নামে কী বা এসে যায়? গোলাপকে যে নামেই ডাকো …
“What’s in a name? that which we call a rose
By any other name would smell as sweet;”
(Romeo and Juliet Act 2, Scene 2 – William Shakespeare)
এই লেখাটা বাংলাদেশে আশি দশকের জ্বলজ্বলে নানা কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে অল্প কিছু লেখকের কবিতা বা সাহিত্যকর্মকে একটা একক নামের আওতায় আনা যায় কি না সেই প্রচেষ্টা থেকে লিখিত। যেই লেখকদের কথা বলতে চাইছি তাঁদের কবিতা, গদ্য ছিল প্রচল থেকে কিছুটা আলাদা। তাঁদের সেইসব কবিতা, সাহিত্যকর্মকে, চিন্তার ধরণ, সাহিত্য দর্শন – প্রভৃতিকে নির্দিষ্ট একটা গণ্ডির মধ্যে নিয়ে আসা যায় কি না, আলাদা ভাবে সম্বোধন করা যায় কি না – নাম দেয়া যায় কিনা – সেই উপায় খোঁজার একটা প্রচেষ্টা বলা যায় আমার এই লেখাটাকে। কেন তাঁদেরকে একটা গণ্ডির মধ্যে ফেলব, কেনই বা তাঁদেরকে একটা ‘গোষ্ঠী’ হিসাবে চিহ্নিত করে সেই গোষ্ঠীর একটা নামকরণ করব – এই উত্তরগুলি আশা করি নিচের লেখায় পরিষ্কার হবে। আলোচনার শেষ পর্যায় এসে তাঁদের মধ্যে থেকে কারো কারো কবিতা উদ্ধৃত করে সামান্য আলোচনার প্রয়াসও নেয়া হয়েছে, যেন পাঠকেরা কিছুটা সুর ধরতে পারেন।
পরিচয়কাল – ১৯৯৭
১৯৯৭-২০০১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার সময় ঘটনাক্রমে একজন সিনিয়ার ছাত্র-ভাইয়ের মারফতে রিফাত ভাই (রিফাত চৌধুরী) সম্পাদিত কিছু পত্রিকা (লিটল ম্যাগ) দেখতে পাই আমাদের ইন্সটিটিউটের ক্যান্টিনের টেবিলের উপর। পত্রিকাগুলি রীতিমতো জ্বলজ্বল করতেছিল সেই প্রায়-দুপুরবেলা। ঘটনাক্রমে আমি নিজেও তখন কবিতা লিখি। দু একটা মেইনস্ট্রিম দৈনিক পত্রিকা বা সাহিত্য ম্যাগাজিনে কবিতা প্রকাশিত হতেছে (নতুন আসা DTP বা Desktop Publishing টেকনোলজি নির্ভর পত্রিকা বা ম্যাগাজিনগুলি ঠিক সেই সময়েই বাজারে আসা শুরু করে, বড়জোর ওর দু তিন বছর আগে থেকে)। কিন্তু এই যে টেবিলের উপরে ছোটো কয়েকটা ‘হাতে বানানো’ ম্যাগাজিন দেখলাম – তাদের গেট-আপ মেক-আপ, আর ভিতরে প্রকাশিত লেখাগুলির মান দেখে আর সাহিত্যের প্রতি তাদের স্বতন্ত্র ‘এপ্রোচ’ দেখে খুবই ভালো লেগে যায়। মনে হয়, আরে, এমন লেখাই তো খুঁজতেছিলাম এতদিন ধরে। এসবই তো সত্যিকারের কবিতা। ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’? আবার তার উপরে যোগ হয় পত্রিকাগুলির বাহ্যিক চেহারা।
যখন কর্ণফুলী-ওয়াইটের মতো ঘিয়াটে, বা মাখন-রঙা, আন্তরিক ধরণের কাগজগুলি বাজার থেকে উধাও হয়ে যেতেছে প্রায়, আর কেমন অস্বাভাবিক নীলচে ছাপ যুক্ত চকচকে প্রফেশনাল ধরণের একটা কাগজে (অফসেটে) ভরে যেতেছে চারিপাশ, ঠিক তখনই কর্ণফুলী ওয়াইট বা সেই ধরণের মাখন-রঙা কাগজে প্রকাশিত কিছু পত্রিকা। পত্রিকার মলাট গুলি খসখসে। একটা সংখ্যার কভার আবার ফুটা-যুক্ত শক্ত ব্রেইল কাগজে ছাপা। নানা পাতায় নানা স্থানে ভিন্ন ভিন্ন সাইজের ফন্টের সুষম উপস্থাপনা, DTP ফন্টের ব্যবহার না করে পুরনো ছাপাখানার ফন্ট ব্যবহার করা, মাঝে মাঝে নানা কবি বা শিল্পীর হাতে আঁকা স্কেচ কিংবা এক রঙা ছবি বলিষ্ঠ ভাবে পুরো পৃষ্ঠা জুরে প্রকাশ করা। ছবিগুলি থেকে আবেগ, অনুভূতি বিচ্ছুরিত হতেছে, চারুকলার ওয়েল-ট্রেইনড স্টুডেন্টদের আঁকা ছবির মতো না। মনে হয় যেন এখানেই আসল ক্রিয়েটিভিটির খনি লুকিয়ে আছে (প্রয়াত শিল্পী সালাম আবদুস ভাই মাঝে মাঝে কিছু স্কেচ দিতেন তখন ঐ পত্রিকায়)। পত্রিকাগুলি যেন সদম্ভে সকল মেইনস্ট্রিম, ব্যবসা নির্ভর সচ্ছলতাকে, প্রচার, বিপণনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঘোষণা করতেছে ‘মানবীয় সাহিত্য’ আসলে ‘অন্য কোথাও’।
পত্রিকাগুলি আবিষ্কারের পরে ( সেগুলি ছিল ‘ছাঁট কাগজের মলাট’ পত্রিকার, ১ম, ২য় ও ৩য় সংখ্যা) নানা ঘটনা বয়ে যায়। রিফাত ভাইয়ের একক ভাবে বসবাস করা বাবুপুরা-র ঘর (নীলক্ষেতের পিছনে বাবুপুরার বস্তি) চিনে নেই। আড্ডা শুরু হয়। নানা ধরণের লোকজনের সমাগম দেখি। লেখক-শিল্পী প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মুস্তফা আনোয়ার ভাই (উনি তখন বেতারের বড় কর্মকর্তা) , শশী ভাই, ফিল্ম মেকার আকরাম ভাই আসতেন, জাহাঙ্গীরনগরের তুখোড় কবি আবু আহসান মিশু ভাই অথবা চমৎকার গদ্যকার তারিক আল বান্না, নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘পত্তর’ পত্রিকার সম্পাদক/প্রকাশক জাফরুল ও শাহরিয়ার ভাই, পুরনো ঢাকার সেন্ট গ্রেগরির আশিক ভাই প্রমুখ সেসব আড্ডায় মাঝে মাঝেই যুক্ত হতেন। এছাড়াও নানা পেশার মানুষ, আড্ডা, মিশেল। সারা রাত ঢাকা শহরে ঘুরে ঘুরে পোস্টার লাগায় – এমন পেশার মানুষও আসতেন, আবার পুরনো ঢাকার চাউলের আড়ত চালান – তিনিও আসতেন। বিদ্যুৎ বিভাগে কর্মরত একজন শ্রমিক নেতাও আসতেন যিনি আবার খুব সুন্দর খোল বাজান, কাগজে আঁকিবুঁকি আঁকেন।

আর এই রাত-দিন-ভোর ব্যাপী আড্ডাগুলির ফাঁকে ফাঁকে রিফাত ভাইদের এর আগ পর্যন্ত করে আসা (আশি – নব্বই দশক ব্যাপী) সাহিত্যকর্ম ইত্যাদির সাথে পরিচিত হতে থাকি ক্রমান্বয়ে। কারা কারা এক সাথে লিখতেন, কি কি পত্রিকা প্রকাশ করতেন – এক সাথে আড্ডা দিতেন সেগুলি সম্পর্কে জানা শুরু করি। নানা রকমের লিটল ম্যাগ, ক্ষুদ্র প্রকাশনা, নানা জনের সম্পাদনায় চমৎকার সব পত্রিকাগুলি, আর স্বতন্ত্র ধরণের লেখালেখির সমাহার পরিস্ফুট হতে থাকে। উনাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশ করা ঐ সময়কার অনেক পত্র পত্রিকা রিফাত ভাইয়ের ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন পেতে রাখা মাদুরের পাশেই সংরক্ষণ করা থাকত।
গোষ্ঠী হিসাবে ভাবব কেন, নাম দেবারই বা দরকার কী?
ক্রিয়েটিভ কাজ আসলে সবসময় একক ব্যক্তি -মানুষ দ্বারা সম্ভব হয় না। অবশ্যই এসবের পিছে একটা না একটা গ্রুপ বা দলবদ্ধতা নিহিত থাকে। এক ধরণের রুচি, চিন্তা, দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিত্ব, আইডিয়ার তুমুল আদান প্রদান, হাসি, আনন্দ, দুঃখ, জীবন জিজ্ঞাসা – এগুলি লুকিয়ে থাকে সেসবের পিছে। এসবের আদান প্রদানই ক্রমান্বয়ে শিল্পের বা ক্রিয়েটিভিটির একটা চেহারা তৈরি করে দেয়। ফলে আমি বুঝতে পারি যে এই ‘গ্রুপ’টা, যাঁরা কিনা আবার প্রচলিত অর্থে বেশ কিছুটা প্রচার বিমুখ – এই ইনাদের ‘ভিন্ন ঘরানা’র এতরকম কাজ আর সাহিত্য যতটা প্রকাশ্যে আসার কথা ছিল, বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিমে আসার কথা ছিল, ততটা আসেনি। মেইনস্ট্রিমে বরং পুরনো / ট্রেডিশনাল সাহিত্যের উপর ভিত্তি করা একটা ‘নিরাপদ’ সাহিত্য প্রচারিত হয়ে যেতেছে। মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার সাহিত্যে যেন সেই লেভেলের কোনো চমৎকারিত্ব নেই, ইনোভেশন নেই, আবিষ্কার নাই, প্রচলের বাইরে গিয়ে লেখার প্রয়াস নাই – এইরকম একটা ধারণা আমার মনে গড়ে উঠতে থাকে। আশির দশক জুড়ে ঢাকা শহরে যাঁরা সত্যিকারের সাহিত্যের কাজ করে গেছেন, আমি বলব তাদের মধ্যে অন্যতম তুখোড় হলো এই কবিতাপ্রেমী, গল্প-প্রেমী, প্রচার-বিমুখ মানুষগুলি। সেই তখন, অর্থাৎ আমার বয়ানের সময়, অর্থাৎ নব্বইয়ের দশকের শেষকালে কিন্তু ফেইসবুক বা গুগল আসে নি। ফলে আমরা সাধারণ পাঠকেরা নিতান্তই দৈনিক পত্রিকার সাপ্তাহিক সাহিত্য কাগজের উপর নির্ভর করতাম সমকালীন সাহিত্যকে জানতে। দৈনিক পত্রিকা যেখানে প্রকাশিত হতো হাজার হাজার কিংবা লক্ষ কপি, সাহিত্য পত্রিকা হয়ত দুইশ তিনশ কপি, যেগুলি হাতে হাতে বিলিয়েই শেষ হয়ে যেত।
ইতিমধ্যে অবশ্য লোকমুখে, কিংবা কাগজে কলমে প্রচারিত, প্রতিষ্ঠিত আছে আশি দশকে সূচনা পাওয়া ‘গাণ্ডীব’ গোষ্ঠীর কথা। ওদের কথা আমরা এখনও বলি। মুখে মুখে উচ্চারণ করি। এমনকি এই গোষ্ঠীর সূচনাকারী ‘গাণ্ডীব’ পত্রিকার লিখিয়ে, সম্পাদক -উনাদের সাক্ষাৎকার এখনও মাঝে মাঝে বড়ো বড়ো দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ হয়, এই এতদিন পরে এসেও। এদিকে আশি দশকের যে গ্রুপের কথা আমি বলছি, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ যে সেই গাণ্ডীব পত্রিকায় লিখতেন না, তা নয়, বরং মাঝে মাঝে যুক্ত হতেন, অনেকে আবার হতেনও না, কিন্তু তারপরেও আমি আমার উদ্দিষ্ট লেখকদের গোষ্ঠীটাকে একটা আলাদা নামে নাম দিতে চাই। কারণ, তাঁদের লেখা ও চিন্তা, আমার মতে, গাণ্ডীব গোষ্ঠীর লেখকদের লেখা থেকে আলাদা ।





২০১২/১৩ সালের দিকে এসে – উনাদের এই গোষ্ঠীর একটা নাম দেবার ইচ্ছহা প্রবল হতে থাকে। কেন নাম দিব? নাম দেবার কারণ হলো, এতে করে, পরের কালে এসে অর্থাৎ বর্তমান বা ভবিষ্যতে, বাংলাদেশের সাহিত্যের গতিধারা নিয়ে সহজে আলোচনা করা যাবে। আলাদা আলাদা ধরণের সাহিত্যের প্রবণতাকে চিহ্নিত করা যাবে। সাহিত্য-গবেষণার নানারকম পথ খুলে যাবে, এমনকি, পরের কালের কবি সাহিত্যিকরাও তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে পারেন, অথবা তাঁদের থেকে স্বতন্ত্র হবার চেষ্টা করতে পারেন। ফলে সাহিত্য ‘গতি’ পাবে। এভাবেই তো একটা ভাষার সাহিত্য এগিয়ে যায়। ফলে চিহ্নিতকরণ, শ্রেণীকরণ, নামকরণ একটা দরকারী কায়দা।
সেই উদ্দিষ্ট গ্রুপের একটা নাম যদি দেওয়া যায়, আর সেই নাম যদি অন্যেরা গ্রহণ করে থাকেন, বয়বহার করে থাকেন, তাইলে কিন্তু ভবিষ্যতে বা বর্তমানে তাঁদের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা করা, প্রচার, বিশ্লেষণ করা সহজ হয়ে উঠতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে, তাঁদের তৎকালীন সেই কর্মকাণ্ড কিন্তু কোনো ‘সাহিত্য আন্দোলন’ নয়। এমন কথা তাঁরা নিজেরাও প্রকাশ্যে বলেন নাই। যদিও লেখালেখির কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য উনাদের সাহিত্যকর্মে পাওয়া যাবে। মাঝে মাঝে দেখা গেছে নির্দিষ্ট কোনো একটা ‘নাম’ বা ‘টার্মের’ আওতায় উনারা উনাদের লেখালেখিকে একত্রিত করার উদ্যোগ নিছিলেন, কিন্তু কোনো কারণে, ওভার-অল ভাবে সেই নামগুলি নিয়ে উনারা নিজেরাই পরের কালে কন্টিনিউ করে যান নাই।
কী নামে ডাকি তোমায়, ‘বাবুল শেখের পায়রা’ গুলি?
আমি ভাবলাম, একজন বাইরের (এবং পরের কালের / পরের দশকের) মানুষ হিসাবে আমি নাম দেবার চেষ্টা করে দেখি। আমি সত্যিকারভাবে উনাদের সেই সময়কার ব্যক্তিগত আদান-প্রদান গুলি জানি না, কিন্তু আমার সামনে আসা লেখালেখি কিংবা প্রকাশনাগুলির ফেইস-ভ্যালুর ভিত্তিতে কোনো একটি নাম কি আমি দিতে পারি? কী নাম দেয়া যায়? সহজে নাম পাওয়া যায় না। হঠাৎ একদিন একটা নাম মনে আসে যা কিনা সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। আর নামটা উনাদের মধ্যকার একজন কবির একটা কবিতা থেকেই নেওয়া। এটা বেসিকালি একটা কবিতার শিরোনাম এবং একই সাথে সেই কবির একটা কবিতা-সংকলনের শিরোনাম। নামটা হলো, ‘বাবুল শেখের পায়রারা’। আমার উদ্দিষ্ট সেই গ্রুপের নাম দিতে চাই ‘বাবুল শেখের পায়রারা’।
কবিতা ও পুস্তিকাটির রচয়িতা শশী ভাই। শশী হক। ব্যক্তিগত জীবনে একজন সুপ্রতিষ্ঠিত আর্কিটেক্ট। ‘বাবুল শেখের পায়রারা’ প্রকাশিত হয়েছিল কাজল ভাই (কাজল শাহনেওয়াজ) কর্তৃক প্রকাশিত ‘ফৃ’ গ্রন্থিকা সিরিজের একটা প্রকাশনা হিসাবে।
কেন এই নামকরণ? বাবুল শেখ কে? উনার পায়রাগুলির কথাই বা কেন?
নব্বই দশকে বা এর আগে যাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার রাস্তা-ঘাট চিনতেন তাঁরা জানেন কাঁটাবন রাস্তায়, অর্থাৎ, নীলক্ষেত থেকে কাঁটাবনের দিকে যেতে থাকলে হঠাৎ করে বাম দিকে একটা খুব ছোটো, চিপা আর অন্ধকার গলিমুখ দেখা যেত। যানবাহন চলাচলের গলি সেটা নয়, বরং দুটা দালানের চিপায় সরু একটা চলাচলের পথ ছিল সেটা যা কিনা কয়েকটা আধা-পাকা ঘরে গিয়ে শেষ হয়েছে। গলিটা আমরা চিনতাম বাবুল শেখের গলি নামে। বাবুল শেখ নামে এক ব্যক্তি পায়রা পুষতেন আর এই স্থান থেকে ভালো কোয়ালিটির তামাকের ডিলারশিপ চালাইতেন। (‘তামাক’ কিন্তু এক সময় বাংলাদেশে আইন-সিদ্ধ ভাবে বিক্রী হতো। সম্ভবত মেডিসিনাল কারণে কিংবা ক্ষুদ্র কিছু নৃগোষ্ঠীর ধর্মীয় বা স্বকীয় কালচারাল অবস্থানকে স্বীকৃতি জানিয়ে। নওগাঁর তামাক প্রায় বিশ্ব-বিখ্যাত বলা যায় । সুদূর আমস্টারডামেও এক সময় পাওয়া যেত নওগাঁর দ্রব্য – এমন শুনছিলাম। নওগাঁয় অবস্থিত তামাকের সরকারী গুদামগুলি এখনও বর্তমান আছে। ছেলেপুলেরা ছাদের উপরে ফুটবল খেলে। তবে যেই সময়ের কথা বলতেছি, ৯০ দশকের শেষ, ততদিনে এটি আর ‘লিগাল’ নয়।)
বাবুল শেখ পায়রা পুষতেন। আমি একদিন রিফাত ভাইয়ের সাথে ভিতরের ঘর পর্যন্ত গিয়ে সেই পায়রাগুলির কয়েকটাকে দেখছিলাম মনে পড়ে।
তো এই যে, বাবুল শেখের বিক্রি করা দ্রব্যের সাথে কারও কারও সংশ্লিষ্টতা (সকলেই সংশ্লিষ্ট না অবশ্যই), আবার পায়রার মতোই ন্যাচারাল আর সুমিষ্ট তাদের কাজ, অবস্থান, স্বতঃস্ফূর্ততা অথচ বাবুল শেখের মতো আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকতে চাওয়া অর্থাৎ প্রচার-বিমুখ এই শিল্পীদের এই কারণে আমি বলতে চাই বাবুল শেখের পায়রা-রা। উনাদের আড্ডা, ঘোরাঘুরি, তর্কাতর্কিও জানা মতে সেই এলাকাটা ঘিরেই বেশি ছিল। কাঁটাবন, নীলক্ষেত, আজিমপুর, কাঁঠালবাগান বাজার রাস্তার ঢাল (কাওরানবাজার অভিমুখে), এটাও একটা কারণ।
[আমি অবশ্য একদিন কাজল ভাইকে (কাজল শাহনেওয়াজ) গল্পচ্ছলে প্রস্তাব দিছিলাম, কাজল ভাই, আপনেদের গ্রুপ বা কর্মকাণ্ডটাকে আমি চিহ্নিত করতে চাই ‘বাবুল শেখের পায়রারা’ নামে। এটা কি ঠিক হবে কিনা। উনি অবশ্য সায় দেন নাই আমার কথায়। কেন দেন নাই সে নিয়ে আর বিস্তারিত আলোচনা করা হয় নাই। উনাদের হয়ত এই বিষয়ে অনেক সিস্টেমেটিক ভাবনা-চিন্তা আছে আর কে, কিভাবে, কেন লিখছেন – সেই সম্পর্কে আগে থেকে সুনির্দিষ্ট ছক কাটা আছে, দর্শন আছে – এইসব কারণে উনি হয়ত সায় দেন নাই। কিন্তু আমি ভাবলাম আমি একজন তৃতীয়, বহিরাগত আর পরের কালের মানুষ হিসাবে উনাদের লেখালেখি বা কর্মকাণ্ডকে একটা একক নামের আওতায় ফেলার চেষ্টা করতেই পারি। পরের কালে অনেক পাঠক, গবেষক এই টার্ম টা গ্রহণ করতে পারেন। না করলেও ক্ষতি নাই।]

কিছু নিদর্শন, কিছু কবিতার আলোচনা
নানা সময় আমি এই গোষ্ঠীর কারো কারো কবিতা নিয়ে ফেইসবুকে ছোটোখাটো থ্রেড লেখার চেষ্টা করেছি। একেবারে আট ঘাট বেঁধে নয়। মাঝে মাঝে আমার বক্তব্যগুলি ছোটো, ‘নোট’ আকারে, আবার মাঝে মাঝে বড়ো। যেরকম প্রস্তুতি নিয়ে লেখা উচিৎ সেইরকম প্রস্তুতিও কিন্তু নেওয়া হয়নি। বলা যেতে পারে শর্ট নোটস। লেখাগুলি সংযোজিত করি।
হয়ত নতুন পাঠক পাঠিকা উপকৃত হবেন। হয়ত কিছুটা বুঝবেন কেন আমি একটা টার্মের আওতায় উনাদের লেখালেখি বা গ্রুপটাকে আনতে চাইছি। উনাদের আলাদা জায়গাটাই বা কোনখানে।
তবে এখানে কিন্তু উনাদের সমসাময়িক অনেকের লেখাই বাদ পড়ে গেছে। যেমন, অমিতাভ দা (অমিতাভ পাল) নিশ্চিত ভাবে ওঁদের মধ্যে ছিলেন। উনার সাথে অনেক দেখা হতো , অদ্ভুত সুন্দর মোলায়েম পরিচ্ছন্ন লেখাগুলি পড়া হতো। অথচ কোনো কারণে উনার কবিতা নিয়ে লেখা হয়নি এই পর্যন্ত। তবে অবশ্যই সামনে লেখার ইচ্ছা আছে।
এই গ্রুপ সংশ্লিষ্ট অনেক অনুজদের লেখা, যাঁরা নব্বইয়ে লেখা শুরু করেছেন, তাঁদের লেখাও বাদ দিলাম।
নিচের কবিতাগুলি লেখকদের নামের বর্ণানুক্রমিক ধারায় সাজানো হয়েছে।
ডাস্টবিনে । আহমেদ মুজিব।
নীলক্ষেতে দাঁড়িয়ে একটা ডাস্টবিনের ছবি তুললাম। কী ক্যাপশন দিব – এই ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল ‘ডাস্টবিনের ভালো নোংরাগুলি’ -এই বাক্যাংশের কথা। সাথে সাথে প্রয়াত কবি আহমেদ মুজিব ভাইয়ের এই চমৎকার কবিতাটার কথা।
নেটে সার্চ করে যতগুলি ছোটোখাটো সংকলন পাওয়া যায় উনার লেখালেখির, তার মধ্যে এই কবিতাটি নেই। অথচ অন্যতম ভালো লাগার একটা কবিতা।
ডাস্টবিনে
চুপচাপ, স্থির ডাস্টবিনের ভালো নোংরাগুলি
বৃষ্টির পর মাঝখানে জমা পানিতে ঠিকই চকচক করে আকাশের তারা
এইখানে আমি করি না মানুষের রূঢ় ব্যবহারগুলি জমা,
অনেক নোংরায় ফুলের মতো
বস্তু নিয়ে ইঁদুর ছুটে গেলে
কালো বিড়াল আর শাদা বিড়াল তর্ক করে শুধু
আঁকাবাঁকা নোংরার ভিতর থেকে ভেসে আসে চিৎকার
কিন্তু মানুষের আস্তে কথা বলার চাইতে স্বাদু ও মধুর।
কালো নোংরায় নাদুসনুদুস শাদা বিড়ালিনীকে
অহংকারী দেখায়গল্পকারদের বানানো গল্পগুলো পড়ে আছে,
শুয়ে আছে কারো কারো বানানো কবিতার লাইন,
একটি ছেঁড়া পেপারে মার্টিনার র্যাকেট খেলায় শীৎকারের বর্ণনা,
রেখার ডাবল পার্টের সিনেমার কথা
পড়ে আছে ডাস্টবিনে(‘শুধু টের পাই আমি’ পুস্তিকা থেকে টুকে নেয়া । প্রকাশক, ফৃ, ২০০৭)
‘ডাস্টবিন’ নিয়ে কবিতা লেখা সম্ভব ?!? এমন অচ্ছুত একটা বিষয়কে এমন মমতায় সামনে নিয়ে আসা সম্ভব? খুব অবাক হবার মতো ঘটনা।
“এইখানে আমি করি না মানুষের রূঢ় ব্যবহারগুলি জমা” – এই লাইন মনের মধ্যে গেঁথে আছে অনেক বছর আগে থেকে আর এটি আমি নিজে নিজেও মাঝে মধ্যেই মনে মনে উচ্চারণ করি নানা প্রেক্ষিতে, এতদিন পরে এসেও। (৯ নভেম্বর, ২০২১)
চিরন্তন সরল রেখা । কাজল শাহনেওয়াজ
উনার চমৎকার আর অভিনব অনেক লেখা ছড়ায়ে ছিটায়ে আছে চারপাশে। অসাধারণ দেখার চোখ, প্রকাশ অন্যরকম। কাজল ভাইকে নিয়ে নতুন করে বলা সাজে না। অনেকেই আমার চে ভালো জানেন। ট্রেডিশনাল বাংলা কবিতার বাইরে গিয়ে যেভাবে উনি কবিতার দিকে এপ্রোচ করেন – কবিতাকে ফোর্সফুলি প্রকাশ করেন – চেহারা দেন – এটা কবিতার সিরিয়াস পাঠকেরা খুব ভালোভাবে বুঝেন। ছোটো একটা লেখা থেকে অল্প কিছু বলা যায় কি না দেখি।
চিরন্তন সরল রেখা
শরীরে বাকল পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি অ্যাকাশিয়া
ছোট্ট সে একেবারে কিশোর পাতাগুলি ছাগল ছানার মতো লাফাচ্ছে
নিচে তার আলো করে দুটি ছোট্ট চকচকে পোকাসমস্ত গাছপালা ঝুঁকে আছে আনন্দে কলিজা রঙের পাতায়
দখিনা বাতাসের ঘন ডাক, মাথা কাত করে মুসান্ডা
এলামন্ডার সাথে ফিসফিস করে হাসাহাসি করছে,
কানে হাওয়া লাগাচ্ছে ঘাসেরা, বিনোদনের, ব্যক্তিগত পাতায়
প্রতি পৃষ্ঠায় সমান বর্ণনা
প্রতিটা গাছই আজ একই সমাজেরপোকা দুটির একটি হলুদ কামিজ আর একটি কালো ট্রাউজার পরেছে
ওরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা সরল রেখার জন্ম দিচ্ছে।
একটা চিরন্তন সরল রেখা।
পাশের পিপুল সাক্ষী, সাক্ষী গর্জন।
প্রথমে দেখা যাক কেন এটাকে ট্রেডিশনাল কবিতা বলব না। ট্রেডিশনাল ছন্দ নেই । গদ্যছন্দ যদি কেউ বলেন তো বলতে পারেন, তবে ‘গদ্যছন্দ’ জিনিসটায় তো জগতের প্রায় সবকিছুকেই শ্রেণীভুক্ত করা যায়, ফলে সেটা আমি আর বললাম না। গল্প বলার ভাষা, অথচ একটা চলা, একটা থামা আছে যা ইনস্টিংকটিভ ভাবে আমরা পাঠ করার সময় বুঝে নেই।
“ছাগল ছানার মতো লাফানো” এই দৃশ্য বা শব্দগুলি কি আমাদের এখনকার কবিতা লেখকেরা এত সহজে ব্যবহার করবেন? মনে হয় না। একটু কাব্যিক ঢঙ নিয়ে আসবেন, ছাগলের আরও ‘গ্রহণযোগ্য’ কাব্যময় প্রতিশব্দ হয়ত খুঁজবেন। একইভাবে ট্রাউজার শব্দটি। “কালো ট্রাউজার” আমরা কত না দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে যেতেছি বছরের পর বছর , কিন্তু বাংলা কবিতায় এই শব্দ ততটা আসছে কই?
নিজের কথাটা কবি নিজের মতো করে বলতে না পারলে সেখানে কবিতা এসে জমা হবে কিভাবে। কবিতা তো একজন কবি বা একজন মানুষের অত্যন্ত ব্যক্তিগত কথা। কলিজা রঙের পাতা। বলিষ্ঠ উপস্থাপন। মুসান্ডা আরে এলামন্ডা – দুই ধরণের দুটি ফুলের গাছ। এদের অবশ্যই দেশী প্রতিশব্দ আছে, খুব প্রচলিত গাছ, চেনা ফুল, কিন্তু এইখানে এই দুটি বিদেশী নাম অবলীলায় কবিতার আবহে মিলে গেল। অর্থ না বুঝলেও তাদের ‘ফিসফিস করে হাসাহাসি’ বোঝা সম্ভব। এখানে এ দুটি নাম ব্যবহার, পাঠক আমার মতে, সার্থক।
সর্বোপরি একটা চিরন্তন ‘সরল রেখার’ বয়ান। দুটি পোকার মধ্যকার একটা সরল রেখা। এবং কবি একে বললেন চিরন্তন। এখানেই কবিতার ফিলোসফি। দুটা পোকার মধ্যে বাস্তবিক অর্থে কোনো সরল রেখা নাই, কিন্তু কবি, দর্শক, মানুষ তাকে তৈরি করতেছে, আর এই নশ্বর দুনিয়ায় – এত সুন্দর আর মনকাড়া যতসব ভঙ্গুরতার মধ্যে সেই কল্পিত, আরোপিত সরল রেখাটাই যেন শেষ পর্যন্ত চিরন্তন। সরল রেখাটা একজন দর্শক মানুষের দাবী, একজন কবির দাবী। কার কাছে দাবী? কেন দাবী? এই ভাবনাগুলাই কবিতা করে তুলে একে।
চমৎকার দৃশ্যের সমাহার, যাকে যেই নামে ডেকে আমরা অভ্যস্ত – সেভাবেই এ কবিতায় ডাকা হচ্ছে। অথচ নতুন। কোনো কাব্যিক ভান নাই। ভঙ্গিমা নিজের মতো, প্রকাশের কায়দা কবি নিজে পাথর কুঁদে বের করতেছেন। আর কী চাই? (২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩)
জয় সুরাইয়া জয় আমাদের চমচম মিয়া । চয়ন খায়রুল হাবিব।
আজকে লিখতে চাই চয়ন ভাই (চয়ন খায়রুল হাবিব)-উনার একটা কবিতা নিয়ে।
উনার মনে আছে কিনা জানি না। একটা অনলাইন চিঠি চালাচালির ফোরামে ২০০৩ কি চারের দিকে ছাত্র-রাজনীতি বিষয়ে একটা বক্তব্য নিয়ে মারাত্মক টক্কর লেগে যায় উনার সাথে । দুই তিনটা চিঠি চালাচালি আর বক্তব্য পরিষ্কার-করণ ইত্যাদির পরে পরে আমার পক্ষ থেকে যুদ্ধ বিরতি (Truce)-এর আহবান জানানো হয় আর উনার পক্ষ থেকেও তা মেনে নেয়া হয়। সেই Truce এখনও চলমান আছে। অর্থাৎ সেটি নিয়ে পরে আর কখনও কথাবার্তা হয়নি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে অনেক সময় অনেক পর্যায় গড়িয়ে গেছে।
যাই হোক । ঐ ঘটনার দু চার বছর পরে চয়ন ভাইয়ের কবিতা প্রথম পাই কাজল শাহনেওয়াজ ভাই প্রকাশিত ‘ফৃ’ গ্রন্থিকা সিরিজে। তখনও লোকেট করতে পারি নাই যে এই চয়ন ভাই আসলে সেই মানুষটি-ই যার সাথে বিতর্ক হয়েছিল অতীতে। এই মিল খুঁজে পেতে আরও দুই কি চার বছর পার হয়ে যায়।
ফৃ গ্রন্থিকা সিরিজের কবিতাগুলি খুব ‘দগদগে’ বলা যায়। একটা কবিতায় এমন একটা দৃশ্য ছিল যে একজন সদ্য-কিশোরী একটা আয়নার নিজেকে দেখছে। নিজের পরিবর্তন দেখছে। এই দৃশ্য এত প্রবল আর আচমকা এসে গ্রাস করছিল যে, এখনও সেই দৃশ্য, আর টোন বা সুর পাঠক আমার ভিতরে জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। এর পরে নানা সময় উনার আরও বেশ কিছু লেখা পড়েছি। সর্বদাই অন্যরকম। আলাদা টোনের। আর এদিকে আজকে একটা কবিতা নিয়ে বলতে চাই, যেটা আবার ইদানীং টাচ করে গেছে নানা কারণে।
আবুল হাসান আর সুরাইয়া খানম বাংলাদেশের অনেক পাঠক-পাঠিকার কাছে একটা উজ্জ্বল, আকর্ষণীয় প্রসঙ্গ। আবুল হাসান তো নিজের কবিতা-গুণেই বিখ্যাত। আর উনার ব্যক্তি জীবন আলোচনা করতে করতে সুরাইয়া খানমের বিষয় সামনে চলে আসে। সুরাইয়া খানমের সেই সময়কার একটা সুন্দর, মিষ্টি ফটোগ্রাফও ফেইসবুকে আজকাল অনেক চালাচালি হয়। সেই সময়কার সৌন্দর্য-মণ্ডিত। উনাদের পারস্পারিক সম্পর্ক নিয়ে চিন্তাভাবনা কিংবা আলোচনা একটা অন্য ধরণের স্পার্ক তৈরি করে অনেকের ভিতরে। মুখরোচক বলা যাবে না, কিন্তু ঐদিকেই যেন বিষয়টা বার বার যেতে চায়।
কিন্তু এত আলোচনা – এসবের সবই গদ্য আকারে। এই আবুল হাসান আর সুরাইয়া খানম – উনাদের ব্যক্তি উপস্থিতি যে কবিতায় ব্যবহার করা যায় – এটা কয় জন আমরা ভাবতে পারি? কবিতা জিনিসটাই যেন আমাদের কাছে সেরকম একটা বিষয় না।
সে-ই – র-ক-ম ঐতিহাসিক চরিত্র হলে অবশ্য আনা যায়।
“বায়েজিদ বোস্তামী শৈশব হতে জননীর সেবা …”
অথবা হুমায়ুন, আওরঙ্গজেব। এর আগে মধ্যযুগে অবস্থা ছিল আবার আরও অন্যরকম।
কিন্তু আধুনিক কবিতায় ঐতিহাসিক চরিত্র – এটা যেন একেবারে অভাবনীয় একটা ব্যাপার। আবার চরিত্র দুটি (হাসান, খানম) সেইরকম ঐতিহাসিক চরিত্র না, কিন্তু আবার ঐতিহাসিক না – সেটাই বা কিভাবে বলি?
কবিতায় ইচ্ছা হলে আবুল হাসান আর সুরাইয়া খানমকে রিক্রিয়েট করব। আধুনিক কবিতাতেই করব। একজন কবির এই ড্যাম-কেয়ার এটিচিউড ভালো লাগে। মানব চরিত্র, ঐতিহাসিক চরিত্র ইদানীংকার কবিতায় ব্যবহার করা মানা, তারপরেও যদি ইচ্ছা হয়, লিখে দিব , কার বাপের কী।
নিচের কবিতাটায় একটা রাজনৈতিক অর্থে টালমাটাল সময়কে ধরা হচ্ছিল। আবুল হাসান যেন সেটি দেখছেন, আবার এক পর্যায় হাসান নিজেই তার অংশ হয়ে পড়তেছেন।
হাসান-খানম কে নির্ভর করে লেখা কবিতায় বেহুলা লখিন্দর চলে আসে, অথচ বেহুলা লখিন্দরের যেই কাহিনী লোকমুখে প্রচলিত সেখানে কিন্তু যৌনতার কোনো উল্লেখ নাই। খুব বেশি হলে বাসর ঘরের কথা আর তার পরে পরেই স্বামীকে বাঁচানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। অথচ এ কবিতায় বেহুলা আর লখিন্দরের মধ্যে সেই প্রাকৃতিক সংস্পর্শ, সেই কাচা জিনিসটা আছে।
অন্যদিকে, আবুল হাসানের সিগনেচার কবিতা: “ঝিনুক নীরবে সহ /ঝিনুক নীরবে সহ, /ঝিনুক নীরবে সহে যাও /ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!”
-এই কবিতা থেকে মোলায়েম ভাবে মুক্তার প্রসঙ্গ উৎকলন করে নিয়ে এসে স্থাপন করা হয় এই কবিতায়। চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয় না। কিন্তু হাসানের মুক্তা ঠিকই থেকে যায়।
“… এ দুজন এখন অবিনশ্বর / মুক্তি ও মুক্তার মালিক ও মালকিন // ধিন্তাধিনাত মহুয়ায় মাত বেহুলা চিৎকার করে:/ অই লখিন্দর আমার মুক্তা ফিরায় দে/ লখিন্দরে কয়: অরে আমার মরা মুক্তার মা/ গার্মেন্টসে যা, কাম কৈরা খা…”
কবিতায় কবি আর পাঠকের স্বাধীনতা অপার। স্বপ্নের মতো উদ্ভট অনেক কিছু আমরা মেনে নেই। এই কবিতায় সেইরকম কিছু কাজ করা হয় তৎক্ষণাৎ। হাসান-খানম থেকে বেহুলা লখিন্দর হয়ে, গার্মেন্টস কর্মী হয়ে, তার পরে পরেই চলে আসে একজন অনুজ কবির কথা। (কোন সেই কবি? জানা নাই। জানার দরকারও নাই) এই কবির যার সাধাসাধিতে পোড়াবাড়ির চমচমের দৃশ্য চলে আসে, তার সাথে মিষ্টি বানানোর কারিগর, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়কার জ্বলজ্বলে ক্যারেকটার, জিঞ্জিরা হোটেল এবং পুনরায় খানম, হাসান।
জিঞ্জিরা হোটেলের চায়ের উল্লেখটাই প্রথম মনোযোগ কেড়ে নিছিল আমার। প্রথমবার কবিতাটা পড়ার সময়। গ্রীন রোডে একটা জিঞ্জিরা হোটেল ছিল (এখনও আছে) – যার চা ছিল বিখ্যাত। এক সময় ওর উল্টা পাশেই ছিল গ্রীন স্টোরস। আর জিঞ্জিরা হোটেলের বেঁটে প্রশস্ত কাপে সুস্বাদু চা আমরা খেতাম এক সময়। এখন অবশ্য সেই বেঁটে কাপ আর নাই, চায়ের সেই সুঘ্রাণও নাই। জিঞ্জিরা হোটেল আছে, সিনিয়ার রিকশাওয়ালারা এক নামে চিনে। জুনিয়ার-রা চিনে না।
জানি না – এই গ্রীন রোডে অবস্থিত জিঞ্জিরা হোটেলের কথাই কবি বলতেছেন কি না, তবে যে হোটেলই হোক, সেখানে এক জ্বলজ্বলে দৃশ্যে পুনরায় আবুল হাসান আর সুরাইয়া খানম ফিরে আসেন, একটা খেই হারানো চিন্তা ফিরে আসার মতো মোলায়েম, ন্যাচারাল আর তাৎক্ষণিক ভাবে।
আমরা দেখি যে আবুল হাসান সরে যাওয়া আঁচলের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সাহিত্যে ঐতিহাসিক চরিত্রকে নির্ভর করে ঘটনা সাজানো বর্জনীয় কিছু না। উপন্যাসে যেরকম। কবিতায় হলে ক্ষতি কী?
এই ভাবে আরও কিছু কাজ সেরে কবিতাটা শেষ হয়। আন্ডারলাইং ভাবনা-ধারা নিয়ে আমি আর কিছু বললাম না। কারণ পাঠক পাঠিকা যে যেভাবে কবিতাটি নিবেন কবিতাটি সেভাবেই রূপ পাবে আমার বিশ্বাস।
তো এই যে একটা ডেয়ারিং এবং স্মার্ট, বাঙালীর চিরায়ত নাকি-কান্না হীন কবিতা, এই জিনিসটা আমার ভালো লাগে।(৪ জুন, ২০২৩)
খুলিতত্ত্ব ।৪। জয় সুরাইয়া জয় আমাদের চমচম মিয়া
পিলখানার বি,ডি,আর গেট থেকে
শহিদ মিনার অব্দি উনিশ শ পঁচাত্তরে
মহাবট অশ্বত্থ রেন্ট্রির খোন্দল থেকে খোন্দলে
ডাক হরকরা মাটির পাতালে ছড়ায়েছে
মাইলকে মাইল লম্বা আবুল হাসানের কবিতার রাতসে-রাতের একপাশে অমাবস্যা
অন্যপাশে পূর্ণিমার চাঁদ
চাদের বুকের বোটায়
দুরকম বাংলাদেশকে চুমোচুমির হাহুতাশ শেষে
ঢাকার রাস্তাঘাটে বাজারে ক্যাম্পাসে পার্কে
আর পুলিশের চৌকিতে শাপলা শালুকের ডাটায়
বানভাসি ফণাগোটানো গোখরাদের লুকানোর
আয়োজনে মুগ্ধ কবি আবুল হাসান দেখেছিল
রাতের বেলাকার আজিমপুর কলোনির পুকুরগুলোর বুকে
খোলা আর বন্ধ জানালাগুলায়
লাল নীল সবুজ পাঁচমিশেলি ছায়াদের সাথে
পর্দাদের ধন্ধ
পর্দা ও ছায়াদের দোলাচলে
আবুল হাসান এখন লখিন্দর
আর সুরাইয়া খানম হলো বেহুলাএক লখিন্দরকে লুকিয়ে আরেক আবুল হাসান
এক বেহুলাকে না জানিয়ে আরেক সুরাইয়া
গোলাপি কাঁকড়াদের উত্তেজনায় এফোঁড় ওফোঁড়
কামড়াকামড়ি জড়াজড়ি শেষে দুজনের ঘামে ঝলসায়
সাগরসেচা বালির মিহিদানা মুক্তার নেকলেস
এ-দুজন এখন অবিনশ্বর
মুক্তি ও মুক্তার মালিক ও মালকিনধিস্তাধিনাত মহুয়ায় মাত বেহুলা চিৎকার করে:
অই লখিন্দর আমার মুক্তা ফিরায় দে
লখিন্দরে কয়: অরে আমার মরা মুক্তার মা
গার্মেন্টসে যা, কাম কৈরা খাঅই অই ঝগড়া কাজিয়া ভালা না
এ-বলে আবুল হাসান ও সুরাইয়া খানমকেআমি লখিন্দর ও বেহুলার স্বপ্ন সিথানে বসাই
অনুজ কবির বিনীত নিবেদনে
পোড়াবাড়ির চমচম শুধাইচমচমগুলা এখন লোমশ কান্না হয়ে
কাচের শোকেসে বসে আছে
এবং বসে বসে আঠাআঠি ফাটাফাটি মজায় দেখছে
মিষ্টির কারিগরেরা হাঁটুর ওপর লুঙ্গি তুলে
রফিক জব্বার নুর হোসেন চলেসের
মৃত্যুর বার্তাবাহক পুরানো খবরের কাগজ ঘষে ঘষে
শোকেসের কাচের ওপর থেকে
মিষ্টির আঠা পরিষ্কার করছেরাস্তার অন্যপারে জিঞ্জিরা হোটেলে
ডিম বাদাম দারুচিনি মেশানো
ভুতুড়ে চায়ের চুমুকে চুমুকে
আবুল হাসান সুরাইয়ার আচল সরানো বুকে
হঠাৎ থমকে গুলিয়ে ফেলেছে
কোনটা গণতন্ত্রের এন্টিকাটার
আর কোনটা বারবার বিক্রি হওয়া
আত্মার ধনুষ্টংকারতোমার ডাকনাম কি
ঘুম-জড়ানো সুরাইয়ার এ-প্রশ্নে
আবুল হাসান বলেছিল :
ডাকনামগুলা
জীবন ও যত্নের সীমান্ত
আমার ডাকনাম জ্যোতি
মেয়ে হলে ডেকো মৌলিক বোলে
ছেলে হোলে ডেকো দ্বৈত
আর ওদের বোলো
আমার আরেকটা ডাকনাম হ’লো চমচম মিয়া
শোক ও স্বৈরতন্ত্রের দেশে
ওরা যাতে সবসময় হাসেজয় আবুল হাসান জয় চমচম মিয়া
জয় সুরাইয়া খানম জয় চমচম মিয়া
এই আমার কবিতা । রিফাত চৌধুরী
আশা করি রিফাত ভাই কিছু মনে করবেন না উনার কবিতা হঠাৎ এইভাবে ফেইসবুকে শেয়ার করার জন্য। অনেকদিন ধরে যোগাযোগ নাই। মাঝ রাত্রের গভীরে আরো নীরবতার মধ্যে কবিতা নিজের স্ফুরণ ঘটাতে শুরু করতেছে
এই আমার কবিতা
(সমুদ্রে নুনের পুতুল / রিফাত চৌধুরী। কাঁটাচামচ প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি ২০০৭)
…………………………………………
কাগজ-কলম তুলে নেবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে
চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে।
হাত থেকে মেঝেয় গড়ায় কাগজ,
বাতাসে এদিক-সেদিক চলে যায়।
আমার কাগজের ছেঁড়া পাতা
উড়ছে এখন ফ্যানের হাওয়ায়।
একটা প্রকাণ্ড ঘুমের মধ্যে আমি নিহত হয়ে যাই।
নিবিড় নিঝুম নিদ্রা।
ফুলফোর্সে ফ্যানের পাখা ঘুরছে।
শিয়াল যেমন হাঁসের হাড় মাংস খেয়ে
তার সাদা সাদা পালকগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়
তেমনি আমার কাগজগুলি সেই বাতাসে
ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে।
ভালো কবিতা নিয়ে আলোচনা করা সমস্যাজনক। একটা জীবন্ত জিনিসকে যেন হত্যা করা হয়। তথাপি, যেহেতু, যে-ইরকম আলোচনা উনার লেখা নিয়ে হওয়ার কথা ছিল – সেইরকম খুব একটা চারিপাশে হয় না দেখে এই অধমই একটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা নিতেছে।
আলোচনার ফরম্যাট এইভাবে স্থির করা যেতে পারে। “কেন এই কবিতা আমার কাছে ভালো লেগেছে”
আমার কাছে ভালো লেগেছে কারণ:
ক) একটা প্রশান্তি নিয়ে আসতেছে – যেটা শুধুমাত্র প্রশান্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বড়ো কিছুকে ধরে। মনের মুলে গিয়ে নাড়া দেয়। শান্ত করতে চায় । বলতে চায় যেন ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’। নিজের কাছেই নিজের ফেরা আরকি …
খ) এই “বড়ো-কিছু” জিনিসটাকে ধরতে গিয়ে খুব মহান জিনিসপত্র কবিতায় নিয়ে আসা হয় নাই। মানবতা, ইতিহাস, সমাজনীতি, ভালো-মন্দ চেতনা। ‘আমি’ কি ব্যক্তিগত ‘আমি’, নাকি সামষ্টিক ‘আমি’। অবশ্যই ব্যক্তিগত আমি। এই আমি ‘হাজার বছর পথ হাঁটিতেছি’-র আমি না।
খুব সাধারণ একজন মানুষের সাধারণ একটা ঘটনা। ‘আমি’ বিষয়ে কোনোরকম ভণিতা নাই।
গ) কোনো চোখ ধাঁধানো চমৎকারিত্ব নাই। চমক নাই। খেলা নাই।
ঘ) শব্দগুলা কষ্ট-কল্পিত না, কিন্তু ফ্রি-ফ্লো হয়ে আসছে। “ফুলফোর্সে” শব্দটা বলতে গিয়ে কবিকে দুইবার ভাবতে হয় নাই। ইংরেজি শব্দ, নাকি বাংলা। খুব স্বাভাবিক ভাবে চলে আসছে শব্দটা।
ঙ) পুরা কবিতায় শব্দগুলা এত স্বাভাবিক যে , হঠাৎ করে একটা লাইনে এসে পর পর তিনটা আপাত স্বল্প-ব্যবহৃত শব্দ (মৌখিক ভাষায় কম ব্যবহৃত আরকি) যখন চলে আসে – সেগুলা চোখে লাগে না। এই শব্দগুলার আগমন যেন খুব স্বাভাবিক ছিল। “নিবিড় নিঝুম নিদ্রা”
চ) “শিয়াল যেমন হাঁসের হাড় মাংস খেয়ে / তার সাদা সাদা পালকগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়” – এই দৃশ্য এক অর্থে একটা যেন দৈনন্দিন বা কিছুটা চিরায়ত দৃশ্য। (নগরবাসীর কাছে ১০০% অবশ্য নয়। গ্রাম থেকেও শিয়াল প্রায় অনুপস্থিত হতেছে, তথাপি) – একটা খুব জীবন-ঘনিষ্ঠ দৃশ্য। যার পালিত হাঁস আছে, শখ, ভালোবাসা কিংবা অর্থনৈতিক কারণে- এরকম ঘটনায় তার মর্মবেদনা একটা খুব গাঢ়-সত্য মর্মবেদনা পৃথিবীর। এই দৃশ্যটাও – সেইসব ফলাফল কিছু ইঙ্গিত না করে খুব সাধারণ ভাবে চলে আসছে – আর সাধারণ গতিতে চলে গেছে। দৃশ্যের চিরায়ত হবার গুণ – এটা লক্ষণীয়।
ছ) ফ্যানের বাতাসে সাদা কাগজের ওড়া-উড়ির সাথে বিচ্ছিন্ন হাসের পালক ওড়ার যে দৃশ্য তৈরি করা হলো – সেটা বাস্তবিক, জ্বলজ্বলে ভাবে জেগে উঠে, মনে হয় পাঠক নিজেই যেন ফ্যানের বাতাস ছেড়ে একটা খালি ঘরে ঘুমিয়ে আছে – আবার নাই।
জ) বাংলা কবিতার অনেক ধরণের ক্লিশে মুক্ত লেখা এটি। পদ্য-ছন্দ নাই। কাব্যিক আবহ জাগাতে উদ্যত হয় যেই টিপিকাল ধরণের শব্দগুলা – তাদের সেইরকম কায়দায় ব্যবহার নাই। ‘নিবিড়’, ‘নিঝুম’ আসছে বটে – তবে সেটা যেন কথার ফ্লো-তে চলে আসা। এই শব্দ দিয়ে কোনো আবহ তৈরির দিকে যাওয়া হয় নাই।
ঝ) অনেকে বলেন যে, এইরকমের সহজ কবিতাও তো অনেক লেখা হয়েছে বাংলাতে। ঠিক আছে, সেটা মেনে নেয়া যায়, কিন্তু দেখা যেতে পারে সহজতার মাধ্যমে রিফাত ভাই আর কি কি এক্সট্রা দিতেছেন, যেটা অন্যেরা এই ভাবে দেন নাই…। খুব জ্বল জ্বল করে উঠা চিত্র। চিত্রের মধ্যে পাঠককে অংশীদার করে ফেলা। কোমল নরম শব্দ আর কথার ফ্লো। সরাসরি উল্লেখ না করেও একটা নিঃসঙ্গতা, অস্বাভাবিকতার প্রকাশ (প্রকাণ্ড ঘুমের মধ্যে নিহত হয়ে যাচ্ছেন কবি, তাইলে ফ্যান, কাগজ, হাঁস – এগুলা দেখতেছেন কে? কিভাবে দেখতেছেন?) এই মেলানকোলি আবার মন কে দমিয়ে দিচ্ছে না, বরং – এটাই যেন একটা সুন্দরতা, একটা ফুলের মতো জীবন্ত আর কোমল।
ঞ) প্রচণ্ড গদ্য ভাষা। কবিতার আবহ এমন ভাবে পাঠককে পেয়ে বসে যে – ভাষাটা যে আসলে গদ্য – এটা মনে থাকে না। মাপা মাপা বাক্য। অর্থ গড়ে তোলার দিকে যাচ্ছে – গদ্য তো এইরকমই। কিন্তু চলে আসে অন্য একটা সুর। এই বৈপরীত্য একরকমের ঝিম ধরিয়ে দেয়।
এইসবই … (২৯ অক্টোবর, ২০২০)


শশী হক। অসামাজিক।
‘একত্রে’-র এই কবিতাটার কথাই বলতেছিলাম (অসামাজিক)। কীরকমের জানি একধরণের সততা বা সিনসিয়ারিটি আমি ব্যক্তিগতভাবে খুঁজে পাই এই সংকলনের সবগুলা লেখায়। মন খুব বিক্ষিপ্ত থাকলেও টেনে নিয়ে আসে। শান্তি দেয়। শশী ভাই আর রিফাত ভাইয়ের এই যৌথ প্রযোজনাটা আমার কাছে এক অসাধারণ সংকলন ছিল।
এই স্পেসিফিক লেখাটা অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম। রিফাত ভাইয়ের সাথে একটা ডুয়েট বই, নাম খুব সাধারণ, ‘একত্রে’, অথচ সেই ডুয়েট পুস্তিকা ঐ দু’জনের চমৎকার সব কবিতায় ঠাসা। শশী ভাইয়ের এই কবিতাটা প্রথম পাঠেই আচ্ছন্ন করে ফেলছিল। কবিতা, অথচ বলা যায় পুরাপুরি গদ্য। লেখাটাকে তথাকথিত ‘কবিতা’ করে তোলার জন্য লেখকের মধ্যে যেন বিন্দুমাত্র কোনো প্রয়াস নেই। তারপরেও বলব, শেষ পর্যন্ত এটা একটা কবিতা হিসাবেই পাঠক আমাকে আচ্ছন্ন করে দিয়ে যায়। এখান থেকে বুঝতে পারি যে, কবিতা হবার জন্য মাপা মাপা লাইন, ছন্দের দোল, এসব লাগে না। কবিতা আরও অনেক ‘র’ আর আন্তরিক একটা জিনিস।(৬ মার্চ, ২০১৭)
অসামাজিক
বাস আসছে। বাস যাচ্ছে। ঠাসা ঠাসা মানুষ। পোকামাকড়ের মত মানুষ। কেউ কারো দিকে পর্যন্ত তাকাচ্ছে না।
ছাউনির পাশে কোলে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবতী মা। কিছুতেই উঠতে পারছে না বাসে। পুরুষ মানুষদের হুলুস্থূল পেশী-বূহ্যের মধ্যে একটা ছোট্ট দরদী ফাঁক খুঁজে পেতে বার বার ব্যর্থ হয়ে, ধাক্কা ঠেলা চাপ খেয়ে, শেষে ফিরে এসে দাঁড়িয়ে আছে ছাউনির পাশে;
নিরেট মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকা কোন এক ভেজা কাকের মত।
মানুষেরা আর মোটেই সামাজিক মানুষ নেই। ভিড়ের মুখোশের আড়ালে দেখি, প্রত্যেকেই অন্তর্বাসী কুকুর হয়ে উঠছে।(আজ বাসে করে বাসায় যাওয়া যাবে না)
স্কুটার নিলাম। উঠে পড়লাম একটা সিগারেট ধরিয়ে। ধরাতে গিয়ে মনে হলো আমিতো খুব সহজেই এই বিপন্ন মা ও শিশুকে ডেকে নিতে পারতাম স্কুটারে। কিন্তু নিলাম না। নেয়া যায় না। নিয়ম নেই। আমাদের সমস্ত শরীর মাছির মত সন্দেহের চোখে ভরে গেছে। আর সহানুভূতি খুঁড়ে এই কূট ও ক্রুর সময়ে ঝামেলা বাড়াতে কে চায়! কেউ না। খুব কুৎসিত এক ব্যবস্থাপনার জীব হয়ে গেছি। সমাজের দাসানুদাস আমি স্কুটারে চেপে একা একা বাড়ি ফিরি।
এই সম্পূর্ণ লেখাটি প্রথম https://torongofr.blogspot.com ওয়েবসাইটে সেপ্টেম্বর, ২০২৩ তারিখে, ভিন্ন শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এখন সামান্য কিছু পরিমার্জন, সংযোজন, বিয়োজন করে এখানে পুনঃপ্রকাশিত হলো। – লেখক।
![]()
2 Comments
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.
অসীম রহমান
দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহনকারী গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনাকর্ম।
Drako Shajib
কবি ও কবিতাকে যেন আরো কাছে থেকে দেখার ও জানার সুযোগ পেলাম। খুব ভালো লাগলো আহমেদ মুজিব – এর লেখা “ডাস্টবিনে” আর চয়ন খায়রুল হাবিব এর “জয় সুরাইয়া জয় আমাদের চমচম মিয়া” কবিতা দুটি। শশী হক এর “অসামাজিক” কবিতাটিও অনবদ্য। শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন!