-
৭. একা একা এই পথে
মোঃ রুবায়েত রহমান রাফিচার সপ্তাহ পর আরিফ আর মায়ার দেখা হলো ক্যাম্পাসে। মায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আরিফ কাছে যেতেই মায়া বলল,
আরিফ, তোর সাথে একটা কথা আছে।
বল।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,তুই আমার পিছনে ঘুরঘুর করিস আমার ভালো লাগে না।
তুই সিগারেট খাস,এসব আমার পছন্দ না, আর আমাকে বারবার ডাকিস না ,আমার একা থাকতে ভালো লাগে।আরিফ কিছু বলল না,শুধু মাথা নেড়ে রইল।
মায়া বলল,
তুই কবিতা লিখিস,ভালো। কিন্তু কবিরা বাস্তব বুঝতে পারে না। তুই স্বপ্নে থাকিস, আর আমি বাস্তবে, স্বপ্ন আর বাস্তবের মিল হয় না, বাস্তবে এসব চলে না।
একটু থেমে মায়া বলল,
আমি বাস্তব মেয়ে, তুই স্বপ্ন দেখিস আমাদের মিল হবে না।
মায়া চলে গেল।মায়ার বাবা ছিলেন একজন ডাক্তার ছোটবেলা থেকেই তিনি মেয়েকে বলতেন,
স্বপ্ন দেখবি,
মানুষ স্বপ্ন ছাড়া বাঁচতে পারে না তবে স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার হিসাবটাও রাখতে হয়।ডাক্তার হওয়া ছিল তাঁর নিজের স্বপ্ন অনেক বাধা পেরিয়ে তিনি সেই স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন।
তাই তিনি স্বপ্নকে কখনো খারাপ কিছু মনে করতেন না। শুধু চাইতেন, মায়া যেন স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি মাটিতে পা রেখেও হাঁটতে শেখে।
মাঝে মাঝে হেসে বলতেন,
স্বপ্ন দেখবি, কিন্তু পা যেন মাটিতে থাকে।
ছোটবেলায় মায়া কথাগুলোর অর্থ বুঝত না।
বাবা মারা যাওয়ার পর বুঝতে শুরু করল।
মায়ের স্কুলের চাকরি আর মায়ার টিউশনের টাকা দিয়ে সংসার চলে।নিজের পড়াশোনার খরচের কথাও তাকে ভাবতে হয়। ক্লাস, টিউশন, সংসারের হিসাব সবকিছুর মধ্যে কবিতা পড়ার জন্য দীর্ঘ দুপুর পড়ে থাকে না বসে বসে স্বপ্ন দেখার সময়ও নেই।
মায়া তখন বুঝল, বাবা ভুল বলেননি।
স্বপ্ন দরকার কিন্তু স্বপ্নেরও একটা দাম আছে।তাই মায়ার কাছে স্বপ্ন এখন শুধু সুন্দর কোনো শব্দ নয়। কখনো কখনো সেটা বিলাসিতা।
আরিফ যখন কবিতা লেখে, ভালোবাসার কথা ভাবে, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে মায়ার ভেতরে অদ্ভুত এক বিরক্তি তৈরি হয়।
তাচ্ছিল্য নয়।
বরং একটু হিংসা।
কারণ আরিফ এখনও স্বপ্ন দেখতে পারে।
আর মায়া জানে, তাকে বাস্তবের মধ্যেই বাঁচতে হবে।
সেদিন তাই আরিফকে স্বপ্ন বলার সময় মায়া শুধু আরিফকে বোঝাচ্ছিল না নিজেকেও বোঝাচ্ছিল।
স্বপ্ন দেখে লাভ নেই।
পা মাটিতেই রাখতে হয়।
আরিফ ক্লাসের দিকে চলে গেল আজকের শেষ পিরিয়ড শেষ করে বাসায় যাবে।
সেই রাতে আরিফ ডায়েরি খুলে লিখল
মায়া বলল, স্বপ্ন আর বাস্তবের মিল হয় না।
ও ঠিক বলেছে।
তবু আমি কেন ওকে ছাড়তে পারছি না?
আজ থেকে সিগারেট কম খাব।
কবিতা লিখব নিজের জন্য।
আর মায়াকে ডাকব না।
পরের দিন সকালে আরিফ দরজার পাশে পড়ে থাকা ভাঙা ডালটার কাছে গেল ডালে শ্যাওলা ধরেছে।
আরিফ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
শ্যাওলা মানে কী?
হয়তো ভাঙাও জীবন্ত।
যে ডালটা একদিন গাছের সঙ্গে ছিল, এখন মাটির পাশে পড়ে আছে। তবু তার গায়ে শ্যাওলা জন্মেছে।আরিফের মনে হলো,
মানুষের ভেতরেও কি এমন কিছু জন্মায়?
যা মনের গভীরে পড়ে থাকে, ধীরে ধীরে পচে যায়,
যেখানে কোনো সজীবতা জন্মায় না।
কী বিশ্রী একটা শব্দ দুঃখ!সে ভাবল যদি মায়াকে ফোন করি? ফোনটা হাতে নিল কিন্তু ডায়াল করল না, কারণ সে জানে মায়া ফোন ধরবে না।
আরিফ ভাবল স্বপ্ন যদি বাস্তব না হয়, তাহলে স্বপ্ন দেখার মানে কী? বিড়ালটা তখন বিছানায় শুয়ে আরিফের দিকে তাকিয়ে আছে।
বিড়ালটা এতক্ষণে এলো গত দুই দিন আসেনি।
আরিফ বলল ধলা,
আসছিস?
কই ছিলি?
আরিফ বিড়ালটাকে আদর করল।তারপর বলল তুই কি জানিস আমি আজ সিগারেট খাইনি? বিড়াল মিউ করল।
দুপুরে আরিফ ভার্সিটিতে গেল আজ সে একা, কোনো বন্ধু নেই। সে চায়ের অর্ডার করল।চায়ের সঙ্গে সিগারেটও চাইল,
কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ল মায়া বলেছে সিগারেট ছাড়তে।আরিফ সিগারেট নিল না। চা খেতে লাগল। হঠাৎ দরজা খুলল। মায়া ঢুকল। আরিফের দিকে তাকাল। কিন্তু কাছে এল না। অন্য টেবিলে গিয়ে বসল। ওর সঙ্গে একটা ছেলে আছে। ছেলেটা লম্বা। চোখে চশমা।
মায়ার সঙ্গে হাসছে। আরিফের বুকটা শক্ত হয়ে গেল। সে কী করবে?
ওদের কাছে যাবে?
নাকি বসে থাকবে? আরিফ বসে রইল।সে জানে মায়ার সঙ্গে যে ছেলেটা আছে, সে হয়তো মায়ার বাস্তব।
আরিফ তো স্বপ্ন। স্বপ্ন আর বাস্তবের লড়াই হয়, কিন্তু স্বপ্ন কখনও জেতে না। আরিফ চা শেষ করল।
আরিফ বেরিয়ে গেল। বাইরে রোদ। কিন্তু তার মনে বৃষ্টি।পথে শিউলির দেখা পেল। শিউলি বলল আরিফ! তোর মুখটা কালো কেন? সিগারেট কমিয়েছি। একদিন না খেলেই মুখ কালো হয়ে গেল?
মুখ না, মন কালো হয়েছে।কিছুক্ষণ চুপ থেকে আরিফ বলল শিউলি, আমি মন থেকে দুঃখিত ওইদিন তোর সঙ্গে যেভাবে ব্যবহার করেছি, তার জন্য। তোকে আমি শুধু বন্ধুর চোখেই দেখেছি।
তোকে ভালোবাসতে পারব না। আমার সঙ্গে তুই ভালো থাকবি না। যার নিজেরই ঠিক নেই, সে ভবঘুরে কবি। শিউলি, তোর মনে অন্য কেউ আছে আমি বুঝেছি। তাই তোকে কোনোদিন জোর করব না।
শিউলি কাছে এল। বলল শুন, আমি জানি তুই মায়ার পিছনে ছুটছিস। কিন্তু মায়া তোকে নেবে না। ও নিজের মতো। তুই ওর মতো নও। আরিফ বলল তাহলে আমি কার মতো?
শিউলি চোখ নামিয়ে বলল আমার মতো। আমরা দুজন একই রকম। দুজনই ভাঙা। আরিফ কিছু বলল না। শিউলি চলে গেল। আরিফ দাঁড়িয়ে রইল।
শিউলি চলে গেল। আরিফ অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। শিউলির কথাগুলো বারবার কানে বাজতে লাগল আমরা দুজন একই রকম। দুজনই ভাঙা।
আরিফ হঠাৎ নীলুর কথা ভাবল। নীলু। যে একসময় আরিফের কাছে ছিল। দূরে থেকেও যার ছায়া আরিফের জীবনে পড়ত। আরিফ মনে মনে বলল নীলু, তুই কি জানিস?
আমি এখনও তোকে পুরোপুরি ভুলতে পারিনি, কিছু স্মৃতি মানুষ চাইলেও মুছে ফেলতে পারে না। নীলুর সঙ্গে পার্কে প্রথম দেখা। নীলুর সেই হাসি।
আর সেই কথাটা আপনি কি দুখাই কবি আরিফ? আরিফের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। তারপরই হাসিটা মিলিয়ে গেল।
কারণ সে জানে, নীলু এখন তার জীবনে নেই।
মায়াকে ভালোবেসে সে নীলুকে ভুলতে চেয়েছিল।
কিন্তু আজ বুঝল একজন মানুষকে ভুলতে গিয়ে আরেকজন মানুষকে ভালোবাসা যায় না।মায়া তার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল তুই স্বপ্ন। আমি বাস্তব। আর নীলু?
নীলু ছিল তার সেই পুরোনো স্মৃতি যে স্মৃতি একদিন দূরে চলে গিয়েছিল, কিন্তু মন থেকে কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
আর শিউলি?
শিউলি হয়তো তার মতোই কোনো এক ভাঙা মানুষ।আরিফ আকাশের দিকে তাকাল মনে হলো, নীলু হয়তো কোথাও একটা মেঘ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে।
সে মনে মনে বলল দূরে থাকা মেঘ, তুই দূরে থাকিস না। তুই কাছে আয়। কিন্তু আকাশ কোনো উত্তর দিল না।
শুধু একটা মেঘ ধীরে ধীরে সূর্যের সামনে এসে দাঁড়াল আরিফ মৃদু হেসে মনে মনে বলল নীলু, তুই কি সত্যিই এখনও আমার আকাশে আছিস?
তারপর মাথা নিচু করে হাঁটতে শুরু করল। সে জানে না তার জীবনে মায়া থাকবে, নাকি নীলু আবার ফিরে আসবে, নাকি শিউলি একদিন তার ভাঙা জীবনের পাশে দাঁড়াবে।
শুধু জানে তার মাথার ভেতর এখনও তিনটা নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে। মায়া যাকে সে ভালোবাসতে চায়।
নীলু যাকে সে ভুলতে পারে না, আর শিউলি যে হয়তো তাকে বুঝতে পারে।
আরিফ মনে মনে বলল মানুষ একজনকে ভালোবাসে, একজনকে ভুলতে পারে না, আর একজনকে হারাতে ভয় পায়। তারপর সে একা একা বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।
যেতে যেতে পার্কের দিকে চোখ পড়ল আরিফের যেইখানে নীলুর সাথে প্রথম পরিচয়।আরিফ আবার সেই পার্কে গেল। আরিফ কিছুক্ষণ বসে নিজের সাথে সময় কাটালো সূর্য ডুবতে শুরু করেছে, তাতে ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে মেসে ফেরার সময় হয়ে গেছে। আকাশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হচ্ছে।
আরিফ আকাশের দিকে তাকাল।
তার মনে হলো ভালোবাসাও কি এমনই? কারও জীবনে তার কখনও উদয় হয় না।
আর কারও জীবনে উদয় হলেও, একদিন নিঃশব্দে ডুবে যায়,মায়ার জীবনে সে কোনোদিন সূর্য হয়ে উঠতে পারেনি।
আর নীলুর আকাশে তার যে সূর্য একদিন উঠেছিল, সেটাও অনেক আগেই ডুবে গেছে।
আরিফ বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।4 Comments-
মোঃ রুবায়েত রহমান রাফি, আরিফের মনের টানাপোড়েন আর বাস্তবতার এই গল্পটা পড়তে পড়তে সত্যিই অনেকক্ষণ থমকে ছিলাম; আপনার কি মনে হয় আরিফ শেষ পর্যন্ত শিউলির মাঝেই তার ভাঙা মনের শান্তি খুঁজে পাবে? আমাদের এই গ্রুপটাকে আরও প্রাণবন্ত রাখতে আপনিও অন্যদের লেখাগুলোতে একটু রিয়েকশন দেবেন আর সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করবেন বলে আশা রাখি।
-
মোঃ রুবায়েত রহমান রাফি, আপনার লেখনীতে “স্বপ্ন আর বাস্তবের লড়াই হয়, কিন্তু স্বপ্ন কখনও জেতে না”—এই বাক্যটি গল্পের আবেগ ও চরিত্রের টানাপোড়েনকে অত্যন্ত গভীর ও হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছে। আপনার এই সুন্দর সৃষ্টিকর্মটি অন্যদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ এবং আপনার এই সৃজনশীলতা বজায় থাকুক, পাশাপাশি দলের সবার পোস্টে নিয়মিত লাইক, কমেন্ট ও রিঅ্যাকশন দিয়ে আমাদের সবাইকে উৎসাহিত রাখবেন এমনটাই প্রত্যাশা করি।
Friends
Moin Uddin
@moinuddin1
মোস্তফা কামাল সাকি
@mostofakamal
উত্তম কুমার
@uttamkumarpaul75
তিতা ফুল
@nadia1
মুনতাছির আহমেদ
@moontasirahmed
Pulock Sheth
@pulocksheth
Shahadat Hossain Bhuiyan
@shahadathossainbhuiyan
Kaoser Ahmed
@kaoserahmed
Nayan Monir
@nayanmonir

স্বপ্ন আর বাস্তবের টানাপোড়েনে আরিফের একাকী পথচলা যেন ভাঙা হৃদয়ের তিনটি নামের নীরব প্রতিধ্বনি…🖤