Profile Photo

Abu Taher AbdullahOffline

  • abutaher
  • Profile picture of Abu Taher Abdullah

    Abu Taher Abdullah

    2 years, 1 month ago

    স্মৃতিময় সেই সব দিনগুলো
    —————————————————
    ঘেরা জাল দিয়ে মাছ ধরা দেখা আমার জীবনে এই প্রথম। ব্যাপারটা যে এমন আড়ম্বরপূর্ণ তা না দেখলে বোঝানো যাবে না। আমাদের গ্রামের বাড়ির পুকুরটা বেশ বড়, প্রায় দু বিঘা জমি নিয়ে সেটাকে একটা দিঘীই বলা যায়। আমার বড় চাচা গ্রামের প্রায় ৬/৭ জন জেলেকে এই কাজে বহাল করেছেন। ভোরবেলাতেই তারা তাদের বিশাল জাল নিয়ে এসে হাজির। এখানে বলে রাখি আমাদের পুকুরটা বিভিন্ন রকম মাছে ভর্তি। কিছুদিন আগেই আমার বড় ভাই ছিপ দিয়ে মাত্র ঘন্টাখানেকের মধ্যে প্রায় ১৫-১৬ টা বাইন মাছ ধরে ফেলেছিল। আমিও বেশ কয়েকবার হাত ছিপ দিয়ে রুই মাছের পোনা ধরেছি এই পুকুরে। নভেম্বরের শেষে বেশ ভালই শীত পড়ে গেছে। জেলেরা এসে প্রথমেই পুকুরের ধারে বসে হুঁকো ধরিয়ে ধূমপান করতে বসে পড়ল। পুকুরের চারপাশ ঘিরে বড় বড় গাছ। বেশিরভাগই নানা জাতের আমগাছ। পুকুরের উত্তর কোনায় বেশ বড় একটা বাঁশ ঝাড়। তার পাশেই বিশাল একটা চালতা গাছ। এছাড়াও কত যে ছোট বড় গাছ আর ঝোপঝাড় তার লেখাজোখা নাই। বেশ অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিল মাছ ধরা দেখতে। তার মধ্যে আমার বন্ধুদেরও দুই একজনকে দেখলাম। একজন তো ঝোপের পাশে উবু হয়ে বসে সিগারেট ধরালো। কেমন একটু অবাক লাগলো, তার তো এখানে আসার কথা না, সে কিভাবে এলো? তখন অবশ্য এত কিছু চিন্তা করার সময় নেই জেলেরা তখন পানিতে নেমে পড়েছে।

    পুকুরের ধারে ধারে কোথাও কোমর পানি কোথাও গলা পানিতে নেমে ধীরে ধীরে জালটাকে পুকুরের চারধার দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। এরপরই দেখতে পাওয়া গেল নয়নাভিরাম এক দৃশ্য। পুকুরজুড়ে শুরু হল নানা জাতের ছোট-বড় নানান মাছের ঝাঁপাঝাপি। সে এক দেখার মতন দৃশ্য। কখনো একটা, কখনো দুটো কখনো বা তিন-চারটা মাছ একসাথে লাফিয়ে উঠছে আবার ঝপাং করে পানিতে পড়ছে। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের আবছা আলোতেই তাদের রূপালি আঁশ ঝিকমিকিয়ে উঠছে। বাঁধানো পুকুর ঘাটটা বেশ বড়, ঘাটের ওপরে দুই পাশে পোশাক বদলানোর জন্য দুটো ছোট ছোট ঘর আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা মাছ ধরা দেখছিলাম। বড়দের নিষেধ ধমক ভুলে ছোটরা আনন্দে চিৎকার চেঁচামেচি সাথে সাথে লাফাতে শুরু করলো এবং সাথে সাথে আমিও। অবাক হয়ে দেখলাম মাছগুলো আস্তে আস্তে যেন আরো বড় হয়ে উঠছে। একেকটা দশসেরি পনেরসেরি মাছ লাফিয়ে উঠে আবার পানিতে পড়ার সময় পানি ছিটিয়ে আমাদেরকে ভিজিয়ে দিতে লাগলো। মনে হল পুকুরটা যেন আরো বড় হয়ে গেছে। অন্য পারে দাড়ানো মানুষগুলোকে আর চেনাই যাচ্ছে না। চারদিকে কেমন কুয়াশা কুয়াশা ভাব। আরেকটা প্রকাণ্ড দৈত্যাকার মাছ লাফিয়ে উঠে ঝপাং করে পানিতে পড়ার সময় এত জোরে পানির ছিটালো যে আমার কাপড় চোপড় সব ভিজে গেল।

    গায়ে মাথায় পানির ঝাপটা লাগাতে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। কোথায় আছি বুঝতে বেশ অনেকক্ষণ সময় লাগলো। আমি স্বপ্ন দেখছিলাম। আশ্চর্য, এতো স্পষ্ট স্বপ্ন! আর কি দেখলাম! বহু বছর আগে ছেলেবেলায় দেশের বাড়ির পুকুরে ঘেরা জালে মাছ ধরা দেখার স্মৃতি এত বছর পর এতো স্পষ্ট হয়ে ফিরে এলো! বাইরে বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হওয়া বইছে। মাথার কাছে জানলাটা খোলা থাকায় বৃষ্টির ছাঁটে কাপড়চোপড় সত্যিই ভিজে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি জানলাটা বন্ধ করে দিলাম।

    বেশ অনেক বছর পর গ্রামের বাড়িতে এসেছি। বাড়িতে শুধুমাত্র এক চাচা ছাড়া আর কেউই থাকে না। চাচি বেশ কয়েক বছর হল মারা গেছেন এবং তাঁদের কোন ছেলে মেয়ে নেই। চাচার বয়সও আশি পেরিয়েছে। উনিও অসুস্থ, প্রায় চলতশক্তিহীন বলা যায়। উনিই এতদিন আমাদের গ্রামের বাড়ির দেখাশোনা করে এসেছেন। বিশাল জায়গা নিয়ে বাড়ি। চারদিকে চারটে বড় বড় ঘর, বাড়ির উত্তর পাশে পেছনদিকে সেই বিরাট পুকুর। পুকুরের পাশে উত্তরের বড় ঘরটাতেই চাচা থাকেন। এছাড়া বাকি অন্যান্য ঘর গুলি সারা বছর খালি পড়ে থাকে। দক্ষিণে বারান্দা ওয়ালা ঘরটাকে এক সময় বৈঠকখানা বলা হতো। এখন বলা হয় বারবাড়ি। প্রায় ৩০/৩৫ ফিট লম্বা এবং কুড়ি ফিটের মতন চওড়া চারদিকে কাঠের দেয়াল আর উপরের টিনের ছাউনি দেয়া এই ঘরটাই আমার সবচেয়ে পছন্দের। গ্রামে আসলে সব সময় আমি এই ঘরটাতেই থাকতে চেষ্টা করি। ছোটবেলায় দেখতাম এই ঘরে অতিথিদের বসার জন্য কালো বার্নিশ করা সুদৃশ্য চেয়ার টেবিল, মেহগনি কাঠের বড় বইয়ের আলমারি, দেয়ালে বংশের সফল পুরুষদের বাঁধানো ছবি ঝুলছে। এখনো অবশ্য সেই আভিজাত্যের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ঘরের একপাশে বনেদিয়ানার শেষ চিহ্ন, একটা বড় খাট বা পালঙ্ক, একটা বড় টেবিল যার একটা পায়া ভাঙ্গা বলে দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা, আর একটা হাতল ভাঙ্গা চেয়ার। বহু বছরের অযত্নে সবই ধূলি ধূসর। দেয়ালের কাঠগুলোর নিচের অংশ জাগায় জাগায় এমন ভাবে খেয়ে গিয়েছে যে সেই ফাঁক দিয়ে অনায়াসে কুকুর বেড়াল যে কোন কিছু ঘরে ঢুকে পড়তে পারে। আমাকে অবশ্য এই ঘরে থাকতে অনেকবার নিষেধ করা হয়েছে। কারণ বাড়ির সামনে আগাছার জঙ্গলটার মধ্যে শেয়ালের আনাগোনা আমি নিজেই দেখেছি। আর প্রহরে প্রহরে তাদের কোরাস তো রীতিমতো ভয় ধরিয়ে দেয়। ঘরের সামনে এ মাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত লম্বা বারান্দা। বারান্দা পেরিয়ে সামনের খোলা জায়গাটায় এক সময় বাগান মতো ছিল, এখন শুধুই আগাছার জঙ্গল। আরো আট দশ গজ সামনে গিয়ে বাড়ির সীমানা শেষ হয়ে গিয়েছে। তারপরের বেশ চওড়া একটা খাল। খালটা একেবেঁকে মাইল দেড়েক গিয়ে মেঘনা নদীর সাথে মিশেছে। এখানেই গ্রামের লঞ্চঘাট এবং বাজার। একসময় বর্ষার মরশুমে এই খালটাই ছিল যাতায়াতের মূল মাধ্যম।

    ১৫-১৬ বছর আগেও এবং তারও আগে যখনি গ্রামে এসেছি তখন এই খালে নৌকা নিয়ে অনেক ঘুরেছি। চাচাতো ফুফাতো ভাই-বোনদের সাথে নৌকায় করে ঘুরে বেড়ানো, দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় রাত জেগে আড্ডা দেয়া আর তার জন্য চাচার বকুনি খাওয়া মনে হয় এইতো সেদিন এর কথা। তখন বাড়িটাতে কত মানুষের আনাগোনা ছিল আর এখন পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ নিঝুম হয়ে পড়ে আছে, যেন প্রাণ নেই। কমিয়ে রাখা হারিকেনের আবছা আলোয় বিছানায় বসে বসে স্বপ্নটার কথা ভাবতে লাগলাম। কি অদ্ভুত স্বপ্ন। ছেলেবেলায় সত্যিই একবার এই ঘেরা জাল দিয়ে মাছ ধরা দেখেছিলাম। সেই একবারই। দাদি তখনো বেঁচে। চাচা,ফুফু এবং চাচাতো-ফুফাতো ভাই-বোনদের আনাগোনায় বাড়িটা তখন সবসময় সরগরম থাকতো। বেলায় বেলায় ১৫-২০ জনের জন্য রান্না হতো। আর এখন মানুষ বলতে অসুস্থ চাচা এবং তাকে দেখাশোনার জন্য একজন লোক তার পরিবার নিয়ে এক পাশে থাকে। চাচা না থাকলে হয়তো আর কেউই এই বাড়িতে থাকবে না। চাচাতো ফুফাতো ভাই বোনদের কারোরই বাড়ির জন্য তেমন টান নেই। কেউ এলেও কোনোমতে এক দুদিন থেকেই পালিয়ে যায়। সংস্কারের অভাবে এখনই বাড়ির চালা, কড়িকাঠ, জানালা দরজা, আসবাবপত্র সবই ভেঙে পড়ছে। পুকুরের সেই শান বাঁধানো ঘাট টার অবস্থাও শোচনীয়। আর কয়েক বছর পরই হয়তো বাড়িটা ভুতুড়ে বাড়ির রূপ নিবে। আমার কিন্তু এই ভাঙাচোরা দক্ষিণের ঘরটায় থাকতে এখনো ভালো লাগে। শুয়ে শুয়ে অতীত দিনের কথা ভাবি। মনে মনে ভাবতে ভালো লাগে সংসার আর কাজকর্মের চিন্তা না থাকলে হয়তো এখানেই থেকে যেতাম। আমাদের বাপ চাচারা কিন্তু এই গ্রামের স্কুলেই পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তীতে তারা সকলেই শহর মুখী হয়ে গ্রামকে ত্যাগ করেছেন বলতে গেলে। কেউ হয়েছেন কলেজের অধ্যাপক কেউ সাংবাদিক এবং দুজন ডাক্তারও আছেন আমাদের ফুফুর পরিবারে। আমার বাবা এবং আরেক চাচা যোগ দিলেন রেলওয়ের চাকরিতে। শুধু এক চাচা যিনি গ্রামের একটা স্কুলে মাস্টারি করতেন, তিনি এবং তার স্ত্রী রয়ে গেলেন বাড়ীর দায়িত্ব নিয়ে। দাদি মারা যাওয়ার পর চাচা-ফুফুদের বাড়ির সাথে যোগাযোগ আরো কমে গেল। তারপর থেকেই হয়তো অবক্ষয়ের শুরু, চাচা অসুস্থ হওয়ার পর যা আরো প্রকট হয়েছে।

    বাইরে বৃষ্টি ধরে এসেছে। বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে টিনের চালের সাথে আম গাছের ডালের ঘষাঘষির একঘেয়ে শব্দটাও থেমে গেছে। জানালাটা খুলে দেখলাম বাইরে ভোরের আবছা আলো ফুটে উঠেছে। দরজা খুলে বারান্দায় এসে বেঞ্চিটায় বসলাম। একটা সরু কাঠের বেঞ্চি সবসময় বারান্দায় থাকে। সামনের জঙ্গলে খচমচ শব্দ, নির্ঘাত শেয়াল। অবশ্য ভয়ের কিছু নেই মানুষ দেখলে ওরা সামনে আসে না। কিন্তু ভয়টা এলো অন্য দিক থেকে। এতক্ষণ একেবারেই খেয়াল করিনি, হঠাৎ দেখি বারান্দার প্রান্ত থেকে থেকে একটা লোক উঠে দাঁড়ালো। সূর্য উঠার এখনো অনেক দেরি। এই সময় অন্ধকারাচ্ছন্ন বারান্দার এক কোণে কারো উপস্থিতি আমি কল্পনাই করতে পারিনি। আমি এমন কোন সাহসী লোক নই। নিস্তব্ধ বাড়ির এই অন্ধকার বারান্দায় একজন লোকটাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে ভীষণ চমকে উঠলাম। আমার ঘাড়ের লোম সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল। অন্ধকারে লোকটার চেহারা দেখা যাচ্ছিল না। কি বলবো বা করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। একটু এগিয়ে এসে লোকটাই বলল “খালে বরশি বানছিলাম ভাইসাব, মাছ পড়ছেনি দেহি গিয়া”। একটু হেসে আবার বলল ” আফনে আইবেন নি ভাইসাব?” আশ্বস্ত হোতে বেশ খানিকটা সময় নিলাম, বললাম “চলো যাই দেখি তোমার মাছ”।

    5
    2 Comments
Skip to toolbar