Profile Photo

নাদিম হোসাইনOffline

  • Nadim-Hossain
  • ========================স্বপ্নীল কারাগার==========================
    লেখকঃ নাদিম হোসাইন।।
    পর্ব নাম্বারঃ ১৮
    ——————————————————————————————————————
    সকাল ৭:৩২ বাজে। আজ ভার্সিটিতে যাবে না অর্পিতা। কারন আজ আবীর এর সাথে তার বাসর হবে। কি অদ্ভুত একটা বিয়ে করলো তারা। অর্পিতা তার জানালার পাশে দাড়িয়ে প্রকৃতিটা দেখছে। আজ সকালটা অনেক সুন্দর মনে হচ্ছে তার কাছে। কিন্তু কেন মনে হচ্ছে সেটা সে জানে না। তবে আজ সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেই সে শুধু আবীর কে নিয়ে ভাবছে। আবীর এখন তার বর। তবে এমন একটা বর যে কিনা আমার থেকেও ছোট। কিন্তু সে আমাকে অনেক ভালোবাসে। উফফফ এই কথাটা ভাবতেই খুব ভালো লাগছে। কিন্তু আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু আর না। এখন থেকে শুধু ভালোবাসবো, অনেক ভালোবাসবো। আচ্ছা আবীর কি এত সকালে জেগে আছে..!! মনে হয়না। আচ্ছা একটা ফোন দেবো..!!! নাহহহ এখন না, একটু পর দেবো।। আবীরকে কখনও বলতে পারিনি আমি ওকে কতটা ভালোবাসি। আজ আমাদের বাসর ঘরেই আমি তাকে বলবো, তাকে আমি কতটা ভালোবাসি। কিন্তু আবীরকে কি আমি আগেও ভালোবসতাম..?? হ্যা ভালোবাসতাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি কখনও। এখন আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, “ আবীর আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।” কিন্তু আমাদের বাসরটা যদি আমরা রাতে করতে পারতাম, তবে বেশি ভালো হতো। কিন্তু যত সমস্যা আমার পরিবার নিয়ে। একটি রাতও আমাকে রাতে ছাড়বে না। ধুর বাসর তো বাসরই। সেটা দিনে হোক কিংবা রাতে। আচ্ছা আবীরকে আজ একটা গিফট দিতে হবে। হাজার হোক আজ আমাদের বাসর বলে কথা। কিন্তু কি গিফট দেয়া যায়..!! আবীরকে আজ পর্যন্ত কখনও কিছু দেওয়া হয়নি। আজ ওকে কিছু একটা গিফট দিয়ে বাসরটাকে স্মরণীয় করে রাখতে হবে। আল্লাহ্ ভালো জানে আজ আবীর আমার জন্য কি কি প্লান করে রাখছে। ও হয়তো আমাকে সারপ্রাইজ করতে অনেক কিছুই ভেবে রাখছে। সময়তো এখন কিছু ঘন্টার মাত্র। কিন্তু সকালটা কেন যেন কাটতে চাইছে না। মনে হচ্ছে সময়টা থেমে আছে। তবে আজ থেকে আমি বলতে পারবো আমার হাসবেন্ড সেরা। ফেসবুকে এ তো কালই স্টাটাস পরিবর্তন করে Married দিয়েছি। আজ আবীর এর সাথে কাপল ছবি তুলে সেটা আপলোড দিয়ে দিবো এবং লিখে দিবো, “He is my husbend and I love him so much.” আচ্ছা আবীর কি স্টাটাস পরিবর্তন করেছে। তবে আজ থেকে আবীর এর সাথে ভদ্র আর নম্রভাবে কথা বলতে হবে। হাজার হোক সে এখন থেকে আমার বর বলে কথা। ওর পায়ের নিচেই আমার জান্নাত। ধুর ছাই, কিসব ভাবছি সেই কখন থেকে। যত্তসব আজেবাজে চিন্তা। নাহ আমি আর পারছি না। আবীরকে একটা কল দেই। দেখি ওকি ঘুমিয়ে আছে নাকি জেগে আছে। কিন্তু যদি ও বিরক্ত হয়। নাহ ওকে কোন বিরক্ত করা যাবে না। ও একটু শান্তি মত ঘুমাক। ওর সকল চিন্তা শেষ। এখন থেকে শান্তি মত ঘুমাবে ও।।

    অর্পিতার ফোনটা বেজে উঠলো। অর্পিতার ভাবনাগুলো থেমে গেলো। সে মনে মনে ভাবছে নিশ্চই আবীর ফোন করেছে। সে জানালার কাছ থেকে সরে তার খাটের দিকে এগিয়ে গেল। খাটের উপর মোবাইলটা ছিল। মোবাইলটা হাতে নিল। কিন্তু কি ব্যাপার এতো আবীর না। তার বান্ধবী রেশমার ফোন। সে ফোনটা রিসিভ করেই বলল…..
     Good Morning বন্ধু।।
     কোথায় আছিস তুই..??
     বাসায় আছিরে।
    রেশমা খুব অস্থির স্বরেই বলছে….
     তুই এক্ষুনি ভার্সিটির গেটে আয়।
     নাহহ রে দোস্ত আমি আজ ভার্সিটি তে যাবো না।
    রেশমা এবার আবার অস্থির স্বরে বলছে…
     প্লিজ অর্পিতা, তুই পাঁচ মিনিটের মধ্যে আয়। তোকে ক্লাসে যেতে হবে না। আর আমরা ক্লাসে কেউ যাবো না।
    অর্পিতা একটু অবাক হয়ে বলল….
     ওহহহ। কিন্তু কেন রে.. কোথাও যাবার প্লান করছিস নাকি। তাহলে আমি একেবারে রেডি হয়ে আসি। জানিসতো আজ আমার আবীর এর সাথে……
    রেশমা কথা শেষ করতে না দিয়ে একটু রেগে বলছে….
     প্লিজ দোস্ত।। তুই একটু জলদি আসবি। তোর জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।
    অর্পিতা একটু হকচকিয়ে গেল। সে বলল….
     ওহহহ।। কেন কি হয়েছে দোস্ত। তোর কি কোন বিপদ হয়েছে নাকি!!!
     দোস্ত, তোকে আমি সব বলছি। কিন্তু তুই প্রশ্ন না করে একটু জলদি বের হ। তু্ই আসলেই সব জানতে পারবি। দেরি করিস না। রাখলাম।।

    রেশমা ফোনটা কেটে দিল। অর্পিতা একটু বিষন্ন হয়ে গেল। যাই হোক যাওয়ার পথে মার্কেট থেকে আবীর এর জন্য একটা গিফট কিনে নিয়ে আসবো। আবীরকে কি একটা ফোন দেবো!! ওহহহহহ আবার আবীর। নাহ এই ছেলেটাতো আমার মাথাটা নষ্ট করে দিল মনে হয়।
    অর্পিতা চুলটা ঠিক করে আর ড্রেসটা Change করে বেরিয়ে পড়লো। সে গিয়ে দেখলো রেশমা সহ তার আরও কিছু বান্ধবী দাড়িয়ে আছে। অর্পিতা আসতেই তারা একটা রিক্সায় উঠে পড়লো অর্পিতাকে নিয়ে। অর্পিতা প্রশ্ন করলো কি ব্যাপার কোথায় যাচ্ছিস, কিছু কি হয়েছে। কিন্তু রেশমা শুধু বলল, চল তো ভাই। গেলেই দেখতে পারবি। অর্পিতা আর কিছু বলল না। তবে তার মেজাজটা একটু গরম হয়ে গেছে। কিছু বলতে পারছে না। কারন রেশমা তাকে অনেক সাহায্য করেছে। চুপ চাপ রিক্সায় বসে থাকা ছাড়া আর কোন উপায়ও নেই।

    একটু পর রিক্সাটা আবীর এর বাসার সামনে থামলো। অর্পিতা কিছু বলার আগেই রেশমা ভাড়া দিয়ে ভেতরে ঢুকলো অর্পিতাকে নিয়ে। অর্পিতা ভেতরে ঢুকতেই অবাক হয়ে গেল এবং ধীরে ধীরে সামনে এগুলো। সে বুঝতে পারছে না এখানে এত ভীড় হবার কারন কি..? রেশমার ছোট ভাই এগিয়ে আসলো। তারপর তাদের নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। অর্পিতা কিছুটা সামনে গিয়ে থেমে গেল। সে আর যেতে পারলো না। মনে হচ্ছে তার পা আর চলছে না। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কারন সামনে আবীর এর নিথর দেহ পরে আছে। অর্পিতা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। কিন্তু কিছু বলতে বা বুঝতে পারছে না। একজন ভদ্র মহিলা সামনে এগিয়ে আসলেন। তারপর হাউমাউ করে কাদতে কাদতে অর্পিতাকে জড়িয়ে ধরলেন। আর কাদঁতে কাদঁতে বলছেন…..
     মা’রে!! আমার ছেলেটা নেইরে মা। আমার সোনার টুকরো ছেলেটা নেইইইই।।।।
    অর্পিতার শরীরে কোন শক্তি পাচ্ছে না। কেমন যেন বুকের ভেতরটায় খুব যন্ত্রনা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে ভেতরটা খালি খালি লাগছে। তার চোখ যেন সরতে চাইছে না আবীর এর থেকে। আবীর এর মা আবার বলছেন…..
     আমি পারলাম না আমার ছেলেকে তার পছন্দের বাইকটা দিতে।। আমি পারলাম না। ( বলেই আবার কান্না করতে থাকলেন।))
    অর্পিতা বুঝতে পারলেন ইনি আবীর এর মা। কিন্তু আবীর মরতে পারে না। কাল রাতেও তার সাথে কথা হয় আমার। কিভাবে সম্ভব এটা। কাল রাতে অনেকটা সময় আমরা একসাথেই ছিলাম। এ হতে পারে না। শানু বেগম অর্পিতাকে নিয়ে নিস্তেজ শরীর এর পাশে গিয়ে বসলেন। অর্পিতা তার হাতটা ধীরে ধীরে আবীর এর মুখে স্পষ করলো। তারপর বলতে থাকলো…….
     আবীর….. এই আবীর…. উঠো না। কি হয়েছে তোমার। আমি এসেছি তো। দেখো তুমি। অনেক হয়েছে…. এখন উঠো। আজ আমরা বাসর করবো। তোমাকে বিরক্ত করিনি আজ সকালে। উঠ প্লিজ সোন। উঠো না। আমি আজ তোমাকে ঘুমাতে দিয়েছি সকালে। কিন্তু এতক্ষন নয়। উঠো প্লিজ। (অর্পিতা এইবার কাদঁতে থাকলো আর বলতে থাকলো।) এই আবীর, আমি যে তোমাকে এখনও বলতেই পারলাম না, তোমাকে আমি কতটা ভালোবাসি। প্লিজ উঠো। তোমাকে আমার অনেক কথা বলার আছে। আজ তোমাকে আমি আমার মনের সব কথা বলবো তো। উঠো না গো।
    শানু বেগম কাদঁতে কাদঁতে বলছেন…
     মা’রে তোর আবীর যে মারা গেছে মা। ও আর উঠবে না। (শানু বেগম আরও হাউমাউ করে কাদঁতে থাকলেন আর বলছেন) ওর বোন বলেছিল আজ ওকে শাষন করবে। কিন্তু তা আর হলো না। তুই কান্না কর মা। তুই কান্না কর। কান্না কর……..

    একথা শেষ না হতেই অর্পিতা শানু বেগমকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল। যেন তার পৃথিবীতে আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। কাদঁতে কাদঁতে অর্পিতা জ্ঞান হারিয়ে ফেলল…
    তার আর স্বামীর সোহাগ পাওয়া হলো না। যাকে এত ভালোবাসলো সে আজ তার চোখের সমনে মৃত।
    একটু দুরে একটা চেয়ারে হেলানো অবস্থায় পড়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন লোকমান সাহেব। তার চোখ দিয়ে নীরবে পানি ঝড়ছে। তার শরীর-এ একটু শক্তি নেই যে উঠে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরবে। শুধু তাকিয়ে দেখছে তার প্রিয় ছেলেটার নিস্তেজ দেহ। আজ তার কারনেই হয়তো রোড এক্সিডেন্ট-এ মারা গেল তার ছেলে। তার পাপের ফল এটা। তার আর বেচেঁ থাকার আশা নেই। সে আর কিছু ভাবতে পারছে না। শুধু তাকিয়ে আছে তার ছেলের মায়া ভরা মুখের দিকে। আজ তার সন্তান তার আগেই চলে গেল। সে ভাবতেই পারছে না। চুপচাপ শুধু তাকিয়ে আছেন।।

    To be continue….

    1
    4 Comments
Skip to toolbar