-
ছোট্ট শিল্পীদের গল্প
গ্রামের সেই ছোট স্কুলটির নাম—প্রভাতী প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভোরের সূর্যের আলো যখন দিগন্ত ভেদ করে এসে জানালার ফাঁক দিয়ে ঢোকে, তখনো পুরোপুরি কোলাহল শুরু হয়নি। কিন্তু সেই শান্ত সকালের মাঝেই এক ভিন্নরকম সুর বাজে ক্লাসরুমে। সেটি চকচকে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখিত অক্ষরের সুর নয়, বইয়ের ভারী অঙ্ক কিংবা বিজ্ঞানের সূত্র নয়, বরং মিষ্টি ছন্দের এক ছড়া।
শ্রেণির শিক্ষক ফাতেমা আপা ছিলেন ভিন্নধারার মানুষ। তার বিশ্বাস ছিল—ছড়ার ভেতরে শিশুদের হৃদয়ের দরজা খোলার অদ্ভুত এক চাবি লুকিয়ে আছে। তাই তিনি ঠিক করলেন, প্রতি সপ্তাহে একটি করে থিম দেবেন শিশুদের। যেমন—“আমার বন্ধু”, “প্রকৃতি”, “পাখি”, “শীতের দিন” ইত্যাদি। শিশুরা সেই থিম নিয়ে নিজের মতো করে ছড়া বানাবে।
প্রথম দিন তিনি থিম দিলেন—“আমার বন্ধু।” শ্রেণিকক্ষে হঠাৎ যেন অদ্ভুত উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বন্ধুর সঙ্গে মাঠে খেলার কথা লিখতে লাগল, কেউ আবার স্কুলে একসঙ্গে বেঞ্চে বসার কথা। এক ছাত্রী লিখল—
“বন্ধু আমার রঙিন ফুল,
সারাদিনে খুশির কূল।”
এই সরল ছড়া শুনে সারা ক্লাস হেসে উঠল। আপা কিন্তু কড়া মুখে কিছু বললেন না, বরং বললেন, “খুব সুন্দর, তোমার বন্ধুকে তুমি ফুলের সঙ্গে মিলিয়েছ। এটাই ছড়ার জাদু।” শিশুটি লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলল, তবে চোখে ফুটে উঠল আনন্দ।
পরের সপ্তাহে তারা দলবদ্ধ হলো। চার-পাঁচ জন মিলে একসঙ্গে ছড়া লেখা শুরু করল। ছোট ছোট গ্রুপগুলো বসে গেল কোণের বেঞ্চে। কারও হাতে কলম, কেউ কাগজে আঁকছে ছবি, কেউ আবার ভাবছে কোন শব্দটা ছন্দে মেলানো যায়। একটি গ্রুপ লিখল—
“সবুজ পাতায় দোলে হাওয়া,
প্রকৃতির গান শোনাও সবার কাওয়া।”
আরেকটি গ্রুপ মজার ছড়া বানাল—
“শীতের সকালে রোদ্দুর ভাই,
চুলোর ভাতের গন্ধ পাই।”
এরপর আবৃত্তির পালা। মঞ্চের মতো ছোট টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিটি গ্রুপ নিজেদের ছড়া শুনাল। হাততালি আর হইচইয়ে ক্লাসরুম ভরে গেল। এমন আবৃত্তির আনন্দ তারা আগে কখনো পায়নি।
শিক্ষক ফাতেমা আপা বুঝতে পারলেন—এভাবেই শিশুদের ভেতর জমে থাকা ভয় আস্তে আস্তে ভেঙে যাচ্ছে। আগে যেসব শিশু বই খোলার আগেই দমবন্ধ হয়ে যেত, এখন তারাই ছড়া বানাতে গিয়ে হাসছে, লাফাচ্ছে। ভুল করলে একে অন্যকে দোষ না দিয়ে বরং নতুনভাবে বানানোর চেষ্টা করছে।
একদিন তিনি ক্লাসে একটি চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করলেন। বললেন, “আজ তোমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে। যে সবচেয়ে সুন্দর বা সৃজনশীল ছড়া বলবে, সে পাবে একটি ছোট্ট পুরস্কার।” সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা চেঁচিয়ে উঠল, কেউ বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগল, কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে শব্দ খুঁজছে।
রাফি নামের এক লাজুক ছেলে, যে সাধারণত ক্লাসে চুপচাপ থাকে, হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। কাঁপা কণ্ঠে বলল—
“আকাশ ভরা পাখির গান,
শৈশব আমার রঙিন জান।”
এই চার লাইনের ছড়া শেষ হতেই শ্রেণি একযোগে তালি দিল। রাফির চোখ ভিজে উঠল আনন্দে। হয়তো এই প্রথম সে নিজের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের ঝলক দেখতে পেল।
ছড়ার সঙ্গে ছবি আঁকার বিষয়টিও যোগ হলো। শিশুরা ছড়া লিখে তার পাশে রঙতুলিতে আঁকতে লাগল বন্ধুর হাসিমুখ, পাখির উড়াউড়ি, শীতের কুয়াশা, কিংবা নদীর ঢেউ। শব্দ ও ছবির সংযোগে তাদের কল্পনার ডানা আরও বিস্তৃত হয়ে উঠল। রঙিন আঁকিবুকি যেন ছড়ার শব্দগুলোকে জীবন্ত করে তুলল।
দিন যেতে থাকল, ছড়া লেখার এই চর্চা শিশুদের ভেতরে অদ্ভুত পরিবর্তন আনল। তাদের শব্দভাণ্ডার বেড়ে গেল, বাক্যগঠন মসৃণ হলো। আগে যারা হুঁশহুঁশ করে পড়ত, এখন তারা গেয়ে গেয়ে আবৃত্তি করে। আত্মপ্রকাশের আনন্দে শিশুরা ধীরে ধীরে ভয় কাটিয়ে উঠল। যে শিশু কখনো শ্রেণির সামনে দাঁড়াত না, সে-ই এখন গর্বভরে বলছে নিজের লেখা।
সহপাঠীদের সঙ্গে মিলেমিশে ছড়া বানানোর ফলে তাদের ভেতরে সহযোগিতার বীজও রোপিত হলো। ঝগড়া কমল, একে অন্যের লেখা নিয়ে হাসাহাসি নয়, বরং সাহায্য করতে লাগল। ছোট ছোট কবিতার লাইনে তারা একে অপরকে উৎসাহ দিল।
শিক্ষক ফাতেমা আপা জানতেন—শিশুরা যদি ভুলও করে, সেটিই হলো শেখার প্রথম ধাপ। তাই তিনি কখনো বকাঝকা করতেন না। বরং প্রতিটি ভুলকে তিনি রূপ দিতেন নতুন সম্ভাবনায়। বলতেন, “দেখো, এই লাইনটা যদি একটু পাল্টাও, কেমন সুন্দর হয়!” শিশুরা আনন্দে হাততালি দিয়ে আবার নতুনভাবে লিখে ফেলত।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুরা কেবল শব্দ শেখেনি, তারা শিখেছে কল্পনার মুক্তি। ছড়া হয়ে উঠেছে তাদের আত্মবিশ্বাসের সিঁড়ি, যার প্রতিটি ধাপে তারা উপরে উঠছে।
গ্রামের অভিভাবকেরাও একসময় লক্ষ্য করলেন, তাদের সন্তানরা আগের মতো আর চুপচাপ নেই। বাড়ি ফিরে তারা মায়ের কানে ফিসফিস করে ছড়া শোনায়, ছোট বোনকে আঁকতে শেখায়। কেউ কেউ নিজের লেখা খাতা মুঠো করে লুকিয়ে রাখে বালিশের নিচে, যেন একদিন শিক্ষককে দেখাবে।
সময়ের সঙ্গে প্রভাতী বিদ্যালয়ের এই ছড়ার চর্চা ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের স্কুলগুলোতেও। একদিন স্থানীয় মেলায় শিশুরা দলবদ্ধ হয়ে আবৃত্তি করল। দর্শকরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। এরা তো সেদিনের ছোট্ট শিক্ষার্থী, অথচ আজ যেন কবির আসনে বসে গেছে।
শিক্ষক ফাতেমা আপা গর্বে ভরে উঠলেন। তার বিশ্বাস সত্যি হলো—শিশুদের প্রতিদিন একটি ছড়ার সময় দিলে তারা হয়ে ওঠে গল্প ও কবিতার ছোট্ট শিল্পী।
এই ছোট্ট গ্রামীণ শ্রেণিকক্ষে তাই জন্ম নিচ্ছে নতুন কবিরা, যারা আগামীতে হয়তো সাহিত্য জগতে আলো ছড়াবে। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা হলো—তারা নিজের কণ্ঠে খুঁজে পাচ্ছে শক্তি, নিজের হৃদয়ে পাচ্ছে সৃজনশীলতার আলো।
এভাবেই ছড়ার সহজ ছন্দে, শব্দের ছোট্ট খেলায়, আঁকিবুকির রঙিন জগতে—শিশুরা শিখছে নিজের ভেতরের মানুষকে চিনতে। আর শিক্ষক ফাতেমা আপার ক্লাসরুম পরিণত হয়েছে এক আশ্চর্য কারখানায়, যেখানে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের ছোট্ট শিল্পী, ছন্দের সৈনিক, কল্পনার অভিযাত্রী।4 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


শুরুতে ছড়া শেখার আনন্দ, তারপর প্রতিযোগিতা, ছবি আঁকা, ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস—সবই ধাপে ধাপে এসেছে। সবমিলিয়ে এক জীবন্ত ছোট গল্প হয়ে উঠেছে। চমৎকার!