্ষতি আমরা করবাে না । খাবার পরে এ নিয়ে আর কোন কথা হবে না ।
সুষ্ঠুভাবে খাবার পালা চুকলাে যখন , বাবা মজলিশে দাঁড়িয়ে বরযাত্রীদের সামনে দু’হাত জোড় করে বললেন – আমাকে মাফ করবেন । মেয়ের বিয়ে আমি দেব না ।ইস্পাত কঠোর বাবা সেই যে নিজের ঘরে গিয়ে বসলেন খাটে , আর নামানাে গেল না কোন কিছুতেই । বড় ভাই , মেঝ ভাই বুঝালেন , স্বজনরা বুঝালেন – আপনার একটা জেদের জন্য মেয়টার ভাগ্য পােড়াবেন না ।
বাবা হাসলেন বেদনাবিধুর । শান্ত , ধীর – স্থির কণ্ঠে বললেন,
—— মেয়েটা আমার অনাদরের নয় । পােড়াবাে না বলেইতাে ঐ ছেলের হাতে জ্বলতে দিতে পারলাম না । মানুষ চিনতে আমার ভুল হয়নি , সিদ্ধান্ত যা নেবার নিয়েছি । এ নিয়ে আর কোন কথা বলে লাভ হবে না ।আর মেয়েটি নিজের হাতের রাখী খুলে ফেললাে নিজেই । বেসিনের আয়নায় নিজের বধূ সাজ দেখলাে , ঠান্ডা পানির ঝাপটায় একে একে ধুয়ে ফেললাে সমস্ত সজ্জা । মস্ত খোঁপায় জড়ানাে ফুলগুলি একটা একটা করে ছিড়লাে ।
তারপর নােটপত্র আর কাপড় চোপড় ব্যাগে গুছিয়ে পায়ে পায়ে এগেলাে বাবার ঘরের দিকে। পাশে খবরের কাগজটা পড়ে রয়েছে , বাবা শূন্যদৃষ্টি মেলে জানালায় চেয়ে । মাথায় হাত রেখে ডাকলাে মেয়েটি,
—– – বাবা বসবাে তােমার কাছে একটুখানি ?
মাথা থেকে হাতটা তুলে নিয়ে নীরবেই বসালেন বাবা পাশে ।
——বাবা , আমার পরীক্ষা আর মাত্র ক’টা দিন । বাসায় ভাল করে পড়বাে বলে এসেছিলাম কিন্ত হচ্ছে না । আমি কালই হলে চলে যেতে চাই । সবার সাথে কমপেয়ার করেই বােধ হয় ভাল হবে পড়াটা ।বাবা ব্যাস্ত হলেন।
—– এসে না বললি পরীক্ষার দু’দিন আগে যাবি এবার ? –
—– বলেছিলাম তাে । কিন্তু পড়া এগােচ্ছে না যে , তুমি আমাকে কিছু টাকা দাও বাবা- কাল সকালের ট্রেনেই রওয়ানা হবো, সব গুছিয়ে ফেলেছি । –মেয়ের স্বাভাবিকতায় বুকের পাথরটা হাল্কা হয় অনেকখানি । শুধু ভেতরে খচখচ করতে থাকে কাঁটাটা । মেয়ের মতটা পর্যন্ত নেয়া হলাে না জেদের বশে । নিজের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে অপরাধী হয়ে রইলেন না তাে মেয়ের কাছে?
—– -বাবা কিছু বলছে না যে ।
মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন বাবা অন্যকথা,
—–আমার উপর তাের কি খুব রাগ হচ্ছে মা ?
—- -কেন বাবা ?
মাথায় হাত রেখে উঠে দাঁড়ান বাবা
—— সব ব্যাপারে এত স্বাভাবিক থাকিস কি করে তুই ? আমার মতামত তাের ঘাড়ে জোর করে চাপিয়ে দিলাম যে ।
——না বাবা , এমন করে এখনই দায় ঘাড়ে নিতে বলাে না । জীবনটা আমার সত্যি কিন্তু ওটিকে তুমি সাজিয়ে না দিলে আমি বুঝবাে না যে কিছুই । ঠিকই তাে হয়েছে বাবা । ঝরে যাবে জেনে কি তােমার ফুল তুমি এমন কোথাও রাখবে , নাকি সেখানেই দেখে – শুনে রাখবে , যেখানে সতেজ থাকবে ।বাবার দু’চোখ ঝাপসা হলাে বটে , আবেগে অধীর হলেন না । শুধু বললেন,
—– কাল সকালের ট্রেনে আমিই তােকে রাখতে যাব ।টানা দু’মাস ধরে অনার্স ফাইন্যাল শেষে মেয়েটি দেখে বাবা হল গেটে দাঁড়িয়ে ।
—– -বাবা তুমি নিতে এসেছাে ? বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
—— নিতে আসিনি । তবে তুই যদি যেতে চাস , অবশ্যই নিতে এসেছি।
—– -ব্যাপারটা কি বাবা ব্যাপারটা কি বাবা ?
——খুব সুন্দর । ডিপার্টমেন্টে তারা তােকে দেখেছে , জেনেছে । এখন তাের মতামত পেলে , ..গম্ভীর হয়ে যায় মেয়েটি
—— বাবা এ ক’মাসে তুমি কি হন্যে হয়ে পাত্র খুঁজে বেড়িয়েছ বাবা ?
——হন্যে হবাে কেন রে ? আমার ফুলের মত মেয়ে , সৌরভ চিনেই তাে ওরা এসেছে । তুই তাে বলেছিলি , আমার ফুলটাকে সতেজ রাখার ঠাঁই আমাকেই খুঁজতে হবে ।
—– -ঠাই কি তােমার সঠিক মনে হয়েছে বাবা ? -নিশ্চয় ।
—– -আমায় কবে নিয়ে যেতে চাও আমি সেভাবেই তৈরি থাকবাে বাবা ।রতন গালে হাত দিয়ে রিসিতার একটানা কথা শুনছিল মুগ্ধ হয়ে । রিসিতার হাত আপন হাতের মুঠোয় তুলে নেয় এবার । গভীর আবেগে বলে ,
——তারপর বিসমিল্লা খাঁর সানাইয়ের করুণ সুরের মূর্ছনায় মেয়েটির বাবা প্রিয় ফুলটি আমার হাতে তুলেদিলেন । তাই তাে ভাবছি এ তিন বছরে এতটুকু ম্লান হয়ে যায়নি তাে ? দেখি দেখি , রতন হাত বাড়িয়ে রিসিতার চিবুক তুলে ধরার পূর্ব মুহূর্তেই ওয়েটার এসে স্থান – কাল মনে করিয়ে দিয়ে ব্যবসায়িক কণ্ঠে শুধালাে,– চা দেব ?রিসিতা রতনের চোখের তারায় চোখ স্থির করে মুখ টিপে হেসে জবাব দিল — না ‘ ।
************
7 Comments
Friends
Fahmida Akter
@fahmida420
র. জামিল
@r-jamil
Diponkor Sharma Partho
@parthodip218
মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল
@ashraful710
Tapan Debbarma
@tanu48
Rahnuma Nira
@tamannahtasneem90
Nahian Hasan
@hasan009
Zahidul Jamy
@zahidul
AdabenTatali
@adabentatali



অসাধারণ