Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • আপনার সন্তানের প্রথম স্কুল বা সে কোন স্কুলে ভর্তি হবে সেটাতো আপনি ই নির্ধারণ করবেন, তাই না? কারণ প্রডাক্ট আপনার, সেটা সেল করার পূর্ণ স্বাধীনতা আপনার। তাই তো? কিন্তু যদি আপনি সঠিক জায়গায় সেল করতে না পারেন, তাহলে সেই প্রডাক্ট এর আর কোন মূল্যই তো আপনার কাছে নেই, তাই না?
    কি খুব রাগ হচ্ছে তো আমার উপরে? কারণ আমি সন্তানকে প্রডাক্ট বলছি। নাহ্, রাগ করবেন না। ধৈর্য্য নিয়ে তবে পড়ুন, লেখাটি।
    মা, বাবা, সন্তান এবং সাথে একজন সহ আমার রুমে আসলেন তাঁরা। এসেই শুরু করে দিলেন -” এই মেয়েকে নিয়ে আর পারছিনা, তিনবার সুইসাইড করার চেষ্টা করেছে, ৬ বার বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। সুইসাইড করলে তখনতো আপনারা আমার দিকে আঙ্গুল তুলবেন, কারণ আমি মা। সব দোষ তো আমার। তাই ওকে সাথে নিয়ে এসেছি, ও এখানে লিখিত দিবে যে ওর মৃত্যুর জন্য আমরা দায়ী না। বলেন, আপনারা আমাকে দোষী করবেননা? বলেন?”
    যেন আমার সামান্য মাথা নড়ানোতেই তাঁর মেয়ের আত্মহত্যার অপরাধ থেকে তিনি মুক্তি পাবেন।
    হতভম্ব আমি! কি ভাবে ওনার সাথে কথা শুরু করবো? তাছাড়া আমার পরিচয়, কোড অব কন্ডাক্ট, প্রফেশনাল এথিকস, কিছু বলার ই সুযোগ দিচ্ছেন না তিনি।
    হেন অপরাধ নেই যা তার ভাষ্যমতে তাঁর মেয়ে করেন নি। এককথায় তাঁরা সাথে করে যেন মেয়ে নিয়ে আসেন নি, বরং সাংঘাতিক এক অপরাধীকে নিয়ে এসেছেন।
    শুরুতে ট্রেনকে লাইনে তুলতে সব সময় ই অনেক সময় লাগে,তবে উনার ক্ষেত্রে ট্রেনকে কারখানা থেকে বের করতেই পারছিনা।
    সংগে করে যে ডিউটি অফিসার নিয়ে এসেছেন, আমি তাঁকে বললাম- আপা, উনারা মনে হয় আইনতো সেবা চাচ্ছেন। আমিতো মানসিক সেবা দিয়ে থাকি।আইনতো সেবার জন্য ওনাদেরকে আগামীকাল আসতে হবে।

    এবার উঁনি(মা) বললে- না আমি আজকেই আপনার সাথে কথা বলবো। এরপর আমি পরিচয় সহ সব কিছু বললাম।
    কে আমার সাথে কথা বলবেন? উত্তর – সমস্যা ওর( মেয়ের),ওর সাথে কথা বলবেন, তবে আগে আমার কথা শুনেন। সব কিছু জেনে নিয়ে শুরু করলাম।
    সম্পূর্ণ বিষয় টা লেখা সম্ভব নয়, আর তার প্রয়োজনও নেই।
    ক্লাস টুতে পড়া কালীন সময় প্রথম মেয়েকে কাউন্সেলিং এর জন্য নিয়ে যান। কারণ মেয়ে তাঁর পছন্দের স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি, অনেকগুলো টিউটর, কোচিং সেন্টার গুলিয়ে ( তাঁর ভাষ্য মতে)।
    এরপরেও তিনি অনেক টাকা পয়সা ঢেলেছেন টিউটর, কোচিং সেন্টার এ। কিন্তু নাহ্, তবুও মেয়ে পারেনি।
    তাঁর মন এর পর থেকেই মেয়ের উপর থেকে উঠে গেছে ( তাঁর ভাষ্য)।
    মেয়ের জন্মের ৫ বছর পরে ২য় সন্তান হয়, ছেলে। ছেলেকে সময় দিতে হয় তাঁকে। কিন্তু মেয়ে ছেলের সাথে মারামারি, ঝগড়া এমনকি তার খাবারও সব খেয়ে ফেলে। স্কুলে ৫/৬ বিষয় এ ফেল করে, রিপোর্ট কার্ডে নিজে নাম্বার বসিয়ে নিয়ে আসে…
    । জন্মের পর থেকেই সে এমন শয়তান… ”
    ।আবার ট্রেন লাইনচ্যুত। বললাম- আজকে যে আপনারা এই সেন্টার এ আসলেন সেই ঘটনা টা বলবেন।
    ” আজ ও আবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলো,…( বেলাইনে যেতে চাচ্ছে ট্রেন)
    কি হয়েছিলো আজ?
    ” ওকে মেরেছি। বলেন, আপনিও তো মা, আপনার সন্তানকে কি আপনি আদব, কায়দা শেখানোর জন্য মারবেন না? বলেন আপনি মারবেন না? আমার প্রতিবেশী, ওর বন্ধবীরা, স্কুলে সবাই জানে যে ও আত্মহত্যা করতে চায়। আমিই বলেছি।
    মেয়ের কাছে জানতে চাইলাম যে সে কি আমার সাথে কথা বলতে চায়?
    মেয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।বললাম- জানতে চাইলাম একা কথা বলবে, নাকি বাবা- মার সামনে কথা বলবে? মেয়ে উত্তর দিলো একা।
    এবার মা- বাবাকে ডিউটি অফিসারের রুমে বাসার অনুরোধ করলাম।
    আসি ক্লায়েন্ট এর বর্ণনায়। বয়সঃ ১৪ বছর ২ মাস, অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী।
    ক্লায়েন্ট এর কথা বলার আগে আবারও আপনাদের একটা প্রশ্ন করি। সেটা হলো- ধরুন আপনার সম্পর্কে আপনার একজন কলিগ আপনার সামনেই সব নেগেটিভ কথা বললেন আপনার বসকে। আপনি কি এখন আর বসের সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলার আগ্রহ পাবেন? নাকি আপনার মনে হবে বসতো আমার বিষয় এ সব নেগেটিভ কথা শুনলো, এখন আমি যাই বলি না কেন, বসকি আমাকে বিশ্বাস করবে? তিনিতো আমাকে জাজ করবেন।
    ঠিক তেমনি আমার ক্লায়েন্ট এর ও মনের অবস্থা। তার সাথে র‍্যাপোর্ট বিল্ড আপটা অত সহজ ছিলো না। যাক সে সব কথা, ওটা আমার প্রফেশনাল দক্ষতা।
    আবার ফিরে আসি ক্লায়েন্ট এর বর্ণনায়।
    ভাদ্র মাসের প্রচন্ড এই গরমে সে হুডি পড়ে এসেছে, মুখে মাক্স। এত ধীরে কথা বলছে যে আমি শুনতে পারছিনা। তখন ক্লায়েন্টকে বললাম- যদি তোমার সমস্যা না থাকে তবে তুমি তোমার মাক্স খুলে কথা বলতে পারো, কারণ আমি তোমার থেকে দূরে আছি। মাক্স খোলার পরে যা দেখলাম, তার জন্য আমি মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। চোখের ঠিক নীচে জখম, একদম টাটকা, মানে যেদিনের কথা বলছি,সেদিন সকালেই বাবা মেরেছে।
    আর হুডি পড়ার কারণ হলো শরীরের বিভিন্ন জায়গায়, গলায় মারের দাগ। চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুন তো! কিভাবে সম্ভব?
    এর মধ্যে মা, গৃহকর্মী সব আবার আমার রুমে এসে বললেন- “ম্যাডাম, ও কিন্তু সব মিথ্যা কথা বলে, এইযে আমার কাজের মেয়েকে জিজ্ঞেস করে দেখেন। ও সত্যি কথা বলেই না। যদি ও সত্যি কথাই বলতো, তাহলে আমাদের সামনে কেন বললো না? আমরাতো ওর সামনেই সব কথা বললাম।”
    যাক, উনি চলে যাওয়ার পরে আমি যথারীতি সেশন শেষ করলাম।
    সন্তান আপনার, তাঁকে নিয়ে স্বপ্নও আপনাদের, কিন্তু সেই স্বপ্নতে সে কতটুকু আপনাদের কাছে?
    আমার বাবা- মা আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন, আমি তা পূরণ করতে পারি নাই, আমি আমার সন্তানকে দিয়ে তা পূরণ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছি। এই “চেন” কি কখনো ভাংবে না?

    4
    4 Comments
    • খুব খারাপ লাগছে বাচ্চাটার জন্য। কী সাংঘাতিক ট্রমার মধ্য দিয়ে সে যাচ্ছে। সন্তানের সাথে তার বন্ডিঙ্গটাই তো হয়নি। এ গমভীর লেখার ভীড়ে “শুরুতে ট্রেনকে লাইনে তুলতে সব সময় ই অনেক সময় লাগে,তবে উনার ক্ষেত্রে ট্রেনকে কারখানা থেকে বের করতেই পারছিনা।” এ জায়গাটায় বেশ মজা পেয়েছি

    • এখানে তো বাচ্চা মেয়েটির থেকে ওর বাবা-মায়ের কাউন্সিলিং করা বেশি জরুরী! শিশুদের সারল্য যারা বুঝতে পারেনা, শিশুকিশোরদের ভাবনাকে যারা মূল্যায়ন করতে জানেনা তাঁরাই তো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত!

      • অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্যারেন্টসরা এটা বোঝে না।

Skip to toolbar