-
বৃষ্টি আসার আগে, বাতাসটা অনেক ভালো লাগে। ভালো লাগে বৃষ্টি পড়ার টিপ টিপ ঝিপ ঝিপ শব্দ। শুধু ভালো লাগে না, বৃষ্টির পড়ে মাটির ভ্যাপসা গন্ধ। ভ্যাপসা গন্ধটা পাশ কাটিয়ে বাস স্টপটার দিকে এগিয়ে গেলাম, হলুদ একটা সোডিয়াম লাইট জ্বলছে সেখানে। বৃষ্টির পানিতে রাস্তা ভিজে আছে, সারি সারি হয়ে দাড়িয়ে থাকা ল্যাম্প পোষ্ট গুলো রাস্তায় আলো দিচ্ছে, আর সেই আলো ভেজা রাস্তায় প্রতিফলিত হয়ে চিক চিক করে জ্বলছে। বাস স্টপের দিকে হাটছি আর মনে মনে আশা করছি বাস না হোক একটা সি এন জি যেন পেয়ে যাই, যদিও এখন রাত এগারো টা। কিছু না কিছু একটা নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। চকিতে মনে পড়লো, এগারো একটা মৌলিক সংখ্যা। একজন বিখ্যাত অনুবাদকের প্রথম মৌলিক উপন্যাসের নাম ছিলো “রাত এগারোটা”, এই লোকের নাম ফুয়াদ আল ফিদাহ। অদ্ভুত মিল। বাস স্টপের কাছে পৌচ্ছাতেই দেখলাম বোরখা পড়া কেউ একজন সেখানে দাড়িয়ে,মুখে মাস্ক, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পেছনে ব্যাগ। ফোন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার দিকে একবার তাকিয়ে আবারো ফোনের দিকে নজর দিলো। আমি তাকে পাশ কাটিয়ে দূরত্ব বজায় রেখে এক পাশে দাড়ালাম। একেই রাত তার উপর মেয়েটা একা, এসময় তারা প্রচন্ড নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। একটা মেয়ে এখানে একা দাড়িয়ে আছে দেখে মোটেও অবাক হলাম না কারণ এই এলাকাটা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং, প্রাইভেট সেন্টার দিয়ে ভরা, তাই রাত দিন এখানটা নানান বয়সী শিক্ষার্থী আনাগোনা থাকে। এই মেয়েটাও হয়তো তেমন একজন, যদিও কোচিং গুলো এতো রাত পযন্ত খোলা থাকে না।, হয়তো কোনো প্রাইভেট ছিলো তাই দেরি করে ফিরছে। আমি নিজে যখন ভর্তি পরিক্ষার্থী ছিলাম তখন রাত বারোটা পযন্ত আমার প্রাইভেট ছিলো।
ঠান্ডা বাতাস টা যেন বেড়েছে। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে বলে আমি শার্টের হাতা গুলো নামিয়ে দিয়ে বোতাম লাগালাম। পকেট থেকে ফোন টা বের করে দেখলাম এগারোটা ষোল। প্রায় দশ মিনিট ধরে দাড়িয়ে আছি কিন্তু কোনো যান বাহনের টিকির পযন্ত দেখা নেই। বলতে বলতে একটা সিএনজি আসতে দেখা গেল। আমি বাস স্টপ থেকে নেমে সামনে জমে থাকা পানি গুলো এড়িয়ে সিন এন জির টা থামানোর জন্য হাত নাড়তে লাগলাম। মেয়েটাও একই কাজ করলো। সি এন জি থামলো।
আমি ড্রাইভারকে জিগ্যেস করলাম “মামা কারওয়ান বাজার যাবেন.?”
ড্রাইভার বলল,“ না মামা সামনে রাস্তায় পানি জইমা আছেয়। আমার ইঞ্জিন ভিইজা যাইবো”, কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি। আমার সামনের মেয়েটার দিকে ইশারা করে বলল, “এই যে আফা আপনে কোনহানে যাইবেন.? আপনেরা কি এক লগে.?”
“জ্বি না। আমি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজের দিকে যাবো, আপনি যাবেন ঐ দিকে.?” মেয়েটা বললো।
ড্রাইভার জবাবে বলল, “না ঐ দিক যামু না, আপনেরা আর একটু অপেক্ষা করেন কিছু একটা পাইয়া যাবেন।“ তারপর সিন এন জি স্টার্ট করে চলে গেল।
এদিকে আমার কানে মেয়েটার বলা কথা গুলো বাজছে। এই মিষ্টি কন্ঠটা আমি চিনি। এই কন্ঠ আমার অনেক পরিচিতি। ভেতরে ভেতরে একটু উত্তেজিত অনুভব করতে শুরু করেছি, আর ভাবছি আমার কোনো ভূল হচ্ছে না তো.? কোথাও কোনো ভূল করে ফেলছি না তো.? কিন্তু আমার অবচেতন মন বলছিলো আমি কোনো ভূল করছি না, তবে কি যার সাথে কোনোদিন দেখা হয়নি। যাকে কখনো চোখের সামনে দেখিনি সে কি এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে?। আমার মাথা ধরে আসছে, চিন চিন করছে মাথার ভেতরটা। সামনের পানি টুকু পেড়িয়ে আবারো ছাউনিতে উঠে আসলাম, পকেট থেকে ম্যাচ আর সিগারেটের প্যাকেট টা বের করলাম। সিগারেট মুখে নিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছি কিন্তু ঝড়ো বাতাসে ম্যাচের কাঠি বার বার নিভে যাচ্ছিলে। পাচ ছয় বার চেষ্টার পর হাল ছেড়ে মনে মনে নিজেকে গালি দিলাম। আমার বন্ধুরা যারা ধূমপায়ী সবাই লাইটার ব্যবহার করে কিন্তু আমি সেই পুরোনো যুগে পড়ে আছি। সেজন্য রাফি ঠাট্টা করে আমার নাম দিয়েছিলো ক্লাসিক স্মোকার। সিগারেটটা ঠোঁটে নিয়ে আমি ইতস্তত করছি। এমন সময় পাশে থেকে ব্যাগের চেইন খোলার আওয়াজ পেলাম। পাশ ফিরো তাকাতেই দেখলাম মেয়েটা ব্যাগ খুলে একটা লাইটার বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, “সিগারেট ছাড়িস নাই তাহলে”
অনেক অনেকদিন পর আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো, আর আমার হৃদপিণ্ড জোরে জোরে লাফাতে লাগলো, আমি তাকে চিনেছি। এবং তার চেয়ে বড় কথা সেও আমাকে চিনছে। আমি কিছু না বলে লাইটার টা হাতে নিলাম। লাইটার টার গায়ে ভন গখের বিখ্যাত পেইন্টিং সানফ্লাওয়ারের ডিজাইন আকা। আমি সিগারেট টা ধরিয়ে লাইটার তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, “আমার এ বদঅভ্যেসটা কখনো ছাড়তে পারবো না”
সে বলল,“মন থেকে চাইলেন ছাড়া যেত”
আমি ম্লান হেসে চুপ করে থাকলাম। একবারের জন্য তাকালাম না তার দিকে, কিন্তু সে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। সামন দিয়ে একটা সি এন জি চলে যেতেই সেদিকে তাকালো। আমি সি এন জি টা ডাকতে চাইলাম, কিন্তু কি একটা কারণে ডাকলাম না চুপ করে দাড়িয়ে সিগারেট টানতে থাকলাম, সেও নিশ্চুপ। চারিদিকে গাঢ় নিরবতা। নিরবতা ভেঙ্গে তাকে জিগ্যেস করলাম, “এখানে কি করা হয়.?
সে আবারো আমার দিকে তাকালো, বলল,“ উন্মেষে কোচিং করি, পরে একটা প্রাইভেট ছিলো। তুই কি করিস এখানে”.?
“ একটা ছাত্র পড়াই।”বলে চুপ করে গেলাম। তার কাছ থেকে লাইটারটা আর একবার চেয়ে নিলাম আর একটা সিগারেট ধরালাম। লাইটারটা ফেরত দিতে দিতে বললাম,“লাইটারটা অনেক সুন্দর, আসি”
শেষ বারের মতো তার দিকে তাকালাম। সে কিছু বললো না চশমার নিচ থেকে বড় চোখ দুটো দিয়ে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো।আমি ছাউনী থেকে নেমে ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকলাম। বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে , অঝোর বিষন্ন বৃষ্টি। কিছুক্ষণ পর আকাশের দিকে তাকালাম, জমাট বাধা অন্ধকারে ছেয়ে গেছে আকাশ, কোথাও এক ফোটা আলোর অস্পষ্ট বিন্দু নেই। মাথার ভেতর থেকে একটা প্রশ্ন উঠে আসলো “তারাও কি আমাদের হারায়, যাদের আমরা হারাই”ভন গখের লাইটার
6 Comments
Friends
Abu Taher
@abu-taher
Arif Muslimeen
@arif-muslimeen
Foyzur Khan
@foyzur-khan
Shohag arnob
@shohagarnobgmail-com
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Shovan Khan Sabuz
@methopath
শায়েরুল ইসলাম
@shaerulislam
Zahidul Jamy
@zahidul



খুব সুন্দর! গল্পে যেন ঝিরঝিরিয়ে পড়ছে অনুভূতির সমস্ত বর্ষণ। শুভেচ্ছা নেবেন।