Profile Photo

হাসনাত সৌরভOffline

  • Hasnat21
  • Profile picture of হাসনাত সৌরভ

    হাসনাত সৌরভ

    3 years, 3 months ago

    ঐন্দ্রজালিক
    হাসনাত সৌরভ
    ===========================

    বাসের ভীড়টা যেন গায়েই লাগছে না থানেশের। এই যে ওর পাশেই একটা লোক কোলে একটা মোরগ নিয়ে বসে আছে, এই যে আর একটা ময়লাটে সাদা জামা পরা লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই অন্তত চারবার ওর গায়ে ঢলে পড়ে গেল, এই যে ওর পায়ের নীচে কার একটা বড় টিনের বাক্স এমনভাবে রাখা যার ফলে পা তেছড়া করে বসে থেকে থেকে ওর পায়ে বেশ ব্যথা করছে – এই সব কিছু ওর যেন গায়েই লাগছে না। থানেশের চোখে শুধু একটাই দৃশ্য এখন – গ্রামের বড় পুকুরটার ওপর ভেসে আছে ও! পুকুর পাড়ে এসে জড়ো হয়েছে গোটা গ্রাম, আশেপাশের গ্রাম থেকেও লোকজন এসেছে। স্কুলের হেডমাস্টার এসেছেন, থানার বড়বাবু উঁকি দিয়ে গেছেন একবার। আর সবাই অবাক হয়ে দেখছে থানেশ পুকুরটা থেকে হাত চারেক ওপরে বাতাসে ভাসছে। প্রকাশ্য দিবালোকে সব্বার চোখের সামনে কোনো রকম লুকিয়ে রাখা চোখ ধাঁধানো কারিকুরি ছাড়াই খালি হাতে জল থেকে উঁচুতে ওর শরীরটা ভাসছে। ঠিক যেমন পনেরো বছর আগে সেই জাদুকরের শরীরটা ভাসছিল।

    ঠিক যেমন পনেরো বছর আগে একদিন ভোরবেলা গ্রামের লোক আবিষ্কার করেছিল পুকুরটার ওপরে জাদুকরের শরীরটা হাওয়ায় ভাসছে। আর থানেশ, সবে স্কুল পালাতে শেখা বন্ধুদের সাথে ভীড় ঠেলে ছুট্টে এসেছিল সেই আজব লোকটাকে দেখতে। এসে দেখেছিল গোটা গ্রাম ভেঙে পড়েছে পুকুরপাড়ে। ঘোরলাগা গলায় হেডমাস্টার ঘোষণা করেছিলেন, ‘আজ স্কুল ছুটি।’

    তিনদিন তিনরাত এইভাবে ভেসেছিল লোকটা আকাশের দিকে মুখ করে। গ্রামের লোক কত ডেকেছে, ফুল ছুঁড়েছে, সাঁতরে ঠিক জাদুকরের নীচে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছে এটাসেটা (আর পরীক্ষা করে এসেছে নীচে লাঠিসোটা দিয়ে ঠেকনা দেওয়া আছে নাকি কিছু); এমনকি গ্রামের চেয়ারম্যান নিজে নৌকা করে জাদুকরের সামনে এসে জিজ্ঞেস করেছেন সে কোথায় থাকে, এই গ্রামে কী করে এলো বা তার কিছু দরকার লাগবে কিনা। কিন্তু জাদুকর কথা বলেনি কোনো।

    তারপর একদিন ভোরবেলা, সবে চাঁদ ডুবে গেছে, লোকটা চোখ খুললো। আর সেই স্বচ্ছ কাচের মতো জলের পুকুরটার ওপর দিয়ে হেঁটে পাড়ে উঠলো। বাসের জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখতে দেখতে নিজের মনেই বলে উঠল থানেশ। ওর গ্রাম আসতে এখনো আধঘন্টা বাকি। এখনো পিচ রাস্তার দুধারে ছোট ছোট বাড়ি, দোকানঘর পিছলে পিছলে যাচ্ছে। সন্ধে হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। একটা কালচে রঙের পোঁচ যেন থানেশের চোখের সামনে ঢেকে দিচ্ছে পনেরো বছর পরে ওর গ্রামে ফেরার রাস্তা, যে গ্রামের সবার সামনে ও একদিন ঘোষণা করেছিল একদিন জাদুকরের থেকে এই বিদ্যা শিখবে, তারপর ফিরবে। জাদুকর হারিয়ে যাওয়ার ঠিক পরেরদিন।

    বাসটা ব্রেক কষে থামল হঠাৎ। ময়লাটে জামা পরা লোকটা আবার ঢলে পড়ল ওর গায়ে। লোকটার মুখ থেকে কী যেন একটা মশলার গন্ধ পেল থানেশ। পাশের লোকটার কোল থেকে মোরগটা ডেকে উঠল হঠাৎ। বাসটা থেমে যাওয়ায় গরমটা যেন চারগুণ বেড়ে গেল সাথে সাথে। থানেশের মনে হলো ও একটা গরম উনুনের পেটের ভেতর আরো কটা রুটির সাথে বসে আছে। আর মালকিন কী একটা গল্পে বিভোর হয়ে উনুন ভর্তি রুটির কথা ভুলেই গেছে।

    গ্রামের লোক অবশ্য ভোলেনি থানেশকে। এই তো বছর চারেক আগেও আবিল চিঠি লিখেছিল, সবাই নাকি অপেক্ষা করে আছে কবে থানেশ গ্রামে ফিরবে। ও চলে আসার পর জন্মানো গ্রামের সমস্ত বাচ্চা নাকি অবাক হয়ে মা বাবাকে প্রশ্ন করে, সত্যিই লোকটা জলের ওপরে হাওয়ায় ভাসবে? লোকটার ডানাও থাকবে না? আবিল নাকি ওদের সবার কাছে গর্ব করে বলে, ‘যে লোকটা ভাসবে হাওয়ায়, সে আমার জিগরি দোস্ত, সে আর আমি তো একসাথেই দেখতে গেছিলাম জাদুকরকে। আমার হাত থেকে জাদুকর প্রথম গম আর আলু নিয়েছিল জানিস! তারপর তো থানেশ সটান লোকটার পায়ে পড়ে গেল!

    পায়ে পড়ে অবশ্য কোনো লাভ হয়নি থানেশের। জাদুকর কোনোভাবেই ওকে এই বিদ্যা শেখাতে রাজি হয়নি। শুধু হেসে বলেছিল, ‘বেরিয়ে আয়, নিজে শিখে নে!’

    এই কথাদুটো আজো কানে বাজে ওর। সত্যি সত্যিই বেরিয়ে এসেছে থানেশ। পনেরো বছর আর গ্রামের ফেরেনি গ্রামে। সেই প্রথমবার শহরে এসে যে সস্তা হোটেলটায় উঠেছিল, আবিলের কাছে সেটার ঠিকানা রয়ে গেছে এখনো। মাঝেমধ্যে শহরে এসে হোটেল মালিকের থেকে চিঠি নিয়েছে থানেশ। বছরে একটা কী দুটো চিঠি। পাল্টা আবিলকে কখনো কিছু লেখেনি ও। আবিল লিখে গেছে, ওর বিয়ে হয়েছে, গ্রামে নতুন পানিরকল বসেছে, নতুন সরকারের আমলে রাস্তা হয়েছে। কখনো লিখেছে গ্রামের অবস্থা ভালো না, মাঝেমধ্যেই আজকাল দাঙ্গা বাধছে। গ্রামের লোক যে গ্রামের লোককেই খুন করবে এইভাবে, ভাবা যাচ্ছে না। আবিল আফশোষ করেছে, মানুষ বদলে যাচ্ছে থানেশ, ছেলেরা সবাই যন্ত্র হয়ে যাচ্ছে, কীসের জন্য যেন একটা রেগে থাকছে সবাই সারাক্ষণ। আর মেয়েরা বন্দি হয়ে যাচ্ছে। ওরা ঠিক করে দিচ্ছে কে কী খাবে, কী পোশাক পরবে, কী দেখবে, কী দেখবে না। শুধু এই সবের মধ্যেও নাকি গ্রামের বাচ্চাকাচ্চাদের এখনো গল্প শোনানো হয় – একদিন দেখবে এক জাদুকর এসে এই পুকুরটার ওপরে হাওয়ায় ভেসে আছে। বাচ্চারা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘এই পুকুরটায়?’ ওদের টলটলে চোখে ভাসে ক্রমশ কচুরীপানায় বুঁজে আসা, কালচে দুর্গন্ধ জলের পুকুরটা, যেটার এক কোণে এই সেদিনও একটা বিদ্রোহীর গলাকাটা লাশ পড়েছিল।

    আবিলের চিঠিগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছে ও। এই ক’বছরে যতবার ভেবেছে এক্কেবারে হারিয়ে যাবে, পাহাড়ের কোলে সেই নির্জন গুহাটায় সেই আশ্চর্য শ্রমণের কাছে কাটিয়ে দেবে বাকি জীবনটা, তার পায়ের তলায় বসে বলে উঠবে, ‘ফিরিয়ে নিন আপনার দেওয়া বিদ্যা, আমার সমস্তটুকু নিয়ে নিন, আর আমায় আপনার মতো, এই বাতাসের মতো, এই তুষারকণার মতো, এই পরাগরেণুর মতো ভাসতে শিখিয়ে দিন অনন্তকাল নিশ্চিন্তে’, তবু আবিলের চিঠিগুলো টেনেছে ওকে। গ্রাম অবধি টেনেছে। বারবার মনে পড়েছে সবকিছু। বারবার ইচ্ছে হয়েছে একবারের জন্য হলেও গ্রামের পুকুরটার ওপরে ভেসে উঠতে। ইচ্ছে হয়েছে গ্রামের সবাই, সব্বাই একসাথে এসে পুকুরপাড়ে দাঁড়াক, আর অবাক হয়ে দেখুক পনেরো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটা লোক জাদুকর হয়ে ফিরে এসেছে।

    বাসটা থামার একটু পরে যেন হুঁশ ফিরলো থানেশের। কন্ডাকটার বেশ কর্কশ গলাতেই ডেকে উঠলো, ‘নামবেন তো? লেট করছেন কেন ভাই? এমনিতে শালা সন্ধেবেলা এইসব জায়গা ভালো না!’

    কোনোরকমে হুড়মুড়িয়ে বাস থেকে নামল থানেশ। সাথে সাথেই চারপাশের সমস্ত আলো আর শব্দ আর উষ্ণতা নিয়ে বাসটা যেন মিশে গেল অন্ধকারে। থানেশ সেই বিশাল নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল একা। ওর বিশ্বাসই হচ্ছিল না এই নিঃশব্দ নিরেট পাথুরে অন্ধকারটাই ওর গ্রাম।

    পরদিন ভোরবেলা গ্রামের সবাই, গ্রামে যার সাথে যার ঝামেলা, যাদের সাথে যাদের দাঁড়ানো বারণ, যাদের ছায়া মাড়ালে যাদের জাত যায়, যাদের বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ, যাদের সামনে আসা মানা, যাদের ভয়ে যারা লুকিয়ে থাকে অন্ধকারে আর যারা এই গ্রামের মানুষ আর অন্ধকার নিয়ন্ত্রণ করে, সবাই অবাক হয়ে দেখল গ্রামের কচুরিপানায় প্রায় ঢেকে যাওয়া, নোংরা কালচে দূর্গন্ধ জলের পুকুরটার হাত চারেক ওপরে ভোরের বাতাসে ভেসে আছে জাদুকর থানেশ।

    @হাসনাতের হস্তাক্ষর

    7
    15 Comments
Skip to toolbar