Profile Photo

অরিন্দম সাইফুল্লাহOffline

  • Arindam-Saifullah
  • উপহার
    সেদিন ৪ঠা মাঘ।
    ও‘র জন্মদিন। প্রিয়জনের জন্মদিনটা সবার কাছে একটু অন্যরকই থাকে। একটু ভিন্নতর ভাবে উদযাপনের প্রয়াশ থাকাটাও বিচিত্র নয়। আমার কাছেও তাই এই দিনটাকে নিয়ে বেশ উত্তেজনা কাজ করছিল। “শুভ জন্মদিন” কথাটা কখন বলব, কিভাবে বলব, কোথায় বলব, এ রকম হাজারটা প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল বারবার। যা আমাকে না শুতে, না বসতে, না খেতে, কোন কিছুই করতে দিচ্ছিল না। যে ভাবেই হোক ও’কে এবার চমকে দিতেই হবে। কলেজ লাইফের লুকিয়ে প্রেম। মেস জীবন আর অপ্রতুল টিউশনির ফাঁক গলিয়ে এই আট বছরের প্রেমের ইতিহাসে ও’কে তেমন কিছুই দিতে পারিনি। যেহেতু সবেমাত্র চাকুরীতে প্রবেশ করেছি সেহেতু সুযোগটা আমি কোনভাবেই হাতছাড়া করতে চাইনি। আমাদের শুরুটা ভায়োলিন দিয়ে।
    নবীন বরণ, চারিদিকে সাজ সাজ রব। ভায়োলিনে ভৈঁরো’র উপরে ওয়েস্টার্ন প্যাটার্নে কাজ করছে একজন তন্বী চপলা নবীন ছাত্রী। জয় জয় ধ্বনি চারিদিকে।মুহূমূর্হু করতালি পড়ছে। অগণিত করতালির ফাঁকে আমি বুঝতে পারলাম, এই বেহালাবাদিনীর প্রতি হঠাৎ করেই আমার বুকের মাঝখানে এক দুর্বলতা জন্মেছে। এই শুরু পূর্ব রাগ।
    আমি আজও অবাক হয়ে ভাবি, কট্টরপন্থী-গোঁড়া ধর্মীয় পারিবারিক চাপকে পরিপূর্ণ উপেক্ষা করে মেয়েটা কিভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে অন্যের ভায়োলিন দিয়ে এত সুন্দর সুর রপ্ত করল? একেই কি প্রতিভা বলে নাকি এটা অধ্যাবসায়ের মূর্ত ফসল? তাই ভাবলাম এবারও তাই দিয়েই আবার শুরু হোক।

    বিশেষ করে যারা গীটার অথবা ভায়োলিন বাজাতে জানেন না, তাদের জন্য ভালো গীটার বা ভায়োলিন কেনা আদৌ সম্ভবপর নয়। তাই রেজওয়ানা লিপাকে সঙ্গে নিলাম। লিপা ও’র বান্ধবীই শুধু নয়, এক প্রাণ দুটি দেহ। উপরন্তু লিপা’র কাছ থেকেই ও’র ভায়োলিনের উপর দুর্বলতার জন্ম এবং লিপা’র কাছেই লুকিয়ে তালিম নেয়া শুরু। ভায়োলিন কিনবার পরে দেখলাম লিপাই যেন বেশি খুশি। কিছুতেই যেন ও’র তর সইছে না। কথা ছিলো কফিশপে বসে কপি নিতে নিতে পরিকল্পনা করা হবে কি করে আজকের এই ক্ষুদ্র উপহার মহারাণী সমীপে পেশ করা হবে। তারপরে পদব্রজে হেঁটে হেঁটে উপঢৌকন সমেত ক্যাম্পাসে গমন ও উদযাপন। কিন্তু লিপার তাড়াতাড়ির পীড়াপীড়িতে কোনটাই হলো না বরং রিক্সা নিতে হলো। রিক্সা যতই ক্যাম্পাসের দিকে আগাচ্ছে আর আমার বুকের ভেতর ততই হাজারটা হাতুড়ির বাড়ি একযোগে পড়ছে আর আমি অযথাই ঘামছি।ভায়োলিনটা দেখে ওর ভেতরে কেমন পরিস্থিতি তৈরি হবে? ও কি খুব খুশি হবে, নাকি রেগে যাবে? ওহ্! ভাবতে পারছিনা আর… এরই মধ্যে মুঠোফোন বেজে উঠলো। পারভেজ খুব দ্রুত কান্না চেপে রাখবার চেষ্টা করতে করতে বলল,
    – তুই কোথায় রে?
    – কেন, ক্যাম্পাসে যাচ্ছি।
    – ক্যাম্পাসে যেতে হবে না, তাড়াতাড়ি মেডিকেলে আয়।
    – কেন, কি হয়েছে? সবাই ঠিক আছে তো?
    – হু, তাড়াতাড়ি আয়, রিক্সা নে জলদি, অতকথা বলবার সময় নেই, ইমার্জেন্সিতে আয়।

    রিক্সাকে বলতে হলো না ঘুরে গেলো চালক হয়ত ওপাশের কথা শুনতে পেরেছিলেন, নয়তোবা এর ষষ্ঠেন্দ্রিয় প্রবল। লিপা আমার দিকে তাকিয়ে আছে,
    – কি হয়েছে?
    – জানিনা, ভয় করছে।

    বেহালা কাঁধে নিয়ে দৌড়াচ্ছি সাথে লিপা, সবাই তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, ভায়োলিনটা অজানা ভয়ে বোঝা হয়ে আছে। গিয়ে দেখলাম যার জন্যে এই ভায়োলিন সে-ই বেডে অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে, চারিদিকে তার রক্তের ফোয়ারা। ওর পরিবার থেকে এখনও কেউ এসে পৌঁছেনি। চারপাশে আমাদের সবাই। সবাই চুপ।
    ডাক্তারেরা বিমর্ষ মুখে বলাবলি করছেন, এ হাত দুটোকে হয়ত আর বাঁচানো যাবে না।যে হাতের আদরে এতকাল ভায়োলিন সুবোধ বালকের মতো সুরের সুরায় ডুবে যেতো, আজকে যার হাতে সদ্য কেনা এই ভায়োলিনটা বেজে উঠবার কথা ছিলো, কত স্বপ্ন ছিল কত আশা, সেই হাতই আর থাকবেনা, কোনকালে এই হাতে বেজে উঠবেনা ভায়োলিন ভাবতেই আমার চোখে একযুগ আদিম অন্ধকারেরা নেমে এলো।
    ২রা আষাঢ়, ১৪২৭;
    16.06.2020
    বেলা- 5.00টা

    15
    13 Comments
    • শুভকামনা

    • জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো।

    • কষ্টরা এমনি করেই এসে যায়!

    • শেষটায় এত কষ্ট কেনো? মনটন সব খারাপ হয়ে গেল।

    • শুভকামনা

    • মানুষের জীবনে সুখটা কি খুব বেশি? মানুষের জীবনে ব্যথার গভীরত খুব বেশি। এই গল্পটা লেখা হয়েছে যদিও প্রেমে, তবে এর মূল কাহিনীটা আমার জীবনের সাথেই অবিচ্ছেদ্য

    • মনোমুগ্ধকর

    • ব্যাথা সর্বদা জানান দেয় আমাদের যে এখনো বেঁচে আছি। বেঁচে থাকতে হবে জীবনভর। দুঃখ করবেনা লেখকপ্রিয়, গভীর দুঃখটার উপর একটুখানী সুখের প্রলেপ পেলেই জীবনটাকে অনেক বেশী সুখী মনে হয়। শুভ কামনা রইল।

    • শেষটায় এসে কস্ট পেলাম

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 14 June 2022 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটকে ধন্যবাদ দেবার ভাষা নেই। আর যাদের জন্য লেখা, তাদেরকে আন্তরিক শ্রদ্ধা

অরিন্দম সাইফুল্লাহ্

Skip to toolbar