Profile Photo

Drako ShajibOffline

  • drako
  • Profile picture of Drako Shajib

    Drako Shajib

    2 years, 3 months ago

    ক্ষ্যাপা বিষুর পাঠশালা

    [ ভালো কাজ করাটা কঠিন তাঁর থেকে কঠিন ভালো কাজকে সঙ্গ দেয়া। ]
    ——————————————————————————————————————

    ১.
    মস্তবড় এক দীঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কাঁঠালিচাঁপা গ্রাম। কাঁঠালিচাঁপা গ্রাম আশেপাশের আট-দশটি গ্রাম থেকে সমৃদ্ধ। গ্রামে একটা ছোট হাসপাতাল, একটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটা পোস্ট অফিস, একটা কালী মন্দির ও একটা চার্চ রয়েছে। গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া অপ্রশস্ত সড়ক এখনো বেশ ভালো। রাস্তার সাথে লাগোয়া সরু খাল বন্ধুর মত পিছু নিয়েছে বড় নদী পর্যন্ত।

    কাঁঠালিচাঁপা গ্রামে এত কিছু থাকা সত্ত্বেও কিছুই নেই। গ্রামের নাম কাঁঠালিচাঁপা হলেও এই গ্রামের কয়েক প্রজন্ম এই ফুল দেখেনি কোথাও। হাসপাতাল থাকলেও ডাক্তার ও রোগী কোনটাই নাই। আগে এক সময় ডাক্তার আসতো শহর থেকে। তখন চোখের চিকিৎসার জন্য দূর দূরান্ত থেকে অনেকে আসতো প্রতি শনিবার। স্কুলটির বেশ সুনাম হয়েছে এখন, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও অনেক। তবে প্রাথমিক শিক্ষার পর বেশীরভাগ শিক্ষার্থী হাইস্কুলের দিকে না গিয়ে আবার ফসলের মাঠে দিকে ফিরে যায়। মন্দিরটি বেশ পুরনো ও জরাজীর্ণ, চার্চটি অবশ্য এখনো তার লাবণ্য ধরে রেখেছে।

    এই দিককার মানুষেরা বেশীরভাগ’ই কৃষি নির্ভর। সব মৌসুমেই ধান-পান চাষ হয়, তবুও গ্রামের মানুষদের অভাব দূর হয়না। প্রতিবছর’ই মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে। ধান চাষ করে যা ফসল পাওয়া যায় তার থেকে খরচা হয় বেশী, মাঝে দিয়ে অক্লান্ত শ্রম সব যায় গচ্চা। তাই আজকাল ছেলেপেলেরা কোদাল-কাস্তের পাশাপাশি বই, পেন্সিল তুলে নিয়েছে। কেউ কেউ চাষবাস ছেড়ে দিয়ে শহরে গিয়ে উঠেছে।

    অভাব-অনটন, আশা-নিরাশা নিয়ে অনেকে এখনো গ্রাম আঁকড়ে বসে আছে। তাদের জীবন বড় অদ্ভুত। ঘরে ধান ফুরালেও তাদের মুখের পান ফুরোয় না। বিড়ি একটার পর একটা জ্বলতে থাকে ঠোঁটের গোঁড়ায় তার সাথে সকাল-সন্ধ্যে পাল্লা দিয়ে চলে চা।

    ২.
    এ… কুডি যাইসনা…
    শোন… শোন… ভালো কই। যাইসনা বাবা। ওরে কেউ থামাও। এই পোলাডা যে আমার পিত্তি জ্বালাই খাইলো।

    বিষুর কানে এসবের কিছুই পৌঁছায় না। শরৎ’এর পেজা মেঘ উড়ে চলেছে দিগন্তের দিকে। তার পিছু পিছু ছুটে চলেছে সে।

    বিষু বরাবর’ই ভীষণ ক্ষ্যাপাটে। তাই বিষুর মা চণ্ডীর কথা কেউ কানে নেয় না। উৎসুক পড়শীরা একবার বিষুর চলে যাওয়া আর একবার চন্ডীর উগ্রমূর্তি দেখে যে যার কাজে মন দেয়। মায়ের ঝাঝানি খেয়ে বিষুর ছোট বোন বীণা অনিচ্ছা স্বত্তেও রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে আসল।
    – কি রে পাইলি তোর দাদারে?
    – না মা। দাদায় নাকি হাঁটতে হাঁটতে পূব মুই গ্যাছে।
    – এহন ক্যামনডা লাগে। ঘরে এক দানা চাউল নাই। ধান কয়ডা কইছিলাম পোলাডারে ভাঙ্গাইয়া আনতে। বস্তায় ধান ভরতে ভরতে পোলাডার মাথায় আবার কোন ক্যারা ওডলো কেডা জানে?
    চন্ডী আপন মনেই কথাগুলো বলছিল। কথাগুলোর ভার বীণা এখনো খুব একটা বইতে শেখেনি। সে বলল,
    – মা আমি রেণুগো বাড়ি যাই?
    – ওগো বাড়িতে কি আবার? ঐদিকে গ্যালে ঠ্যাং ভাইঙ্গা দিমু। এখনি কোলায় যাবি। যাইয়া তোর বাবুরে খবর দে।
    – বাবুরে কি কমু?
    – যাইয়া ক’ এহনি বাড়ি আইতে। ধান কয়ডা ভাঙ্গাইয়া দিয়া যাক। নাইলে আজকে আর গেলা লাগবেনা?

    বিষণ্ণমুখে বীণা ফসলের মাঠের দিকে হাঁটা শুরু করল। বীণার ভোঁতা মুখ দেখে চণ্ডীর মেজাজ আবার বিগড়ে গেল। রোদে পোড়া মায়াহীন মুখটা তৃষ্ণা আর ক্লান্তিতে সত্যি সত্যি এবার রণচণ্ডী রূপ ধারণ করল। মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলল, কামের কথা শুনলেই তো তোগো মাথায় ঠাডা পরে। মরলে পরে ঝোলা ভইরা খাইস।

    মায়ের কথা গায়ে না মেখে বীণা গ্রামের ছায়াঘন মেঠো পথ দিয়ে আনন্দে হেঁটে চলেছে। তেঁতুল তলা দিয়ে যাওয়ার সময় একটু থামল সে। আকো-পোকো দুই ভাই মার্বেল দিয়ে নাইকামুঠ খেলছে। দুইটা পাকা তেঁতুল তাদের পাশে অযত্নে পড়েছিল। বীণা তেঁতুল দুটি কুঁড়িয়ে নিয়ে তার কোঁচায় বাঁধল। তারপর, কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে খেলা দেখে মনে কিছুটা সংশয় নিয়ে বলল, ‘পোকাদা তুমি জেতলে মোরে কয়ডা বেল দেবা কও?’
    উত্তরে, “গেলি এইহান থিকা।”বলেই পোকো চোখ রাঙাতেই বীণা একছুট দিল।

    রোদের তেজ অনেক, কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকাতেই বীণার চোখে জল চলে আসলো। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ খাঁ খাঁ করছে। বছরের এই সময়টা ধান কাঁটার পর কেউ কেউ শীতের শাক সবজী চাষের জন্য মাঠ প্রস্তুত করে। মাঠে যারা কাজ করছে তাদের কারো কারো মাথাতে এখনো বাঁশের তৈরি মাথাইল দেখতে পাওয়া যায় বাকি সবার মাথাতেই গামছা বাঁধা। অনেকটাদূরে বীণা তার বাবা আশীষকে দেখতে পেয়ে কয়েকবার গলা ফাটিয়ে ডাক দিলো। বীণাদের সামান্য কিছু জমি আছে এই মাঠে। তার উপর নির্ভর করেই সংসার চলে আশীষের। সংসারে তাকে নিয়ে মোট সাত জন। দুই ছেলে-মেয়ে ও ধর্মপত্নী বাদে তার বৃদ্ধা মা, বিধবা বোন ও একটি বকনা গরু।

    আশীষ লাউয়ের জন্য মাচা করছিল। একটা ক্ষীণ তবে পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে আসতেই মাথা তুলে দূরে তাকালো সে। সাথে সাথে মাথার ঘাম কপাল বেয়ে নেমে আসলো সমস্ত মুখ জুড়ে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো তাঁর। মাথার গামছা খুলে ভালো করে চোখ-মুখ মুছে নিয়ে আবার শব্দের উৎস খুঁজতে লাগলো আশীষ। চোখের উপর হাত দিয়ে রোদটাকে আড়াল করে দূরে তাকাতেই বীণাকে দেখতে পেল সে। বীণা খালি পায়ে আইল দিয়ে হেঁটে কাছে আসতেই আশীষ শুধালো,
    – কি রে মা? তুই এইহানে ক্যা?
    – মা’য় তোমারে বোলায়।
    – তোর মা’য় আবার বোলায় ক্যা? তর দাদায় আবার কিছু করছে নাকি?
    – হয়। তুমি ত’তড়ি লও। নাইলে মা’য় মোরে কোপাবে।
    – কি করছে তোর দাদায় আবার?
    – মুই কইতারমু না। মা’য় জানে। তুমি এহনি লও।
    – আচ্ছা। হাট তয়।

    রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে ফসলের আইল ধরে বাবার পিছনে পিছনে হাটছে বীণা। এই শৈল্পিক দৃশ্য কোন শিল্পী দেখলে সাথে সাথে রংতুলি নিয়ে আঁকতে বসে যেত। কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে এই দৃশ্য বড় সাধারণ। তারা কাজের ফাঁকে একপলক শুধু দেখে নেয় কে বা কারা যাচ্ছে। অবসর পেলে কেউ কেউ শুধায় কাজ ফেলে বাবা- মেয়ে কই যায়। কেউ কেউ আবার হালকা রসিকতা করে বলে, “কি রে বুড়ি চল্লি নাকি শ্বশুর বাড়ি?”

    ৩.
    বিষুরে নিয়া সন্ধ্যে বেলায় চায়ের দোকানগুলো মুখর হয়ে উঠল। কেউ বলল, ছেলেটার মাথা তো অনেক আগে থেকেই খারাপ। আবার কেউ বলে, পেত্নীতে ধরছে দেইখাই বিষু এমন করে। নগেন কাকা বলে, ঐসব কিছুনা, ও হইলো মায়ের চ্যালা। ওর উপর নিশ্চয়ই মা কালীর দৃষ্টি আছে।

    আশীষ সারাদিন ছেলেকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে। শেষমেষ ছেলেকে না পেয়ে বড় বাজার থেকে ধান ভাঙিয়ে চাল আর তুষের বস্তা সমেত গ্রামে ফেরে সে। সরাসরি বাড়ি না গিয়ে হরিহরের চায়ের দোকানে থামে কমলের ভ্যান। কমল এই গ্রামের’ই ছেলে। শক্ত-সামর্থ্য, ভীষণ কর্মঠ। আশীষের কয়েক ঘর পরেই কমলের ঘর। গ্রামে কারো ভ্যানের প্রয়োজন হলেই ডাক পরে কমলের।

    হরিহর চা দিতে দিতে আশীষকে প্রশ্ন করে, কিরে আশু পোলাডার কোন খোঁজ পাইলি?
    আশীষ চা হাতে নিয়ে নিরস মুখে চুপ করে থাকে। উত্তর দেয় কমল, “কাগু তন্ন তন্ন কইরা খুঁজজি বোনাডারে। ওর ছায়াডাও দেহি নাই।”

    হরিহর বলে, “পোলাডায় এমন বোনা হইলে যে ক্যামনে বুঝিনা বাপু!” এই বলে, হাতের মুঠোয় ধরা বিড়ি মুখের কাছে নিয়ে বেশ কায়দা করে বার দুই টান দিল। আর সাথে সাথে খুক খুক করে কাশতে শুরু করল সে। বেশ কিছুক্ষণ কেশে গলা খাকড়ি দিয়ে গল্পের মত করে বলতে শুরু করল, “ও যাওয়ার সময় এই দিক দিয়াই যায়। মুই তহন দোকানের ঝাঁপি হালাই বাড়ির দিকে যামু দেইখা। দেহি বলদাডার গা হাত পা সব খালি। আকাশের দিকে চাইয়া হাটতাছে। আমি এত কইরা বোলাইলাম ওরে একটা বার ফিরাও চাইলোনা।”

    আশীষ এইবার মুখ খুলল, কাকা ওয় বাড়ি আহুক একবার। বাইড়াইয়া যদি ওর ঠ্যাং না ভাংছি তাইলে আমি আমার মরা বাপের মাথা খাই। তুমি দেইখা নিও কাকা, ওর মাথার ভূত না তাড়াইয়া আমি ক্ষ্যান্ত দিমু না।

    পাশ থেকে রথিন বলে, আহা… এত মাথা গরম করলে চলে। পোলাপান মানুষ গায়ে একটু হাওয়া বাতাস লাগাইয়া চলবোই তা তুমি যতই শাসন করো। তা তোমার পোলাডা তো ভালোই আছে। আমার কালু ঐদিন কি করলো শোন। ওরে সেদিন কইছি যা একটু মাছের খাওনডা দিয়া আয় বাপ। পোলা আমার কথা কানের ধারেই নিলো না। পোলাপান মানুষ কথা কইলে যদি কথা না শোনে তাইলে কেমনডা ঠেহায় কও। আমার মাথায় গেল রক্ত উইঠগা। দিলাম কানসা পাচাইয়া চোপাড়। পোলায় চোপাড় খাইয়া কই বাড়ি ছাইড়া পলাইবো হেইয়া না উল্ডা চলা লইয়া আইসে মোরেই মারতে।

    গল্পে মন বসেনা আশীষের। সকাল মরিচ গুলে পান্তা যা খেয়েছিলো তার এক দানাও পেটে অবশিষ্ট নেই। খিদে পেলে এমনিতেই মাথা ঠিক থাকে না তাঁর। তখন চোখের সামনে যা দেখতে পায় তাই খেতে ইচ্ছে করে। একটু আগে সাদা পলিথিনের ঠোঙায় ঝুলতে থাকা কেকগুলো সব খেতে ইচ্ছে করছিল। এখন মনে হচ্ছে গোটা দোকানটা ভেজে দিলে একাই চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে পারবে সে।

    আশীষের বিমর্ষ মুখ দেখে হরিহর বলে, ওত চিন্তা করিসনা আশু। বাড়ি যা এহন। পেটে টান পড়লে দেখবি বনগড়ুডা ঠিকি বাড়ি ফিরা আইবো।

    আশীষ তাঁর ও কমলের চায়ের দাম মিটিয়ে বলে, “যাই তয় কাকা।” তারপর কমলের উদ্দেশ্যে বলে, “চল।”
    কমল বলে, “আশুদা তুমি আউগগাও মুই বিড়িডা খাইয়া আইতাছি।”

    সাথে সাথে গলার রগ ফুলিয়ে আশীষ বলল, “বিড়ি পরে খাইস। এহন ল। ঘরে চাউল নাই একটাও। চাউল কয়ডা লইয়া গ্যালে তারপর তোর বৌদি ভাত চড়াইবো।”
    “আরে দাদো.. তুমি যে তড়াশ দিলা আজকে। আচ্ছা হাডো।” এই বলে কমল তাঁর ভ্যানের ব্রেক ঢিলে করে দুই পা এগুতেই আবার থামল। তারপর, মাথা চুলকে ইতস্তত করে বলল, “দাদো এহন যে আরেকটা কাম বাজজে।”

    – মাইয়া মাইনষের মত যুইত না কইরা ক দেহি কি হইসে।
    – মা’য় কইছিলো কয়ডা মুগের ডাইল আর আধ সের চিনি লইয়া যাইতে। কিন্তু মোর ট্যাহে আছে মোডে কুড়ি টাহা। দাদো তুমি যদি কয়ডা টাহা দেও হেলে…
    – দাঁড়া দেহি মোর ধারে কত আছে।

    আশীষ পকেট হাতড়িয়ে পঞ্চাশ টাকার বেশী পেলনা। সেখান থেকে বিশ টাকা কমলকে দিয়ে বলল, এই টাহাডা রাখ এহন। আর এক কাম কর, দিনুর দোকানে যা। ওরে আমার কথা কইয়া যা যা লাগবো নিয়ায়। ওরে টাহা দেওয়া লাগবোনা।

    দিনুর সাথে আশীষের অনেকদিনের লেনদেন। প্রতি মৌসুমেই দিনুর কাছে আশীষ ধান বিক্রি করে। ধানের মূল্য বাবদ মোট টাকা দিনু একবারে কখনোই দিতে পারেনা। প্রতিবারেই বেশ কিছু টাকা বকেয়া রাখে দিনু। যে কয়টা বকেয়া থাকে তার বেশীর ভাগ’ই দিনুর দোকান থেকে সদাই কিনে উসুল করে নেয় আশীষ। দিনু’ও কোন আপত্তি করেনা।

    ৪.
    ১৩ বছর হতে চলল বিষু বাড়ি ফেরেনি। আশীষ ছেলের খোঁজ করা বন্ধ করে দিয়েছে বহু আগেই। তবে, চন্ডী এখনো আক্ষেপ করে ছেলের জন্য। বীণা তাঁর দাদার চেহারা মনে করতে চেষ্টা করে তখন। খুব আবছা একটা মুখ মনে পরে। সে মুখে উজ্জ্বল দুটি চোখ নক্ষত্রের মত জ্বল জ্বল করে। এখনো গ্রামের চায়ের দোকানে বিষুর ক্ষ্যাপামি নিয়ে বিস্তর গালগপ্প চলে। ছেলেটা ভীষণ বেমানান ছিল এখানে। তাঁর চিন্তা-ভাবনা, চালচলনে গ্রামের কারো সাথে মিল ছিল না। পড়া লেখায় ভীষণ অমনোযোগী হলেও হেড স্যারের খুব ভক্ত ছিল সে। অংকে মাথা ভালো ছিল তবে অজিত স্যারের রাগী রাগী চেহারা দেখে খুব ভয় পেত বিষু। তাই, অংক ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই পালিয়ে যেত স্কুল থেকে। ক্ষ্যাপা বিষুর ক্ষ্যাপামির কিছু উদাহরণ দেয়া যাক এইবার।

    বিষুর দাদু রুপাই বেঁচে ছিল তখন। সে সময়ে গ্রামের শান্তি রক্ষার জন্য একঝাক প্রবীন দিনরাত চায়ের দোকানে বসে থাকত। যদিও তাঁরা চোখে খুব একটা দেখতে পেতনা তবুও গ্রামের খুটিনাটি প্রতিটি বিষয়ে তাদের নজর ছিল। একদিন বিনয়ের চায়ের দোকানে রুপাই, নন্দ আর কানাইয়ের মধ্যে বিড়ি খেতে খেতে কি যেন একটা ব্যাপার নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছিলো। এমন সময় বিষু উপস্থিত সেখানে। তাঁর বয়স খুব অল্প। সবে পাকা পাকা কথা বলতে শিখেছে। সে দাদুকে বলল, “দাদু মুই’ও বিড়ি খামু। মোরে এক প্যাকেট বিড়ি কিন্না দেও।” চায়ের দোকানে উপস্থিত সবাই তো সে কথা শুনে তো হো হো করে হেসে উঠল। কিন্তু বিষু সে দিকে গ্রাহ্য না করে তাঁর দাদুকে আবার বলল, “দাদু মোরে বিড়ি কিন্না না দিলে তোমারেও বিড়ি খাইতে দিমুনা।”
    – রুপাই তাঁর নাতীকে বলে, তুই গুড়াগাড়া মানু বিড়ি কি খাবি, তরে লেমঞ্চুস কিন্না দিমুহানে।
    – মুই লেমঞ্চুস খামুনা। মুই বিড়ি খামু।
    – ছোড গেদুগো বিড়ি খাইতে নাই। আমার মত বড় হইলে তহন খাইস। এহন পোড়া পোড়া হরিস না তো।
    -ছোড গেদুগো বিড়ি খাইতে নাই ক্যান?
    -ছোডরা বিড়ি খাইলে ত’তড়ি মইরা যায়।
    -বিড়ি খাইলে মোরা ত’তড়ি মইরা যামু তয় তোমাগো মত শয়তান বুড়াগো কিছু হয়না ক্যান?
    -কি মোরা শয়তান বুড়া?
    -শয়তান না তো কি? মোরে ভুলাই ভালাইয়া একলা একলা বিড়ি খাবা ভাবছো। মোরে বিড়ি না দিলে তোমার বিছনা আমি রাতত্তিরে মুইতা যদি না ভিজাইছি মুই তোমার নাতী না।

    সেদিন সত্যি সত্যি রাতে রুপাই ভেজা বিছানায় ঘুমায়। এবং তাঁর পরের বেশ কয়েকটা দিন’ও রুপাই তাঁর বিছানা ভেজা পায়। শেষমেশ জ্বর ঠান্ডা লেগে বিশ্রী একটা অবস্থা হয়। কিন্তু বিষু তাঁর জেদ তখনো ধরে রাখে। উপায় না পেয়ে নাতীর পায়ে পরে রুপাই। বলে, “ক্ষ্যামা দে আমারে দাদুভাই। তর বিড়ি, পান, চা যা খাইতে মন চায় খা তবু আমারে ক্ষ্যামা” এই দৃশ্য দেখে সবাই হেসে লুটোপুটি খেলেও আশীষ তাঁর ছেলেকে শাসন করতে যায়। কিন্তু বিষু বলে যে বিষ খাওয়া ক্ষতিকর সে বিষ খাওয়া চলবে না। যদি কেউ খায় তবে তাকেও খাবার অনুমতি দিতে হবে।

    ছেলের কথার মাহাত্ম্য বুঝতে পেরে দমে যায় আশীষ। বাধ্য হয়ে বিড়ি খাওয়া ছাড়তে হয় রুপাই’য়ের। এমন কি অল্প কিছুদিনের মধ্যে তামাকমুক্ত গ্রাম গড়তে কচিকাঁচার একটা দল আন্দোলন শুরু করে, যার নেতৃত্ব দেয় বিষু নেপথ্যে থাকে প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার আব্দুল জব্বার ও অজিত স্যার।

    গ্রামের সব দোকানে বিড়ি-সিগারেট বিক্রি বন্ধ থাকে দীর্ঘদিন।

    এমন হাজারটা কীর্তি আছে ক্ষ্যাপা বিষুর। আরেকদিনের ঘটনা বলি, নিখিলদের অনেক পুরনো একটা বৈলাম গাছ ছিল। দূর থেকে কাঁঠালিচাঁপা গ্রাম চেনার সবথেকে সহজ উপায় ছিল ঐ বৈলাম গাছ। আশপাশে এত বড় আর মোটা গাছ আর একটাও নেই।

    একদিন হঠাৎ নিখিলের বাবা অমৃতবাবু সিদ্ধান্ত নেয় গাছটি কেটে ফেলবে। এর আগে অনেকেই বেশ ভালো দাম দিতে চেয়েছিল গাছটির জন্য কিন্তু অমৃতবাবু কারো কাছেই বিক্রি করে নাই। তবে সেবারে তাঁর নতুন ঘর তোলার জন্য জমি ও ঘরের খুঁটি আর আসবাব বানানোর জন্য ভালো কাঠ প্রয়োজন তাই, তিনি গাছটি কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন।

    অমৃতবাবুর পরিকল্পনা মত সব কিছু ঠিক করে যেই গাছ কাটতে যাবে ঠিক তখন ক্ষ্যাপা বিষু হাজির। বিষু অমৃতবাবুর পা জড়িয়ে ধরে বলল, “কাকা তুমি মোর পাঁজরের হাড় দিয়ে তোমার ঘরের খুঁটি বানাও তবু এই গাছ কাইটো না। এই গাছ শুধু আমাগো গ্রাম না সারা দেশ ঘুইরা আর একটাও পাবা না।”
    অমৃতবাবু বলল, বিষু পাগলামি করলে দূরে গিয়া কর। এইখানে তর কোন পাগলামি চলব না।
    – কাকা তুমি লাগলে মোগো ঘর বাড়ি সব নিয়া নাও তাও এই কাম কইরো না কাকা।
    – পা ছাড় কইলাম। এই কে আছস পাগলটারে ধর দেহি।
    – সারা জীবন তোমার দাস হইয়া থাকমু কাকা। মা কালীর দোহাই লাগে তাও গাছটা কাইটো না। ভগবান তোমারে দুই হাত ভইরা দিসে কাকা। তোমার তো টাহার অভাব নাই। জমির অভাব নাই। এই গাছটা না কাটলেও তোমার কোন ক্ষতি হইবোনা। কিন্তু এই গাছটা কাটলে মোগো হগগলের ক্ষতি হইবো কাকা।
    – আমার গাছ কাটলে তোগো কিসের ক্ষতি হইবো। আমার গাছ আমি কাটমু। কেউ বাঁধা দিলে ওরেও কাইটা ফালা ফালা করমু।
    – “ঠিকাছে কাকা তয় আমারেই আগে কাটো।” এই বলেই বিষু অমৃতবাবুর পা ছেড়ে দিয়ে গাছটাকে জড়িয়ে ধরে। বিষুকে খুব সামান্য লাগে বৈলাম গাছটার সামনে। গাছটা এত প্রকান্ড যে বিষুর মত দশ-বারো জন একসাথে হাতে হাত ধরে গাছটাকে জড়িয়ে ধরলে তবেই গাছটাকে পুরোপুরি ঘিরে ধরতে পারবে।

    অমৃতবাবু খেপে গিয়ে গ্রামের সবাইকে জড়ো করে সেখানে। অনেকে অনেক কিছু বোঝানোর চেষ্টা করে বিষুকে। একে একে সবাই ব্যার্থ হয়। আশীষ এসে খুব মারধর করে ছেলেকে, তবুও বিষু এক পা নড়েনা। এসব দেখে নিখিল শেষমেশ এগিয়ে আসে। নিখিল শহরে পড়ালেখা করা ছেলে। সে তাঁর বাবাকে বোঝানো চেষ্টা করে। কিন্তু অমৃতবাবু এতসব কান্ড দেখে আরো বেঁকে বসে। সে ঘোষণা দিয়ে যায় আজ না হয় কাল এই গাছ সে কাটবেই কাটবে। কোন ক্ষ্যাপামি তাঁর কাছে চলবে না।

    বিষু একটানা ৫২ দিন বৈলাম গাছ পাহারা দেয়। এই ৫২ দিন সেই গাছতলায় থেকেছে সে। সেখানেই খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, বিসর্জন। তারপর একদিন রাতে কারা জানি দল বেঁধে এসে ধরে নিয়ে যায় বিষুকে, অন্ধকার এক কুঠুরিতে দিন দুই আঁটকে রাখে। তারপর, আবার চোখ বেঁধে ছেড়ে দিয়ে যায় ঠিক আগের জায়গাতেই। কিন্তু যখন সে ফিরে আসে তখন আর বৈলাম গাছটার কোন চিহ্ন খুঁজে পায়না সে।

    (চলবে)

    26
    15 Comments
    • অসাধারণ

      • অনেক ধন্যবাদ মঞ্চবন্ধু! গল্পটার মাঝে চেষ্টা করেছি আমার দেখা গ্রামীণ জীবনটাকে ফুটিয়ে তুলতে জানিনা কতটুকু পেরেছি তবে, গ্রামীণ সরল জীবনের আড়ালেও কিছু জটিল বিষয় লুকিয়ে আছে সেগুলো গল্পের পরের পর্বে তুলে ধরার ইচ্ছা আছে!

    • আপনি ভীষণ ভালো লিখেন কিন্তু ! পরের অংশ কবে দেবেন ?

      • অনেক অনুপ্রেরণা পেলাম মঞ্চবন্ধু! ইচ্ছা আছে ২৬ শে মার্চ, আমাদের স্বাধীনতা দিবসে পরের পর্ব প্রকাশ করার যদিও, গল্পের পরের অংশ লেখা এখনো বাকি! তবে, আমার এই গল্পে বিষু একজন ভীষণ স্বাধীনচেতা চরিত্র। তাই ঐদিনটি ক্ষ্যাপা বিষুর আত্নপ্রকাশের জন্য আদর্শ হবে।

    • গল্পটা পড়তে পড়তে মনে হলো এ যেন আমার গ্রামেরই কারোর গল্প, যদিও পরের অংশ এখনো বাকী কিন্তু মনে হলো খ্যাপা বিষুর আমাদেরই আশেপাশের কেউ অতি আপনার একজন!

      • গল্পটা পড়েছেন জেনে খুব আনন্দ পেলাম কবিবন্ধু!
        হ্যাঁ, ক্ষ্যাপা বিষু আমাদের প্রত্যেকের’ই খুব আপন কারণ সে সৃষ্টির প্রতিটি অণুকে আপন ভেবে তাদের মঙ্গল কামনা করে। আর এমন সুন্দরমনা সরল মানুষ সর্বত্র’ই রয়েছে এমনটাই আমি বিশ্বাস করি।
        পরের পর্বে ক্ষ্যাপা বিষুর আরো অনেক পাগলামি অপেক্ষা করছে কবিবন্ধু, আশা করি ভালো লাগবে। শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন!

    • অনেক অনেক অজস্র ধন্যবাদ ও আন্তরিক অভিনন্দন। এমন একটি গ্রামীন পটভূমি তুলে ধরা যেন তেন কাজ নয় ! আমার সারা জীবন চেষ্টাতেও আমি তা করতে পারতাম না ! বিষু ! প্রকৃতি ও সমাজের কান্ডারি ! অভাব এবং প্রকৃতি দুটোই অসাধারণ উপায়ে চিত্রিত হয়েছে ! আমি অপেক্ষা করছি, কী প্রকার সমাধান আসে?

      • অনেক অনুপ্রেরণা পেলাম মঞ্চবন্ধু! ইচ্ছে থাকলেও গল্পটা এখনো শেষ করতে পারিনি। তবে, যে শক্তি জুগিয়েছেন তাঁর জোরে খুব শীঘ্রই ক্ষ্যাপা বিষুকে নিয়ে আবার হাজির হব। অবিরাম ভালোবাসা রইল মঞ্চবন্ধু!

    • “ভালো কাজ করাটা কঠিন তাঁর থেকে কঠিন ভালো কাজকে সঙ্গ দেয়া।” অসাধারণ একটা কথা প্রিয় কবি।

      • ধন্যবাদ মঞ্চগুরু!
        ভালো কাজ বেশি বেশি হোক, আর আমাদের হাত ধরেই হোক।

    • “ভালো কাজ করাটা কঠিন তাঁর থেকে কঠিন ভালো কাজকে সঙ্গ দেয়া।” অসাধারণ একটা কথা প্রিয় কবি।

    • ভালো কাজে সবাই একসাথে…

    • অনেক সুন্দর

Skip to toolbar