-
কামনার দাস থেকে আত্মসংযমের বিজয়
ঢাকার এক গলির ভেতর, পুরোনো একটি ভাড়া বাসায় থাকে রায়হান। বয়স তেইশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, পড়াশোনায় খারাপ নয়, কিন্তু তেমন ভালোও না। তার রুমমেটরা যখন গভীর রাতে বই পড়ে কিংবা আগামী দিনের স্বপ্ন আঁকে, রায়হান তখন ফোনের স্ক্রিনে ডুবে থাকে। কখনো পর্ন, কখনো সোশ্যাল মিডিয়ার ইনবক্সে মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট। তার দিন শেষ হয় ক্লান্ত, অনুতপ্ত, কিন্তু আবারও একই চক্রে আটকে যায়।
রায়হান একসময় ভেবেছিল, প্রেম কিংবা নারীসঙ্গই জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। কিন্তু ধীরে ধীরে সে লক্ষ্য করে— পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে, শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, মাথায় স্থিরতা নেই, আর প্রতিদিন নতুন করে লজ্জা কাজ করছে নিজের প্রতি। বন্ধুদের আড্ডায় কেউ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে, কেউ বিদেশে স্কলারশিপের পরিকল্পনা করছে, আর রায়হান শুধু ভাবছে— আজ রাতে কার সাথে কথা হবে, কাকে ইমপ্রেস করা যায়।
এক সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অধ্যাপক কবীর স্যার ক্লাসে বললেন,
“তোমাদের ব্যর্থতার মূল কারণ অনেক সময় বইয়ের অভাব নয়, ইচ্ছাশক্তির অভাব। যে ছেলে বা মেয়ে নিজের কামনাকে জয় করতে পারে না, সে কখনোই জীবনের বড় লড়াই জয় করতে পারে না।”
এই কথাটা সরাসরি রায়হানের বুকের ভেতর গেঁথে গেল। হঠাৎ যেন মনে হলো— স্যার সরাসরি তাকেই বলছেন।
সেই রাতে বিছানায় শুয়ে সে ভাবতে লাগল। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের নাম ছোটবেলায় ইতিহাস বইয়ে পড়েছে, পড়েছে নেপোলিয়ন, মোহাম্মদ আলী, এমনকি আধুনিক যুগের এলন মাস্কের গল্প। তারা কেউ সময় নষ্ট করেনি অর্থহীন ভোগে। অথচ সে— তার প্রতিদিনের শক্তি, মনোযোগ, স্বপ্ন সবকিছু খরচ করছে সস্তা আনন্দে।
পরদিন ভোরে, অ্যালার্ম বাজতেই রায়হান হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। এবার আর স্ক্রিনের দিকে নয়, সে হাঁটতে বের হলো। মাঠের চারপাশে দৌড়াতে দৌড়াতে নিজের ভেতর এক অদ্ভুত সংকল্প জন্মাল— “আমি আর কামনার দাস হয়ে বাঁচব না।”
কিন্তু যুদ্ধটা সহজ ছিল না। প্রতিদিনের অভ্যাস বদলানো কঠিন। মাঝেমধ্যে রাতের নিস্তব্ধতায় আবারও সে পুরনো অভ্যাসের টানে হেরে যেত। ভোরে উঠে অনুতাপে কাঁদত। কিন্তু ধীরে ধীরে, প্রতিটি ছোট ছোট জয়ের মাধ্যমে রায়হান বুঝতে পারল— আত্মসংযম মানে একদিনে জয় নয়, বরং প্রতিদিনের ক্ষুদ্র যুদ্ধ জয়।
মাসের পর মাস কেটে গেল। একসময় রায়হান লক্ষ্য করল, তার পড়াশোনায় মনোযোগ বেড়েছে, শরীর শক্তিশালী হচ্ছে, চোখে আবার আগের মতো উজ্জ্বলতা ফিরে এসেছে। বন্ধুরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে— “তুই কেমন করে এত বদলে গেলি?”
সে শুধু হেসে বলে— “নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি।”
তার এই পরিবর্তন নজর এড়িয়ে গেল না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কবীর স্যারের কাছেও। একদিন স্যার তাকে আলাদা ডেকে বললেন,
“তুমি এখনো তরুণ, কিন্তু আজীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যদি সত্যিই ধরতে পারো, তাহলে সামনে তোমার জন্য পৃথিবী উন্মুক্ত হবে। মনে রেখো, নারীসঙ্গ বা ভোগ কোনো অভিশাপ নয়, অভিশাপ হলো যখন তুমি এর দাস হয়ে যাও। তুমি যদি এটাকে নিয়ন্ত্রণ করো, তবে এটি শক্তি হবে; আর যদি এটিই তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তবে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।”
রায়হান মাথা নিচু করে শ্রদ্ধাভরে উত্তর দিল,
“স্যার, আমি বুঝেছি। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু আমি নিজেই— আমার ভেতরের দুর্বলতা। আমি সেই শত্রুকেই হারাতে চাই।”
সেদিন থেকেই রায়হান নিজের ভেতরে এক নতুন মিশন শুরু করল। প্রতিদিন সকালে সে শরীরচর্চা করে, দিনভর পড়াশোনা করে, আর রাতে ডায়েরি লেখে। তার ডায়েরির প্রথম পাতায় বড় হরফে লেখা—
“যে পুরুষ নিজের কামনাকে জয় করে, সে-ই নিজের ভবিষ্যৎ জয় করে।”
কিছুদিনের মধ্যেই রায়হান নিজের জীবনে পরিবর্তন দেখতে পেল। এখন আর সে নারীর পেছনে ছুটে বেড়ায় না, বরং লক্ষ্য আর কর্মঠ জীবনের কারণে মানুষ তার দিকে আকৃষ্ট হয়। মেয়েরাও তাকে আলাদা চোখে দেখে— কারণ সে আর সাধারণ একজন নয়, সে একজন আত্মসংযমী পুরুষ, যে জানে জীবনের আসল উদ্দেশ্য কী।
বছর ঘুরে যায়। রায়হান একসময় বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। বিদায়ের আগে তার বন্ধুরা তাকে জিজ্ঞেস করল,
“তোকে তো একসময় দেখতাম মেয়েদের জন্য কাঁদতে, দিন রাত ফোনে ডুবে থাকতে। আজকে তুই কোথায় দাঁড়ালি?”
রায়হান মৃদু হেসে বলল,
“আমি শুধু এক জিনিস শিখেছি— আনন্দ সাময়িক, কিন্তু নিয়মানুবর্তিতা স্থায়ী। নারী আসবে যাবে, কিন্তু সফলতা একবার পেলে সেটাই জীবনভর সঙ্গী।”
তার চোখে ছিল দীপ্তি, কণ্ঠে দৃঢ়তা।
________________________________________2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


এটা শুধু একটা গল্প নয়, বরং একটা রূপান্তরের যাত্রা—অভ্যাসের বন্দিত্ব থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণের দিকে। পুরো লেখাটার ভেতরে শিক্ষামূলক আর প্রেরণাদায়ী দিক আছে, আবার গল্পের মতো আবেগ আর নাটকীয়তাও বজায় আছে।