Profile Photo

অনন্যা অরী ( ছদ্মবেশী )Offline

  • sansri
  • শহরে বৃষ্টি আজও থামেনি। মীরার মনে হয়, আকাশটা যেন আজ তার হয়েই কাঁদছে। বাস স্টপেজের এক কোণে দাঁড়িয়ে সে একা। তার পরনের সাদা শাড়ির লাল পাড়টা বৃষ্টির ছোঁয়ায় ভিজে আরও গাঢ় হয়েছে। হাতে ধরা লাল গোলাপটা বৃষ্টির তোড়ে তিরতির করে কাঁপছে, ঠিক যেমন কাঁপছে মীরার ভেতরটা। মীরার চোখে অস্থিরতা—কার যেন অপেক্ষা।

    ​মীরা আর বিহানের পরিচয় হয়েছিল পাঁচ বছর আগে, ভার্সিটির করিডোরে। মীরা ছিল সচ্ছল পরিবারের আদুরে মেয়ে, যার হাসিতে পুরো ক্যাম্পাস মেতে থাকত।
    আর বিহান ? মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে, যার কাঁধে ছিল সংসারের হাজারো দায়ভার। বিহানের বাবা মারা যাওয়ার পর টিউশনি করে তাকে নিজের পড়াশোনা আর ছোট বোনের খরচ চালাতে হতো। মীরা তাকে ভালোবাসত নিঃস্বার্থভাবে, কিন্তু বিহান সবসময় একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখত নিজের চারপাশে। সে জানত, মীরার বাবা কখনোই একজন সাধারণ টিউশনি করা ছেলেকে তার মেয়ের জামাই হিসেবে মেনে নেবেন না।

    ​বিহানের পরিবার থেকে বিয়ের চাপ আসছিল তার বোনের জন্য, আর মীরার বাড়িতে তখন চলছিল মীরার জন্য ডাক্তার পাত্র খোঁজার ধুম। মীরা বহুবার বিহানকে বলেছে,

    “একবার শুধু আমার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলো তুমি আমাকে চাও।”

    কিন্তু বিহান সাহসের অভাবে পিছিয়ে যেত। তার মনে হতো, অভাবের সংসারে মীরাকে নিয়ে আসা হবে তার ওপর অন্যায় করা। এই আত্মসম্মান আর দ্বিধাই আজ তাদের এই মোহনায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

    ​রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে বিহান অনেকক্ষণ ধরে মীরাকে দেখছে। তার মনটা আজ চুরমার হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ আগে সে জানতে পেরেছে, মীরার বাবা আজই তার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। বিহান আজ শেষবারের মতো এসেছে, হয়তো কিছু বলতে, নয়তো সব হারিয়ে ফেলতে। তার চোখের কোণে বৃষ্টি জমে আছে, যা বৃষ্টির জলে মিশে একাকার। সে ভিজে জবজবে হয়ে সাহস সঞ্চয় করে মীরার দিকে এগিয়ে গেল। শার্টটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে, চুলগুলো অবিন্যস্ত, কিন্তু তার চোখ দুটো হন্যে হয়ে মীরার চোখের দিকে তাকাচ্ছে।

    ​বিহানকে কাছে আসতে দেখে মীরা তাকাল। তার ঠোঁটে একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল, যাতে মেশানো ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা গভীর কষ্ট।

    বিহানকে দেখে মীরা কিছুটা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠল,

    “তুমি এলে? কিন্তু আজও কি শুধু দাঁড়িয়েই থাকবে? কিছু বলবে না?”

    ​বিহানের গলা আটকে এল। সে চারপাশের ব্যস্ত শহর আর বৃষ্টির শব্দে নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলল।
    সেদিকে তাকিয়ে মীরা বিষণ্ণ হেসে বলে উঠল,

    “তুমি তো সবসময় এভাবেই বলো—‘আসলে কী বলব?”

    ​বিহানের মুখে এবার এক কঠিন হাসি। সে ম্লান স্বরে বলল,

    “আমার অনেক কিছু বলার ছিল, মীরা। অনেকগুলো বছর, অনেকগুলো রাত আমি মহড়া দিয়েছি তোমাকে কী বলব। কিন্তু আমি সবসময়ই দেরি করে ফেলি, তাই না?”

    ​মীরা তার চোখ সরিয়ে নিল রাস্তার অন্ধকারের দিকে।

    “হয়তো। কিন্তু আজ দেরিটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। এখন আর কিছু বলার জায়গা অবশিষ্ট নেই।”

    ​বিহানের বুকের ভেতরটা যেন কেউ ধারালো অস্ত্র দিয়ে চিরে দিচ্ছে। সে কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,

    “তুমি কি… সত্যিই অন্য কারোর জন্য অপেক্ষা করছো? অবশেষে আঙ্কেল তোমাকে রাজি করাতে সক্ষম হলো?”

    ​মীরা চুপ করে রইল। তার চোখে টলমল করছে জল, কিন্তু সে চায় না বিহান তার দুর্বলতা দেখুক। সে নিচু স্বরে বলল,

    “হ্যাঁ, আমি অপেক্ষা করছি। কিন্তু কার জন্য জানি না। হয়তো এক নতুন বন্দিজীবনের জন্য, নয়তো এই বৃষ্টির শেষ হওয়ার জন্য।”

    ​বিহানের ঠোঁট কাঁপছে। সে বলল,

    “মীরা, আমি চাই না তুমি আর আমার জন্য অপেক্ষা করো। আমি তোমাকে দেওয়ার মতো কিছুই জোগাড় করতে পারিনি। আমি চাই না আমার এই টানাপোড়েনের জীবনে এসে তুমি কষ্ট পাও।”

    ​মীরা তাকাল বিহানের দিকে, তার চোখে এখন অদ্ভুত এক শূন্যতা।

    “তুমি জানো, বিহান ? আমি তোমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু আজ বুঝতে পারলাম, ভালোবাসা যখন একপাক্ষিক হয়ে যায়, কিংবা একপক্ষ যখন শুধু ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, তখন সেই ভালোবাসার কোনো মানে থাকে না। সাহস ছাড়া ভালোবাসা টেকে না।”

    ​বিহান মাথা নিচু করল। তার কাঁধ থেকে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে ধরা গলায় বলল,

    “তুমি ঠিকই বলেছো। আমি সবসময়ই তোমার কাছে আসতে চেয়েছি, কিন্তু আমার অভাব আর দায়িত্ব আমাকে আটকে দিয়েছে। আমি দুঃখিত।”

    ​মীরা ম্লান হেসে বলল,

    “তোমার জন্য অপেক্ষা করাটাই আমার ভুল ছিল। আমি ভেবেছিলাম তুমি এসে সব সামাজিকতা ভেঙে আমাকে রক্ষা করবে, কিন্তু তুমি এলে না।”

    ​ঠিক তখনই শহরের শেষ বাসটা এসে স্টপেজে দাঁড়াল। মীরা আর দেরি করল না। সে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে পেছনে না তাকিয়েই বলল,

    “আমি অপেক্ষা করতে করতে বড্ড ক্লান্ত বিহান, তাই আর অপেক্ষা না। সব প্রতীক্ষার শেষ বিহান, সব শেষ।”

    ​বিহানের মনে হলো তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। সে কয়েক পা দৌড়ে গিয়ে আর্তনাদ করে বলল,

    “মীরা, প্লিজ… আরেকটু সময় দাও! আমি সব ঠিক করে নেব!”

    ​মীরা জানালার পাশে বসে শেষবারের মতো পেছনে তাকাল। তার চোখে তখন শ্রাবণের ধারা। সে অস্ফুট স্বরে বলল,

    “সময় অনেক দিয়েছিলাম, বিহান। এবার আর নয়।”

    ​বাসের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ধোঁয়া ছেড়ে বাসটা ধীরে ধীরে ধোঁয়াটে বৃষ্টির মাঝে মিলিয়ে যেতে লাগল। মীরা জানালার কাঁচে হাত রেখে দেখল বিহানের আবছা অবয়বটা ছোট হয়ে আসছে। সে মনে মনে বলল,

    “ভালো থেকো, বিহান। আমার অপূর্ণতা হয়েই থেকো।”

    ​বিহান দাঁড়িয়ে রইল সেই জনশূন্য স্টপেজে। তার হাতের মুঠোয় মীরার ফেলে যাওয়া সেই লাল গোলাপটা। বৃষ্টির ঝাপটায় গোলাপের পাপড়িগুলো একটা একটা করে খসে পড়ছে কাদার ওপর, ঠিক যেমন ঝরে গেল তাদের দীর্ঘ পাঁচ বছরের লালিত স্বপ্ন। বিহান একা, বৃষ্টিতে ভেজা এক ব্যর্থ প্রেমিক, যার চোখে এখন শুধু অপ্রাপ্তির নোনা জল আর এক অনন্ত হাহাকার।

    অনুগল্প: #শেষ_বিকেলের_অপেক্ষায়
    লেখিকা : #অনন্যা_অরী ( ছদ্মনাম )

    5
    6 Comments
Skip to toolbar