Profile Photo

ঠিকানাহীন অরণ্যOffline

  • Vobertale.aranna
  • শৈশব থেকে অনন্তকাল
    (ধারাবাহিক আত্মস্মৃতি)
    ঠিকানাহীন অরণ্য

    আমাদের দলটায় আমরা ষোল-কুড়িজন ছিলাম, একটু বয়স্ক বড় ভাই, তিনি বয়সে দুই তিন বছরের বড় তাই তিনিই নেতা ছিলেন। বড়দের মধ্যে যে বেশি বাইরের জগৎ চিনে সে-ই নেতা।

    বাইরের জগৎ বলতে আমরা এক অলিখিত সোসাইটির মধ্যে ছিলাম, এখানে টিভি ছিলোনা, টিভি দেখলে নাকি পোলাপান ইচড়ে পাকা হয়ে যায়। যারা বড় ছিলো তাদের দেখতাম ভি. সি. আর নামক ইয়া মোটা কালো কালো ক্যাসেট নিয়ে ভেতরে দরজা আটকিয়ে দেখছে। আজকাল এমন করলে মানুষ ভাববে হয়তো এডাল্ট মুভি দেখছে। আসলে তা নয়,
    বাইরে জানাজানির ভয়, এক কান দুই কান করে রটে যাবে এরা সিনেমা দেখছে। সিনেমা দেখা তো অমার্জনীয় অপরাধ!

    আমরা দল বেঁধে রুটিন করে টিভি দেখতে যেতাম। তারপর এসে এক ঘন্টা লাগতো ঘরে ঢুকতে। আমরা যে এসেছি তা জানান দিতে টিনের প্রাচীরে একটু ধাক্কা দিতাম। ‘এই ক্যারে! কোথায় গেছিলিস জানি, কঞ্চি রেডি রাখা আছে, আজকে পিঠের চামড়া তুলে ফেলবো, পড়ালেখা নাই খালি ঘুরা আর টিভি দেখা!’
    আমরা সেখান থেকে ছুট লাগাতাম। তারপর রাত যখন অনেক হতো তখন মা বলতেন যে কাল থেকে আর যেন না হয়, নে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড় তোদের বাপ যেন না জানে। আমরাও খেয়ে দেয়ে চুপ করে শুয়ে পড়তাম।
    পরেরদিন ফজরের পরেই নিজেরাই পড়তে বসে যেতাম- ডাকাডাকি করতে হতোনা।

    একটু পরে দেখতাম বাবা আটানা দামের ডালপুরি নিয়ে এসেছে।

    সপ্তাহ গড়িয়ে সেই আবার আলিফ লায়লার রাত চলে আসতো, সিন্দবাদ কিংবা রবিনহুডের রাত আসতো। মনে আছে পিসি মানে ফুফুর বাড়িতে প্রতিদিন সিরিয়াল না দেখলে খাওয়াই হতোনা।
    কারমা, সুরাগ, শক্তিমান, জয় হনুমান, জয় গংগা মাইয়া, আহট!
    এমন গোগ্রাসে দেখতাম যে আজো মনে আছে!

    শাসন পেয়ে আমরা যে কুতুব হয়ে গেছি তা নয়, তবে শাসনের ফল এই যে আমরা অন্তত হাইব্রিড প্রজন্মের মতো ল্যক্টোজেন সম্প্রদায় হইনি। এরা জানেইনা বাবা মায়ের শাসন, শিক্ষকের বেতের মার, মহল্লায় আদবের সাথে চলা, গুরুজনকে সম্মান করা, একটু সিনিয়রদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ শ্রদ্ধা নিয়ে চলা।
    আমরা এখনও এক দু বছরের বড়দের সামনে সিগারেট ধরাইনা, হাতে থাকলে ফেলে দেই। আজকালের ছোয়ারা হাফ প্যান্ট পরে কানে এয়ারফোন দিয়ে দিব্যি সুখটান দিতে দিতে সামনে বাপের সমবয়সী কেউ আছে কি না আছে থোরাই কেয়ার করে।

    এটা হচ্ছে ফানুশ আধুনিকতা।
    সে যুগ আমাদের শচীন জন্ম দিয়েছে, ওয়াসিম আকরামের মতো সুইং বোলার জন্ম দিয়েছে, ইমরানের মতো লিডার বা কপিলের মতো অলরাউন্ডার জন্ম দিয়েছে। আজ তো সবটাই কমারশিয়াল। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত চরিত্র ও বেপরোয়া জীবন প্রভাবিত করছে নেতিবাচকভাবে।

    এখনের ইয়ো ইয়ো জেনারেশান পার্কে বসে ব্যা ব্যা করে গায় আর এলো মেলো কাচি চালানো চুলের হেলানে ভেবে নেয় মস্ত গুনী। ক্যারাউকে যোগে সিদ্ধি পাওয়া গায়ক গায়িকা কিভাবে বুঝবে গুরুর সম্মান, রাগ, ছন্দ, লয়, তাল বা একতারা, হারমোনিয়ামের সাথে প্রেমের গুরুত্ব?

    আজ চরম বিকাশের মধ্যেও সেই পুরণো স্মৃতিই দোলা দেয় মনে, জাগরিত করে উত্তাল ঢেউ, ফুরফুরে করে মেজাজ। যেন ফিরে যাই সেই অকৃত্রিম শৈশব-কৈশোর আর যৌবনের প্রারম্ভে।

    বিকেলে ফুলের বাগানে প্রজাপতি ধরা, রাতে জোনাকী ধরা। রোদের আলোয় জানালা দিয়ে গাছ গাছালির ছবি বিছানার চাদরে প্রস্ফুটিত হওয়া। অসাধারন!

    দ্যা সোর্ড অফ টিপু সুলতান সিরিয়াল দেখে একটা কাঠের তরবারী বানিয়েছিলাম আমরা। একবার খেলতে খেলতে আঘাতও পেয়েছিলাম। এরপর থেকে সেই সোর্ড আর পাওয়া হয়নি। টিপু সুলতানও হয়ে উঠা হয়নি।

    (চলবে)

    6
    4 Comments

ঠিকানাহীন অরণ্য -

লেখক

আমি স্বত্মা সম্বলিত আত্মাবাহক মানুষ

কষ্ট চাষ করে শব্দ ভেদ করে সাহিত্য রস বের করা আমার কাজ

প্রেম আমার ধর্ম,  ন্যায়বিচারের কথা আমার যুদ্ধ

আমি চোখের ভেতর সাগর চষি উম্মাদ উম্মত্য হয়ে

জাগতিকতার যান্ত্রিকতা কি করবে আমায় নিয়ে?

আমি ভবঘুরে, আনমনে, বণ্য এক অরণ্য---

Skip to toolbar