Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    2 months, 2 weeks ago

    বীরত্বের অন্য নাম: সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ও মানবতার এক অনন্য অধ্যায়

    ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মধ্যযুগের ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ ছিল রক্তক্ষয়ী এক সংঘাত। ১০৯৫ থেকে ১২৯১ সাল পর্যন্ত চলা এই লড়াইয়ে যখন ধর্মের নামে তরবারি গর্জে উঠত, ঠিক তখনই একজন মানুষ তাঁর মহানুভবতা দিয়ে জয় করেছিলেন খোদ শত্রুদের মন। তিনি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, সত্যিকারের বিজয় রক্তপাতে নয়, বরং ক্ষমা আর দয়ায়।

    ১. জেরুজালেম বিজয়: প্রতিশোধ নয়, ছিল বিনম্রতা
    ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের সময় খ্রিস্টান বাহিনী যখন জেরুজালেম দখল করেছিল, তখন রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। কিন্তু দীর্ঘ ৮৮ বছর পর ১১৮৭ সালে সুলতান যখন শহরটি পুনরুদ্ধার করেন, তিনি দেখিয়েছিলেন বিরল ধৈর্য। তিনি কোনো রক্তপাত বা লুণ্ঠন তো করেননিই, বরং শত্রু শিবিরের সাধারণ মানুষকে নিরাপদে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

    ২. দরিদ্রদের জন্য সুলতানের মমতা
    শহর ত্যাগের জন্য সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সামান্য কর ধার্য থাকলেও, সালাহউদ্দিনের চোখে পড়ল অসহায় দরিদ্র পরিবারগুলো। মানবিক সুলতান তখন ঘোষণা করলেন যে, যারা টাকা দিতে পারবে না তারা কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত। তিনি এবং তাঁর ভাই আল-আদিল ব্যক্তিগত তহবিল থেকে হাজার হাজার বৃদ্ধ ও নারীর মুক্তিপণের ব্যবস্থা করে দেন। এমনকি বিধবাদের জন্য বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করেন।

    ৩. রাজা রিচার্ডের সাথে সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ক
    হ্যাঁ, রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট (The Lionheart) কথাটি একদম সত্য। তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা এবং সালাহউদ্দিনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু তাদের শত্রুতা ছিল কেবল যুদ্ধের ময়দানে, ব্যক্তিগতভাবে তারা একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন।

    বিপদে বন্ধুর মতো: রিচার্ড যখন জ্বরে শয্যাশায়ী, তখন যুদ্ধের মাঠ থেকে সালাহউদ্দিন তাঁর জন্য নাশপাতি, আঙুর এবং পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা বরফ পাঠিয়েছিলেন শরীর শীতল করার জন্য।

    রাজকীয় সম্মান: রিচার্ডের ঘোড়া মারা গেলে সুলতান তাঁকে উন্নত মানের দুটি ঘোড়া উপহার পাঠান এই বলে যে— “এমন বীর রাজার পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করা সাজে না।” এটি ইতিহাসের এক অবিশ্বাস্য উদারতার নিদর্শন।

    ৪. ধর্মীয় সহনশীলতার আদর্শ
    জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের পর সুলতান কোনো উপাসনালয় ধ্বংস করেননি। বরং খ্রিস্টানদের গির্জাগুলো অটুট রেখেছিলেন এবং তীর্থযাত্রীদের জন্য পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তাঁর এই ধর্মনিরপেক্ষ আচরণের কারণেই আজও ইউরোপের ঐতিহাসিকরা তাঁকে একজন ‘নাইট’ বা আদর্শ বীরের মর্যাদা দেন।

    ৫. নতুন একটি তথ্য: সুলতানের শেষ সঞ্চয়
    সুলতানের উদারতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর মৃত্যুর পর। দীর্ঘকাল শাসন এবং এতগুলো যুদ্ধের পর যখন তাঁর মৃত্যু হয়, দেখা গেল তাঁর ব্যক্তিগত কোষাগারে একটি সোনার মুদ্রা কিংবা নামমাত্র রুপার মোহরও নেই। তিনি তাঁর সমস্ত সম্পদ দরিদ্রদের কল্যাণে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করে গিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর জানাজা ও দাফনের খরচও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ধার নিতে হয়েছিল।

    “আমি চাই না এক ফোঁটা রক্তও বৃথা ঝরুক, কারণ রক্ত কখনো ঘুমায় না।”

    — সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী

    সালাহউদ্দিন আমাদের শিখিয়েছেন, তরবারি দিয়ে এলাকা দখল করা যায়, কিন্তু ভালোবাসা আর ক্ষমা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। ইতিহাসের ধুলোবালি ভেদ করে আজও তাই তাঁর নাম শ্রেষ্ঠ বীরদের তালিকায় উজ্জ্বল হয়ে আছে।

    3
    2 Comments
Skip to toolbar