-
উঠোন পেরোলেই ঘনবন, জীবনসন্ধ্য নামিবার পর সেখান গাঢ় আঁধার নামিয়া আসে; তখন ভয়ডর হয় – গা ছমছম করিয়া উঠে। বনানী হইতে দেবদারু, অশ্বথ, শিমুল তাহারা নগ্ন চোখে চাহিয়া – মাথা উঁচু করিয়া স্থীর হইয়া থাকে কেবল হাওয়া বইলে তারা দুলিয়া উঠে। তাহাদের আরও অনন্তর বনানীর আরও গহীনে ঘন জারুল, কাঁটাবন, ছাতিম, চালতা ও বুনো জবা ফুলের বৃক্ষরাজি, সেইসব কত শিশির জল, কত বিহঙ্গ বাসা বাঁধিয়াছে!
প্রকৃতি বৈচিত্র্য বলিয়া তাহার নানান ছল, যেই বনানীতে জীবনসন্ধ্য নামিলে চাহিতে ভয়ডর করে সেথায় সূর্যের প্রথম কিরণ হইতে অর্থ্যাৎ সূর্য উদয় হইতে অস্ত যাইবার আগ পর্যন্ত তাহার রুপ, রস, গন্ধ সমস্তই উন্মুক্ত করিয়া দেয়। শৈশব কত মধ্যাহ্নে, কত অপরাহ্নে সেখানে নিজ মনে খেলা করিয়াছি তাহার অন্ত নেই, সেই বনানীর রুপ, রস, গন্ধ শিশুমনে দারুন ছাপ ফেলিয়াছিল। এই বনানী আমার কাছে রুপকথার রাজ্য মনে হইত, চারদিকে পল্লবের স্তুপ, ঘেঁটু বন, কলমীলতার কতার ঝোপ ভূতলে আম কাঠালের ছায়া, ঐ সোনাদীঘির মাঠ,গাছে গাছে মাকাললতা ঐসব হৃদয় এতকাল লালন করিয়া আসিয়াছি। ঐসবই আমার শৈশব থেকে পরিণত বয়সে হৃদয়ের কোন এক গোপন কৌঠায় স্বযত্নে ছিল, তাহাদের আমি মাঝে মাঝে খুঁজিয়া বেড়াই। ইট পাথরের এই নষ্ট শহরের ভিড়ে তাহাদের আর দেখা মিলে না, রুপকথার রাজ্য সত্যি আজ রুপকথা হইল।
ঐ বৃক্ষরাজির আড়ালে আজ চন্দ্রমা হাসিতেছে, সারা আকাশপথ ভাসিয়া যাইতেছে।
কি যে তাহার প্রমোদ তা কেবল সই জানে! চারদিকে জোছনার মহাপ্লাবন, এই যেন কোন রুপকথার দেশ।
এই ভয় ধরে যাওয়া নিশিতে জীবনশূন্য সকলেই যেন এই মহাপ্লাবনে জাগিয়া উঠিয়াছে, মহীরুহের দীর্ঘ পল্লবে যেন জোছনা নামিয়া আসিয়াছে, ইহা যেন মহীরুহের দীর্ঘ কোন পল্লব নয়, ইহা যেন জোছনার ফুল, এই যেন কোন অলীক কল্পনার পূর্ণতা, ইহা যেন কোন কবির দীর্ঘ প্রতিক্ষার কবিতা।
বৃক্ষরাজির অধিকন্তু অতলে যেন জোছনার কোন উৎসব, আমার যেন নিমন্ত্রণ!
আমি দ্রুতগামী কোন মেঘের মতোই ছুটিয়া গেলাম, চরণতলে কিসের যেন শব্দ করিয়া উঠে, এই যে শিমুল, ছাতিম, হিজলের পাতা – মচমচ করিয়া উঠে, তাহাদেরও আজ নিমন্ত্রণ!
দূর কোথাও হইতে ঝিঁঝি পোকার ধ্বনি আসে, তাহারা মনের পরিতোষ কিংবা দ্বিপ্রহরের বিক্ষোভ করিতেছে, তাহাদের ভাব বুঝিয়া লয় এমন কে আছে? একই স্বরে বনানীর বিহঙ্গরাও ডাকিয়া উঠে, আজ প্রত্যেকেই যেন জোছনার অতিথি।
মহীরুহের দীর্ঘ পল্লবে জোছনা, ঐ জোছনায় তাহাদের ছায়া ভূতলে নামিয়া আসিয়াছে, কী অপূর্ব নকশা! ইহা যেন ধরণীর গোপন রুপ, আল্লাহর রহমতেই কেবল তাহার দেখা মিলে।
আমি কৌতূহল, বিষ্ময় অধিকন্তু প্রমোদ বোধ করিলাম, অম্বর অভিমুখে যখন চাহিলাম তখন বোধ হইল আরও এক গভীর বিষ্ময় প্রতীক্ষমান, এই যেন ‘জীবনানন্দ’ বলিতেছে-
“পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;
পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে; পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দু’জনার মনে; আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে।”কেবল ভূতল, বৃক্ষরাজি, মহীরুহের দীর্ঘ পল্লব, দীঘির স্বচ্ছ জলে নয় অম্বরে জোছনা নাচিয়া বেড়াইতেছে। জোছনার কিরণে অম্বরের ছায়াপথের কালো-কালো মেঘ ভাসিয়া উঠিয়াছে, শতসহস্র নক্ষত্রের তাহারাও যেন কোন অন্তরাল হইতে বাহির হইয়া জ্বলিতেছে আপন আলোয়, এই কি কোন অলীক কল্পনা নয়!
2 Comments
Friends
কনা পারভিন
@maria-ferdous
ফাতিহা সুবাহ্
@subah
Drako Shajib
@drako
Akash-Talukder-Akash
@akash-talukder-akash
ইভান
@ivan
Halima-Moly
@halima-moly
Sumon Hawlader
@sumontoulot
Anjuman-Ara-Ankhi
@anjuman-ara-ankhi
Mohammad-Mamun-Hossen
@mohammad-mamun-hossen

সুন্দর স্মৃতিকথা! শহুরেদের কাছে হয়ত রূপকথার মত লাগবে! তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি এই সবুজ ঝোপঝাড়, শূন্য মাঠ, পুকুরঘাট, চাঁদের আলোয় মাটিতে উচু ডালের নকশা এসব দেখলে এখনো মনের কোনে যে বিস্ময়, যে আনন্দ জেগে ওঠে তার সত্যি কোন তুলনা হয়না!