Profile Photo

মোঃ রুবায়েত রহমান রাফিOffline

  • একা একা এই পথে

    মোঃ রুবায়েত রহমান রাফি

    ৬.

    রাত দশটা।

    আরিফ ফোন হাতে নিয়ে মায়ার প্রোফাইলে গেল।

    প্রোফাইল পিকচারে মায়া হাসছে।

    ক্যাপশন

    হারিয়ে যেতে ভালো লাগে।

    আরিফ কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

    মায়ার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।

    সে প্রায়ই হঠাৎ করে নিজের ফেসবুক আইডি ডিঅ্যাকটিভেট করে দিত। কয়েকদিন পর আবার হঠাৎ ফিরে আসত।

    কখনও এক সপ্তাহ।

    কখনও দশ দিন।

    কখনও তারও বেশি।

    কেউ জিজ্ঞেস করলে মায়া শুধু বলত,

    অনলাইনে থাকতে ভালো লাগে না।

    আরিফ এসব জানত।

    তবু মায়ার প্রোফাইলের ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, কিছু মানুষকে অনলাইনে পাওয়া না গেলেও তাদের অনুপস্থিতিটা খুব সহজে বোঝা যায়।

    সে টাইপ করল

    কী করছো?

    সেন্ড করার আগেই হঠাৎ রিফ্রেশ দিল।

    প্রোফাইলটা উধাও।

    আরিফ ফোনটা কিছুক্ষণ হাতেই ধরে রাখল।

    তারপর ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর রেখে দিল।

    সিগারেট জ্বালাল।

    ধলা এসে তার পাশে শুয়ে পড়ল।

    আরিফ বিড়ালটার দিকে তাকিয়ে বলল,

    মায়া আবার আইডি ডিঅ্যাকটিভেট করল।

    ধলা চোখ মেলল।

    আরিফ একটু হেসে বলল,

    আবার কবে আসবে কে জানে।

    কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,

    ফোন করলে কেমন হয়?

    ধলা এবারও কোনো উত্তর দিল না।

    আরিফ বলল,

    নম্বর তো আছে।

    কিছুক্ষণ পর সত্যিই কল দিল।

    রিং হলো।

    একবার।

    দুবার।

    তিনবার।

    কেউ ধরল না।

    আরিফ ফোনটা কানে রেখেই বসে রইল।

    তারপর কল কেটে গেল।

    সে নিজেকেই বলল,

    হয়তো ধরবে না, জানতাম।

    কিন্তু মানুষ কিছু কিছু জিনিস জানার পরও করে।

    কারণ আশা জিনিসটা যুক্তির কথা খুব একটা শোনে না।

    মায়া মাঝে মাঝে এমনই করে।

    হঠাৎ আসে।

    হঠাৎ হারিয়ে যায়।

    কিন্তু আজ কেন যেন তার মনে হলো,

    মায়া এবার শুধু ফেসবুক থেকে হারায়নি।

    আরিফের কাছ থেকেও একটু দূরে সরে গেছে।

    হয়তো এটা শুধু আরিফের মনের কথা।

    হয়তো মায়া আগের মতোই আছে।

    কিন্তু কিছু কিছু দূরত্ব তৈরি হওয়ার জন্য দুজন মানুষের দূরে যাওয়া লাগে না।

    একজনের একটু চুপ হয়ে যাওয়াই যথেষ্ট।

    কয়েকদিন পর।

    সকাল।

    আরিফ ভার্সিটিতে এসেছে।

    বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ শিউলিকে দেখা গেল।

    সাদা শার্ট।

    নীল জিন্স।

    চুল খোলা।

    শিউলি আরিফের থেকে দুটো টেবিল দূরে গিয়ে বসল। সঙ্গে আরও দুজন মেয়ে।

    শিউলি হাসছিল।

    কিন্তু আরিফের দিকে তাকাচ্ছিল না।

    আরিফের মন বলল
    যা, কথা বল।

    পা-ও যেন বলল

    যা।

    আরিফ উঠে দাঁড়াল।

    দুই পা এগিয়েও গেল।

    তারপর থেমে গেল।

    কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসে পড়ল।

    ঠিক তখনই শিউলি ফোন বের করল।

    কারও সঙ্গে কথা বলছে।

    হ্যাঁ, আমি আসছি। পাঁচ মিনিট।

    ফোনটা রেখে শিউলি উঠে দাঁড়াল।

    আরিফ আর এগোল না।

    পাশ থেকে রনি বলল,

    ও তোর দিকে তাকায় না কেন?

    আরিফ হালকা হেসে বলল,

    ওইদিনের পর আর সেভাবে কথা হয়নি। অভিমান করেছে হয়তো। রাগও করতে পারে।

    রনি বলল,

    তুই কিছু বলিসনি?
    আরিফ সিগারেটের ছাই ঝেড়ে বলল,

    সব কথা বলা যায় না রে।

    রনি একটু হেসে বলল,

    কিছু কথা না বললেও বুঝতে হয়।

    আরিফ কিছু বলল না।

    দূরে শিউলি তখনও হাসছিল।

    কিন্তু সেই হাসিটা আরিফের কাছে কেমন যেন অনেক দূরের মনে হলো।

    সেই রাত।

    আরিফের ঘুম আসছে না।

    ঘরের বাতি নিভানো।

    জানালার বাইরে অন্ধকার।

    হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।

    আরিফ ফোন হাতে নিল।

    স্ক্রিনে মায়ার নাম।

    তার হাতটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

    মায়ার মেসেজ।

    আরিফ অনেকক্ষণ শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

    তারপর লিখল—

    ভালো আছি। আপনি?

    কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুছে দিল।

    আবার লিখল—

    আপনার আইডি ডিঅ্যাকটিভেট কেন?

    মুছে দিল।

    তারপর অনেকক্ষণ ভেবে লিখল—

    আপনাকে মিস করছি।

    এটাও মুছে দিল।

    শেষে লিখল—

    ভালো আছি। আপনি আইডি ডিঅ্যাকটিভেট কেন করেছিলেন?

    সেন্ড করল।

    বিশ মিনিট পর উত্তর এলো

    ভালো আছি। আইডি খোলার ইচ্ছে নেই। অনলাইনে কম আসব। ভার্সিটিতে দেখা হলে কথা বলব।

    আরিফ মেসেজটা পড়ল।

    আবার পড়ল।

    তারপর ফোনটা বালিশের পাশে রেখে দিল।

    কোনো উত্তর দিল না।

    জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।

    বাইরে তখনও অন্ধকার।

    কারণ কিছু কিছু উত্তরের জন্য শব্দ লাগে না।

    শুধু অপেক্ষা লাগে।

    4
    5 Comments
    • তিনটি মেয়ের সাথে আরিফের এই জটিল সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি এত সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রতিটা ছোট ইঙ্গিত গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করছে।

    • “কিছু কিছু দূরত্ব তৈরি হওয়ার জন্য দুজন মানুষের দূরে যাওয়া লাগে না, একজনের একটু চুপ হয়ে যাওয়াই যথেষ্ট”—আপনার এই নিপুণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানুষের মনের সূক্ষ্ম অস্থিরতা ও আবেগের যে গভীরতা আপনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা সত্যিই এক অনন্য ও হৃদয়স্পর্শী সংযোজন।

    • চুপ হয়ে যাওয়া মানুষের অনুপস্থিতিতেও ভালোবাসা টিকে থাকে অপেক্ষার নীরব ভাষায়…..🤍🖤

    • আজকালকার প্রেমের বাস্তবতাটা ভাসলো😄

    • লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগল, বিশেষ করে ‘কিছু কিছু জিনিস জানার পরও মানুষ করে, কারণ আশা জিনিসটা যুক্তির কথা খুব একটা শোনে না’ লাইনটা একদম মনের মতো হয়েছে। আরিফ আর মায়ার এই নীরবতার টানাপোড়েন খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আপনি। গ্রুপে সবার লেখাগুলো নিয়মিত পড়ে লাইক আর কমেন্ট করলে আমাদের কমিউনিটিটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে, তাই আপনিও একটু সময় করে অন্যদের লেখাগুলোতে আপনার সুন্দর মন্তব্য জানাবেন।

Skip to toolbar