Profile Photo

অভিমানী মনOffline

  • ovimanimon
  • Profile picture of অভিমানী মন

    অভিমানী মন

    2 years, 9 months ago

    চড়ুই মামা

    ছেলেবালায় আমরা ছোট্ট একটা পাহাড়ি শহরে থাকতাম। শহরটার নাম চন্দ্রঘোনা। পাহাড়ের গায়ে গায়ে সুন্দর পিচঢলা পথ; চুড়ায় চুড়ায় বাংলো-বাড়ি; আর লম্বা ট্রেইল জুড়ে বিশাল কলোনি। এখানেই চাঁদের মতো বাঁক নিয়ে সমতলের দিকে ছুটে গেছে খরশ্রোতা কর্নফুলি।
    এমন শান্ত, গম্ভির শহর পৃথিবীর কোথাও দেখি নাই। এই শহরে পাবলিক বাস বা রিক্সা চলে না। সকাল বেলায় দলবেঁধে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতাম। আমাদের সঙ্গে পথ চলতো পেপার ও রেওয়ান মিলের হাজারো শ্রমিক।
    ছোট্ট শহরটায় সবাই সবাইকে চিনতাম, আর আনন্দ করতাম ভূবনহারা। আমরা যখন সেভেন/ এইটে পড়ি, এখানে নতুন একটা পরিবার দেখি; ওদের এক ছেলে, এক মেয়ে—আমাদের বয়সি। কিংবা ওরা হয়তো ডর্মেটরিতে থাকতো—আগে চোখে পড়ে নাই।
    আমরা যখন স্কুলে যেতাম, ওরা বাসার বাউন্ডারি ওয়ালের উপর পা ঝুলিয়ে বসে থেকে তুত-ফল খেতো। ওরা ভিষণ ফর্সা আর সোনালি চুলের। আমরা উৎসুক হয়ে জানতে চাই—তোমরা স্কুলে যাও না?
    ওরা বলে—না। আমরা বাসায় পাপার কাছে পড়ি।
    কি পড়?
    ইংরেজি, বাংলা দুটোই; অংকও শিখি।
    তোমাদের বই আছে?
    পাপার কাছে দুইটা বই আছে—ওল্ড টেস্টামেন্ট আর অরিজিন অফ স্পিসেস। বাকি পড়া পাপা শিখায়।
    বাসায় ফিরে ওদের সম্পর্কে জানতে চাই। মা বলে—ও; ইলারুস সাহেবের বাচ্চাদের কথা বলতেছিস? উনি নামকরা ক্যামিস্ট। ওরাতো এংলো; ইংল্যান্ড থেকে এসে এদেশে থেকে গেছে। ওদের বাড়ি ফিরিঙ্গি বাজারে। আমি হাসতে হাসতে বলি—মা জানো, ওরা দাঁত মাজে না!
    মা হাসে—মাজে। ওদের দাঁত হলদেটে।
    অল্প দিনেই ওদের সাথে ভাব হয়ে যায়। রিকি খুব চাল্লু। ডেসি শান্ত টাইপের মেয়ে; মায়ের সাথে আখক্ষেতে কাজ করে। ওদের বাবা মাথায় হ্যাট পরে; ঠোটে চুরুট ঝুলে থাকে। টিনের ছোট্ট বোতল থেকে চুকচুক করে মদ খায়। ওদের মা নানা রকম কেক বানাতে জানে। আমরা গেলে হাঁক ছেড়ে বলে—মারিয়া, বাচ্চাদে কেক খেতে দাও; কয়েকটা স্টবেরিও দিয়ো। আমাদেরকে বলে—হাই বেবিস, কল থেকে পা ধুয়ে ঘরে ঢুকো।
    আমরা তখন মোটেই বেবি নই; ক্লাস এইটে উঠে গেছি। স্টবেরিগুলো পকেটে নিয়ে রিকির সাথে বেরিয়ে পড়ি। ডেসি যখন ‘হাই’ বলে হলুদ দাঁত বের করে জানতে চায়—তোমরা কি সিতা-পাহাড়ে যাচ্ছো?—আমাদের মন ভরে যার; আর প্যান্টের ভিতরে নুনুটা তিড়িং করে লাফিয়ে ওঠে। আখক্ষেত থেকে ওদের মা বলে—তোমরা পাহাড়ের বেশি ভিতরে ঢুকবে না; পথ হারিয়ে ফেলোবে…। রিকি বলে—ডোন্ট ওরি, মারিয়া; আই এম এনাফ এডাল্ট।
    আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি—মাকে তোমরা নাম ধরে ডাকো?
    হ্যাঁ। প্রতিটি মানুষ আলাদা ব্যক্তিত্ব; পাপাকে ইলারুস বলে ডাকি।
    যেতে যেতে কয়েকটা বন-মোরগ দেখি। রিকি পকেট থেকে গুলতি বের করে এক-মারে একটা মোরগ ফেলে দিয়ে বলে—যাও, যাও; খপ করে ধরে ফেলো।
    অন্য মোরগগুলো উড়ে যায়। আহতটাকে ধরে এনে বলি—তোমার হাতে এতো এইম!
    রিকি যে পাহাড়ের এতোকিছু চেনে, বুনো গাছ, লতা পাতা, পাখ-পাখালির নাম—অবাক হয়ে যাই। রিকি বলে—ছুটির দিনে ছোটবেলা থেকে আমরা ফুল-ফ্যামিলি ট্রেকিং করি; তোমরা যাওনি কখনো?
    রিকির সাথে বনে ঘুরার নেশা হয়ে গেছিলো আমাদের। ও-ই আমাদের চড়ুই মামার কাছে নিয়ে যায়। কোনো এক ছুটির দুপুরে আমরা মিথিঙ্গা ছড়ি পেরিয়ে সিতা-পাহাড়ের ট্রেইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা টিলার উপর উঠে আসি। তাকিয়ে দেখি, চারদিকে গিরিসৃঙ্গ! কর্নফুলি যেনো বনোমধ্যে রূপালি সরু চাঁদ। চন্দ্রঘোনা শহরটাকে বহুদূরের অচেনা ছোট্ট লোকালয় বলে মনে হয়। আমরা প্রানভরে শ্বাস নিয়ে বলে উঠি—আহা, ওহো; কি সুন্দর! কি নির্মল নীলাকাশ; কি সবুজ, কি গম্ভির…!
    সমতলের মানুষের কাছে পাহাড় এক রহস্যের ডিপো। গিরিখাদ বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বানর দেখি অজশ্র। যেখানে বেজি থাকে, সেখানে সাপও থাকে বিষধর। গিরগিটিগুলো মাথায় রক্ত তুলে সাবধান করে—আর উপরে যাইস না! বুকে হাঁটা গুইসাপ দুটি একদম নির্বিকার। সেগুন গাছের শুকনো পাতা খসে পড়লে যে মর্মর শব্দ ওঠে—মনে হয়, পাহাড়টাই যেনো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়ছে!
    উপরের দিকে উঠতে উঠতে আমাদের পা যখন অসাড় হয়ে আসে, তখন নীলাকাশ চোখে পড়ে; তারপর মাথার উপরে শুধুই দিগন্ত-জোড়া বিশাল আকাশ; পাঁজি পাঁজি মেঘ।
    দিগন্ত এতো সুদূর হতে পারে, ভাবি নাই। বিজয়ের আনন্দে আমরা যখন প্রানহারা, রিকি তখন বিশাল এক কাঠাল গাছের গোড়ায় গিয়ে বলে—চড়ুই মামা, ওঠো, দেখো কারা এসেছে! এগিয়ে গিয়ে দেখি—পুর্ণাঙ্গ মানুষের একটা কংকাল কাঠালতলায় কাঁৎ হয়ে শুয়ে আছে! আমরা বলি—আরে রিকি, কার সাথে কথা বলতেছো?
    রিকি বলি—উনিই চড়ুই মামা।
    আশ্চর্য, এ-তো মানুষের কংকাল! এতো উঁচুতে কংকাল এলো কি করে! আমরা ভয়ে শিহোরিত হই। আর সাঁই সাঁই হাওয়ায় আমাদের গা কেঁপে যায়। রিকি বলে—ডাকো; ঘুম থেকে জাগাও।
    আমরা একসঙ্গে বলি—চড়ুই মামা, ওঠো…। কংকালেরতো চোখ থাকে না, ‘চোখ মেলো’ বলবো ক্যামনে! ভাবতে গিয়ে পেছনের গাছগুলো থেকে শিশুর হাসির শব্দ আসে—দুপুর পার হয়া গেছে, তা-ও গুরুর ঘুম ভাঙ্গে না! তাকিয়ে দেখি, বড় বড় লেজঝোলা বানর, যারা লাল পাছা চুলকায়, দুষ্টূ ছেলেদের মতো খিক খিক হেসে আমাদের দিকে লটকন ছুড়ে মা্রে। এই অবসরে চারদিক থেকে শত শত চড়ুই এসে কাঠালতলার কংকালটাকে সম্পুর্ণ ঢেকে ফেলে ছোট ছোট ডানা এমনভাবে নাড়তে থেকে, যেনো ঝড় বইছে! বানরের হাসির সাথে চড়ুইয়ের কিচির-মিচির একাকার হয়ে গিয়ে এতোই বিভ্রান্ত করে ফেলে, আমরা বলে উঠি—রিকি, এটা কি সেই ভূতের পাহাড়?
    রিকি হাসে—ওয়েট এন্ড সি; সম থিং মিরাকল; ইউ নেভার সিন।
    সত্যি, চড়ুইগুলো হঠাৎ কংকালের উপর থেকে সরে গিয়ে ঘুর্ণির মতো পাঁক খেয়ে পুরো টিলাজুড়ে ওড়াউড়ি করতে করতে কাঠাল গাছটায় থিতু হয়; আর তখন দেখি, কংকালের স্থানে একজন এংলো মানুষ শুয়ে আছে—পুরো নাঙ্গা!
    ঘটনার ঘনঘটায় আমরা বিমূঢ় হয়ে থাকি। কংকাল থেকে রূপান্তারিত হওয়া লোকটার গায়ে শত দাগ, ফোটা ফোটা লাল তিল, মাথা ভরা সোনালি-সাদা চুল; কুঁচকির বালে নুনু ঢেকে আছে। রিকি বলে—দেখো চড়ুই মামা, কারা এসেছে।
    দাঁড়াবার পর বুঝতে পারি, লোকটা সরু, আর বিরাট; উচ্চতার ভারে একটু নুয়ে পড়েছে যেনো। ঘুম থেকে জেগে গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা পাদ্রিদের সাদা জোব্বাটা গায়ে চাপিয়ে ক্রুশ লাগানো রোজরি-মালা গলায় পরে নিয়ে বলে—হোয়াই ইউ কেইম হেয়ার, বয়েজ?
    আমরা কাঁপতে কাঁপতে বলি—তোমাকে দেখতে।
    হা হা হা…। আমাকে দেখার কিছু নাই; আই এম এ ভ্যাগাবন্ড…। বলতে বলতে বুড়ো এংলোটা এদিক-ওদিক মরে পড়ে থাকা চড়ুইগুলো কুড়িয়ে এক জায়গায় স্তুপ করে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে রিকির বাপের মতো চুরুট ধরায়। গাছের তলায় রাখা একটা মাটির ভাড় থেকে পানি খেতে গিয়ে জামা ভিজিয়ে কাশতে শুরু করে। এরই মধ্যে গন্ধ ছুটে গেলে আগুন সরিয়ে পোড়া চড়ুইগুলো মচমচ করে খায় আর বলে—ল, খা; তোরাও খা; পৃথিবীতে খাদ্যের অভাব নাই; অথচ দেখ, কোনো একদিন খাবারের অভাবে ইংল্যান্ড থেকে আমাদের পুর্বপুরুষরা এদেশে এসেছিলো; হা হা হা…। অনলি গড নোজ, হোয়াট ইজ রং, হোয়াট ইজ রাইট!
    রিকির দেখাদেখি আমরাও পোড়া চড়ুইয়ের পালক ছাড়িয়ে একটা, দুটো খাই। রিকিরা রবিবার শুকোরের মাংশ খায়; আমাদের পাশের বাসার মার্মাদের বাসায় নাপ্পির ডাল রান্না হয়—মাছ, মাংশ পঁচিয়ে বানানো, উৎকট গন্ধযুক্ত; পাহাড়িদের প্রিয় খাবার। পোড়া চড়ুই খেতে আমাদের বেশ লাগে। চড়ুই মামা বলে—সান ইজ ডাউন; এখন না গেলে তোরা পথ হারিয়ে ফেলবি। বয়েজ, গো ডাউন; খুব সাবধান।
    পাহাড়ে চড়া যতো কঠিন, তার চেয়ে কঠিন নিরাপদে নেমে আসা। নামতে নামতে আমরা পথ খুঁজে পাই না। শান্ত পা ফসকে গড়িয়ে গেলে চড়ুই মামা পকেট থেকে একগাছি দড়ি ছুড়ে দিলে কোনো প্রকারে বিপদ থেকে রক্ষা পায়। নামতে নামতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসে।ঘন- অন্ধকারে আমরা সাপ-কোপের ভয় পাই। চড়ুই মামা হাঁক ছাড়ে—বয়েজ, খুব খেয়াল; সূর্য ডুবে গেলে প্রেতরা জেগে ওঠে…।
    নামতে নামতে চেনা পথের দেখা পেয়ে হাপ ছেড়ে বাঁচি। ঘুরে দেখি, চড়ুই মামা নাই! যে চড়ুইগুলো আমাদের সাথে সাথে নিচে নামছিলো, ওদেরও সাড়া পাই না। রিকি বলে—চড়ুই মামা চলে গেছে।
    চোখের পলকে কোথায় গেলো?
    জানি না; পাহাড়ের সবকিছু জানা যায় না।
    চড়ুই মামার দেখা পাওয়ার পর থেকে পাহাড়ে চড়ার উৎসাহ বেড়ে যায়। বুঝতে পারি, বন-বনানীর স্তরে স্তরে বিচিত্র রহস্য লুকানো। কিন্তু আমাদের আর ভয় করে না। যখনি পথ হারিয়েছি, দুর্গম মনে হয়েছে, জোরে জোরে তালি বাজিয়ে বলেছি—চড়ুই মামা, পথ দেখাও…; আর অমনি লতা-পাতায় জড়িয়ে থাকা ছোট পাখিরা কিচির-মিচির করে সাড়া দিয়েছে। আমরা বুঝে গেছি, ছোটপাখি যেদিকে যায়, সেদিকেই মানুষের পথ; আর যেখানে প্রজাপতি ওড়ে, সেখানে সাপের বাসা।
    যেহেতু আমরা পাহাড়ি শহরের ছেলে, তাই পাহাড়টাকে চিনে নিতে চাই—যেমন গভির অরন্যে চিতা থাকে। রিকিকে চিতার মতই চৌকশ মনে হয়। ও স্কুলে যায় না; কিন্তু দারুন ফুটবল খেলে। চিতার মতো ছুটতে ছুটতে গোল সে দেবেই। ছুটির দুপুরে ঘুম বাদ দিয়ে আমরা ব্যাংকের মাঠে যাই, শুধু ওর খালা দেখতে। কিন্তু মাসখানেক হয়, কলোনির কোথাও খুঁজে পাই না। সকাল বেলায় কার্ডিগান পরে ডেসি একা বাউন্ডারি ওয়ালের উপর পা ঝুলিয়ে বসে ভুট্টা-পোড়া খায়। স্কুলে যাওয়ার পথে আমরা ওর দিকে হাত নাড়ি। হাসলে ওর গালদুটো আরো গোলাপি হয়ে ওঠে। কন্ঠ বাড়িয়ে জানতে চাই—রিকি কোথায়?
    ও উত্তর দেয়—ওয়েন্ট টু প্লে।
    কোথায়?
    চিটাগং।
    কবে আসবে?
    গড নোজ।
    ডেসি একদম হেয়ালি টাইপের। ওড়নাতো পড়েই না; কিছু জিজ্ঞেস করলে যা তা উত্তর দিয়ে দুধদুটো নাচাতে থাকবে। তা সত্বও আমরা ওকে বেশি পছন্দ করি। ‘গড নোজ’ মানে কি! রিকি আর কলোনিতে আসবে না? ইস্টার-সানডে’র সন্ধ্যায় ওদের বাসায় যাই। গেটের সামনে বাঁশের মাথায় লাল, নীল কাগজের বড় একটা স্টার ঝুলিয়ে দিয়েছে। বসার ঘরের দেওয়ালে মাতা মেরির ছবিতে তাজা ফুলের মালা। ঢুকতেই দেখি, রিকির পাপা বারান্দার চেয়ারে বসে মদ খাচ্ছে। আমাদেরকে থামিয়ে বলে—ডু ইউ নো, রিকি চিটাং সান-রাইজারস ক্লাবে চান্স পেয়েছে?
    নাতো; ডেসি বলে নাই।
    কামিং সানডে স্টাইকার হয়ে মাঠে নামবে। হি ইস মাই সান…।
    বসার ঘরের সোফায় বসে আমরা ইস্টারের কেক খাই। ডেসির পরনে নতুন জিন্স আর ফুলফুল জামা, মাথায় খরগোসের ব্যান্ড। আমাদের কাছে জানতে চায়—আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?
    আমরা চোখ বড় বড় করে বলি—ওয়াও; লাইক এন এনজল!
    থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। শোনো, তোমরা কি রিকির খেলা দেখতে যেতে চাও?
    হ্যাঁ, চাই।
    ভেরি গুড। আমিও তোমাদের সাথে যাব। গ্যালারিতে বসে ছিটি বাজাবো। আমার কাছে টাকা থাকবে। আমরা আইসক্রিম খাবো।
    রবিবার স্কুল ছুটি। আমরা ভোর বেলায় রিকিদের বাসার সামনে আসি। রিকির মা, বাবা গির্জায় গেছে প্রার্থণা করতে। এই সুযোগে ডেসি আমাদের সঙ্গে রওয়ানা দেয়। আমাদের শহরে রিক্সা নাই। আমরা পায়ে হেঁটে লিচু বাগান থেকে বাসে চড়বো। রোদের জন্য ডেসি একটা পালক লাগানো হ্যাট পড়েছে, চোখে গগলাস। ডেসি বলে—আমার কাছে জলের বোতোল আছে; চাইলে খেতে পারবে; কিন্তু সাবধান, মুখ লাগাবে না।
    আমরা যখন কর্নফুলির পাড় ধরে ছবির মতো রাস্তাটা দিয়ে যাচ্ছি, সামনেই পাহাড়ের উপর কাঠের গির্জা, তাকিয়ে দেখি, সিঁড়ির একদম নিচ ধাপে পথের দিকে মুখ করে চড়ুই মামা বসে আছে—ওই ময়লা জুব্বাটা পরা, চুলে পাখির বিষ্ঠা ভরা; ওকে ঘিরে অনেক চড়ুই কিচির-মিচির করতেছে! ডেসিকে রেখে ছুটে যাই—আরে চড়ুই মামা, তুমি এখানে!
    লোকটা আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না।
    আমরা অসহিষ্ণু হয়ে বলি—তুমি আমাদের চিনতে পারছো না! অই যে, তোমাকে দেখতে পাহাড়ে গেছিলাম?
    বুড়ো এংলোটা তবু নির্বিকার বসে থাকে; আর গির্জায় প্রার্থণা করতে আসা যিশু-ভক্তরা ওর সামনে কয়েন রেখে যায়। আমরা ঝঁকি দিয়ে বিলি—চোখ তোলো, চড়ুই মামা।
    লোকটা রেগে গিয়ে বলে—আই এম নট স্পেরো-আঙ্কেল।
    পেছন থেকে ডেসি বলে—কি বলতেছো তোমরা! উনিতো ব্রাদার রিচার্ড; নাউ হি ইজ এ ভেগাবন্ড।
    ডেসির কন্ঠ পেয়ে লোকটা আমাদেরকে একবার দেখে নিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে পাহাড়ে উঠতে থাকে আর বিড়বিড় করে বলে—আই এম নো-বডি; আমি কেউ না…।
    ডেসি আমাদেরকে তাড়া দেয়—আরে চলোতো; দেরি হয়ে গেলে বাস ফেল করবো।
    না মানে, আমরা ওকে পাহারে পেয়েছি; কংকাল থেকে বেরিয়ে এসেছিলো।
    ওকে বয়েজ, লেটস হারি।
    লিচু বাগান থেকে আমরা বাসে উঠে যাই। ডেসি আমার পাশে বসে। ওর গা থেকে স্টবেরির ঘ্রান পাই। আমি বলি—তোমার হাতটা একটু ধরবো?
    ডেসি হলুদ দাত বের করে হাসে—তুমি খুব ভালো; ধরো।
    ডেসির পাশে বসে রিকির খেলা দেখতে যাই বটে; চড়ুই মামার কথা মাথা থেকে সরে না। কে সত্য—এই লোকটা, না কি পাহাড়ের কাঠালতলায় কংকাল থেকে বেরিয়ে আসা চড়ুই মামা? বুঝতে পারি, সত্য বলে কিছু নাই; যাকিছু সত্য, তা আংশিক; সময়ের ব্যবধানে বাস্তবতা পাল্টে যেতে থাকে। সেদিন পাহাড় থেকে নামার সময় চড়ুই মামা বলেছিলো—ম্যান ইজ এ ভ্যাগাবন্ড এনিমেল; চলতে থাকো; পথ খুঁজে পাবে।

    6
    1 Comment
    • ছুটির দিনে এর থেকে ভালো কিছু আর হয়না! চমৎকার গল্প! পড়তে পড়তে বারবার মন ছুটে যাচ্ছিল গল্পের শহরে!

Skip to toolbar