-
এতিমের সুখ দুঃখ
প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান। দেশের নামকরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ার তিনি। পাশ করেছেন স্থাপত্যবিদ্যায়। বহু মানুষের বসতবাড়ির নকশা তিনি নিজ হাতে করে দিয়েছেন। বিলাসবহুল বাড়ি, সুরম্য অট্টালিকা, আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক দালান কোঠা কত কিছুর নকশা তিনি করেছেন। বাড়ির ভিতরে একটু পায়চারি করার জন্য, একটা অলস বিকেল কাটানোর জন্য, শহরের যান্ত্রিক জীবন আর কোলাহল থেকে একটু মুক্তির জন্য মানুষ নিজের বিলাসবহুল বাড়িটাকে একটু নান্দনিকতার ছোঁয়া দিতে পছন্দ করে। যে জন্য প্রয়োজন একটা সুবিশাল বারান্দা, বাড়ির সামনের দিকে একটু খোলা জায়গা যেখানে থাকবে ফুলের বাগান। সেইসব বাগান ইঞ্জিনিয়ার সাহেব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বাড়ির ডিজাইন এর সাথে যুক্ত করেছেন।
কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এর ঢাকার অভিজাত এলাকার নিজের বাড়ীটাকে আজ বড্ড নিরানন্দ লাগছে। কত ফুল ফুটে আছে বাগানে কিন্তু মনে আনন্দ নেই। শুধু বাগানের ফুলে কি মন ভরে? নিঃসন্তান দম্পতি কেবল বুঝতে পারেন এই কষ্টের কথা। কি নেই তাহার সুবিশাল বাড়িটাতে? দামি আসবাব পত্র, গহনাগাটি, দামি গাড়ি, বাড়ির সর্বত্র রঙ্গিন আলোর ঝলকানি। সব আছে তবু কি যেন নেই। কেবল শূন্যতা আর হাহাকার। মনে শান্তি নাই। তাই ইঞ্জিনিয়ার সাহেব ভাবলেন গ্রামের বাড়ি থেকে পরিবারসহ কটা দিন বেড়িয়ে আসবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। তারপরে একদিন পরিবার নিয়ে চলে গেলেন গ্রামে। পরিবার বলতে কেবল স্বামী-স্ত্রী।
অনেকদিন পর পরিবার নিয়ে গ্রামে বেড়াতে এসেছেন। গ্রামে একটি এতিমখানা বানিয়েছেন। সেটা দেখাশোনার জন্য একদিন বের হলেন তিনি। প্রায় ত্রিশ জন এতিম ছাত্র পড়াশোনা করে এখানে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে এতিম শিশুরা এখানে এসেছে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের অর্থায়নে আর এলাকার মানুষের দান-দক্ষিণায় এতিমখানাটি চলছে। এতিমখানায় গেলে দিল নরম হয়। পিতা-মাতা ছাড়া এসব অনাথ শিশুদের দিকে তাকালে খুব মায়া হয়। উৎসবের দেশ বাংলাদেশ। সারা বছর একটা না একটা উৎসব লেগেই থাকে। কেউ না দিলে কপালে জুটে না এদের। নতুন জামা কাপড় ছাড়া ঈদ কাটাতে হয় এসব এতিম শিশুদের। ঈদের দিন পাশের বাড়ির বিরিয়ানি, পোলাও, পায়েস পিঠাপুলি সেমাই এর গন্ধ আসে নাক এ। ওরা অসহায়। ওরা এতিম। ওরা একটু সেমাইয়ের ভাগ পেয়েছে কিনা সে খবর কে রাখে। এসবের দিকে তাকালে মনে হয় পৃথিবীর এক প্রান্তে সবুজে পরিপূর্ণ মহাবন আমাজন আরেক প্রান্তে শুধু খা খা ধুকতে থাকা সাহারা মরুভূমি। মরুভূমির বুকে না আছে কোন গাছ আর না আছে পানি। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু তপ্ত বালি। মরুভূমির কি ইচ্ছে হয় না কখনো একটু পানির স্পর্শ পেতে। হয়তো হয়। কে জানে। এতিম শিশুরাদের চোখের দিকে তাকানো যায়না। ওদের মাথায় লাগে না তার পিতার হাতের স্পর্শ। একটু কান্না করার সুযোগ হয়না কারো মায়ের আঁচল ধরে। ওরা একা। খুব একা। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে ওদের। ঠিক যেন আরাল সাগরের মত।
হেমন্তের সকাল। হিমশীতল আবহাওয়া। কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে শীত আসি আসি করছে। ফজরের নামাজ পড়ে এতিমখানা চত্বরে পায়চারি করছিলেন ইঞ্জিনিয়ার সাহেব। এতিমখানার বারান্দায় বিষন্ন মনে বসে আছে একটি অনাথ শিশু। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব টের পেলেন বিষয়টি। কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন নাম কি তোমার বাবু। শিশুটি নিচু স্বরে সে শুধু উত্তর দিলো আব্দুল্লাহ। সাহেব জানতে চাইলেন মন খারাপ করে কি ভাবছে আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহ নিরুত্তর। আবারও একই প্রশ্ন। আব্দুল্লাহ এবার উত্তর দিলো মা বাবার কথা খুব মনে পড়ছে তার। জন্মের আগে বাবাকে হারিয়েছে সে। বাবা দেখতে কেমন ছিলো সে জানেনা। বাবার গল্প শোনার সুযোগ মেলেনি। মাকে হারিয়েছে সে বছর দুয়েক পর। মায়ের চেহারাও ঠিক মনে করতে পারছে না এখন। এমনি করে দিন, মাস, বছর পেরিয়ে যায়। একটি বারের জন্য মা বাবাকে দেখতে পাবে না সে। কোনদিন আর আসবেনা ভাবতে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে তার দুধ সাগর ঝরনার মত।
কানাডার বিখ্যাত জলপ্রপাত নায়াগ্রা ফলসের সৌন্দর্য দেখতে কত শত মানুষ পাড়ি জমায় প্রতিবছর। দূর-দূরান্ত হতে ছুটে চলে ওরা। দেশ হতে দেশান্তরে। অথচ বাড়ির পাশে এতিমখানায় কতশত পিতৃ-মাতৃহীন এতিম শিশুরা দিন রজনী কান্নাকাটি করে ওদের চোখের পানি দেখতে কেউ আসেনা। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মনটা নরম হয়ে এলো। তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে। মায়া লাগছে তার। পরক্ষণেই আব্দুল্লাহকে বুকে জড়িয়ে নিলেন পরম মমতায়। সারা শরীরে একটা কম্পন হয়ে গেল তার। নিঃসন্তান ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের শূন্য বুকটা ভরে গেল স্বর্গীয় কোন প্রাপ্তিতে। সন্তানের মুখ দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। আব্দুল্লার ও সৌভাগ্য হয়নি পিতার মুখ দেখার। আব্দুল্লাহ পৃথিবীর আলো দেখার পূর্বে তার পিতা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছিল।
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব ভাবলেন ছেলেটাকে নিজের পরিবারের কাছে নিয়ে যাওয়া যাক। নিঃসন্তান দম্পতির সিদ্ধান্তে এতিম শিশুর আব্দুল্লার একটা বন্দোবস্ত হলো। আব্দুল্লাহ যাবে তাদের সাথে। আর মনমরা হয়ে থাকতে হবে না। নিঃসন্তান দম্পতির যুগের পর যুগ ধরে নির্জন নিরিবিলিতে পড়ে থাক বাড়িতে এতিম শিশু আব্দুল্লাহ খেলবে, দৌড়াবে। শুরুটা তবে এভাবেই হোক না। নিঃসন্তান দম্পতি পাবে সন্তান অার এতিম শিশু আব্দুল্লাহ পাবে পিতামাতার স্নেহ, ভালোবাসা।2 Comments
Friends
রাহেনা বেগম
@rahena-begum
Md. Deloar Hossen
@md-deloar-hossen
সৃষ্টি
@premdevota
Pritam Biswas
@pritam-biswas
Sirazam-Munira
@sirazam-munira
Redwan Khan
@redwan-khan
Kanej-Roksana
@kanej-roksana
AdabenTatali
@adabentatali
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
@mohammad-shahzaman

সুন্দর। লিখে যাও।