Profile Photo

মো. মিকাইল অাহমেদOffline

  • Mekail2
  • দুই সাগরের কান্না
    দুনিয়ার একদিকে সাহারা মরুভূমি অন্যদিকে আতাকামা মরুভূমি। মরুভূমি তো মরুভূমিই। যেখানে রয়েছে রিক্ততা আর শূন্যতা। একটু পানির স্পর্শ পাওয়ার জন্য তীব্র হাহাকার। দুনিয়াতে দুই শ্রেণীর মানুষ রয়েছে যাদের জীবনে আছে মরুভূমির মতোই হাহাকার। এতিমের কান্না বাবা-মায়ের জন্য আর নিঃসন্তান দম্পতির কান্না একটি সন্তানের জন্য। দুই মরুভূমির অবস্থান পৃথিবীর দুই প্রান্তে হলেও দুঃখের ধরণ একই।
    এতিম কোনদিন পাবেনা বাবা-মায়ের আদর, স্নেহ, ভালোবাসা। অপরদিকে নিঃসন্তান দম্পতি পায়না একটি ফুটফুটে সন্তান যাকে একটু আদর করবে, স্নেহ করবে, ভালোবাসবে। ভেবে ভেবে দুই পক্ষই কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে যায় আরাল সাগরের মতো। বুকের ভেতরের হাহাকার মরুভূমির মতো হলেও ক্রন্দনরত চোখের জল সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির মতো। এতিম শিশু আজমত কাঁদছে। কাঁদছে নিঃসন্তান দম্পতি জোহরা-জয়নালও। এ যেন পাশাপাশি দুই সাগরের কান্না।
    মাজেদা শুধু এক বাসাতেই বুয়ার কাজ করেনা। জয়নালের বাসায় কাজ সেরে তারপর যায় আয়ানদের বাসায়। জয়নালের বাসা থেকে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকে মাজেদার দিন চলে না। ঢাকা শহরে জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম। পেটের দায়ে দুই বাসায় কাজ করতে হয় মাজেদার। জোহরা-জয়নালের কষ্টটা মাজেদা বুঝে। দীর্ঘদীন জয়নালের বাসায় কাজ করার ফলে তাদের সাথে হয়ে গেছে মাজেদার আত্মার সম্পর্ক। জোহরার দুঃখ গুলো মাজেদাকেও নাড়া দেয়। গরীব মানুষ অপরের দুঃখ বুঝতে পারে সহজে। জোহরাও অবলীলায় সুখ-দুঃখের কথা শেয়ার করে মাজেদার সাথে।
    জোহরার মাজেদা খালা। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও কিছু কিছু মানুষের সাথে সম্পর্ক হয়ে যায় একেবারে আত্মার। জোহরার সাথে মাজেদার সম্পর্কও ঠিক সেরকম। একটু দুর্বলতার সুযোগ পেলে কাছের মানুষগুলো যখন পর হয়ে যায়, বিষবাক্যে জর্জরিত করে জীবনকে করে তুলে বিষিয়ে ঠিক তখনই অসহায় মানুষগুলো এমন কিছু মানুষের স্বরণাপন্ন হয় যাদের সাথে একটু মন খুলে কথা বলা যায়, সুঃখ-দুঃখের ভাগীদার হওয়া যায়। তাই শহরের অসহায় মানুষগুলো মিলেমিশে বাস করে। টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত না থাকলেও মিল মহব্বত আছে। আছে মায়া। আছে মমতা।
    জয়নালের গ্রামের বাড়ি উত্তরবঙ্গে। জোহরার বাপের বাড়িও সেখানেই। বিয়ের আগে জয়নাল ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতো। টগবগে তরুণ। সুন্দর, সুঠাম দেহ। বিয়ের সময় জোহরা সবে কলেজের গণ্ডি পেরিয়েছে। জোহরাও রূপ লাবণ্যে অন্যন্য। শিক্ষিত, চাকুরিজীবি পাত্র দেখে এমন সম্বন্ধ হাতছাড়া করতে চায়নি জোহরার পিতা। ফলে দুই পরিবারের সম্মতিতে পারিবারিক ভাবেই বিয়ে হয় জোহরা ও জয়নালের। প্রথম প্রথম সংসারজীবন বেশ ভালোই চলছিলো তাদের। বেতন অল্প হওয়ায় বিয়ের পর পরই জোহরাকে ঢাকায় আনতে পারেনি জয়নাল। এখন বেতন বেড়েছে, চাকুরিতে প্রমোশন হয়েছে। ঢাকায় একটি বাসা নিয়ে থাকার মতো সক্ষমতা হয়েছে জয়নালের। একটি সুখের নীড় রচনা করতে চায় সব দম্পতিই। জয়নালের চোখমুখেও ছিলো রঙ্গিন স্বপ্ন। একসময় জয়নালের রঙ্গিন স্বপ্ন ধূসর বর্ণ ধারণ করলো। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস আর সংগ্রামের গল্প।
    জোহরার কপালে শ্বশুরবাড়ির সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বছর পাঁচেক যেতে না যেতেই জোহরার জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। শ্বাশুড়ি, ননদ, জা’য়ের নানা কটুবাক্যে জোহরার জীবন হয়ে উঠে বিষময়। কারণ আর কি। ঐ এক বিষয়ই। সন্তান না হওয়া। গ্রাম-বাংলার চিরাচরিত রূপ এটা। সব নব দম্পতির প্রেমালাপ বেশিদিন টিকে না। পারিবারিক নানা চাপ, অপমান, লাঞ্ছনা না গঞ্চনায় জোহরার জীবনে অন্ধকার নেমে আসলো। এই একটা জায়গায় এক নারী আরেক নারীকে বিন্দুমাত্র সহ্য করতে পারেনা। দুটো কটুকথা শুনাবার পারলে কে এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়? নারীর কোমল রূপ আর কোমল থাকেনা তখন। কুসুমের মতো কোমল নারীর হৃদয় হয়ে যায় পাথরের চেয়েও শক্ত। নারীরা এমনিতেই গীবত করতে পটু। দুইজন নারী একত্রে হলে শুরু হয় তৃতীয় কোন পক্ষের বদনাম। আবহমানকাল থেকেই চলে আসছে এই প্রথা।
    কবে নাতি-নাতনীর মুখ দেখবে এই চিন্তায় জোহরার শ্বাশুড়ি অস্থির। পুরুষ মানুষ মহিলাদের মতো ঘ্যানরঘ্যানর পছন্দ করেনা বলে জোহরার শ্বশুর মুখ ফোটে তেমন কিছু বলে না। মনে মনে তিনিও নাতি-নাতনীর মুখ দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। সরাসরি না বললেও আকারে- ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন জোহরার শ্বশুর। জোহরা বুঝতে পারে সবই তবে করার থাকেনা কিছুই। সবকিছুতে তো মানুষের হাত নেই। সন্তান দানের একচ্ছত্র ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। সবই আল্লাহর মর্জি। এর বাইরে কোনদিনই সম্ভব নয়। কোনদিনই নয়। একপাক্ষিক অপমান জোহরা কেবল মুখ বুঝে সহ্য করেই যাচ্ছে। শ্বাশুড়ি, ননদ, জা’য়ের প্রতিটি তীর্যক মন্তব্য জোহরার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। জয়নাল সবই শুনে, সবই বুঝে কিন্তু করতে পারেনা কিছুই। কষ্টটা জোহরার একার না জয়নালেরও।
    দুইজনেই সন্তান জন্মদানে অক্ষম একথা ডাক্তার বলেনি কখনোই। তাই একজন অপরজনকে দোষ দিতে পারছে না তারা। কোন এক অজানা কারণে তাদের সন্তান হচ্ছে না। জয়নালও আশা পুরোপুরি ছাড়েনি। আল্লাহ চাহেন তো একদিন হয়তো নিশ্চয়ই সন্তান হবে তাদের। ঘর আলোকিত করে আসবে এক নিষ্পাপ অতিথি। জয়নালের শূন্য বুকটা ভরে উঠবে খুশির জোয়ারে। সেই অপেক্ষায় দিন গুনছে জয়নাল। জোহরার দুঃখ নেহায়েত কম নয়। উঠতে বসতে শ্বাশুড়ি আর ননদের অপমান। জয়নাল সবই জানে। এজন্য শিক্ষিত তরুণ জয়নাল জোহরার উপর বাড়তি চাপ প্রয়োগ করতে একদমই আগ্রহী নয়। বিয়ের সময় জোহরার চোখমুখে ছিলো আনন্দের ঝিলিক। সারাঘর আলোকিত করে রাখতো জোহরার মায়াবী হাসি। এখন আর জোহারার মুখে কোন হাসি নেই। চেহারা মলিন হয়ে থাকে জোহরার।
    দেখতে দেখতে এক যুগ কেটে গেছে এই দম্পতির বিয়ের বয়স। দীর্ঘদিন যাবৎ জোহরার মুখে কোন হাসি নেই। না হেসে কতদিন থাকতে পারে একজন মানুষ? জয়নালও হাসে না। বিপদে-আপদে যে মানুষ গুলোর সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তারাই আজ ছুড়ছে বিষাক্ত বাক্যবাণ। প্রতিদিন। প্রতিক্ষণ। চতুর্দিক থেকে আসা তীরের আঘাতে দুজনেই বিধ্বস্ত ওরা। অপমান আর সহ্য হচ্ছে না। এদিকে জোহরাও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কিছু একটা করা দরকার। জয়নাল ভাবে। জোহরাকে ঢাকায় নিজের কাছে নিয়ে আসবে জয়নাল ঠিক করলো।
    একদিন জোহরাকে জয়নালে নিয়ে এসেছে ঢাকায়। জয়নালের পরিবারের কেউই রাজি ছিলো না। পরিবার থেকে চাপ আসছিলো জয়নালকে আবার বিয়ে করাবে। জোহরার মুখের দিকে তাকিয়ে জয়নাল রাজি হয়নি। একটা জীবন প্রয়োজন হলে সন্তান ছাড়াই কাটিয়ে দিতে পারবে সে তবুও জোহরার হৃদয় ভাঙতে পারবে না। জয়নাল না হয় আরেকটা বিয়ে করবে, সুখের নীড় রচনা করবে, সন্তান হবে, ঘর সংসার নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হবে কিন্তু জোহরার কি উপায় হবে? জোহরা কিভাবে সহ্য করবে সারাজীবন? নারী কি শুধু একা দুঃখ পাওয়ার জন্যই জন্মিয়েছে পৃথিবীতে?
    নাহ। জয়নাল এতো নিষ্ঠুর হতে পারবে না। নারীর কষ্ট যে উপলদ্ধি করতে পারে সেই তো আসল পুরুষ। সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়েই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলো তারা। তবে কেন আজ দুঃখের ভাগ বইবে না জয়নাল? জয়নাল জানে পুরুষ অক্ষম হলেও নারীরা স্বামীর ভাগ অন্য নারীকে দিতে চায়না কখনোই। এই একটা জায়গায় এসে নারী সত্যিই অপরূপা, অনন্যা। নারীর তুলনা নারী নিজেই। স্রষ্টার অপূর্ব সৃষ্টি নারী।
    একটা সন্তানের জন্য জয়নালেরও মন কাঁদে। মুখ ফোটে বলতে পারেনা কিছুই। বজ্রকন্ঠের পুরুষও এখানে এসে চুপসে যায়। বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় সন্তান জন্মদানে সক্ষমতা পুরুষের জন্য বিরাট গর্বের বিষয়। পুরুষ মানেই যুদ্ধংদেহী মনোভাব, শৌর্য, বীর্যের প্রমাণ। নারী কটুকথা শুনে ঘরের ভেতরে আর পুরুষকে শুনতে হয় বন্ধুদের আড্ডায়, অফিসে সহকর্মীদের কাছে। বিষের বাণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউই। হোক সে পুরুষ অথবা নারী।
    সন্তানহীনা মেয়েলোকদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে দেখা হয়। অবস্থাটা এমন যেন মেয়ে মানুষের জীবনের কোন দাম নেই। সন্তান বংশের প্রদীপ। সন্তানই যদি না হয় বংশে প্রদীপ জ্বালাবে কে? আরো নানারকম কথা শুনাতে ছাড়ে না কেউ। কথাগুলো মানুষ বলে ঠিকই কিন্তু আগেপিছে ভেবে বলেনা। আরেকজনকে ঘায়েল করার জন্য মোক্ষম সুযোগ ছাড়তে চাইনা কেউ। আর আঘাত যদি আসে নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে তাহলে কষ্টটা বেড়ে যায় দ্বিগুণ। একটা অদ্ভুত, অসুস্থ তৃপ্তি সমাজের কিছু মানুষকে পেয়ে বসেছে।
    অপবাদ শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো জোহরা। দম বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম। প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকায় দায়। ঢাকায় এসে কিছুটা স্বস্তি মিললো। যদিও সন্তান না হওয়ার ব্যাথাটা রয়েই গেছে। মানসিক যন্ত্রণা থেকে এখনো মুক্তি মেলেনি। জোহরা তারপরেও খুশি। শ্বাশুড়ি, ননদ আর জা’য়ের অত্যাচার থেকে সাময়িক মুক্তি মিলেছে। একা একা কাঁদতে হলেও একটা নিরিবিলি জায়গা দরকার। সে সুযোগটাই এতদিন পাচ্ছিলো না জোহরা। এখন তাহাজ্জুদের নামাজে জায়নামাজে বসে নিজের গুপ্ত বাসনা, আকুতি, মিনতি গুলো খোদার দরবারে তুলে ধরছে জোহরা। জয়নালও ইবাদতে মশগুল। সন্তান দেওয়ার মালিক যিনি চাইতে হবে তাঁর কাছেই। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র তিনি। তিনি দিনকে রাত করেন, রাতকে করেন দিন। দুঃখের পর সুখ মালিকও তিনি। এ বিশ্বাসে ভর করেই চলছে জোহরা-জয়নালের দাম্পত্যজীবন। বিয়ের পর দেড়যুগ ওরা কাটিয়ে দিয়েছে এভাবেই।
    গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে জনজীবন ওষ্ঠাগত। বেশ কয়েকদিন যাবৎ কোন বৃষ্টি হয়নি। আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও ছিলোনা। হঠাৎই গতকাল সন্ধ্যায় এক ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেল। বৈশাখের শুরু। কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস। না ঝড়ো হাওয়াই ছিলো শুধু, বৃষ্টি হয়নি একটুও। একটু বৃষ্টির জন্য হাহাকার করছে সবাই। আল্লাহর কি মহিমা। শেষরাতে নামলো রহমতের বৃষ্টি। সাথে ঝড়, বাতাসের তান্ডব লীলা। কারো ঘরবাড়ি ভেঙেছে। কারো আবার গাছপালা। একপশলা শিলা বৃষ্টিও হয়ে গেলো। যে মরুর বুকে গাছ নেই, গাছের কোন ছায়া নেই, বৃষ্টির সাথে আলিঙ্গন হয়না বছরের পর বছর সেই মরুর বুকে যদি হঠাৎ এমন ঝড়বৃষ্টি হয় তখন কেমন লাগবে ভাবা যায়। ঝড়, বৃষ্টি আর বজ্রপাতের মুহুর্মুহু আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলা জোহরার।
    টিনের চালে শিলাবৃষ্টির তান্ডবে ঘুমিয়ে থাকতে পারেনি জোহরার স্বামী জয়নালও। দুজনেই ঘুম থেকে ওঠে একেবারে বসে পড়েছে। ঐদিকে বিদ্যুৎও নেই। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে বজ্রপাতের আলোয় ঘরের এদিকওদিক একটু আধটু দেখা যায়। ঘরে ওরা দুজনেই শুধু। আর কেউ নেই। বিয়ের বয়স বিশ পেরিয়ে গেছে এখনো কোন সন্তান হয়নি এই দম্পতির। ঝড়ের রাতে ঘর যতোটা না অন্ধকার তারচেয়েও বেশি অন্ধকার লাগে দুনিয়াটা যখন ওদের মনে পড়ে তাদের কোন সন্তান নেই। শুন্যতায় বুকটা হাহাকার করে উঠে। ফুল না ফুটলে বাগানের কী সৌন্দর্য্য! সমাজের মানুষের নানা কটু কথা নিঃসন্তান দম্পতির কষ্ট টা আরও বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ।
    টাকা পয়সার অভাব নেই। ঘরবাড়ি, দামি আসবাবপত্র, গহনাগাঁটি সবই আছে। নেই কেবল একটি জিনিস। যার কারণে সাজানো গোছানো সুন্দর রাজপ্রাসাদকেও খাঁ খাঁ শুন্য মরুভূমি মনে হয়। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। এখানে মানুষের কোন হাত নেই। আচ্ছা মরুর বুকেও তো বৃষ্টি হয়। নাকি হয়না কোনদিন? মরুর বুকে বৃষ্টিপাত দেখার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় এই যা। মনে মনে ভাবে জয়নাল। একা একাই চিন্তা করে সে। জোহরা শুনলে কষ্ট পাবে এই ভেবে জোহরার সাথে সব কথা শেয়ার করে না জয়নাল। জয়নালের যেমন বাবা ডাক শুনার ইচ্ছা তেমনি মা ডাক শুনার ইচ্ছা তো জোহরারও।
    ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডন। বরং এটা মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। যারা এটা মেনে নিতে পারেনা তারাই ভোগে চির অশান্তিতে। প্রত্যেকটি কাজের পেছনে, সৃষ্টির পেছনে স্রষ্টার কোন না কোন রহস্য লুকিয়ে আছে। সব বোঝার, সব দেখার ক্ষমতা তো কোন মানুষকে দেয়া হয়নি। রহস্যের ডালি স্রষ্টার কাছেই থাকুক। ভবিষ্যৎ জানার ক্ষমতা থাকলে কেউ হয়তো সাময়িক সুখী ভাববে নিজেকে কিন্তু বেশিরভাগই হবে আতঙ্কিত অস্থির। এজন্যই আল্লাহ তাআলার মানুষের ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা দেননি। নিজের আসন্ন বিপদের কথা জানতে পারলে কোন মানুষ থাকতে পারবে একমূহুর্ত সুস্থির?
    টানা কয়েক ঘণ্টা ঝড় বৃষ্টির পর এবার একটু থামলো। প্রকৃতিতে বয়ে গেলো প্রশান্তির ফল্গুধারা। মূহুর্তেই শান্ত হয়ে গেলো সবকিছু। প্রকৃতির আচরণেও শিক্ষা আছে তাদের জন্য যারা চিন্তা করে। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির পরও যে প্রকৃতিতে শান্তি আসে এটাইতো বড় শিক্ষা। মানুষের জীবনও তো এমনই। দুঃখের পরই সুখ আসে। এটা জানার পরেও মানুষ কেন এত অধৈর্য হয়? মানুষ আসলেই অস্থির প্রকৃতির— কুরআনেও আছে একথা।
    আজকের ঝড়বৃষ্টি নিঃসন্তান এই দম্পতির মনে নতুন আশা জাগিয়ে দিয়েছে। দুজনেই চিন্তা করলো ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া যাক। দৃঢ়চেতা জয়নাল। সহজে দমবার পাত্র নয় সে। আরেকটু চেষ্টা করে দেখা যাক কোন সন্তান হয় কিনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের দিকে মুুখ তুলে তাকাবেন। এ বিশ্বাস বুকে লালন করে সে। কথামতো নিকটস্থ ফার্টিলিটি সেন্টারে ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে জয়নাল। আগামী সপ্তাহে সিরিয়াল। দুজনেই বুকে বাসা বাঁধে। বিশ্বাসের বাসা। এ বিশ্বাসে ভর করেই তো সন্তান ছাড়া বিশটি বছর কাটিয়ে দিয়েছে এই দম্পতি। একটি বারের জন্য কেউ কাউকে দোষারুপ করেনি। প্রত্যেকেরই দেহ আলাদা, মন আলাদা। কষ্টটা দুজনেরই লাগে। শেলের মতো বিঁধে প্রতিবেশীর মুখের কটুকথা, বাকাদৃষ্টি। ইচ্ছে করে কি কেউ নিঃসন্তান থাকে? একথা প্রতিবেশীদের কে বুঝাবে।
    যথারীতি ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্টের দিন হাসপাতালে হাজির জোহরা-জয়নাল দম্পতি। দুজনের বুকেই উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। একটা নতুন খবর যদি পাওয়া যায়। একটা নতুন আশা। একটা নতুন দিন। হাসপাতালে ঘুরাঘুরি করছিলো ছোট্ট শিশু মুহতাসিম। তার উদ্দেশ্য ফুল বিক্রি করা। এটাই তার পেশা। মা-বাবা কেউ নেই। এতিম, অসহায়। চাচা-চারীর সংসারে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অজানার উদ্দ্যেশ্যে পাড়ি জমায় মুহতাসিম। একদিন লঞ্চে উঠে ঢাকায় আসে সে। বাড়ি বরিশালে। ঢাকায়ও তার কেউ নেই। পথশিশুদের সাথে একসময় সখ্যতা গড়ে উঠে তার। এভাবেই ঢাকার এক বস্তিতে অন্যান্য পথশিশুদের সাথে আশ্রয় মিলে শিশু মুহতাসিমের। এখন রাস্তায় রাস্তায় ফুল বিক্রি করে জীবন চলে তার।
    হাসপাতালের নিচতলায় কাউন্টারের পাশে সিরিয়ালের অপেক্ষায় বসে আছে জোহরা-জয়নাল দম্পতি। গ্রিনরোডের হাসপাতালটি একেবারে রাস্তার কূল ঘেষা। সামনে কয়েকটি এম্বুলেন্স দাঁড়ানো। নতুন অতিথির আগমনে হাসপাতালে নবদম্পতিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে যায় আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেউ কেউ। এতিম শিশু মুহতাসিম বিষয়টি জানে তাই ফুল বিক্রির আশায় বিভিন্ন হাসপাতালেও ঢুঁ মারে মাঝেমধ্যে। সেই আশায় আজও এই হাসপাতালে এসেছে নাবিল। জোহরা-জয়নাল দম্পতিকে লক্ষ্য করে ডাক দেয় মুহতাসিম।
    – একটা ফুল নিবেন স্যার?
    হাসপাতালে ফুল দিয়ে কি করবে জয়নাল ভাবতে পারে না সে। ফুল তো বিক্রি করে দোকানে অথবা রাস্তায়। পরক্ষণেই তার মনে হলো কঠিন কোন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর রোগীকে শুভেচ্ছা জানাতে ফুল দিতে আসে কেউ কেউ। জয়নাল ফুল দিয়ে করবেটাই বা কি তাও আবার হাসপাতালে। এই ফুলের সুভাস কিংবা সৌরভ থাকবেই বা আর কয়দিন?
    জয়নালের দরকার এমন একটি ফুল যা তার সারাবাড়ি সুভাস ছড়াবে। খেলবে, দৌড়াবে। মাতিয়ে রাখবে বছরের পর বছর। এতিম শিশু মুহতাসিমের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হলো জয়নালের। পরনে ছেড়া, জীর্ণ-শীর্ণ কাপড় হলেও চেহারায় পবিত্রতা সুস্পষ্ট। শিশুরা ফুলের মতো পবিত্র, কোমল ও নিষ্পাপ। জয়নালের ফুল কেনার কোন ইচ্ছে ছিলো না। শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবলো একটি ফুল নেয়া যাক। শিশুটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জয়নাল। ফুল বিক্রি করতে পেরে মুহতাসিমের চোখমুখে আনন্দের ঝিলিক। যেই বয়সে খেলনা দিয়ে খেলার কথা সেই বয়সে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি সে। তারপরেও মনে কোন ক্ষোভ নেই। কয়টা ফুল বিক্রি করতে পারলেই সে মহাখুশি। নিতান্তই বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে ফুল বিক্রির পেশায় এসেছে।
    এতক্ষণ সবকিছু শুনছিলো জোহরা। মুহতাসিমের গায়ে ময়লা, ছেড়া পোষাক দেখে জোহরারও খারাপ লাগলো। মনে হচ্ছে কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো খাবারও খায়নি ছেলেটা। মেয়েদের মায়ের মন। জোহরা জিজ্ঞেস করেই বসলো মুহতাসিমকে। বাড়িতে তোমার কে কে আছে?
    মুহতাসিম কোনো উত্তর দেয় না। চুপ করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। জোহরার কৌতূহল আরও বেড়ে গেলো। আবারো জিজ্ঞেস করে জোহরা।
    – তোমার বাবা-মা নেই?
    মুহতাসিম এবারও নিরুত্তর। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না সে। ছোট শিশু হলেও আবেগ অনুভূতি তো সবারই আছে। মা-বাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই চোখ দুটো পানিতে ভিজে এলো তার। একপর্যায়ে বলে উঠলো মুহতাসিম। মা-বাবা কেউ নেই তার। সে এতিম। খুব ছোটবেলায় মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছে সে। মা-বাবার চেহারাও স্পষ্ট মনে করতে পারেনা এখন।
    যেদিন বাড়ি ছেড়ে বরিশালের লঞ্চে উঠে ঢাকায় এসেছিলো এখনো সে কাপড়টিই মুহতাসিমের পরনে। মনে হচ্ছে একবারের জন্যও জামাটি কেউ ধুয়ে দেয়নি। মা-বাবা হারা এতিম শিশুকে কে দিবে নতুন জামা কিনে? এতিমের দুঃখ সকলে বুঝেনা। অসুখ করলেও সেবা করার কেউ নেই। একা একাই কাঁদতে হয়। এতিম শিশু মুহতাসিমের ঢাকায় কোন অভিভাবক নেই। জোহরা-জয়নাল দম্পতির মনে খুব দাগ কাটলো বিষয়টা। একটি সন্তানের জন্য জোহরা-জয়নাল দম্পতির জনম জনমের অপেক্ষা আর এতিম শিশু মুহতাসিম অপেক্ষা মা-বাবার একটু আদর, স্পর্শের। একটু কান্না করার জন্য হলেও তো মায়ের আঁচলটা দরকার। আর বাবার কাছে বায়না ধরা। নানা জিনিস পাওয়ার আবদার। মুহতাসিমের তো কেউ নেই। কোথায় যাবে সে?
    এরকম ফুটফুটে শিশুকে একা ফেলে যেতেও মনে সায় দিচ্ছে না জোহরা-জয়নালের। নিজেদের সন্তান হলে কি তারা এভাবে অনিরাপদ পরিবেশে রাস্তায় ফেলে যেতে পারতো? ভয়ে গা শিহরিয়ে উঠবে না? আল্লাহর পরিকল্পনা হয়তো এরকমই ছিলো। নিঃসন্দেহে আল্লাহর পরিকল্পনা উত্তম। এতিম শিশু মুহতাসিমকে নিজেদের বাসায় নিয়ে এসেছে জোহরা-জয়নাল দম্পতি। সমগ্র বাড়িতে খুশির জোয়ার বইছে। মুহতাসিম খেলছে, দৌড়াচ্ছে। ফুলহীন বাগানে ফুল ফুটেছে। গরীবের টিনের ঘর রাজপ্রাসাদের চেয়ে বেশি আলোকিত আজ। এ যেন চাঁদের হাট বসেছে। মুহতাসিমের চোখে-মুখে আনন্দের বন্যা। মা-বাবা দুজনকেই পেয়েছে সে। জোহরা-জয়নাল দম্পতিও বেজায় খুশি। প্রশান্তি অনাবিল। নিঃসন্তান দম্পতির আর মন খারাপ করে থাকতে হবেনা। এমন বোধোদয়টা হতো যদি সবার! সকল এতিম শিশুই পেত একটু মাথা গুঁজার ঠাঁই।
    আল্লাহ কার ভাগ্য কিভাবে লিখে রেখেছেন কেউ জানে না। মুহতাসিমকে পেয়ে জয়নালের আনন্দের সীমা নেই। জয়নালের শূন্য বুকটা ভরে উঠছে এবার। সমস্ত হাহাকার নিমিষেই কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। জোহরা-জয়নাল এখন একটু আনন্দ প্রকাশ করুক। এতদিন তো সান্ত্বনা দিতেও কেউ আসেনি। তীরের ফলায় বিদ্ধ করেছে শুধু। সমালোচকদের কাজই সমালোচনা করা। সমালোচকদের সব কথায় কান দিতে নেই। এতে অনর্থক দুঃখ বাড়ে। কাজের কাজ কিছুই হয় না।
    নতুন পরিবেশে আস্তে আস্তে মানিয়ে নিচ্ছে মুহতাসিম। মুহতাসিম কখনো কল্পনাও করেনি তার ভাগ্য এভাবে বদলে যাবে। এখন আর মন খারাপ হয়না মুহতাসিম। দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্য বোতল কুড়াতে হয়না। মা, বাবা, পেট পুরে খাবার, থাকার জায়গা সবই পেয়েছে সে। একটু ভালো খাবারের আশায় কতদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে সে। দয়াপরবশ হয়ে কেউ না দিলে কপালে জুটেনি। এত প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেও অতীত ভুলেনি মুহতাসিম। একটু সময় পেলেই বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যায়। আজমত তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আজমত খুবই খুশি হয়েছে বন্ধুর একটা আশ্রয় মিলায়। আজমত মুহতাসিমকে খুব ভালোবাসে। ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করে। ওরা দুজনেই এতিম তাই এদের মধ্যে কোন হিংসা নেই।
    এ খুশির সংবাদটা মাজেদা খালাকে দেয়ার জন্য সকাল থেকেই জোহরা অপেক্ষা করছে। মাজেদা খালা নিশ্চয়ই খুশি হবে এমন সংবাদে। মাজেদা এসেছে একটু বেলা করে। মাজেদা বাড়িতে ঢুকতেই জোহরা জড়িয়ে ধরেছে তাকে। জোহরার আনন্দ আর দেখে কে। মাজেদা খালা শুরুতে বুঝতে পারেনি কিছুই। এতদিন যার মুখে একটিবারের জন্যও হাসি দেখেনি সেই জোহরার আজ বাঁধভাঙা উল্লাস। মাজেদা কিছুক্ষণের জন্য থ বনে রইলো। কৌতূহল চেপে রাখতে না পারে মাজেদা জিজ্ঞাসা করে।
    – আইজ এতো খুশির কারণ কিগো মা? তোমারে কোনদিন দেখি নাই অত খুশি হয়তে। খবর আছে নি কোন? জোহরা একগাল হেসে দেয়। কতবছর ধরে জোহরা হাসে না। জোহরা বিস্তারিত জানায় মাজেদাকে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। মাজেদা আকাশের দিকে তাকিয়ে শুকরিয়া আদায় করে আর বলে আলহামদুলিল্লাহ। মাজেদা ভীষণ খুশি। মাজেদা মন খুলে দোয়া করে জোহরা, জয়নাল আর মুহতাসিমের জন্য। আরো বলে এতদিনে একখান ভালো কাজ করছো তোমরা। দোয়া করি আল্লাহ তোমাদের সুখি করুক।
    জোহরার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার বস্তিতে ফিরে আসে মাজেদা। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর ক্লান্ত দেহে শুয়ে পরে মাজেদা। কিন্তু ঘুম আসছে না মাজেদার। আজমত ঘুমিয়ে পড়ছে। ঘুমন্ত এতিম ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে মাজেদার খুব মায়া হলো। যেদিন থেকে মাজেদার সাথে পরিচয় সেদিন থেকে অন্য কোথাও যায়নি আজমত। মাজেদাও বৃদ্ধ হয়েছে। আগের মতো চলতে-ফিরতে পারেনা। শরীরে সায় দেয় না। অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্তি ভর করে দেহে। কোনদিন পরপারে যাওয়ার ডাক আসে কেউ জানে না। মাজেদা চলে গেলে আজমতের কি হবে, কোথায় যাবে সে, কে তাকে আশ্রয় দিবে এসব ভাবতেই মাজেদার দুচোখ গড়িয়ে পানি পড়তে লাগলো। রক্তের সম্পর্ক নেই, বংশের সম্পর্কও নেই অথচ দুটি প্রাণ কি এক মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে গেছে সময়ের পরিক্রমায়। মুহতাসিমের মতো আজমতের একটা গতি হলে মাজেদা শান্তি পেতো, দুশ্চিন্তা মুক্ত হতো।
    অক্টোবরের শেষ দশক। প্রকৃতিতে হালকা কুয়াশা পড়েছে। হিমশীতল আবহাওয়া। শীত আসি আসি করছে। অতিষ্ঠ গরমের যন্ত্রণা থেকে মাস কয়েকের মুক্তি মিলবে। হেমন্ত জয়নালের প্রিয় ঋতু। কারণ হেমন্তুে একদিকে গরমের তেজ কমে আসতে থাকে অন্যদিকে একটু শীত শীত ভাব। সবমিলিয়ে অপূর্ব একটা ঋতু। জোহরার প্রিয় ঋতু বর্ষা। ঝুমবৃষ্টি তার ভালো লাগে। আকাশের যেদিন মন খারাপ থাকে, ঘন কালো মেঘে ঢেকে যায় আকাশটা, একটা প্রশান্তির বৃষ্টি এসে সব মেঘ দূর করে দেয়। তারপর দেখা মেলে ঝকঝকে, তকতকে আকাশের। সেই মুহূর্তটা জোহরার দারুণ লাগে। আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে জোহরা আর মনে মনে ভাবে ঈশ! আকাশের মেঘটার সাথে জোহরার মনের দুঃখ গুলো উড়িয়ে দিতে পারতো যদি! আর কেউ না শুনলেও আল্লাহ শুনে জোহরার হৃদয়ের কাকুতিমিনতি। এটা জোহরার বিশ্বাস।
    স্রষ্টার প্রতি এই বিশ্বাসই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে যুগের পর যুগ। কত ঝড়-ঝঞ্চা আসে মানুষের জীবনে। কেউ একবারে ভেঙ্গে পরে, কেউবা হয় দিশেহারা। কেউবা শিক্ষা নেয়, নতুন উদ্যোমে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। মানুষের ভাগ্য যিনি লিখেন, ভাগ্য পরিবর্তন করার ক্ষমতা কেবল তাঁরই। ঝড় যতো শক্তিশালীই হোক, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের ভিত্তি যদি হয় মজবুত তাহলে সে ঝড় মানুষের কোন ক্ষতি করতে পারে না। সবকিছুই আল্লাহর হাতে।
    এক ইলাহতে বিশ্বাসী মানুষকে টলাতে পারেনা কেউ। স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস পাথর, সিমেন্ট, রডের গাঁথুনির মতো এতো ঠুনকো নয় যে ভূমিকম্পে দেবে যাবে না হয় ভেঙে যাবে। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের ভিত্তিমূল সুদূঢ়। যত বড় বিপদ-আপদ কিংবা প্রাকৃতিক দূর্যোগই আসুক না কেন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী মানুষগুলোর বিশ্বাসে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরাতে পারেনা। অদৃশ্য বিশ্বাসের দেয়ালই সবচেয়ে শক্তিশালী। যে দেয়ালের কাঁচামাল স্রষ্টার প্রতি প্রেম, ভালোবাসা ও আনুগত্য। এ প্রেমের টানেই স্রষ্টার প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় জোহরা ও জয়নাল। সিজদায় কপালটা লুটিয়ে দেয় মহান প্রভুর দরবারে।
    কেবলমাত্র সন্তান লাভই চূড়ান্ত সফলতা নয়, সন্তান জন্মদানে সক্ষমতাই পুরুষের শৌর্য, বীর্যের পরিচয় নয়। পুরুষের দায়িত্ব নানাবিধ। সন্তানকে সুশিক্ষিত করে যাওয়া, দেশপ্রেমের সবক দেয়া পুরুষের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। জয়নালের পরিবারের নতুন অতিথি মুহতাসিমকে ঘিরে জয়নালের নানা স্বপ্ন। ফুটফুটে শিশু, ঠোঁটের কোণে মিষ্টি লাজুক হাসি। অনাদরে, অবহেলায় বেড়ে উঠেছে মুহতাসিম। তাকানো যেত না মাসুম বাচ্চাটার দিকে। যে কারো মায়া লাগতে বাধ্য। না জানি কতদিন, কতরাত না খেয়েছে কাটিয়েছে সে। এবার একটু প্রাণ ফিরে পাবে।
    হেমন্তের শেষে শীতের আগমন। ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে চারপাশ। মুহতাসিমের জন্য শীতের গরম কাপড় কিনতে বেড়িয়েছে জয়নাল। আর ঐদিকে খেজুরগুড় দিয়ে শীতের ভাপা পিঠা বানাচ্ছে জোহরা। নিমন্ত্রণ করেছে মাজেদাকেও। আশেপাশের বাসার কয়েকঘর প্রতিবেশীদের দিয়েছে পিঠাপুলির দাওয়াত। সারাবাড়িতে উৎসবের আমেজ। জোহরা-জয়নাল দুজনেই রোমাঞ্চিত। নতুন নতুন খেলনা পেয়ে উচ্ছসিত মুহতাসিমও। নিরানন্দে পড়ে থাকা বাসাটায় প্রাণের স্পন্দন। মুহতাসিমের মুখে আব্বা-আম্মা ডাক কলিজায় প্রশান্তি এনে দেয় জোহরা ও জয়নালের। পৃথিবীটা মানুষের হোক।

    3
    3 Comments

Friends

Profile Photo
Md. Deloar Hossen
@md-deloar-hossen
Profile Photo
সৃষ্টি
@premdevota
Profile Photo
Pritam Biswas
@pritam-biswas
Profile Photo
Sirazam-Munira
@sirazam-munira
Profile Photo
Redwan Khan
@redwan-khan
Profile Photo
Kanej-Roksana
@kanej-roksana
Profile Photo
AdabenTatali
@adabentatali
Skip to toolbar