Profile Photo

Abul Hasan TuhenOffline

  • abulhasantuhen
  • Profile picture of Abul Hasan Tuhen

    Abul Hasan Tuhen

    4 years ago

    নাটক ।। ঝিলিমিলি

    মূল কাহিনি : কাজী নজরুল ইসলাম
    বেতার নাট্যরূপ: আবুল হাসান তুহিন

    কাহিনি সংক্ষেপ: মির্জা সাহেবের মেয়ে ফিরোজা , দোতলার পূবে জানালা দিয়ে হাবিবের বাড়ি দেখা যায়। জানালা দিয়ে ফিরোজা ঝিলিমিলি দেখতো। হাবিব গান করে বাঁশি বাজায় মুগ্ধ হয়ে দুজন দুজনার প্রেমে পড়ে। বাধসাধে মির্জা সাহেব বন্ধ করে দেয় পূবের জানালা অসুস্থ হয়ে যায় ফিরোজা। পরে হাবিবকে শর্ত দেওয়া হয় গান-বাজনা ছেড়ে দিলে এবং বিএ পাশ করলে হাবিবের সাথে ফিরোজার বিয়ে দেয়া হবে । বদ্ধ ঘরে থেকে ফিরোজা দিন দিন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। পুবের জানালা খুলে দিতে ফিরোজা বার বার আকুতি জানায়, একসময় জানালা খুলে দেয়া হয়, ততক্ষণে ফিরোজার জীবন প্রদীপ নিভে আসে । হাবিবের বিএ পাস এর রেজাল্ট যেদিন বের হয় সেদিন ফিরোজা মারা যায়।

    চরিত্র রূপায়ণে:
    ১। মির্জা সাহেব -পিতা
    ২। হালিমা -মাতা
    ৩। ফিরোজা -মেয়ে
    ৪।হাবিব – প্রেমিক
    ৫।ডাক্তার—- পুরুষ

    দৃশ্য।।০১।।সন্ধ্যা।। মির্জা সাহেবের বাড়ি
    চরিত্রঃ মির্জা সাহেব, হালিমা, ফিরোজা, হাবিব

    [বাড়ির উপর-তলায়, মির্জা সাহেবের ষোড়শী মেয়ে ফিরোজা রোগশয্যায় । সব জানালা বন্ধ, শুধু পশ্চিম দরজা খোলা। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। পাশে বসে মির্জা সাহেবের স্ত্রী হালিমা বিবি মেয়েকে পাখা দিয়ে বাতাস করছেন। বাদলায় ও বেলাশেষের অন্ধকারে ঘরের আঁধার গাঢ়তর হয়ে উঠলো। হালিমা বিবি উঠে হারিকেন জ্বালালেন।]

    হালিমা : একটু ঘুমানোর চেষ্টা কর মা, তোর পাশে এভাবে বসে থাকলে চলবে! সংসারে কতো কাজের সামাল দিতে হয়। এদিকে বাদলা কিছুতে থামছেনা চারিদিকে অন্ধকার হয়ে এসেছে ঘরে হারিকেন জ্বালাতে হবে। যাই হারিকেন টা জ্বালিয়ে আনি। (হালিমা হারিকেন জ্বালাতে গেল)

    ফিরোজা : মা! ওমা কোথায় গেলে।

    হালিমা :(ছুটে এসে ফিরোজার মুখের কাছে মুখ রেখে) কী মা! সোনা আমার! এই যে পাখা দিয়ে বাতাস করছি।

    ফিরোজা : আহ্ মা বাতি জ্বালিয়ে আনলে কেন? বাতিটা নিভিয়ে দাও!

    হালিমা : কেন মা? বড্ড আঁধার যে! ভয় করবেনা।

    ফিরোজা : উঁহুঁ। তুমি আমায় ধরে বসে থাকো। (মা-কে জড়িয়ে ধরলো) বাতি বিশ্রী লাগে।

    হালিমা : তা তো লাগবেই মা‌! (দীর্ঘশ্বাস ) আচ্ছা,
    আমি কাগজ আড়াল করে দিই। কেমন?

    ফিরোজা : না। তুমি নিভিয়ে দাও। (রোগশীর্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠে) দাও শিগগির!

    হালিমা : কেঁদো না মণি, মা আমার! এই আমি নিভিয়ে দিচ্ছি। (বাতি নিভাতে গেলেন। ততক্ষণে কতকগুলো বাদলা পোকা এসে বাতি ঘুরে নৃত্য করতে লাগলো। ফিরোজা এক মনে দেখতে লাগলো। বাদলা পোকা উড়ার শব্দ)

    ফিরোজা : কি সুন্দর বাদলা পোকা এসেছে।থাক বাতি নিভিয়ো না, মা! আমি বাদলা পোকা দেখব!

    হালিমা। : হা হা হা (হেসে ফিরে ) খ্যাপা মেয়ে! আচ্ছা নিভাবো না। পোকা যে গায়ে মুখে এসে পড়বে মা, বাতিটা একটু সরিয়ে রাখি।

    ফিরোজা : (চিৎকার করে কাঁদে উঠলো) না! আমি বলছি, বাদলা পোকা দেখব!

    হালিমা : (কন্যাকে চুমু দিলেন) লক্ষ্মী মা আমার! অত জোরে কথা বলো না! ওতে অসুখ বেশি হয়! আমি বাতি সরাচ্ছি নে।

    ফিরোজা : (চুপ করে বাদলা পোকা দেখতে লাগলো) আমি চুপ করে বাদলা পোকা দেখবো মা, আমাকে একটা বাদলা পোকা ধরে দাও না।

    হালিমা : ছি মানিক! পোকা ছুঁতে নেই! পোকার গায়ে জীবাণু থাকতে পারে, আজ অমন করছো কেন ফিরোজা?

    ফিরোজা : (কান্নার সুরে) দাও বলছি। নইলে চেঁচিয়ে রাখব না কিছু।

    হালিমা : লক্ষ্মী, মা! কেঁদো না। এই দিচ্ছি। এই ধরি ধরি, ধরলাম। এই নাও মা। (একটা বাদলা পোকা ধরে মেয়ের হাতে দিলেন। (ফিরোজা হাতে নিয়ে পোকা দেখবে )

    ফিরোজা : দাও । কি সুন্দর বাদলা পোকা, এই যা! পাখা খসে গেল! আ-হা-রে! আচ্ছা মা! বাদলা পোকার খুব লাগল?

    হালিমা : তা লাগল বইকী!

    ফিরোজা : তা হলে ছেড়ে দিই ওকে। মা, তুমি ওকে নীচে রেখে এসো।

    হালিমা : দাও বাইরে ছেড়ে দিচ্ছি। এবার একটু শান্ত হও।
    ফিরোজা : মা, বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে, না?

    হালিমা : হাঁ মা, খুব বৃষ্টি। শুনছ না ঝমঝমানি শব্দ?

    ফিরোজা : আমার খুব ভালো লাগে ওই বৃষ্টির শব্দ। … মা, আব্বা কোথায়?

    হালিমা : বাইরে, দহলিজে বোধ হয়।

    ফিরোজা : এখন যদি আমি খুব জোরে কাঁদি, আব্বা শুনতে পাবেন?

    হালিমা : ছি মা, কাঁদবে কেন? উনাকে ডেকে পাঠাব?

    ফিরোজা : না, না, ডেকো না। মা তুমি খুব লক্ষ্মী মেয়ে! আচ্ছা মা, তুমি যদি এখন গান কর, আব্বা শুনতে পাবেন?

    হালিমা : ওরে দুষ্টু! বুঝেছি তোমার মতলব। … না, মা, এখন কি আর গান করি, তোর আব্বা শুনলে রাগ করবেন।

    ফিরোজা : এত বৃষ্টিতে শুনতে পাচ্ছেন কিনা! মা, লক্ষ্মী মা, সোনা-মা, আস্তে আস্তে গাও না! সেই বৃষ্টি ঝরার গানটা।

    হালিমা : আচ্ছা, গাচ্ছি আস্তে আস্তে। এখন কি আর গান আসে রে ফিরোজা। সেই কবে ছেলেবেলায় গেয়েছি গান। এখানে এসেই তা ভুলতে চেষ্টা করেছি। তোর আব্বা বড্ডো রাগ করেন গান শুনলে।

    ফিরোজা : আচ্ছা মা, গান শুনেও কেউ রাগে? আব্বাতো আচ্ছা মানুষ, যা হোক!

    হালিমা : আগে কিছুদিন রাগ করতেন না। … গান তো প্রায় ভুলেই যাচ্ছিলাম। কেবল তোর জন্যেই আজও দু-একটা মনে আছে।

    ফিরোজা : আব্বা আগে রাগ করতেন না মা, তুমি গান করলে?
    হালিমা :না! ………. তুই এখন গান শোন।

    ।। গান ।।
    ঝরে ঝরঝর কোনো গভীর গোপন
    -ধারা এ শাঙনে
    আজি রহিয়া রহিয়া গুমরায় হিয়া
    একা এ আঙনে॥

    ঘনিমা ঘনায় ঝাউ-বীথিকায়
    বেণু-বন-ছায় রে
    ডাহুকিরে খুঁজি ডাহুক কাঁদে রে
    আঁধার গহনে॥

    কেয়া-বনে দেয়া তূণীর বাঁধিয়া
    গগনে গগনে ফেরে গো কাঁদিয়া
    বেতস-বিতানে নীপ-তরুতলে
    শিখী নাচ ভোলে পুছ-পাখা টলে।

    মালতী লতায় এলাইয়া বেণি কাঁদে
    বিষাদিনী রে,
    কাজল-আঁখি কে নয়ন মোছে
    তমাল-কাননে॥

    ফিরোজা : মা! এবার জানলাটা খুলে দাও। আমি মেঘ দেখব!

    হালিমা : লক্ষ্মী মা! জানলা খোলে না। ঠান্ডা লাগবে। আমি বরং একটা গান করি, তুমি শোনো।

    ফিরোজা : না মা। আর গান আমি সইতে পারব না। খোলো না মা, জানলাটা।

    হালিমা : এই তো খুলেছি। (হালিমা দক্ষিণের জানালা খুলতে গেলেন )

    ফিরোজা: ওটা না মা, ওই পুব-দিককার জানলাটা খোলো। পুবের হাওয়ায় কদম ফোটে, না মা?

    হালিমা : ও-দিককার জানলা খুললে তোর আব্বা আমাকে জ্যান্ত রাখবেন না, ফিরোজ! এই দক্ষিণের জানলাই খুলি। (দক্ষিণের জানালা খুললেন।) ঐযে দূরে বনের আভাস দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টিধারায় বন ঝাপসা হয়ে আসছে। দেখতে পাচ্ছো মা ।

    ফিরোজা : (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাশ ফিরলো।) না দেখবো না। এই আমি পাশ ফিরলাম। আমি পূবের জানালা দেখবো ।( আবার পাশ ফিরে জানালার দিকে তাকিয়ে কেঁদে) মা! ও মা তুমি আব্বার মতো নিষ্ঠুর নও ।

    হালিমা : মা আমার! তুই কাঁদছিস ফিরোজা ?

    ফিরোজা : আচ্ছা মা, আব্বা তোমায় খুব ভালোবাসেন?

    হালিমা : জানি না।কাঁদলে বালিশ ভিজে যাবে। আমি চোখ মুছে দিচ্ছি। (চক্ষু মুছে দেবে)

    ফিরোজা : আগে খুব ভালোবাসতেন?

    হালিমা : বাতিটা এখন সরিয়ে রাখি? তোর চোখে লাগছে, না?

    ফিরোজা : আচ্ছা রাখো। কিন্তু তুমি বলো …

    হালিমা : (বাতি সরিয়ে ) এখন একটু চুপ করে
    ঘুমাও তো ফিরোজা। বেশি বকলে আবার অসুখ বাড়বে।

    ফিরোজা : আচ্ছা, তুমি না-ই বললে। আমি সব বুঝি। আব্বা কক্ষনো কাউকে ভালোবাসেননি। নইলে মানুষ কখনো এমন নীরস আর নিষ্ঠুর হয়!

    হালিমা : তুই কি থামবি নে ফিরোজা? লক্ষ্মী মা আমার, কেন মন খারাপ করছ এত, বল তো! আজ ডাক্তার বাবু চুপ করে থাকতে বলে গেছেন।

    ফিরোজা : আচ্ছা মা, কাল থেকে ওই পুব-দিককার জানলাটা খুলবে তো, তখন তো আর আব্বা বকবেন না?

    হালিমা : (শিহরিত হয়ে। কান্নায় তাঁহার গলা ভেঙে আসলো।) ও কী কথা বলছিস ফিরোজা?

    ফিরোজা : কাল আর ও-জানলা খুলতে বলব না মা! (বালিশে মুখ লুকাইল।)

    হালিমা : পাগলী মেয়ে এমন কথা বলতে নেই।
    ( কণ্ঠ অশ্রুবিকৃত হয়ে ) বুঝেছি রে হতভাগি, সব বুঝেছি। তুই আমাদের বড়ো শাস্তি দিয়ে যাবি। … মা, এই আমি খুলে দিচ্ছি পুব-জানলা, তুই অত অধীর হসনে। (পুব-জানালা খুলে দিতেই সম্মুখের বাড়ির মৃদু-আলোকিত বাতায়ন দেখা গেল।)

    ফিরোজা : দেখেছ মা শান্তির বাতাস বয়ে যাচ্ছে।
    বাতায়নপথে কে যেন ছটফট করে ফিরছে।
    হালিমা : শান্ত হও ফিরোজা।

    ফিরোজা :মা দেখ দূর হতে তাকে ছায়ামূর্তির মতো দেখাচ্ছে। ছায়ামূর্তি নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মনে হয় যেন এই বাতায়ন-পানেই সে অচঞ্চল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

    হালিমা : তুমি তো জানো ওটা কে হতে পারে? (হালিমা আড়ালে চক্ষু মুছলেন।)

    ফিরোজা :(ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ) আঃ কি শান্তি, মা ও মা ও ভাবে দাড়িয়ে রইলে যে ! মা সরে দাড়াও, বাতায়ন-পথে বাঁশি বাজছে না? উঁহুঁ কে যেন কাঁদছে! (অস্থির হয়ে) বাইরে কে কাঁদে মা? মা, মা, শোনো!

    হালিমা :কই মা, কিছু না। ও বৃষ্টির ঝরঝরানি। … হুঁ … না …হাবিব বুঝি গান করছে এসরাজ বাজিয়ে।

    ফিরোজা :আহ! বৃষ্টিটা যদি থামত, গানটা শুনতে পেতাম … বৃষ্টি থেমে আসছে – না মা?
    হালিমা :হাঁ মা, বৃষ্টিটা ধরে এল।

    ফিরোজা :মা – মা! এইবার শুনতে পাচ্ছি গান। আহ! একটু শব্দ না হয় যেন। মা তুমি চুপ করে শোনো। (বাতায়ন হতে গান ভেসে আসছে।)
    ।।গান ।।
    হৃদয় যত নিষেধ হানে নয়ন ততই কাঁদে।
    দূরে যত পলাতে চাই, নিকট ততই বাঁধে॥

    স্বপন-শেষে বিদায়-বেলায়
    অলক কাহার জড়ায় গো পায়,
    বিধুর কপোল স্মরণ আনায়
    ভোরের করুণ চাঁদে॥

    বাহির আমার পিছল হল কাহার চোখের জলে।
    স্মরণ ততই বারণ জানায় চরণ যত চলে।

    পার হতে চাই মরণ-নদী
    দাঁড়ায় কে গো দুয়ার রোধি,
    আমায় – ওগো বে-দরদি –
    ফেলিলে কোন্ ফাঁদে॥

    [গান শেষ হলে বাতায়নের আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠে। সেই আলোকে এক প্রিয়দর্শন হাবিবের মূর্তি স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। সে স্থির দৃষ্টিতে এই দিকেই তাকিয়ে আছে।]

    হাবিব : (স্বাগত) আমার অধীর নয়ন ভুল দেখছে না তো। অনেক দিন পর ফিরোজার ঘরের জানালাটা খুললো। ও যদি এখন সামনে এসে দাঁড়াতো,তাহলে আমার ভাঙ্গা বুকটা কিছুটা জোড়া লাগতো। ফিরোজার কিছু হয়নি তো! কেন জানলা টা হঠাৎ খুলল। না না ফিরোজার কিছু হবে না। ফিরোজা সামনে এসে দাঁড়াও তোমার ছায়া মূর্তি দেখলেও আমার পরান জুড়িয়ে যাবে ।
    ।। সামান্য পচ।।
    ফিরোজা :মা – মা-মণি! ঘরের বাতিটা খুব উজ্জ্বল করে দাও। যেন আমার মুখটা খুব ভালো করে দেখা যায় ও-বাড়ি হতে। (বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।)

    হালিমা :ওরে ফিরোজা ! বন্ধ করতে হবে, পুব-জানালা। তোর আব্বা আসছেন। (মির্জা সাহেব গৃহে প্রবেশ করতেই একটা দমকা হাওয়ায় প্রদীপ নিভে গেল, দমকা বাতাসের শব্দ)

    যা দমকা বাতাস বাতিটা নিভিয়ে দিল। আবার জ্বালাতে হবে। আপনি একটু সাবধানে আসেন বাতিটা নিভে গেছে জ্বালিয়ে দিচ্ছি।(হালিমা আবার বাতি জ্বালাবেন।)[ ম্যাচ জ্বালানোর শব্দ]
    এমনিতেই জানালা খুলি নি মেয়েটি কেমন করছিল, আমি জানালা বন্ধ করে দিচ্ছি।

    মির্জা সাঃ :থাক, আর জানলা বন্ধ করতে হবে না। আমি বহুক্ষণ থেকেই তোমাদের কীর্তি দেখছি। দেখ, আর যা-ই কর, ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেতে চেষ্টা, কোরোনা। (হালিমা নিরুত্তর) … আর ওই বাঁদর ছোঁড়াটাকেই বা কী বলি! এক গাছা কাঁচা বেত নিয়ে বেতিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত … (ক্রোধে বদ্ধমুষ্ঠি হইয়া দাঁত কড়মড় করিয়া উঠিলেন।) দিনরাত গান আর গান! বাঁশি আর এসরাজ! স্থিরচিত্তে একটু ‘কোরান তেলাওত’ করবার কী নামাজ পড়বার জো নেই। হতচ্ছাড়া পাজি কোথাকার! ওই বিশ্ব-বখাটে আবার বলে, পাশ করবে বি.এ.। ও তো ফেল করেই আছে। ওই রত্নের সঙ্গে দেব মেয়ের বিয়ে!

    হালিমা :দেখো, তোমার পায়ে পড়ি, আজ একটু আস্তে কথা কও, আজ ফিরোজা কেমন যেন করছে!

    মির্জা সাঃ : জানালা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে এবার। (পুব-দিকের জানালা বন্ধ করতে করতে) হুঁ। … তা এমন করে জানলা খুলে তাকিয়ে থাকলে যে-কোনো আইবুড়ো মেয়েরই অসুখ করে।…দেখ, তুমিই ফিরোজার মাথা খেলে। আর ওই বুড়ো বয়সেও তোমায় গান গাওয়া অভ্যেস গেল না। কী ভুলই করেছি স্কুলে-পড়া মেয়ে বিয়ে করে!

    হালিমা : সত্যি, এ ভুল না হলে দুইজনই বেঁচে যেতাম। আমি এ কথা-ভাবতেও পারিনে যে, কোনো কোনো গ্র্যাজুয়েট গোঁড়ামিতে কাঠ-মোল্লাকেও হার মানায়।

    মির্জা সাঃ : শরিয়তের বিধি-নিষেধ মানাকে তুমি গোঁড়ামি মনে কর, এ অভিযোগ তো বহুবার শুনেছি, হালিমা। আর কোনো নতুন কথা শোনাবার থাকে তো বলো।

    হালিমা : আছে। তোমার মতো শরিয়তের টিন-বাঁধানো হৃদয়ে তা কি লাগবে? …একটু আগে গানের খোঁটা দিচ্ছিলে। কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছ যে,আমি গান গাইতে পারি জেনেই তুমি আমায় বিবাহ করে কৃতার্থ হয়েছিলে!

    মির্জা সাঃ : ভুলিনি সেকথা। কিন্তু তখন জানতাম না যে তোমার গান শুধু চোখের জল, শুধু ব্যথা। কেন গান শরিয়তে নিষিদ্ধ, তা আমার চেয়ে কেউ বেশি বুঝবে না! শরিয়তে যিনি সংগীত নিষিদ্ধ করেছিলেন, তিনি জানতেন এর ব্যথা দেওয়ার পীড়া দেওয়ার শক্তি কত।

    হালিমা :আমি এও জানি, যিনি এই শরিয়তের স্রষ্টা, তিনি গান শুনে আনন্দও পেয়েছেন। যাক, তর্ক করবার স্থান এ নয়। মেয়েটাকে একটু শান্তিতে মরতে দেবে কি?

    মির্জা সাঃ: দেখ, জীবনে হয়তো শান্তি দিইনি তোমাদের। আমার বিশুষ্ক জীবনে তোমাদের জন্যে হাসির ফুল ফোটাতে পারিনি, শুধু কাঁটাই ফুটিয়েছি। কিন্তু মরণেও তোমাদের অশান্তি হানব, এত বড়ো গালি আমায় না-ই দিলে! (হালিমা চমকিয়া উঠিলেন, ফিরোজা পাশ ফিরিয়া জলসিক্ত চোখে তাহার বাবার দিকে তাকাইল – মির্জা সাহেব পায়চারি করিতে লাগিলেন।)

    ফিরোজা :আব্বা! আমার পাশে এসে বসো।

    মির্জা সাঃ :(কাঁপিয়া উঠিলেন)…হালিমা! তুমি ফিরোজাকে দেখো, আমি ডাক্তার ডাকতে চললাম।

    ফিরোজা :আব্বা! আব্বা! দেখছ না কীরকম ঝড়-বৃষ্টি শুরু হল আবার। তুমি যেওনা না। আমি আর ওষুধ খাব না। একটু কাছে এসে বসো আজ লক্ষ্মীটি।

    মির্জা সাঃ :(হঠাৎ রাগান্বিত হয়ে উঠলেন।) কিন্তু আমি থাকলে তো তোমার অসুখ আরো বেড়ে উঠবে মা!

    ফিরোজা :না, আজ আর বাড়বে না। তুমি এসো (মির্জা সাহেব তাহার শয্যাপার্শ্বে বসে মেয়ের ললাটে হাত বুলিয়ে দিলেন) … আব্বা, আজ আমি খুব যা-তা বকব, তুমি কিছু বলবে না, বলো।

    মির্জা সাঃ :আচ্ছা মা, বলো।

    ফিরোজা :তুমি ওই পুব-জানলাটা খুলতে দাও না কেন?

    মির্জা সাঃ :(হঠাৎ কঠোর হয়ে উঠলেন) ও ব্যাটা পাজি, নচ্ছার, বাঁদর!…কিন্তু মা, তুমি ভালো হয়ে ওঠো। ও যদি বি. এ. পাশ করতে পারে এবার, তাহলে ওই বাঁদরের গলাতেই মোতির মালা দেব – এও তো বলে রেখেছি।

    ফিরোজা :কিন্তু আমি তো আর ভালো হব না আব্বা।
    মির্জা সাঃ :(শিহরিত হয়ে) না, মা, ভালো হবে। এখনই তো ডাক্তার আসবে।

    ফিরোজা :উঁহুঁ, কিছুতেই ভালো হব না আমি।…আচ্ছা আব্বা, তুমি ওকে এ-বাড়ি আসতে দাও না কেন?

    মির্জা সাঃ :(হঠাৎ বিছানা হতে উঠে চিৎকার করে) আমি ওকে খুন করব। শয়তান আমার মেয়েকে খুন করেছে।(বাইরের দরজায় করাঘাত শোনা গেল)

    হাবিব :আমি এসেছি। আমাকে খুন করুন। … মা, একটিবার দোর খুলে দিন।

    মির্জা সাঃ :খবরদার! কেউ দোর খুলো না। বেরোও পাজি এখান থেকে।
    হাবিব : আমার পাশের খবর বের হয়েছে।

    মির্জা সাঃ :পাশ করেছ ?

    হাবিব ‌ :এখনও খবর পাইনি। তবে অবশ্যই পাশ করেছি। হয়তো এখনই খবর আসবে।

    মির্জা সাঃ :মিথ্যাবাদী! আগে খবর আসুক, তারপর এসো। এখন বেরোও। মেয়ের অসুখ বেড়েছে।

    হালিমা :আহা, দাও না বাছাকে আসতে। একটু দেখে যাবে বই তো নয়! কদিন থেকে ছেলেটা যেন ছটফটিয়ে মরছে।

    মির্জা সাঃ :হাঁ, আর সেই দুঃখে নতুন নতুন গান গাওয়া হচ্ছে। চুপ করো তুমি। (চিৎকার করে) এখনও দাঁড়িয়ে আছ?

    হাবিব : আছি। আমায় খুন করবেন বলেছিলেন। খুন করুন, তবুও একবার দোর খুলুন মির্জা সাহেব।

    মির্জা সাঃ : দেখেছ ব্যাটার মতোলব। নিশ্চয় সাথে পুলিশ নিয়ে এসেছে। আমায় বলিয়ে নিতে চায় যে, আমি খুন করব বলেছি। আমি কখখনো খুন করব বলিনি, তুমি লক্ষ্মী-ছেলের মতো বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ো।

    ফিরোজা : কেন এত অপমান সইছ আমার জন্যে, তুমি যাও। আমি তোমাকে আমি সত্যি করে পেয়েছি।

    হাবিব :পেয়েছ?

    ফিরোজা :হাঁ, পেয়েছি।

    হাবিব :কিন্তু, আমি তো পাইনি।

    ফিরোজা :কাল পাবে। আমি আজ তোমার উদ্দেশে যাব পুব-জানলা দিয়ে। তুমি তোমার বাতায়নের ঝিলিমিলি খুলে রেখো।

    হাবিব :কিন্তু তোমার বাতায়ন তো রুদ্ধ।

    ফিরোজা : যখন যাব তখন আপনি খুলে যাবে।

    হাবিব : তবে যাই আমি।

    ফিরোজা :যাও। যাওয়ার কালে আমার ঝিলিমিলি-তলে সেই যাওয়ার গানটা শুনিয়ে যাও।
    [হাবিবের গাইতে গাইতে প্রস্থান]
    ।। গান ।।
    শুকাল মিলন-মালা, আমি তবে যাই।
    কী যেন এ নদী-কূলে খুঁজিনু বৃথাই॥

    রহিল আমার ব্যথা।
    দলিত কুসুমে গাঁথা,

    ঝুরে বলে ঝরা পাতা –
    নাই কেহ নাই॥

    যে-বিরহে গ্রহতারা সৃজিল আলোক,
    সে-বিরহে এ-জীবন জ্বলি পুণ্য হোক।

    চক্রবাক চক্রবাকী
    করে যেমন ডাকাডাকি,
    তেমনই এ-কূলে থাকি
    ও-কূলে তাকাই॥

    ফিরোজা :মা! মা! আমার কেমন করছে! মাগো, তুমি আমায় ধরো! আব্বা, তুমি যাও। তোমায় ভালো লাগে না। … মা! মা! এত বাতি জ্বলে উঠল কেন! (মূর্ছিত হইয়া পড়িল)

    হালিমা :ওগো, তোমার পায়ে পড়ি, যাও ডাক্তারকে খবর পাঠাও ! মা! সোনা মা আমার! লক্ষ্মী মা! ফিরোজা !

    মির্জা সাঃ : ফিরোজা ! মা! তুই ফিরে আয়! আমি হাবিবকে ফেরাতে যাচ্ছি।
    [বিদ্যুৎবেগে বের হয়ে গেলেন।]
    ।। পট পরিবর্তন ।।

    দৃশ্য।।০২।।রাত।। স্বপ্নপুরি।।
    চরিত্রঃ ফিরোজা, হাবিব

    [স্থান সাদা মেঘের পাল-টাঙানো সপ্তমী চাঁদের পানসিতে চড়ে হাবিব ও ফিরোজা ভেসে চলছে। শ্বেত-মরালীর সারি ডানা দিয়া দাঁড় টানছে। তাহাদের ভিড় করে আছে চকোর-চকোরী। ময়ূরকণ্ঠী আলোতে হাবিবের মুখ এবং ফিরোজার মুখ রাঙিন হয়ে উঠেছে। সারা আকাশ যেন জুঁই-বাগানের মতো বিকশিত হচ্ছে।]

    ফিরোজা :এ আমরা কোথায় এসেছি, হাবিব?

    হাবিব :(হাসিয়া) ছি, নাম ধরে ডাকতে নেই এখানে! এখানে আসতে হয় নাম ছারিয়ে, সকল নামের দিশা ছড়িয়ে। এখানে হাবিবও আসতে পারে না, ফিরোজাও আসতে পারে না।

    ফিরোজা :তবে যে আমরা এসেছি।

    হাবিব :একবার চাঁদের জ্যোৎস্না-মুকুরে ভালো করে নিজের মুখ দেখো দেখি।

    ফিরোজা :(সভয়ে) এ কী, আমি যে আমায় চিনতে পারছিনে! এ আমি কে?

    হাবিব : (হাসিয়া) কার মতো বোধ হয়?

    ফিরোজা : এ যেন – এ যেন সকলের মুখ! এ যেন শকুন্তলার, এ যেন মালবিকার, এ যেন মহাশ্বেতার মুখ! এ যেন লায়লির, এ যেন শিরীর মুখ!হাবিব :সত্যিই তাই, তোমার মুখে আজ নিখিল-বিরহিণী ভিড় করেছে। এখানে আসতে হয় শুধু ‘প্রিয়’ আর ‘প্রিয়া’ হয়ে। এখানে নর-নারী অ-নামিক। এ লোকে নর-নারীর পরিচয়-সংকেত ‘প্রিয়’ আর ‘প্রিয়া’। এখানে ডাকতে হয় শুধু ‘প্রিয়তম’ বলে।

    ফিরোজা :(লজ্জায় রাঙিয়া উঠিল, চাঁদকে ঘিরিয়া রামধনুর সাত-রঙা শোভা বিজলির মতো খেলিয়া গেল!) যাও! (কানে কানে) চকোর-চকোরী শুনতে পাবে যে!

    হাবিব :শুনুক। ধরায় আমাদের যে কথা কানাকানি হয়ে আছে, তারায় তারায় আজ তারই জানাজানির হুল্লোড় পড়ে গেছে। দেখছ না প্রিয়তম! কত নব নব তারা জন্ম লাভ করল সৃষ্টির নীহারিকা-লোকে, শুধু ওই কানে-কথাটি শুনবার লোভে। ওই কানে-কথা শুনবে বলেই তো চন্দ্রলোকে এত চকোর-চকোরীর ভিড়!

    ফিরোজা :এ কোন লোক, প্রিয়তম? (চাঁদ দুলিয়া উঠিল)

    হাবিব :দেখলে? চাঁদ দুলে উঠল তোমার ‘প্রিয়তম’ ডাকের নেশায়! …এ স্বপ্ন-লোক।

    ফিরোজা : স্বপ্ন-লোক! তাহলে এ-স্বপ্ন টুটে যাবে? আবার তোমায় হারাব?

    হাবিব : হয়তো হারাবে, হয়তো হারাবে না;
    জানিনা। তো … এ স্বপ্ন-লোক এত ক্ষণিক বলেই এত সুন্দর।…না, না, এ স্বপ্ন-লোক চিরদিনের, এ সুন্দরের আকাঙ্ক্ষা-লোক, এর কি মৃত্যু আছে? এর কি শেষ আছে?

    ফিরোজা :তবে ভয় হয় কেন? এখনই এর শেষ হয়ে যাবে মনে করে?

    হাবিব : ওই শেষের ভয় – ওই হারাবার ভয় আছে বলেই এত মধুর এ-লোক। তাই তো এমন জড়িয়ে ধরে আছি পরস্পরকে। চোখের পাতা ফেললেই এ স্বপ্ন টুটে যাবে ভয়েই তো এমন পলক-হারা হয়ে চোখে চোখে চেয়ে থাকি। ওই হারাবার ভয়েই তো চন্দ্র-সূর্য গ্রহ-নক্ষত্র এমন বিপুল আবেগে পরস্পর পরস্পরের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে না – পায়ে পায়ে ঘুরে ফিরছে।

    ফিরোজা :তাহলে এই বেহেশ্‌ত?

    হাবিব :এই বেহেশ্‌ত।

    ফিরোজা :তাহলে আর যারা বেহেশ্‌তে এসেছে তারা কই? শিরী, লায়লি, জুলেখা? আর ফরহাদ, মজনু, ইউসুফ?

    হাবিব : আমাকে ভালো করে দেখো দেখি।

    ফিরোজা :(সভয়ে হাবিবকে জড়াইয়া ধরিল) ওগো, একী! তোমার এত বিপুলতা আমি সইতে পারব না। তুমি যেন নিখিল-পুরুষ, তুমি যেন অনন্তকাল ধরে কাঁদছ।

    হাবিব :(হেসে ফিরোজার কপোলে তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলি দেয়ে ) এই যে তোমার কপাল ছুঁয়ে বলছি। ভয় নেই, প্রিয়তম! আর একবার দেখো, তুমি যাকে দেখতে চাইবে তাকেই দেখতে পাবে আমার মুখে।

    ফিরোজা :(তাকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে) আচ্ছা বেহেশ্‌তের হুরপরি কই?

    হাবিব :তুমি ইচ্ছা করলেই তারা আসবে। এখানে বাসনা দিয়ে তাদের সৃজন করতে হয়।

    ফিরোজা :তারাও সব তাহলে আমাদের মধ্যে?

    হাবিব :হাঁ, এখানে – এই স্বর্গলোকে – শুধু দুটি নরনারী – তুমি আর আমি – অনন্তকাল ধরে মুখোমুখি বসে আছে। তাদের চোখে পলক নেই। বুঝি পলক পড়লেই বিশ্ব কেঁদে উঠবে। হারিয়ে যাবে সুন্দর এ স্বর্গলোক। হারিয়ে যাব আমি আর তুমি।

    ফিরোজা :(হাবিবকে জড়িয়ে ধরে) প্রিয়তম!

    হাবিব :(ফিরোজার কপোলে কপোল রেখে) প্রিয়তম!
    [চন্দ্র সাথে দোল খাইতে লাগিল। চকোর-চকোরী উন্মত্ত হইয়া উঠিল। হাবিব ও ফিরোজ চাঁদের সাথে দোল খাইতে খাইতে অস্ত গেল।]

    দৃশ্য।।০৩।।ভোর বেলা।।মির্জা সাহেবের বাড়ি
    চরিত্র মির্জা সাহেব, ডাক্তার, ফিরোজা, হালিমা, হাবিব

    [মির্জা সাহেবের অন্দরমহল। ফিরোজা পালঙ্কে মূর্ছিতা, ডাক্তার তার চিকিৎসা করবে]

    মির্জা সাঃ: ভোর হয়ে এসেছে। আকাশ এখনও মেঘাচ্ছন্ন! মেঘলা আকাশ চিরিয়া ‘বউ কথা কও’ পাখির স্বর দূর হইতে দূরান্তরে মিশিয়া গেল। প্রদীপ-শিখা ম্লান হইয়া উঠিয়াছে।

    হালিমা : (বার বার আঁচলে চক্ষু মুছছেন ও কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে) ডাক্তার সাহেব কিছু একটা করেন।

    ডাক্তার : ধৈর্য্য ধরুন , সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখুন।

    মির্জা সাহে: ডাক্তার সাহেব আমার একমাত্র মেয়েটাকে হারাতে পারবেনা।
    ডাক্তার : শুনুন রোগীর অবস্থা বেশি ভালো না তাছাড়া এ বদ্ধ ঘরে মানুষ বসবাস করতে পারে সমস্ত জানলা দরজা খুলে দিন।
    মির্জা সাহে: (অস্থিরভাবে পায়চারি করে) ঠিক আছে ডাক্তার আমি জানালা খুলে দিচ্ছি আপনি মেয়েটাকে ভালোভাবে চিকিৎসা করুন।

    ডাক্তার : দেখি দেখি মা, বারে বারে নাড়ি দেখছেন । শেষে হাতে একটা ইঞ্জেকশন দিয়া ডাক্তার কাহাকেও কিছু না বলিয়া চোখ মুছিতে মুছিতে বাহিরে উঠিয়া গেলেন।]

    ডাক্তার : মির্জা সাহেব আপনার মেয়ের অসুখটা শরীরের নয় মনের । আমি চেষ্টার ক্রটি করেনি। মনের অসুখের ডাক্তার আমি নই। শেষ ইনজেকশনটা দিলাম, সৃষ্টি কর্তাকে ডাকুন, তিনি চাইলে ফিরাতে পারেন। না হলে —–

    মির্জা সাঃ: ডাক্তার , আমার ধন সম্পদ প্রতিপত্তি বিনিময়ে আমার মেয়েকে সুস্থ্য করুন।

    ডাক্তার : আমি শেষ চেষ্টা করছি। মেয়ে যদি সুস্থ হয়ে উঠে ও যা চাইছে সেটা করবেন। আপনার ধন সম্পদ প্রতিপত্তির প্রয়োজন হবে না। চলি মির্জা সাহেব।( ডাক্তার চলে গেলেন )

    ফিরোজা :(নড়ে উঠবে) মা!

    হালিমা : (ছুটে গিয়ে ফিরোজার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে) মা মা আমার! ফিরোজা ফিরে এসেছিস! মানিক আমার! জাদু আমার!

    মির্জা : ফিরোজা মা! আবার চললাম খুঁজতে তাকে। ওই সকাল হয়ে এল। আল্লাহ। এবারটি আমাকে মাফ করো। আমি তোমার ইঙ্গিত বুঝেছি হালিমা। মাকে আমার ধরে রেখো। আমি হাবিবকে খুঁজতে চললাম। (ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন)

    ফিরোজা : মা-মণি খুব কেঁদেছ বুঝি? ও কী! পুব-জানলা খুললে কে?

    হালিমা : (ললাটে গভীর চুম্বন এঁকে দিলেন) তোমার আব্বা।

    ফিরোজা :মা, আব্বাকে ডাক।

    হালিমা :তিনি যে হাবিবকে ডাকতে গেলেন, মা! আজ তোদের বিয়ে (মা ম্লান হাসি হাসলেন)।

    ফিরোজা :(উজ্জ্বল হাসি হেসে) মা, তুমি আব্বাকে খুব ভালোবাস?

    হালিমা : (হেসে) আজ তোর সাথে সাথে প্রথম ভালোবাসলাম। (মুখ ফিরালেন)।

    ফিরোজা :(মার হাতে চুমু খেয়ে) দুষ্ট মেয়ে। তাহলে তোমাদেরও আজ বিয়ে হল। তাহলে আমি তোমাদের কে হলাম।

    হালিমা :খ্যাপা মেয়ে। তুই আমাদের মা হলি। হল তো?
    ফিরোজা :(হঠাৎ সোজা হইয়া উঠে হাবিবের ঝিলিমিলির পানে তাকিয়ে ) মা! মা! ওর জানলা বন্ধ কেন?

    হালিমা :অভিমানী ছেলে – রাত্রে কোথায় চলে গেছে। যাবে আর কোথায়? এক্ষুণি হয়তো আসবে। তোমার আব্বা ওকে না নিয়ে ফিরছেন না।

    ফিরোজা :(শয্যায় ছিন্নকণ্ঠ কপোতীর মতো লুটাইয়া পড়িল) মা! মা গো! সে আর ফিরবে না। আমার স্বপ্নই তাহলে সত্য হল। ওই অস্তচাঁদের চোখে তার অশ্রু লেগে রয়েছে। মা! মা! ও কী? ও কার গান? (দূরে হাবিবের ক্লান্ত কণ্ঠের করুণ বিলাপ-গীতি শোনা যাচ্ছে।)
    ।।গান।।

    স্মরণ-পারের ওগো প্রিয়
    তোমায় আমি চিনি যেন!
    তোমার চাঁদে চিনি আমি,
    তুমি আমার তারায় চেন॥

    নতুন পরিচয়ের লাগি
    তারায় তারায় থাকি জাগি
    বারে বারে মিলন মাগি
    বারে বারে হারাই হেন॥

    নতুন চোখের প্রদীপ জ্বালি
    চেয়ে আছি নিরিবিলি,
    খোলো প্রিয় তোমার ধরার
    বাতায়নের ঝিলিমিলি।

    নিবাও নিবু-নিবু বাতি,
    ডাকে নতুন তারার সাথি,
    ওগো আমার দিবস-রাতি
    কাঁদে বিদায়-কাঁদন কেন॥

    ফিরোজা : মা! মা! চাঁদের পার হতে ভেসে আসছে ও-গান। ও-গান স্বপন-লোকের, ও-গান বেহশ্‌তের। মা – গো – !

    হালিমা :হাবিব! হাবিব! ছুটে আয় বাপ আমার! তোর ফিরোজা চলে যায়। মা! মা আমার রে! (লুটিয়ে পড়লেন)

    হাবিব : (ঝড়ের বেগে দ্বারে করাঘাতের শব্দ করে) মির্জা সাহেব। দোর খুলুন! খোলো দ্বার! ‘ ফিরোজাকে আর আটকে রাখতে পারবেনা, ফিরোজা ’আমি এসেছি ফিরোজা। আমি বি. এ পাশ করেছি। খোলো দ্বার। আজ আমাকে কেউ আটকাতে পারবেনা।(দ্বারে পদাঘাত করে, দ্বার ভেঙ্গে পড়লো।) মা! মা! ফিরোজা কই, আমি পাশ করেছি। এই দেখো ‘তার’ – পারদর্শিতার সহিত পাশ!

    হালিমা :হাবিব, হাবিব, ফিরোজা আমার চলে গেছে।

    হাবিব :(ক্রন্দন-উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে চিৎকার করে)না, না,না , আমাকে একা রেখে, চলে গেছে?

    হালিমা : হ্যাঁ চলে গেছে – ওই পুব-জানলা দিয়ে। বললো , মা আমি চললাম ওই জানলার ঝিলিমিলি খুলতে।

    হাবিব : মা! আমি তাকে খুঁজতে চললাম। ওই অস্ত-চাঁদের চোখে তার ইঙ্গিত দেখতে পেয়েছি। ফিরোজা ফিরোজা আমি আসছি ফিরোজা, চাঁদের জোৎস্নায় বেহেস্তের আঙিনায় আমাদের মিলন হবে। [ঝড়ের বেগে চলে গেল।]
    ।। সমাপ্ত ।।

    5
    5 Comments

Abul Hasan Tuhen

Friends

Skip to toolbar