Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • লাল ঠোঁটের বিজ্ঞান
    একদিন বিকেলে চায়ের টেবিলে কয়েকজন বন্ধু বসে আড্ডা দিচ্ছে। আলোচনার বিষয়বস্তু একেবারেই অপ্রত্যাশিত—“ঠোঁট কেন লাল হয়?”
    শুরুটা করল রহিম। রহিম বরাবরই বিজ্ঞানের গল্প শুনতে ভালোবাসে, তবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাঝে মাঝেই গুবলেট পাকায়। সে বলল—
    “শোন, আসল কথা হলো, মানুষের ঠোঁট লাল হয় কারণ ভেতরে ছোট্ট একটা ফ্যাক্টরি আছে। ওই ফ্যাক্টরি সারাদিন লাল রঙ তৈরি করে, আর ওই রঙ ঠোঁট দিয়ে বের হয়।”
    সবাই হো হো করে হেসে উঠল। মফিজ তো হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে বলল—
    “আরে ধুর! ঠোঁট কোনো ফ্যাক্টরি নাকি? তুমি কি ভাবছো ঠোঁটের ভেতরে ছোট ছোট রঙের মিস্ত্রি বসে রঙ মিশাচ্ছে?”
    এবার কথায় যোগ দিল সেলিম। সে সবসময় একটু সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথা বলে, কিন্তু আসলে সে-ই সবচেয়ে বড় কৌতুক অভিনেতা। সে বলল—
    “আসলে ব্যাপারটা হলো, ঠোঁট লাল থাকে কারণ মানুষ সবসময় গরম চা খায়, ঝাল খায়, মরিচ খায়—তাই গরমে ঠোঁট টকটকে হয়ে যায়। যাদের ঝাল খাওয়ার অভ্যাস কম, তাদের ঠোঁটও ফ্যাকাশে।”
    মিজান তখন শান্ত গলায় বলল—
    “তাহলে কি আমাদের গ্রামের মুনির কাকা, যিনি পেঁয়াজ ছাড়া কিছু খানই না, তার ঠোঁট কি গোলাপি না লালগোলাপি?”
    সবাই আবারো হো হো করে হেসে উঠল।
    এরপর আলোচনায় ঢুকল আসল বিজ্ঞান। টেবিলে বসা কামরুল, যে স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষক, ধৈর্য ধরে বলল—
    “আরে ভাই, আসল ব্যাপারটা হলো ঠোঁটের চামড়া খুব পাতলা। এর নিচেই আছে কৈশিক নালিকা। সেই নালিকার মধ্য দিয়ে লাল রক্ত প্রবাহিত হয়, আর সেই রঙ ঠোঁটে দেখা যায়।”
    শেখ কামরুল কথা শেষ করতেই মফিজ মুচকি হেসে বলল—
    “মানে দাঁড়াল, আমাদের ঠোঁট হলো কাঁচের বোতল, আর ভেতরে লাল শরবত ভরা আছে। তাই বাইরে থেকে শরবতের রঙ দেখা যায়, তাই না?”
    আবারো টেবিল জুড়ে হাসির রোল।
    হাসতে হাসতেই হঠাৎ আলোচনার মোড় ঘুরে গেল অন্যদিকে। রহিম বলল—
    “তাহলে কি প্রেমপত্র লেখার জন্য ঠোঁটই সবচেয়ে ভালো কলম? কারণ ঠোঁট তো সবসময় লাল কালি নিয়ে প্রস্তুত!”
    এবার তো সবার হাসি সামলানোই দায় হয়ে গেল। চায়ের কাপ টলে পড়ে গেল, বিস্কুট ভিজে ভেসে গেল, কিন্তু আড্ডার হাসির স্রোত থামল না।
    এরপর মিজান বলল—
    “এই যে ঠোঁট লাল, এই বিষয়টা নিয়েই তো কবি-সাহিত্যিকরা কত গান-কবিতা লিখেছে। কবি লিখেছেন—‘তোমার ঠোঁট লাল টকটকে, যেনো ডালিমের দানা।’ কিন্তু আসলে ব্যাপারটা তো খুব বৈজ্ঞানিক—রক্তনালীর খেলা। আহা রে রোমান্স, গিয়েছিল বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরিতে!”
    কথাটা শুনে সেলিম বলল—
    “তাহলে প্রেমে পড়ার আগে ডাক্তারি বই পড়া দরকার। কে জানে, যার ঠোঁট লাল, সে হয়তো বেশি ক্যাপিলারি আছে বলে লাল দেখাচ্ছে, না হলে হয়তো একেবারেই ঝাল খেয়ে লাল হয়ে আছে!”
    সবার হাসি আবারও বাঁধ ভাঙল।
    আড্ডার শেষ দিকে রহিম একধরনের উপসংহার টানল—
    “ভাই, আসলে ঠোঁট লাল হওয়ার মধ্যে একটা বড় শিক্ষা আছে। ঠোঁট সবসময় বলে, ভেতরে কেমন রক্ত আছে, সেই সত্যিটাই বাইরে ফাঁস হয়ে যায়। তাই জীবনে যেমন রক্ত ভালো রাখতে হয়, তেমনি মনও ভালো রাখতে হয়। কারণ মনও একসময় ঠোঁট দিয়ে বেরিয়ে পড়ে—হাসির আকারে, কথার আকারে।”
    সবাই এবার একটু থমকে গেল, আবারও হেসে উঠল—
    “এই প্রথম রহিম কোনো প্রফেসরের মতো কথা বলল।”
    চায়ের আড্ডা শেষ হলো, কিন্তু গল্পের রস থেকে গেল সবার ঠোঁটে। কেউ বিজ্ঞান শিখল, কেউ হাসির খোরাক পেল, আবার কেউবা প্রেমের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।
    ঠোঁট লাল হওয়ার সেই ছোট্ট বৈজ্ঞানিক কারণটাই হয়ে উঠল এক বিকেলের সবচেয়ে রঙিন ও আনন্দময় আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু।

    3
    4 Comments
Skip to toolbar