কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অসমাপ্ত আত্মজীবনী – ১১

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অসমাপ্ত আত্মজীবনী – ১১

কম্পিউটার স্বাগতম

 

আমার প্যাকেট থেকে সিগারেট অফার করায় তিনি তা আগ্রহের সঙ্গেই গ্রহণ করলেন। তাঁর মুখের সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলাম, তিনি আমার মুষ্টিবদ্ধ হাতে টোকা দিয়ে ধন্যবাদ দিলেন। বুঝতে পারলাম, ভদ্রতাজ্ঞান টনটনে। গতরাতে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাসায় তাকে যেমনটি দেখেছিলাম, আজকে বেশভূষায় তার সম্পূর্ণ বিপরীত- ক্লিন শেভড বিশাল এক ব্যক্তিত্ব! মনে হচ্ছে, কোনো অনুষ্ঠানের সভাপতি অথবা প্রধান অতিথি সেজে রেডি হয়ে আছেন।

বিয়ারের ফাঁকে ফাঁকে আমার প্যাকেটের সিগারেট অফার করছি আর তিনি সেটা সানন্দে গ্রহণ করছেন দেখে তাঁকে একটা নতুন বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট উপহার দিলাম। তিনি খুশি হয়ে তা গ্রহণ করলেন।

পরে জেনেছিলাম, সুভাষদা নানা রকম সিগারেট খেতে ভালোবাসেন। এক ব্র্যান্ডে স্থিত থাকেন না, যদিও তাঁর কবিতায় ইন্ডিয়ান ‘চার্মিনার’ ব্র্যান্ডের উল্লেখ দেখেছি।

তিনি জানতে চাইলেন, বাগদাদে বিয়ার আছে কিনা। বললাম দুটো ব্র্যান্ড আছে, ওদের ওখানে তৈরি হয়। একটা ‘ফরিদ’, অন্যটা ‘লুলুয়া’! দুটোই জার্মান লাইসেন্সে তৈরি হয়। মুদির দোকানেই বিক্রি হয় অবাধে। শুনে তিনি খুব খুশি হলেন। তাঁর রাশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আর ভদকা পানের স্মৃতিচারণ করলেন।

দুজনের প্রথম বোতল দুটো শেষ হতেই সুভাষ বললেন, সোহেল চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে ওরা অপেক্ষা করছে। আমি তাকে অনুসরণ করলাম।

হোটেল থেকে বেড়িয়ে ট্যাক্সি নিতে তিনি আপত্তি করলেও আমার আপত্তিতে সাই দিতে তিনি বাধ্য হলেন। ট্যাক্সি চললো ধর্মতলা নাকি কলেজ স্ট্রিটের দিকে সেটা মনে পড়ছে না।

পথে পথে আমরা জ্যামে আটকে থাকলাম। বিরক্তির চেয়ে বরং উপরি পাওনা হিসেবে সুভাষের অনেক গল্প শোনা হলো। ফাঁকে ফাঁকে তিনি বাংলাদেশ আর ইরাকের নানা প্রসঙ্গে আমাকে প্রশ্ন করলেন।

ট্যাক্সি বিদায় করে আমরা এবার হাঁটা শুরু করলাম। আমার তখন বিয়ার আর চরসের বকবকানি শুরু হয়েছে। সুভাষ হাঁটছে আর আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছি।

হঠাৎ সুভাষ থামলেন। বললেন, ‌‌‌‍”সোহেল, আমি এই কানটায় শুনি না। তুমি যদি এপাশ দিয়ে হাঁটো, তাহলে কথা শুনতে পাবো। বলো এবার, কী বলছিলে।”

আমি তো অবাক! লোকটা এক কানে শোনে না অথচ রাস্তা দিয়ে এভাবে হেঁটে চলেছে! ওপাশ দিয়ে কোনো গাড়ি এসে তো লোকটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিতে পারে!

জীবনানন্দের কথা মনে এলো- তিনিও কি এরকম কানে কালা ছিলেন যে জলজ্ব্যান্ত একটা ট্রাম এসে তাঁকে পিষে দিলো! নাকি স্ত্রীর গঞ্জনায় তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন?

সে যাই হোক, আমি আর কথা বাড়াই নি। বরং মনে হলো, এতক্ষণ যা বলেছি সেগুলো যেহেতু তিনি শোনেনই নি, নতুন করে আর পুনরাবৃত্তির দরকার নেই। বেকার এতক্ষণ আঁতলামি করলাম!

ততক্ষণে আমরা নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছেও গেছি। একটা রংচটা পুরনো দালান ঘরের নিচে একটা চায়ের দোকান, কয়েকজন ছোকরা গোছের যুবক খুব ত্রস্ত-ব্যস্তভাবে অস্থির ঘোরাঘুরি করছে। সুভাষদাকে দেখেই বললো, “সুভাষদা- সুভাষদা এসেছেন! বড্ড দেরি করে ফেলেছেন! সবাই তো চলে গেছে, সুভাষদা।”

আমি এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, অনুষ্ঠানের প্যান্ডেল বা মিলনায়তন খুঁজছি, নিদেনপক্ষে একটা ব্যানার। কোনো আলামত খুঁজে পেলাম না। বুঝলাম, আমরা আছি একটা দালানের নিচে নয়, দুটো দালানের মধ্যেকার ফাঁকে একটি চায়ের দোকানে।

আঁতেলদের আড্ডা! সুভাষদাকে একটা বেঞ্চে বসিয়ে দিলো ওরা প্রায় জোর করে। তারপর আরো দুটো চায়ের অর্ডার এমন ভঙ্গিতে দিলো যেন বিল্ডিং দুটো ছোকরাদের বাপ-দাদার। সুভাষদা আর ওদের মধ্যে যেসব আলাপ চললো তাতে প্রতীয়মান হলো যে, সেটা ছিলো কে কে এসেছিলো কে কে আসেনি তার হিসাব নিকাশ।

মাটির খুরিতে চা এলো, যেটা ছিলো আমার জন্যে খুব আকর্ষণীয়, তবে চায়ের স্বাদ মোটেও আনন্দের হলো না। আমি চা পানের অভিনয় করে সিগারেট ধরাবো বলে সুভাষদাকে অফার করলাম।

সুভাষ এসে গেছেন, অতএব অনুষ্ঠান শেষ- এমন একটা ভাব নিয়ে অন্যরা ভেগে গেলো। টিকে রইলো শুধু একজন। আমি তাকেও সিগারেট অফার করলাম।

ছেলেটা একটু কাঁচুমাচু করছিলো। সুভাষ উৎসাহ দিয়ে বললেন, “নাও নাও! ওর নাম সোহেল, বাগদাদে থাকে।” তারপর তারও প্রশংসা করে বললেন, “খুব ভালো ছেলে! সাহিত্য নিয়ে খুব খাটাখাটনি করে।”

আমাদের দুজনের মধ্যে দু-একটি কথাবার্তাও হলো, ভালোই লাগলো ছেলেটাকে। খুব বিনয়ের সঙ্গে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বললো, এখানে ওরা সবসময় থাকে। সময় পেলেই যেন এখানে চলে আসি। আমি জি-জাহাঁপনা করে কাটিয়ে দিলাম।

আসলে কিছুই বুঝছিলাম না- সুভাষদা কী দেখাতে এখানে আমাকে নিয়ে এসেছেন! তবে ব্যাপারটা বোঝা গেলো সুভাষদার বিদায় নেয়ার সময়। আমাকে আড়াল করে ছেলেটা সুভাষদার মুঠোর মধ্যে কিছু টাকা গুঁজে দিলো। সুভাষদা যাতে টাকাগুলো গুনতে না যান তাই বিনীত কণ্ঠে বললো, “খুব কম হয়ে গেলো সুভাষদা! কী করবো, সবকিছুই একা একা করতে হয়! কেউ সহযোগিতা করে না।”

কিন্তু ছেলেটি এতক্ষণ যা বললো সব ওই কালা কানটার দিকে দাঁড়িয়ে। সুভাষদা `কী বললে, কী বললে’ বলে ভালো কানটা ওর দিকে এগিয়ে দিলেন। ছেলেটাকে বাধ্য হয়ে কথাগুলো আবার বলতে হলো, আর তাই আমারও শোনা হয়ে গেলো।

ছেলেটির কাছ থেকে থেকে বিদায় নিয়ে আবার আমরা হাঁটতে লাগলাম। এ গলি, সে গলি, বড় রাস্তাসহ নানাবিধ চক্র অতিক্রমশেষে একটা কাঁচের দরজা ভেদ করে পাশের একটা বিল্ডিংয়ে ঢুকে পড়লাম। ভেতরে সেজেগুজে ঘোরাফেরা করছে কয়েকজন কেতাদুরস্ত বাবু! প্রথমে মনে হলো কোনো প্রদর্শনী হচ্ছে। আবার মনে হলো কোনো সেমিনার হবে হয়তো।

সুভাষদাকে দেখে একজন এগিয়ে এলো। `নমস্কার, সুভাষদা, আসুন আসুন’ বলে তারা আমাদের আরো ভেতরে নিয়ে গেলো। সেখানে আরো কিছু লোক, কিন্তু সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলছে। সম্ভবত এখানকার অনুষ্ঠান শুরু হয় নি এখনো। আমরা আগেই চলে এসেছি।

সুভাষদা কাকে যেন খুঁজলেন। যে লোকটি সম্ভাষণ জানিয়ে আমদের এখানে নিয়ে এলেন, তিনি ব্যস্তসমস্ত হয়ে সুভাষদা যাকে খুঁজছেন তাকে ডেকে আনতে গেলেন। ঘরের মধ্যে যাঁরা ছিলেন তাঁরা সবাই সুভাষদাকে আড়চোখে দেখছেন আর কথা বলে যাচ্ছেন। বুঝতে পারলাম, সুভাষদা এখানে তারকা গোছের কিছু।

এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে একজন ছুটে এলেন। এসেই বললেন, “সুভাষদা, এত দেরি করে এলেন! অনুষ্ঠান তো শেষ হয়ে গেলো। আপনি থাকলে খুব ভালো হতো।”

সুভাষদা জানতে চাইলেন, কিসের অনুষ্ঠান হচ্ছে এখানে? ভদ্রলোক সুভাষদাকে সঙ্গে নিয়ে এককোণে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা একটা টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কাপড়টা তুলে বললেন, ‘দেখুন সুভাষদা, এটাই হচ্ছে কম্পিউটার! ডেস্কটপ কম্পিউটার। প্রেসের কম্পোজ করার ঝামেলা আর থাকলো না। এখন থেকে এই একটা যন্ত্র দিয়ে একজন লোকই আমাদের পত্রিকার সব কাজ করে ফেলবে।”

ভদ্রলোকের মুখে তৃপ্তির হাসি আর সুভাষের মুখে ফুটে উঠলো আতঙ্কের ছাপ! সুভাষদা জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে প্রেসের কম্পোজিটরদের সবাই তো বেকার হয়ে যাবে!”

ভদ্রলোক সুভাষের কথায় মোটেও খুশি না হয়ে একটা পত্রিকার সংখ্যা এনে দেখালেন। “দেখুন সুভাষদা, দেখুন, কত সুন্দর ঝকঝকে ছাপা!” সুভাষদা পত্রিকাটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করলেন।

আমি দেখলাম পত্রিকাটার নাম `প্রতিক্ষণ’। আমার প্রিয় পত্রিকা। একসময় কুষ্টিয়াতে নিয়মিত পড়তাম এটা। কিন্তু সুভাষদার হাতের সংখ্যাটি ‘দেশ’ পত্রিকার সাইজ। এটাই নাকি কলকাতায় কম্পিউটার কম্পোজ করা প্রথম পত্রিকা। আজকে এটার শুভ উদ্বোধন হলো, অনুষ্ঠান সে-উপলক্ষেই।

সুভাষদা এবং আমার জন্যে দুটো নাস্তার প্যাকেট দেয়া হলো। সঙ্গে দুটো পত্রিকার সংখ্যাও নিয়ে আমরা ভাঙা অনুষ্ঠান থেকে বিদায় নিলাম। কম্পোজিটরদের বেকার হওয়ার দুশ্চিন্তা সুভাষকে ছাড়লো না। তা অনুধাবন করে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেলো।

সেটা ছিলো বাংলাদেশে কম্পিউটার বিষয়ে প্রথম একটা সেমিনার, বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের ছাদে সেই অকিঞ্চিৎকর অডিটোরিয়ামে। আমেরিকা থেকে `মোস্তফা জব্বার’ নামে একজন বক্তা এসেছে। আমি এসবের কিছুই জানতাম না। আমরা দল বেঁধে প্রতিদিনের মত বাংলা একাডেমিতে ঘোরাঘুরি করছিলাম। হঠাৎ একটা হট্টগোল শুরু হলো। অনেকেই ছোটাছুটি করছে এদিক সেদিক।

আমাদের দেখে একদল দাঁড়িয়ে পড়লো- তারা সবাই বাংলা একাডেমির প্রেস শ্রমিক। আমাদের সঙ্গে মুখ চেনাচেনি আছে। জানতে চাইলাম- কী হয়েছে? ওরা সমস্বরে অভিযোগ করলো, “দেখেন তো ভাই, আমেরিকা থেকে সাম্রাজ্যবাদের এক দালাল এসেছে কম্পিউটার প্রোপাগান্ডা করতে, আমাদের চাকরি খাবে।”

ব্যাপারটা বুঝে ফেললাম খুব তড়িৎগতিতে। জিজ্ঞেস করলাম, “দালালটা কোথায়?”

ওরা বললো, ‘ওই বিল্ডিংয়ের ভেতরে আছে।’ ওদের হাতে লাঠিসোঁটা, ইটপাটকেল। ভীষণ ক্ষুদ্ধ হয়ে আছে সবাই।

আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করে বললাম, “আপনারা প্রেসে ফিরে যান। আমরা ব্যাটাকে শায়েস্তা করছি।”

ওরা আমাদের হাতে বিষয়টি ছেড়ে দিয়ে প্রেসে ফিরে গেলো। আমার মনে হয়েছিলো, একাডেমির কর্মচারী হিসেবে এ ধরণের বিশৃঙ্খলা প্রশাসনের কাম্য হতে পারে না। আমরা ছাত্রমানুষ যা খুশি করতে পারি, ভুল হলে ক্ষমা পেতে পারি। কিন্তু ওরা তো ক্ষমা পাবে না।

এরপর বর্ধমান হাউজের ভেতরে ঢুকে দেখি অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে, উদ্যোক্তা বা শ্রোতা কেউ নেই। একটা রুমের মধ্যে পাতলা ছিপছিপে একজন আতঙ্কিত হয়ে কাঁপছেন। বাংলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদেরকেও ভদ্রলোকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন দেখলাম। আমি তাদেরকে অভয় দিয়ে ভিকটিম ভদ্রলোককে আমাদের সঙ্গে নিয়ে নিরাপত্তা দিয়ে বাংলা একাডেমির গেট পার করে দিয়েছিলাম।

ফিরে এসে প্রেস শ্রমিকদের বলেছিলাম, “সেমিনার বাতিল। দালালটাকে উত্তম মধ্যম দিয়ে বিদায় করে দিয়েছি।”

সবাই শান্ত হলো, ফিরে এলো বাংলা একাডেমির স্বাভাবিক পরিবেশ।

পরবর্তীতে সেই কম্পিউটার অ্যাক্টিভিস্ট মোস্তফা জব্বারের ক্রমাগত অগ্রগতির খবর পেয়েছি। তিনি ‘বিজয় ৫২’ নামের বহুল ব্যবহৃত বাংলা সফটওয়্যারের স্বত্বাধিকারী। কম্পিউটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আশাবাদী ছিলাম অনেক আগে থেকেই। একদিন ঘটা করে মতিঝিলের আইবিএম অফিসে গিয়ে কম্পিউটার দেখেও এসেছিলোাম। কবিতাও লিখেছিলাম কম্পিউটারকে স্বাগত জানিয়ে।

সুভাষদা আর বাংলা একাডেমির প্রেস শ্রমিকদের সেই দুশ্চিন্তা পেরিয়ে কম্পিউটার এখন ঘরে ঘরে কম্পোজিটর তৈরি করে আরো বেশি কর্মসংস্থান করছে। সুভাষের জন্মশতবার্ষিকীতে দেখছি, সেই কম্পিউটার-নিবেদিতপ্রাণ মোস্তফা জব্বার এখন বাংলাদেশের মাননীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী!

 

১৯.০৮.২০১৮

Loading

12 Comments

  1. অভিজ্ঞতার আলোরণ গল্পে। খুব জীবন বোধের অনন্যরুপ। ভাল লাগা রইল।

  2. নন্দিত উপস্থাপন।

Leave a Reply

Skip to toolbar