-
• 4 years, 1 month agoমো. মিকাইল অাহমেদ• 4 years, 1 month ago
পড়ন্ত বেলা
গ্রামের নাম রসূলপুর। যতদূর চোখ যায় বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে বিশাল গোরস্থান। কখন এই গোরস্থানের গোড়াপত্তন কেউই নিশ্চিত বলতে পারেনা। কয়েক প্রজন্ম চলে গেছে মাটির নিচে। ধনী-গরিব, জমিদার, দ্বীনদার, পরহেজগার, অহংকারী মানুষ সব এক কাতারে শামিল। সবারই আজ এক পরিচয় কবরস্থানের বাসিন্দা। শুনশান। নিরব। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। যৌবনে যখন তেজ ছিল কারো কারো হুংকারে কাঁপতো গায়ের মাটি। গ্রামের সরদার কিংবা পালোয়ান সবার কণ্ঠ নিরব, নিস্তব্ধ। যাদের ডাকে মুহূর্তে মানুষ জড়ো হয়ে যেত সেই মানুষগুলো আজ বড্ড অসহায়। সাঁতার না জানা পানিতে পড়া অবুঝ শিশুটির মতো। কবরের অন্ধকার ঘরে তাদের চিৎকারও কেউ শুনতে পায়না। দুই দিনের দুনিয়ায় কত শত বাহাদুরি না ছিল। অর্থবিত্ত আর রূপের দেমাগে মাটিতে যাদের পা পরতে না তারাও আজ মাটির বাসিন্দা। বাড়ি, গাড়ি, টাকা পয়সা কিছুই যায়নি সঙ্গে। কিছু যায়ও না।এবারের বর্ষায় পানি হয়েছিল বেশ। বিগত কয়েক বছর ধরে এমন পানি হয়না। এখন পানি অনেকটা শুকিয়ে গেছে। সারাদিন তপ্ত রোদ। বাইরে বের হবার জো নেই। বিকেলে জমিজমা দেখাশোনা করার জন্য বের হয়েছে গ্রামের কৃষক করিম মিয়া। ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ লোক। চুল, দাড়িতে পাক ধরেছে। সাদা দাড়িতে খুব গর্ব হয় তার। নবীর সুন্নত দাড়ি। সাদা দাড়িওয়ালা মুরুব্বীদের বিশেষ সম্মান আছে। জীবনে কোনদিন দাড়ি কামায় নাই করিম মিয়া। নবীর সুন্নত দাড়িতে ক্ষুর লাগালে যেন তার কলিজায় আঘাত লাগে। পড়াশোনা বেশি করতে না পারলেও সমাজ সচেতন মানুষ তিনি। নবীর মহব্বত আছে তার দিলে। নবীর সুন্নত পালনে সজাগ দৃষ্টি তার। এই একটা সুন্নতই তো সঙ্গে যাবে কবরে। যখনই একটু সময় পায় সাদা দাড়িতে হাত বোলায় করিম মিয়া। আনন্দে পুলকিত হয় তার মন।
বিগত কয়েক বছর জমিতে ফসল ভালো না হলেও হতাশ নন করিম মিয়া। তিনি মনে করেন এটা আল্লাহর পরীক্ষা। রিজিকের মালিক আল্লাহ। রিজিকের পেরেশানি তিনি করেন না কখনোই। তবে একটা ব্যাপারে খুব পেরেশানি আছে তার। খুব ভয় হয় কখন না জানি হারাম খাদ্য ঢুকে যায় পেটে। সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি তার। কারণ করিম মিয়া জানে হারাম খাদ্যে হৃষ্টপুষ্ট যে মাংস নরকাগ্নি তার উত্তম স্থান।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভা। কবর স্থানের পাশ দিয়ে জমি দেখতে গিয়েছিল করিম মিয়া। তার ফসলের জমি কবরস্থানের একটু দূরেই। ফেরার সময় ভাবলে মা-বাবার কবরটা জিয়ারত করা যাক। দাদা-দাদির কবর গুলোও পাশেই। কতশত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব নিজ হাতে কবরে শুইয়েছে সে। জীবন সায়াহ্নে এসে নিজেকে বড্ড একা লাগছে। মউতের কথা মনে পড়ছে খুব। কখন না জানি ডাক আসে চলে যাবার চলে যেতে হয়ও। কেউ থাকতে পারে না। থাকার জন্য আসে না কেউ। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলেন করিম মিয়া। একেতো দরজা-জানালা বিহীন অন্ধকার ঘর, তারউপর কবরের কঠিন আযাবের ভয়। কীভাবে থাকবে সে। মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। নামাজের দিকে এসো কল্যাণের দিকে এসো। এবার যাওয়ার পালা।
1 Comment
অভিনন্দন