-
নির্বাপিত স্তব্ধতা
হাসনাত সৌরভ
===================================বৈশাখ মাস, শুকনো বাতাসে শুধুই ঝরে আমের মুকুল, সেই কবে শুকিয়ে গেছে হাতে গোনা টবের কয়েকটি ফুল। আকাশের মেঘ ঘুরে ফিরে উড়ে যায় দিশাহীন অস্পষ্ট নিরুদ্দেশ। দোলের রং এখন ফ্যাকাশে। এখন প্রায় মধ্য দুপুর। অসহ্য ভ্যাপসা গরম। এই দুপুরেও লোকটা বসে আছে একটা টং দোকানে। যেখানটায় বসে আছে, সেখানে তার মাথার উপর কোন ছাউনি নেই। কোন একসময় হয়তোবা ছিল। বৃষ্টি কিংবা ঝড়ে সেটার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। যার কারণে দুপুরের ঝাঁঝালো রোদ সরাসরি তার মাথার উপর পড়ছে। সরিষার তেল দেয়া টাক মাথায় রোদ পড়ে বেশ দূর থেকেই জায়গাটা অল্প অল্প ঝিলিক দিচ্ছে। সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই তার। তিনি আনমনে চা পান করে যাচ্ছেন। রং চা। প্রত্যেকবার বেশ আয়েশ করেই চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। কেউ দেখলে ভাববে চা’টা বেশ ভালো হয়েছে। অথচ এলাকার সবচে বাজে চা তৈরির দুর্নাম আছে এই টং দোকানটার।
মজিদ মেম্বার বর্তমানে তেমন কিছু করেন না। দীর্ঘদিন এলাকায় মেম্বার ছিলেন, এখন সেটাও করছে না। শুধু মাতব্বরিটাই বাকি আছে – এই যা। বেশ নামকরা মাতব্বর। আশপাশের দশ গ্রামের মানুষ এক ডাকে চেনে। লোকটা আর যাই হোক, বিচারের কাজটায় খুব সৎ। কোন প্রকার ছলচাতুরি করেন না তিনি। যার কারণে নিজ গ্রাম বাদেও আশপাশের কোন গ্রামে বিচার হলে তার ডাক পড়বেই। এটা যেন অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। লিখিত নিয়মের চেয়ে অলিখিত নিয়মগুলো বেশি করে পালিত হয়। মানুষ অলিখিত নিয়ম মানতেই বেশি পছন্দ করে। দোষের ভিতর তেমন কিছুই নেই মজিদ মাতব্বরের। শুধু একটু যেটা আছে, সেটা হল কৃপণতা। তবে এটাই দিনদিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। হঠাৎ কিভাবে কৃপণতা তাকে পেয়ে বসল, তার সঠিক কারণ পরিবারের কেউ জানে না। এই যে তিনি এখন এই দোকানে বসে চা পান করছেন, এটার মাঝেও রয়েছে কৃপণতা। অন্যান্য টং দোকানের চেয়ে এখানে এক টাকা কম মূল্যে চা বিক্রি হয়।
বৈশাখের এই দুপুরে তার বাড়ি থেকে বের হবার কথা না। তিনি এই সময় বাড়িতে থাকেন। খালি গায়ে বসে থাকেন একটা আম গাছের নিচে। বেশি গরম লাগলে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে শরীর জুড়িয়ে নেন। আজ সবকিছু বাদ দিয়ে এই দুপুরে বাজারে বসে চা পান করার কারণ হলো শহর থেকে তার মেয়ে আর নাতনী আসছে। তাদেরকে নেয়ার জন্য এখানে এসে বসে আছেন। তবে আশপাশের কিছু মানুষ না জানার কারণে ধারণা করছে, কৃপণতা করতে করতে শেষ পর্যন্ত তিনি দুপুরের খাবার ত্যাগ করেছেন। বেলা দেড়টায় যে লঞ্চ ঘাটে ভিড়ে, তাতে তার মেয়ে আর নাতনীর আসার কথা ছিল। কিন্তু লঞ্চ আসে নি। এখন আরো বেশ কিছুক্ষণ তাকে অপেক্ষা করতে হবে – ভাবতেই মেজাজটা খিচড়ে গেল মজিদ মাতব্বরের। সাথে দুশ্চিন্তাও হলো, পথে কিছু হলো নাতো আবার? কেননা মহেশখালি- কক্সবাজারের এই চ্যানেল এলাকায় কখন কী হয়ে যায়, তার কিছুই বলা যায় না।
তার মেয়ে আর নাতনী যখন লঞ্চ থেকে নামল, তখন বাজে বিকেল সাড়ে তিনটা। মজিদ মাতব্বরের ইচ্ছে হলো, ঘাটেই মেয়ে নাতনীকে কিছুক্ষণ ঝাড়বেন। কিন্তু নাতনীর ভয়ে লাল হয়ে যাওয়া চেহারা দেখে একেবারেই দমে গেলেন তিনি। সবেমাত্র বারোতে পা দিয়েছে মেয়েটা। ভয়ে এখনো থরথর করে কাঁপছে। মেয়ের মুখে শুনলেন, চ্যানেল দিয়ে আসার সময় বাতাস উঠেছিল, লঞ্চ খুব দুলছিল সে বাতাসে। তাতেই ভয় পেয়েছে সুষমা।
(দুই)
সকাল থেকে এ পর্যন্ত মজিদ মাতব্বরের সাথে তিনবার ঝগড়া হল শাহানা বেগমের। ঝগড়ার মূল বিষয় নৌকা আর সুষমা। মজিদ মাতব্বরের বাড়ির পাশ দিয়ে একটি খাল চলে গেছে। মাঝেমধ্যে সেই খালে মাছ ধরেন তিনি। মাছ ধরার জন্য ছোট্ট একটি নৌকা বানিয়েছেন। তবে সেটা অনেক বছর আগের। এখন নৌকার অবস্থা ভাল নেই। নৌকার এক পাশের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে। খুব সাবধানে নৌকা চালাতে হয়। একটু এদিক-সেদিক হলেই নৌকা ডুবে যাওয়ার ভয় আছে। সুষমা এ বাড়িতে আসার কিছুক্ষণ পরেই ছুটে গিয়েছে নৌকার কাছে। নৌকায় চড়ে ঘুরতে চেয়েছিল পুরো খাল। শাহানা বেগমের জন্য সেটা পারে নি। ভাঙা নৌকা দেখে একমাত্র নাতনীকে নৌকায় উঠতে দেননি তিনি। নাতনীর আগ্রহ দেখে সেদিন রাতেই খাওয়ার পরে স্বামীকে নৌকা ঠিক করানোর কথা বলেছে। তিনি দেখবেন বলেছিলেন। আজ তিনদিন হয়ে গেল সুষমারা এসেছে। সবমসময় মেয়েটা নৌকায় চড়ে ঘুরতে চায়। কোনবারই শাহানা বেগম তাকে অনুমতি দেন না। মনে কষ্ট পান ঠিকই। কিন্তু কি করবেন? স্বামীকে এই নিয়ে বিশ বারের উপর বলা হয়ে গেছে। প্রতিবারই তিনি দেখবেন বলেছেন। আজ সকালে যখন মজিদ মাতব্বরকে আবারো বললেন ‘‘নৌকা ঠিক করানোর কথা বলছ তো? ঠিক আছে, আমি দেখবো।’’ তখন আর ঠিক থাকতে পারলেন না শাহানা বেগম। মুখের উপরেই শুনিয়ে দিলেন ‘‘আপনি এতো টাকা দিয়ে কী করবেন, শুনি? কবরে নিয়ে যাবেন?’’‘‘কি বলছো এসব? আমি টাকা কবরে নিয়ে যাব মানে?’’
‘‘তো টাকা জমিয়ে করবেনটা কি আপনি? নাতনী এই প্রথম আমাদের কাছে এসেছে। কত করে শখ করেছে নৌকায় চড়ে ঘুরবে। আর আপনি তার শখ পূরণ করছেন না! আর ক’দিনই বা থাকবে ওরা?’’ বড় ধরণের ঝগড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মজিদ মাতব্বর। তবে সেটা পারলেন না। ধলঘাটা থেকে তিনজন লোক এসেছে তাকে নিয়ে যাবার জন্য। ধলঘাটায় এক নৌকা চোর ধরা পড়েছে, তার বিচার করার জন্য ডাক পড়েছে মজিদ মাতব্বরের।
দুপুর হয়ে গেলো, বৈশাখের দুপুর মানে ঝিমিয়ে পড়া প্রকৃতি। সবকিছুতেই কেমন একটা অলসতা ভাব আসে। খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। সবাই শুয়ে পড়েছে। সুষমার মা বেশ শব্দ করে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। শাহানা বেগমের নাক ডাকার শব্দ হচ্ছে না। তবে বোঝা যাচ্ছে, তিনিও ঘুমিয়ে পড়েছেন। মজিদ মাতব্বর ধলঘাটা থেকে এখনো ফেরে নি। সুষমা শোয়া থেকে উঠে বসল। তার চোখে ভেসে ওঠছে বাড়ির পাশের খালে জামগাছের সাথে বেঁধে রাখা নৌকার ছবি। নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। উঠোনে এসে চারদিকে সতর্ক চোখে দেখল আশপাশে কেউ নেই। এমন দুপুরে অবশ্য কেউ বাইরে থাকেও না। ছোটো ছোটো পা ফেলে সুষমা এগিয়ে যায় নৌকার দিকে।
বেলা পড়ে ভরতি সন্ধ্যা নামছে, খানিক পরেই চারদিকটা ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে যাবে। আকাশটা এখন গাঢ় কুসুম রঙে ছেয়ে আছে। রুচিশীল মানুষের মন কাড়তে বাধ্য এমন দৃশ্য। এতো সুন্দর পরিবেশটা মজিদ মাতব্বরের বাড়ির সাথে ঠিক মানাচ্ছে না। সেখানে এখন কান্নার রোল। একপাশে সুষমা শুয়ে আছে। শাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে তার শরীর। মুখটা এখনো কেমন হাসি হাসি করে রেখেছে। দেখে মনে হচ্ছে এখনই আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াবে মেয়েটা!
এইতো, কিছুক্ষণ আগে নৌকার মিস্ত্রীর সাথে কথা হয়েছে মজিদ মাতব্বরের। খাল থেকে আগামীকাল ডুবে যাওয়া নৌকা তুলে ঠিক করে দেবে বলেছে।
@হাসনাতের হস্তাক্ষর
8 Comments-
@shomikadhikarynandon ধন্যবাদ
Friends
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
AdabenTatali
@adabentatali




শুভেচ্ছা